লিংকনকে ঘিরে ‘আহলে হাদিস’ বিতর্ক: আবেগের রাজনীতি, নাকি তথ্য যাচাইয়ের সময়?
- Update Time : ১২:৪১:১৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৬
- / ২০ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
নিজস্ব প্রতিবেদক :: বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবেগের প্রভাব নতুন নয়। তবে ধর্মীয় অঙ্গন, বিশেষ করে কওমি পরিমণ্ডলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে যখন আবেগ তীব্র হয়ে ওঠে, তখন অনেক সময় তথ্য যাচাইয়ের আগেই তৈরি হয় নানা ধারণা। ধর্মবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শামীম কায়সার লিংকন দায়িত্ব পাওয়ার পর এমনই একটি বিতর্ক সামনে আসে। তাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে—তিনি কি আহলে হাদিসপন্থি? কেউ কেউ এমন দাবিকে কেন্দ্র করে তীব্র প্রতিক্রিয়াও দেখান। এমনকি বিষয়টি নিয়ে হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে নিন্দা-প্রস্তাবের আলোচনা সামনে এলে কওমি অঙ্গনের অনেকেই আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—লিংকন সাহেবের ধর্মীয় অবস্থান সম্পর্কে কি যথাযথভাবে খোঁজ নেওয়া হয়েছিল? খোঁজ নিতে এগিয়ে আসেন কয়েকজন আলেম এই প্রশ্নের জায়গা থেকেই কয়েকজন আলেম বিষয়টি যাচাই করার উদ্যোগ নেন বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে। তাদের মধ্যে সম্মিলিত ইমাম খতীব পরিষদের চেয়ারম্যান মুফতি আজহারুল ইসলাম, জমিয়তের মুফতি মনির কাসেমী এবং মুফতি শরিফুল্লাহ প্রমুখের উদ্যোগ বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে। তাদের অবস্থানের মূল বিষয় ছিল—কোনো ব্যক্তিকে শুধু প্রচলিত ধারণা বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার না করে তার বক্তব্য, কর্মকাণ্ড ও বাস্তব অবস্থান সম্পর্কে আগে খোঁজ নেওয়া।
মন্ত্রী হওয়ার পর লিংকনের বক্তব্যে কী মিলল?
শামীম কায়সার লিংকন ধর্মবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর তার বিভিন্ন সফর ও বক্তব্যও আলোচনায় আসে। তার প্রথম দিকের সফরের একটি ছিল বারিধারা মাদ্রাসায়। এরপর ইসলামী ফাউন্ডেশনে দেওয়া বক্তব্যেও তার কথাবার্তায় হানাফি মাজহাবের প্রতি ইতিবাচক মানসিকতার প্রকাশ ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। এরপর তিনি সাক্ষাৎ করেন হেফাজতে ইসলামের আমিরের সঙ্গে। সেখানে তার বক্তব্যেও কওমি মাদ্রাসা ও উলামায়ে কেরামের প্রতি সম্মান ও ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে বলে উপস্থিত ব্যক্তিরা জানান। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল তার একটি বক্তব্য—দাওয়াতের ময়দানে তিনি নতুন; মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো ভুল হলে উলামায়ে কেরাম যেন তাকে সংশোধন করেন, তিনি সেটিই প্রত্যাশা করেন। এই বক্তব্যকে অনেকে দেখছেন আলেমদের সঙ্গে সংঘাত নয়, বরং পরামর্শ ও সংশোধনের পথ বেছে নেওয়ার মানসিকতা হিসেবে। তাহলে ‘আহলে হাদিস’ পরিচয়ের ভিত্তি কোথায়?
এখানেই মূল প্রশ্ন।
কোনো ব্যক্তিকে আহলে হাদিস, হানাফি, কওমি কিংবা অন্য কোনো ধর্মীয় পরিচয়ে চিহ্নিত করার আগে তার নিজের আকিদা, বক্তব্য ও দীর্ঘদিনের ধর্মীয় অবস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকা প্রয়োজন। শুধু রাজনৈতিক অবস্থান বা কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের ভিত্তিতে কারও মাজহাব বা আকিদা নির্ধারণ করা কতটা যুক্তিসঙ্গত—সেটিও ভাবার বিষয়। লিংকনের ক্ষেত্রে তাই আবেগের পরিবর্তে তথ্য, বক্তব্য ও বাস্তব কর্মকাণ্ডকে মূল্যায়নের ভিত্তি করা প্রয়োজন।
‘নিজের লোক’কে দূরে ঠেলে দেওয়ার সংস্কৃতি কি বদলাবে?
কওমি অঙ্গনে অনেকের অভিযোগ—নিজেদের পরিমণ্ডনের কোনো ব্যক্তি ভিন্ন রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক অবস্থানে গেলে তাকে দ্রুত ‘অন্য ঘরের মানুষ’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে মুফতি আজহারুল ইসলাম, মুফতি শরিফুল্লাহ ও মুফতি মনির কাসেমীর মতো আলেমরা যদি সরাসরি খোঁজখবর নেওয়ার উদ্যোগ না নিতেন, তাহলে হয়তো প্রচলিত ধারণার ভিত্তিতেই বিষয়টি আরও বড় বিভাজনে রূপ নিত। বরং তারা যদি উদ্যোগ নিয়ে একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেন, তার অবস্থান বোঝার চেষ্টা করেন এবং ভুল থাকলে সংশোধনের সুযোগ তৈরি করেন—তাহলে সেটিই হতে পারে আলেম সমাজের দায়িত্বশীল ভূমিকার উদাহরণ।
শেষ কথা
শামীম কায়সার লিংকনকে নিয়ে বিতর্কের চূড়ান্ত সত্য নির্ধারণের দায়িত্ব কোনো ব্যক্তি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নয়। তার ধর্মীয় অবস্থান সম্পর্কে সিদ্ধান্তে যেতে হলে প্রয়োজন প্রমাণ, বক্তব্য ও নির্ভরযোগ্য তথ্য।রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু মতপার্থক্যের কারণে একজনকে নিজের ঘর থেকে বের করে দেওয়ার আগে অন্তত একবার তার কাছে গিয়ে কথা বলা, তার বক্তব্য শোনা এবং সত্যতা যাচাই করা জরুরি।
কারণ—
“নিজের লোককে অন্য ঘরে ঠেলে দেওয়া সহজ; কিন্তু কাছে এনে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া—এটাই দায়িত্বশীলতার পরিচয়। ”কওমি অঙ্গনে মুফতি আজহারুল ইসলাম, মুফতি শরিফুল্লাহ ও মুফতি মনির কাসেমীদের উদ্যোগ তাই শুধু একজন মন্ত্রীর পরিচয় যাচাইয়ের বিষয় নয়; এটি হতে পারে আবেগের রাজনীতির পরিবর্তে সংলাপ, যাচাই ও পারস্পরিক সংশোধনের একটি নতুন দৃষ্টান্ত।




























