খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা ও সাংবাদিকদের গাড়ি ভাঙচুর
- Update Time : ০৪:৪৬:৩৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৯ অক্টোবর ২০১৭
- / ১৬ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
জগন্নাথপুর পত্রিকা ডেস্ক :: রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে কক্সবাজার যাওয়ার পথে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে দুই দফা হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। হামলায় গণমাধ্যমের কয়েকটি গাড়িসহ অন্তত ১৫ থেকে ২০টি গাড়ি ভাঙচুর করে দুর্বৃত্তরা । এতে সংবাদকর্মীসহ আহত হয়েছেন কয়েকজন। কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে শনিবার সকালে গুলশানের বাসভবন থেকে সড়ক পথে রওনা হয়ে রাতে চট্টগ্রাম পৌঁছান বিএনপি চেয়ারপারসন। আজ তিনি কক্সবাজারের উখিয়া যাবেন। সেখানে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণ করার কথা রয়েছে তার। শনিবার সকাল পৌনে ১১টায় গুলশানের বাসা থেকে রওনা হওয়ার সময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদুসহ দলের সিনিয়র নেতারা খালেদা জিয়ার সঙ্গে ছিলেন। বহরে শতাধিক গাড়ি রয়েছে। এদিকে খালেদা জিয়াকে পথে পথে সংবর্ধনা জানিয়েছেন দলীয় নেতাকর্মীরা। স্থানে স্থানে বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরকে স্বাগত জানান। খালেদা জিয়ার এ সফর ঘিরে নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা গেছে প্রাণচাঞ্চল্য। বিএনপি নেতাকর্মীদের অবস্থান ঘিরে কুমিল্লায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিএনপি কর্মীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে ফেনী শহরে জেলার অন্য উপজেলার নেতাকর্মীদের আসতে বাধা দেয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা। বিএনপি নেতাকর্মীরা যাতে জেলা শহরে আসতে না পারে সেজন্য বিভিন্ন সড়কে গাছ ফেলে যানবাহন আটকে দেয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বিকালে ফেনী শহরে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর প্রবেশের সময় ফেনী পৌরসভার মেয়র ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা হাজী আলাউদ্দিনের মালিকানাধীন স্টার লাইন পেট্রোল পাম্পের কাছ থেকে গাড়িবহরে হামলা হয়। দুর্বৃত্তরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। এদের কারও কারও হাতে আগ্নেয়াস্ত্রও দেখা গেছে। খালেদা জিয়ার গাড়িবহরের সঙ্গে থাকা সাংবাদিকদের গাড়িতেও হামলা চালানো হয়। বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের গাড়িবহর ফেনীর ফতেপুর রেলক্রসিং অতিক্রম করার পর পরই অতর্কিতে হামলা চালানো হয়। এ সময় বিএনপির দলীয় পোস্টার ও স্টিকার লাগানো বেশকিছু গাড়ির কাঁচ ভেঙে ফেলা হয়। এসময় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট মামুনুর রশিদ মামুনসহ ৮/১০ জন আহত হন। আহতরা স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিকে চিকিৎসা সেবা নিয়েছেন। একাত্তর টিভির জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক শফিক আহমেদ বলেন, ‘অতর্কিতে ৪৫ থেকে ৫০ জন ছেলে লাঠিসোটা নিয়ে গাড়ির ওপর হামলা চালায়। আমাকে ও আমার চিত্রগ্রাহক আলম হোসেনকে তারা মারধর করে। আমাদের চ্যানেলের ক্যামেরাও ভেঙে ফেলা হয়েছে।’ এ সময় প্রথম আলো, বিবিসি বাংলা, একাত্তর, বৈশাখী, চ্যানেল আইসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। তিনি ছাড়াও এই হামলায় চ্যানেল আইয়ের সিনিয়র ক্যামেরাম্যান মোহাম্মদ মনির হোসেনসহ বেশ কয়েকজন সাংবাদিক আহত হয়েছেন। এদিকে চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে গাড়িবহর যাওয়ার সময় ফের হামলার ঘটনা ঘটে। এসময় দুই পাশ থেকে ছোড়া ইটপাটকেলে বিএনপি চেয়ারপারসনের নিরাপত্তা কর্মীদের একটি গাড়ি ও এনটিভির একটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসময় এনটিভির প্রতিবেদক হাসান মাহমুদ আহত হন। হামলার বিষয়ে গাড়িবহরে থাকা সাংবাদিকদের বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালিয়েছে। একটি মানবিক কাজে যাওয়ার পথে এ ধরনের হামলা অত্যন্ত নিন্দনীয়। এর আগে নিজের ওপর হামলার তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, তারা চায় না বিএনপি ভালো কাজ করুক। সন্ধ্যার দিকে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর ফেনী সার্কিট হাউজে পৌঁছলে সেখানে নেতাকর্মীরা তাকে স্বাগত জানান। সেখানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান, আবদুল আউয়াল মিন্টু, প্রচার সম্পাদক শহিদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, ফেনী জেলা সভাপতি আবু তাহের, সাধারণ সম্পাদক জিয়াউদ্দিন মিস্টার, সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক রেহানা আখতার রানু প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। সেখানে ঘণ্টাখানেক যাত্রা বিরতি করে খালেদা জিয়া চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হন। রাতে চট্টগ্রামে অবস্থানের পর আজ সকালে তিনি কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা দেবেন।
এদিকে গুলশানের বাসভবন থেকে রওনা হয়ে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর চট্টগ্রামে দীর্ঘ যানজটে পড়ে। সাইনবোর্ড থেকে কাঁচপুর ব্রিজ পর্যন্ত রাস্তাটিতে যানজট তীব্র আকার ধারণ করে। ওই সড়কে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন খালেদা জিয়াকে স্বাগত জানাতে। কাঁচপুর ব্রিজের পশ্চিম পাড়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সাবেক মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন ও সাবেক এমপি গিয়াস উদ্দিন, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা তৈমূর আলম খন্দকার, গোমতী সেতুর গোড়ায় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ড. খন্দকার মারুফ হোসেন এবং ব্রিজের পূর্ব পাড়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামান, যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতা মোস্তাফিজুর রহমান ভুঁইয়া দীপু, সাবেক এমপি আতাউর রহমান আঙ্গুর, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা বদরুজ্জামান খসরু, যুবদল কেন্দ্রীয় নেতা নজরুল ইসলাম আজাদ, সোনারগাঁও মোড়ে সাবেক মন্ত্রী রেজাউল করিম ও বিএনপি নেতা এটিএম কামাল, মুন্সীগঞ্জের জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল হাই, সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান রতন, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা মীর শরফত সপু সহ নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন।
কুমিল্লায় স্বাগত জানান নেতাকর্মীরা: যানজট ও গাড়ির চাকা বিকলের ভোগান্তির মধ্য দিয়ে কুমিল্লা অতিক্রম করেন বিএনপি’র চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। এ জেলার ৯৭ কিলোমিটার সড়ক অতিক্রম করতে সময় লেগেছে প্রায় আড়াই ঘণ্টা। দুপুর ২টার দিকে খালেদা জিয়া কুমিল্লার প্রবেশদ্বার দাউদকান্দিতে পৌঁছেন। পরে দাউদকান্দি, চান্দিনা, দেবিদ্বার, বুড়িচং, আদর্শ সদর, সদর দক্ষিণ, চৌদ্দগ্রামসহ আশেপাশের উপজেলা থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে সমবেত নেতাকর্মীদের দেয়া অভ্যর্থনার পয়েন্টসমূহ অতিক্রম করে বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম সীমান্ত অতিক্রম করেন। এদিকে নিরাপত্তার স্বার্থে দুপুর থেকেই মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে বিপুলসংখ্যক পুলিশ, র্যাব, ডিবি ও হাইওয়ে পুলিশের সদস্য মোতায়েন করা হয়। বিএনপি’র চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে অভ্যর্থনা জানাতে মহাসড়কের কুমিল্লা অংশের দাউদকান্দি থেকে চৌদ্দগ্রাম সীমান্ত পর্যন্ত দলীয় নেতাকর্মীরা সকাল থেকে ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে খালেদা জিয়া ও দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে অভ্যর্থনা জানাতে সমবেত হন। দাউদকান্দিতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের পক্ষে, চান্দিনায় খোরশেদ আলম, ইলিয়টগঞ্জে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের পক্ষে মুরাদনগর বিএনপি, দেবিদ্বারে সাবেক এমপি ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর সমর্থকরা, নিমসার এলাকায় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শওকত মাহমুদ, আলেখারচর এলাকায় কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাজী আমিন-উর রশিদ ইয়াছিন, পদুয়ার বাজার এলাকায় সিটি মেয়র মনিরুল হক সাক্কুর সমর্থকরা, সদর দক্ষিণের দয়াপুর থেকে সুয়াগাজী পর্যন্ত দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মনিরুল হক চৌধুরী ও চৌদ্দগ্রামে কামরুল হুদা দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে সমবেত হয়ে দলের নেত্রীকে অভিনন্দন জানান।
মুরাদনগরে পুলিশের মারধর: খালেদা জিয়াকে অভিবাদন জানাতে বেলা সাড়ে ১১টা থেকে কুমিল্লা জেলা ও মহানগর বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদলের নেতাকর্মী, সমর্থকসহ উৎসুক সাধারণ মানুষ মহাসড়কের কুমিল্লা অংশের বিভিন্ন পয়েন্টে জমায়েত হতে শুরু করে। এদিকে খালেদা জিয়াকে অভিবাদন জানানোর কর্মসূচিতে যাতে অংশ নিতে না পারে সেজন্য মুরাদনগরে বাড়িঘরে ঢুকে বিএনপি নেতাকর্মীদের মারধর করেছে পুলিশ। মুরাদনগরের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগের লোকজন ব্যারিকেড দিয়ে বিএনপির লোকদের মহাসড়কে পৌঁছতে বাধা দেয়।
নিরাপত্তার আশ্বাস পাওয়া গেছে-ফখরুল: বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কক্সবাজার যাওয়ার পথে সার্বিক নিরাপত্তাজনিত বিষয়টি নিশ্চিত করেছে পুলিশ। এমনটাই জানিয়েছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শনিবার সকালে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে ঢাকা থেকে রওনা হওয়ার আগে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, পুলিশের আইজি আমাদের আশ্বস্ত করেছেন তারা দেশনেত্রীর যে নিরাপত্তা সেটা নিশ্চিত করবেন। একইভাবে এই সফর যেন সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয় এ ব্যাপারেও তারা সহযোগিতা করবে।
জনপ্রিয়তায় শঙ্কিত হয়ে হামলা-রিজভী: এদিকে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেছেন, রোহিঙ্গাদের দেখতে কক্সবাজার যাওয়ার পথে কয়েক জায়গায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা হয়েছে। প্রশাসনের কাছে সহযোগিতা চেয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। বিকালে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে রিজভী বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কক্সবাজার যাওয়ার বিষয়টি পূর্বনির্ধারিত। রাস্তায় যেন কোনো সমস্যা না হয়, সে জন্য স্থানীয় প্রশাসনের কাছে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছিল। এরপরও পথিমধ্যে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেন, দেশে ফেরার পর খালেদা জিয়ার ডান চোখে ব্যান্ডেজ করা ছিল। তিনি লন্ডনে থাকা অবস্থায় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন দেশে ফিরে রোহিঙ্গাদের দেখতে যাবেন। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হন। কিন্তু ফেনীতে সড়কে গাছ কেটে রাখা হয়েছে, চান্দিনার কুটুম্বপুর ও মুনিতলা এলাকায় আওয়ামী লীগের ‘সন্ত্রাসীরা’ খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা করেছে। চট্টগ্রামের মিরসরাই এলাকায় বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর আওয়ামী লীগের লোকেরা হামলা চালিয়েছেন। তিনি বলেন, বিএনপির জনপ্রিয়তায় শঙ্কিত হয়ে সরকার ও ক্ষমতাসীন দল এই হামলা করেছে। বিএনপি নেত্রীকে দেখতে পথে মানুষের যে ঢল নামে, সেই ঢল থামাতে সরকার সমর্থকরা ‘নিম্ন রুচির’ পরিচয় দিয়েছেন। এসব হামলা ও বাধা দিয়ে বিএনপির জনপ্রিয়তা কমানো যাবে না। তিনি বলেন, শনিবার সকালে কক্সবাজার যাওয়ার উদ্দেশে খালেদা জিয়া যখন তার বাসভবন থেকে বের হচ্ছিলেন, তখন কয়েকটি টেলিভিশন সরাসরি সমপ্রচার করছিল। এই সমপ্রচার সরকারের নির্দেশে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।





























