১২:৫৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৬ মে ২০২৬, ২৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আল্লামা আহমদ শফীর ৫ম শ্রেণী তত্ত্ব ও বাংলাদেশের বাস্তবতা : এইচ. এম. ময়নুল হক

  • Update Time : ০৭:১৬:৫৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ জানুয়ারি ২০১৯
  • / ৪ বার নিউজটি পড়া হয়েছে

১১ জানুয়ারি ২০১৯ তারিখে দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসার বার্ষিক মাহফিল ও দস্তারবন্দী সম্মেলনে আল্লামা আহমদ শফীর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তথাকথিত সুশীল মহলে তোলপাড় চলছে। আর অল্প শিক্ষিত কিছু নামধারী আলেমরাও তাদের সাথে তাল দিচ্ছেন।

 

আহমদ শফী সাহেব নাকি বলেছেন মেয়েদেরকে ফোর/ফাইভ (চতুর্থ/পঞ্চম) শ্রেণী পর্যন্ত স্কুলে পড়ানোর জন্য। যদিও মিডিয়া শফী সাহেবের খন্ডিত বক্তব্য দিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করছে। নিম্নে উনার মূল বক্তব্যের কিছু অংশ তুলে ধরছি।

 

আল্লামা শফী বলেন, “আমাদের দেশের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মেয়েদের পড়াশোনার প্রয়োজনীয় নিরাপদ পরিবেশ নেই। অথচ মেয়েদের শিক্ষার মতো পরিবেশটাও অতি গুরুত্বপূর্ণ।

 

তিনি অভিভাবকদের সতর্ক করে বলেন, আপনাদের মেয়েদের স্কুল-কলেজে পাঠানোর ব্যাপারে সতর্ক হোন। তাঁদের শিক্ষার নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করুন”।(ইনসাফ ২৪ ডট কম)

 

কিছু সময়ের জন্য মেনে নিলাম যে, তিনি সরাসরি বলেছেন মেয়েদেরকে চতুর্থ/পঞ্চম শ্রেণীর বেশি স্কুলে পড়াবেন না। উনার এ কথা বালাটাও যুক্তিসংগত। কারণ যেখানে স্কুলে মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত নয় সেখানে কিভাবে আপনার মেয়েকে উচ্চ শিক্ষার জন্য পাঠাবেন।

 

আসুন একটু দেখে নেই বাংলাদেশের স্কুল/কলেজের বাস্তব চিত্র কি। প্রথমে দুইটি নিউজ আপনাদের সামনে তুলে ধরছি।

 

(১) ছাত্রীকে ধর্ষণ: শিবচরের সেই শিক্ষক সাসপেন্ড:১২ মে ২০১৮ সমকাল

 

প্রেমের ফাঁদে ফেলে ধর্ষণ। পরে আপত্তিকর ভিডিও ফাঁস করে দেওয়ার হুমকি। এভাবে তিন বছর ধরে ছাত্রীকে ধর্ষণ করে মাদারীপুরের শিবচরের উমেদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের লম্পট শিক্ষক রবিউল ইসলাম। অবশেষে ছাত্রীর অভিযোগের মুখে তাকে সাময়িক বরখাস্ত (সাসপেন্ড) করেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ।

 

সহকারী শিক্ষক রবিউলের বিরুদ্ধে একই বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী ১৩ মার্চ স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে তাকে তিন বছর ধরে ধর্ষণের লিখিত অভিযোগ করে। এরপরই বের হয়ে আসে ওই শিক্ষকের আরও অপকর্মের তথ্য। ছাত্রীদের ধর্ষণের মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও রেখে দিত সে। তার বিরুদ্ধে একই বিদ্যালয়ের নবম ও দশম শ্রেণির দুই ছাত্রীর পরিবার অভিযোগ আনে। এর পর রবিউল গা-ঢাকা দেয়। স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েও উত্তর পায়নি।

 

(২) বাশঁখালীতে ছাত্রীকে ধর্ষণ চেষ্টায় প্রধান শিক্ষক গ্রেফতার দৈনিক সংগ্রাম
বৃহস্পতিবার ১৯ এপ্রিল ২০১৮

 

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার খানখানাবাদ ইউনিয়নের সন্দ্বীপপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত একই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মাহবুব আলীকে (৪০) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় খানখানাবাদ ইউনিয়নের রায়ছটা গ্রাম থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

 

তো এবার ধর্ষক শিক্ষকের কাছে আপনার মেয়েকে পাঠাতে আপনি কতটুকু প্রস্তুত? তাহলে বিদ্যালয়ের মেয়েদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত হওয়ার আগ পর্যন্ত আহমদ শফী সাহেবের কথা কি অযৌক্তিক? সচেতন কোন অভিভাবক চাইবেনা তার মেয়ের সতীত্ব বিসর্জন দিয়ে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করুক। তার চেয়ে লেখাপড়া না করলেও ভালো।

 

এবার ইউকিপিডিয়া থেকে আপনাদের সামনে বাংলাদেশের স্কুল/কলেজের শিক্ষার্থী (মেয়ে) নির্যাতনের কিছু তত্ত্ব প্রমান পেশ করছি।

 

৭৬ শতাংশ কিশোরী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন নির্যাতনের স্বীকারঃ ইউকিপিডিয়া।

 

বাংশাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উপর যৌন নির্যাতনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা বা মামলাসমূহ এখানে অর্ন্তভূক্ত হয়েছে। পপুলেশন কাউন্সিলের গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বাংলাদেশের ৭৬ শতাংশ কিশোরী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়।

 

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য জানিয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি বন্ধে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিরোধ কমিটি হবে। যার ধারাবাহিকতায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হয়।

 

এনজিওদের মোর্চা গণসাক্ষরতা অভিযানের পরিচালিত এডুকেশন-ওয়াচ ২০১৭ নামক একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের অর্ধেক শিক্ষক নিজেদের নৈতিক আদর্শ মনে করেন না। আরো বলা হয়, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ৫০ শতাংশ, মাধ্যমিকের দুই তৃতীয়াংশ এবং, উচ্চ শিক্ষার ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী শিক্ষকদের নৈতিক আদর্শ মনে করেন না।

 

এখানেই শেষ নয় ইউকিপিডিয়া উল্লেখিত আরো কিছু তত্ত্ব দেখুন। তারপর না হয় আহমদ শফী সাহেবের বিরোধিতা করবেন।

 

তথ্যসুত্র সম্পাদনা ইউকিপিডিয়াঃ

 

৭৬ শতাংশ কিশোরী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন নির্যাতনের স্বীকার”। বাংলা নিউজ ২৪ ডট কম। ২৮ নভেম্বর ২০১৬।

 

“শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি হচ্ছে”। ইত্তেফাক। ০২ নভেম্বর ২০১৫।

 

“অর্ধেক শিক্ষকও নিজেদের আদর্শ ব্যক্তিত্ব বলে মনে করেন না”। প্রথম আলো। ১০ মে ২০১৮।

 

“কৌশলে স্কুলে আটকে রেখে ছাত্রীকে ধর্ষণ”। বাংলাদেশপ্রতিদিন। ৯ মার্চ ২০১৫।

 

“বই দেওয়ার নাম করে স্কুলে ডেকে ধর্ষণের চেষ্টা”। পারবাত্তানিউজ ডট কম। ৩ এপ্রিল ২০১৫।

 

“মিরপুরে স্কুলে শিশু ধর্ষণ : শিক্ষকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড”। ভোরেরকাগজ। ২৭ মে ২০১৭।

 

“ছাত্রী ধর্ষণ মামলায় শিক্ষক জেলহাজতে: স্কুল থেকে বহিষ্কার”। নিউজবাংলাদেশ। ৫ মে ২০১৬।

 

“স্কুলে বেধে রখে তিন বার ধর্ষণ : চবি ছাত্র গ্রেপ্তার”। বাংলামেইল। ১১ জুলাই ২০১৬।

 

“দৌলতপুরে শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্র ধর্ষণের মামলা”। দৈনিক সমকাল। সংগ্রহের তারিখ ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭।

 

“৯ বছরের শিশু শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার প্রধান শিক্ষক”। বিডিমর্নিং ডেস্ক। ৭ এপ্রিল ২০১৭।

 

“মৌলভীবাজারে দ্বিতীয় শ্রেণির এক শিশু ছাত্রী ধর্ষণের শিকার”। ডেইলি আলোকিত বাংলাদেশ । ২৭ মে ২০১৭।

 

“ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে শিক্ষক গ্রেফতার”। চ্যানেল অনলাইন। ১১ জুন ২০১৭।

 

“ছাত্রীকে যেভাবে স্কুলের ছাদে নিয়ে ধর্ষণ করল প্রধান শিক্ষক”। গো নিউজ২৪। ১১ জুলাই ২০১৭।

 

“বাসাইলে শিক্ষার্থীদের হাতে প্রধান শিক্ষক লাঞ্ছিত!”। দৃষ্টি টিভি। ৭ আগষ্ট ২০১৭।

 

“ছাত্রীকে নোট দেয়ার কথা বলে স্কুলে আটকে রেখে ধর্ষণ”। ১৮ আগষ্ট ২০১৭।

 

“একজন অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ”। মুক্তকথা। ২৮ আগষ্ট ২০১৭।

 

“পড়া বুঝিয়ে দেওয়ার কথা বলে ডেমরায় স্কুলে শিশু ধর্ষণ”। ডেইলি ইত্তেফাকে । ১১ অক্টোবর ২০১৭।

 

“আরেক পরিমলের উত্থান”। নিউজ২৪। ৯ নভেম্বর ২০১৭।

 

“কুলাউড়ায় স্কুল ছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টায় দপ্তরির অব্যাহতি নিয়ে ধুম্রজাল!”। সিলেটটুডে। ২০ নভেম্বর ২০১৭।

 

“গাইবান্ধায় জিম্মিকরে ছাত্রীকে ধর্ষণ, ধর্ষক শিক্ষক আটক”। বাংলাভিশন। ১১ জুলাই ২০১৬।

 

“ভালুকায় ধলিয়া বহুলী স্কুল এন্ড কলেজে ছাত্রীর ধর্ষণ চেষ্টা ভিডিও ধারণ দুই ছাত্র বহিষ্কার”। ভালুকা ডট কম । ৩০ জুলাই ২০১৬।

 

“ধর্ষণ করতে গিয়ে গণপিটুনি খেলো ছাত্রলীগ নেতা”। বাংলা ট্রিবুন। ১৩ নভেম্বর ২০১৬।

 

“ফেনী কলেজে ছাত্রী ধর্ষণ: পিয়ন কৃষ্ণচন্দ্র দাস গ্রেফতার”। বাংলানিউজ২৪। ৭ জুন ২০১৭।

 

“সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়”। আজকের পত্রিকা। ৪ মে ২০১৫।

 

“যৌন হয়রানি: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সাময়িক বরখাস্ত”। প্রথম আলো।

 

“যৌন নির্যাতনের দায়ে চাকরিচ্যুত খুবি শিক্ষক”। প্রথম আলো। ২৫ আগস্ট ২০১৭।

 

“ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ”। চ্যানেলএইটনিউজ। ২৮ জুলাই ২০১৬।

 

“যৌন হয়রানি: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক বরখাস্ত”। বিবিসি বাংলা। সংগ্রহের তারিখ ২৮ ডিসেম্বর ২০১৬।

 

“বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ধর্ষণের অভিযোগ”।
“হাজী দানেশ বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ”। ঢাকা টাইমস। ৩ জুন ২০১৭।

 

“যৌন হয়রানীর দায়ে ইবি শিক্ষক বরখাস্ত”। আমাদের অর্থনীতি। ২৪ আগষ্ট ২০১৭।

 

“চবি শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ”। ইত্তেফাক। ১৬ নভেম্বর ২০১৭।

 

এত্তসব নির্যাতনের চিত্র সামনে রেখেই তিনি বুঝাতে চেয়েছেন যে, স্কুল/কলেজে মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত “আপনাদের মেয়েদের স্কুল-কলেজে দেবেন না। বেশি হলে ক্লাস ফোর বা ফাইভ পর্যন্ত পড়াতে পারবেন। বিয়ে দিলে স্বামীর টাকা পয়সা হিসাব করতে হবে। চিঠি লিখতে হবে স্বামীর কাছে। আর বেশি যদি পড়ান, পত্রপত্রিকায় দেখছেন আপনারা, মেয়েকে ক্লাস এইট নাইন টেন এমএ বিএ পর্যন্ত পড়ালে ওই মেয়ে আপনার মেয়ে থাকবে না। অন্য কেহ নিয়ে যাবে। পত্র-পত্রিকায় এরকম ঘটনা আছে কিনা? ওয়াদা করেন। বেশি পড়ালে মেয়ে আপনাদের থাকবে না। টানাটানি করে নিয়ে যাবে আরেক পুরুষ।” (প্রথম আলো)

 

প্রিয় পাঠক দুচোখ বন্ধ করে একটু চিন্তা করুন। যদি ৭৬ শতাংশ মেয়ে শিক্ষার্থী স্কুল/কলেজে নির্যাতনের স্বীকার হয় তাহলে আহমদ শফী সাহেব কি ভুল বলেছেন।

 

আল্লামা আহমদ শফী সাহেবের বক্তব্য বুঝার মতো যোগ্যতা যাদের নেই তারাই গেলো গেলো বলে লাফাচ্ছে। জ্ঞানী ব্যক্তির কথা বুঝতে হলে সমপরিমান জ্ঞান থাকা দরকার। হয়তো আল্লামা শফী সাহেবের মতো জ্ঞান অর্জন করুন আর না হয় চুপ থাকুন।

 

লেখক: সিলেট মোবাইল 01713-814610

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ

আল্লামা আহমদ শফীর ৫ম শ্রেণী তত্ত্ব ও বাংলাদেশের বাস্তবতা : এইচ. এম. ময়নুল হক

Update Time : ০৭:১৬:৫৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ জানুয়ারি ২০১৯

১১ জানুয়ারি ২০১৯ তারিখে দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসার বার্ষিক মাহফিল ও দস্তারবন্দী সম্মেলনে আল্লামা আহমদ শফীর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তথাকথিত সুশীল মহলে তোলপাড় চলছে। আর অল্প শিক্ষিত কিছু নামধারী আলেমরাও তাদের সাথে তাল দিচ্ছেন।

 

আহমদ শফী সাহেব নাকি বলেছেন মেয়েদেরকে ফোর/ফাইভ (চতুর্থ/পঞ্চম) শ্রেণী পর্যন্ত স্কুলে পড়ানোর জন্য। যদিও মিডিয়া শফী সাহেবের খন্ডিত বক্তব্য দিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করছে। নিম্নে উনার মূল বক্তব্যের কিছু অংশ তুলে ধরছি।

 

আল্লামা শফী বলেন, “আমাদের দেশের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মেয়েদের পড়াশোনার প্রয়োজনীয় নিরাপদ পরিবেশ নেই। অথচ মেয়েদের শিক্ষার মতো পরিবেশটাও অতি গুরুত্বপূর্ণ।

 

তিনি অভিভাবকদের সতর্ক করে বলেন, আপনাদের মেয়েদের স্কুল-কলেজে পাঠানোর ব্যাপারে সতর্ক হোন। তাঁদের শিক্ষার নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করুন”।(ইনসাফ ২৪ ডট কম)

 

কিছু সময়ের জন্য মেনে নিলাম যে, তিনি সরাসরি বলেছেন মেয়েদেরকে চতুর্থ/পঞ্চম শ্রেণীর বেশি স্কুলে পড়াবেন না। উনার এ কথা বালাটাও যুক্তিসংগত। কারণ যেখানে স্কুলে মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত নয় সেখানে কিভাবে আপনার মেয়েকে উচ্চ শিক্ষার জন্য পাঠাবেন।

 

আসুন একটু দেখে নেই বাংলাদেশের স্কুল/কলেজের বাস্তব চিত্র কি। প্রথমে দুইটি নিউজ আপনাদের সামনে তুলে ধরছি।

 

(১) ছাত্রীকে ধর্ষণ: শিবচরের সেই শিক্ষক সাসপেন্ড:১২ মে ২০১৮ সমকাল

 

প্রেমের ফাঁদে ফেলে ধর্ষণ। পরে আপত্তিকর ভিডিও ফাঁস করে দেওয়ার হুমকি। এভাবে তিন বছর ধরে ছাত্রীকে ধর্ষণ করে মাদারীপুরের শিবচরের উমেদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের লম্পট শিক্ষক রবিউল ইসলাম। অবশেষে ছাত্রীর অভিযোগের মুখে তাকে সাময়িক বরখাস্ত (সাসপেন্ড) করেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ।

 

সহকারী শিক্ষক রবিউলের বিরুদ্ধে একই বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী ১৩ মার্চ স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে তাকে তিন বছর ধরে ধর্ষণের লিখিত অভিযোগ করে। এরপরই বের হয়ে আসে ওই শিক্ষকের আরও অপকর্মের তথ্য। ছাত্রীদের ধর্ষণের মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও রেখে দিত সে। তার বিরুদ্ধে একই বিদ্যালয়ের নবম ও দশম শ্রেণির দুই ছাত্রীর পরিবার অভিযোগ আনে। এর পর রবিউল গা-ঢাকা দেয়। স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েও উত্তর পায়নি।

 

(২) বাশঁখালীতে ছাত্রীকে ধর্ষণ চেষ্টায় প্রধান শিক্ষক গ্রেফতার দৈনিক সংগ্রাম
বৃহস্পতিবার ১৯ এপ্রিল ২০১৮

 

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার খানখানাবাদ ইউনিয়নের সন্দ্বীপপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত একই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মাহবুব আলীকে (৪০) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় খানখানাবাদ ইউনিয়নের রায়ছটা গ্রাম থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

 

তো এবার ধর্ষক শিক্ষকের কাছে আপনার মেয়েকে পাঠাতে আপনি কতটুকু প্রস্তুত? তাহলে বিদ্যালয়ের মেয়েদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত হওয়ার আগ পর্যন্ত আহমদ শফী সাহেবের কথা কি অযৌক্তিক? সচেতন কোন অভিভাবক চাইবেনা তার মেয়ের সতীত্ব বিসর্জন দিয়ে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করুক। তার চেয়ে লেখাপড়া না করলেও ভালো।

 

এবার ইউকিপিডিয়া থেকে আপনাদের সামনে বাংলাদেশের স্কুল/কলেজের শিক্ষার্থী (মেয়ে) নির্যাতনের কিছু তত্ত্ব প্রমান পেশ করছি।

 

৭৬ শতাংশ কিশোরী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন নির্যাতনের স্বীকারঃ ইউকিপিডিয়া।

 

বাংশাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উপর যৌন নির্যাতনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা বা মামলাসমূহ এখানে অর্ন্তভূক্ত হয়েছে। পপুলেশন কাউন্সিলের গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বাংলাদেশের ৭৬ শতাংশ কিশোরী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়।

 

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য জানিয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি বন্ধে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিরোধ কমিটি হবে। যার ধারাবাহিকতায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হয়।

 

এনজিওদের মোর্চা গণসাক্ষরতা অভিযানের পরিচালিত এডুকেশন-ওয়াচ ২০১৭ নামক একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের অর্ধেক শিক্ষক নিজেদের নৈতিক আদর্শ মনে করেন না। আরো বলা হয়, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ৫০ শতাংশ, মাধ্যমিকের দুই তৃতীয়াংশ এবং, উচ্চ শিক্ষার ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী শিক্ষকদের নৈতিক আদর্শ মনে করেন না।

 

এখানেই শেষ নয় ইউকিপিডিয়া উল্লেখিত আরো কিছু তত্ত্ব দেখুন। তারপর না হয় আহমদ শফী সাহেবের বিরোধিতা করবেন।

 

তথ্যসুত্র সম্পাদনা ইউকিপিডিয়াঃ

 

৭৬ শতাংশ কিশোরী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন নির্যাতনের স্বীকার”। বাংলা নিউজ ২৪ ডট কম। ২৮ নভেম্বর ২০১৬।

 

“শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি হচ্ছে”। ইত্তেফাক। ০২ নভেম্বর ২০১৫।

 

“অর্ধেক শিক্ষকও নিজেদের আদর্শ ব্যক্তিত্ব বলে মনে করেন না”। প্রথম আলো। ১০ মে ২০১৮।

 

“কৌশলে স্কুলে আটকে রেখে ছাত্রীকে ধর্ষণ”। বাংলাদেশপ্রতিদিন। ৯ মার্চ ২০১৫।

 

“বই দেওয়ার নাম করে স্কুলে ডেকে ধর্ষণের চেষ্টা”। পারবাত্তানিউজ ডট কম। ৩ এপ্রিল ২০১৫।

 

“মিরপুরে স্কুলে শিশু ধর্ষণ : শিক্ষকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড”। ভোরেরকাগজ। ২৭ মে ২০১৭।

 

“ছাত্রী ধর্ষণ মামলায় শিক্ষক জেলহাজতে: স্কুল থেকে বহিষ্কার”। নিউজবাংলাদেশ। ৫ মে ২০১৬।

 

“স্কুলে বেধে রখে তিন বার ধর্ষণ : চবি ছাত্র গ্রেপ্তার”। বাংলামেইল। ১১ জুলাই ২০১৬।

 

“দৌলতপুরে শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্র ধর্ষণের মামলা”। দৈনিক সমকাল। সংগ্রহের তারিখ ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭।

 

“৯ বছরের শিশু শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার প্রধান শিক্ষক”। বিডিমর্নিং ডেস্ক। ৭ এপ্রিল ২০১৭।

 

“মৌলভীবাজারে দ্বিতীয় শ্রেণির এক শিশু ছাত্রী ধর্ষণের শিকার”। ডেইলি আলোকিত বাংলাদেশ । ২৭ মে ২০১৭।

 

“ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে শিক্ষক গ্রেফতার”। চ্যানেল অনলাইন। ১১ জুন ২০১৭।

 

“ছাত্রীকে যেভাবে স্কুলের ছাদে নিয়ে ধর্ষণ করল প্রধান শিক্ষক”। গো নিউজ২৪। ১১ জুলাই ২০১৭।

 

“বাসাইলে শিক্ষার্থীদের হাতে প্রধান শিক্ষক লাঞ্ছিত!”। দৃষ্টি টিভি। ৭ আগষ্ট ২০১৭।

 

“ছাত্রীকে নোট দেয়ার কথা বলে স্কুলে আটকে রেখে ধর্ষণ”। ১৮ আগষ্ট ২০১৭।

 

“একজন অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ”। মুক্তকথা। ২৮ আগষ্ট ২০১৭।

 

“পড়া বুঝিয়ে দেওয়ার কথা বলে ডেমরায় স্কুলে শিশু ধর্ষণ”। ডেইলি ইত্তেফাকে । ১১ অক্টোবর ২০১৭।

 

“আরেক পরিমলের উত্থান”। নিউজ২৪। ৯ নভেম্বর ২০১৭।

 

“কুলাউড়ায় স্কুল ছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টায় দপ্তরির অব্যাহতি নিয়ে ধুম্রজাল!”। সিলেটটুডে। ২০ নভেম্বর ২০১৭।

 

“গাইবান্ধায় জিম্মিকরে ছাত্রীকে ধর্ষণ, ধর্ষক শিক্ষক আটক”। বাংলাভিশন। ১১ জুলাই ২০১৬।

 

“ভালুকায় ধলিয়া বহুলী স্কুল এন্ড কলেজে ছাত্রীর ধর্ষণ চেষ্টা ভিডিও ধারণ দুই ছাত্র বহিষ্কার”। ভালুকা ডট কম । ৩০ জুলাই ২০১৬।

 

“ধর্ষণ করতে গিয়ে গণপিটুনি খেলো ছাত্রলীগ নেতা”। বাংলা ট্রিবুন। ১৩ নভেম্বর ২০১৬।

 

“ফেনী কলেজে ছাত্রী ধর্ষণ: পিয়ন কৃষ্ণচন্দ্র দাস গ্রেফতার”। বাংলানিউজ২৪। ৭ জুন ২০১৭।

 

“সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়”। আজকের পত্রিকা। ৪ মে ২০১৫।

 

“যৌন হয়রানি: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সাময়িক বরখাস্ত”। প্রথম আলো।

 

“যৌন নির্যাতনের দায়ে চাকরিচ্যুত খুবি শিক্ষক”। প্রথম আলো। ২৫ আগস্ট ২০১৭।

 

“ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ”। চ্যানেলএইটনিউজ। ২৮ জুলাই ২০১৬।

 

“যৌন হয়রানি: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক বরখাস্ত”। বিবিসি বাংলা। সংগ্রহের তারিখ ২৮ ডিসেম্বর ২০১৬।

 

“বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ধর্ষণের অভিযোগ”।
“হাজী দানেশ বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ”। ঢাকা টাইমস। ৩ জুন ২০১৭।

 

“যৌন হয়রানীর দায়ে ইবি শিক্ষক বরখাস্ত”। আমাদের অর্থনীতি। ২৪ আগষ্ট ২০১৭।

 

“চবি শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ”। ইত্তেফাক। ১৬ নভেম্বর ২০১৭।

 

এত্তসব নির্যাতনের চিত্র সামনে রেখেই তিনি বুঝাতে চেয়েছেন যে, স্কুল/কলেজে মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত “আপনাদের মেয়েদের স্কুল-কলেজে দেবেন না। বেশি হলে ক্লাস ফোর বা ফাইভ পর্যন্ত পড়াতে পারবেন। বিয়ে দিলে স্বামীর টাকা পয়সা হিসাব করতে হবে। চিঠি লিখতে হবে স্বামীর কাছে। আর বেশি যদি পড়ান, পত্রপত্রিকায় দেখছেন আপনারা, মেয়েকে ক্লাস এইট নাইন টেন এমএ বিএ পর্যন্ত পড়ালে ওই মেয়ে আপনার মেয়ে থাকবে না। অন্য কেহ নিয়ে যাবে। পত্র-পত্রিকায় এরকম ঘটনা আছে কিনা? ওয়াদা করেন। বেশি পড়ালে মেয়ে আপনাদের থাকবে না। টানাটানি করে নিয়ে যাবে আরেক পুরুষ।” (প্রথম আলো)

 

প্রিয় পাঠক দুচোখ বন্ধ করে একটু চিন্তা করুন। যদি ৭৬ শতাংশ মেয়ে শিক্ষার্থী স্কুল/কলেজে নির্যাতনের স্বীকার হয় তাহলে আহমদ শফী সাহেব কি ভুল বলেছেন।

 

আল্লামা আহমদ শফী সাহেবের বক্তব্য বুঝার মতো যোগ্যতা যাদের নেই তারাই গেলো গেলো বলে লাফাচ্ছে। জ্ঞানী ব্যক্তির কথা বুঝতে হলে সমপরিমান জ্ঞান থাকা দরকার। হয়তো আল্লামা শফী সাহেবের মতো জ্ঞান অর্জন করুন আর না হয় চুপ থাকুন।

 

লেখক: সিলেট মোবাইল 01713-814610

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ