jagannathpurpotrika-latest news

আজ, , ১৪ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

সংবাদ শিরোনাম :



সুদ ব্যবসায়ীদের অত্যাচারে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক :: সর্বত্র চলছে রমরমা মহাজনী সুদের ব্যবসা মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে। সুদ গ্রহীতা সাধারণ মানুষ প্রতি মাসে সুদের টাকা সুদ দিতে নিঃশ্ব হচ্ছে। মাস শেষে সুদের টাকা দিতে না পারলে চক্রবৃদ্ধি হারে বৃদ্ধি পায় সুদ। সুদ ব্যবসায়ীদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ অনেকে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। কয়েক বছর ধরে চলছে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে সুদের ব্যবসা। সমাজের মুখোশধারী কিছু লোক উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ও বাজারে মানুষের দুর্বলতাকে কেন্দ্র করে সুদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। নিজেকে আড়ালে রেখে অন্যের নামে স্ট্যাম্প লিখে চলছে অর্থলগ্নির রমরমা ব্যবসা। এর কারণে সমাজ এবং পরিবারে বিশৃঙ্খলাও সৃষ্টি হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগে জানা যায়, উপজেলার পতনঊষার, মুন্সীবাজার, শমশেরনগর, আদমপুর, আলীনগর, মাধবপুর, সদরসহ সবক’টি ইউনিয়ন ও গ্রামগঞ্জে এক শ্রেণির অসাধু দাদন ব্যবসায়ী চড়া সুদে কৃষকদের ঋণ প্রদান করছে। এসব দাদন ব্যবসায়ীরা সুদের ব্যবসা চালিয়ে রাতারাতি ধনী হয়ে উঠছে। পাশাপাশি এনজিওর মহাজনী ঋণের কিস্তি চালাতে নিঃশেষ হচ্ছে পরিবারসমুহ।

এনজিওর ঋণ গ্রহণকারী আবুল মিয়া জানান, ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে কাজে লাগানোর পূর্বেই ঐ টাকা ভেঙে সপ্তাহের কিস্তি চালাতে হয়। ফলে সাপ্তাহিক কিস্তি দিতে গিয়ে টাকা কাজে লাগানো সম্ভব হয় না এবং ঋণের বোঝা বাড়তে থাকে।

কমলগঞ্জ উপজেলার নিম্নবিত্ত প্রায় ৯০ শতাংশ পরিবার এনজিও ও মহাজনী ঋণের জালে আটকা। এছাড়া এনজিও আর দাদন ব্যবসায়ীদের কাছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরও ঋণ গ্রহণ করার অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। এসব ঋণ গ্রহণ করে কেউ মুখ খুলে কথাও বলতে পারছেন না। অভাব-অনটনের সংসারে অশান্তি, অস্থিরতা, হতাশা ও ঝগড়াঝাঁটি লেগেই আছে।

শমশেরনগর চা-বাগানের বাসিন্দা সুমন চাষা বলেন, দৈনিক যা রোজগার করি তা এনজিওর কিস্তি পরিশোধে শেষ হয়ে যায়। পতনঊষার ইউনিয়নের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মনাই মিয়া বলেন, আমাদের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা স্থানীয় দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বাধ্য হয়ে মাসিক শতকরা দশ টাকা হার সুদে টাকা নিতে হয়। পরে মাসের পর মাস ঋণ পরিশোধ করেও সুদে-আসলে টাকা শেষ হয় না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লক্ষীপুর গ্রামের একজন কৃষক জানান, মুন্সীবাজার এলাকার এক প্রভাবশালী দাদন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে এক লক্ষ টাকা ঋণ এনে এক বছরে দ্বিগুণ টাকা দিয়েও ঋণ পরিশোধ হয়নি। ফলে নি:স্ব হয়ে পড়ছেন তার পরিবার। পতনঊষারের ধূপাটিলা গ্রামের কয়েকজন নারী জানান, গ্রামে বেশ কয়েকজন লোক সুদে টাকা দেয়। কেউ কোন সমস্যায় পড়লে তাদের কাছ থেকে সুদে টাকা নেয়া হয়। মাসিক শতকরা ১০ টাকা হারে সুদের ব্যবসা করছে।

স্থানীয় কৃষকরা বলেন, কৃষি শ্রমিকের মজুরি, সার-ডিজেল-কীটনাশক, বীজের মূল্য পরিশোধ করে চাষাবাদের পর উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে ঋণগ্রস্ত হতে হয়। এছাড়াও বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির পর তা কাটিয়ে উঠতে না পেরে এনজিও, দাদন ও মহাজনী ব্যবসায়ীদের ঋণের জালে আটকা পড়তে হচ্ছে।

রহিমপুর ইউনিয়নের বিষ্ণুপুর গ্রামের বাসিন্দা উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার প্রদীপ আচার্য্য বলেন, আমার ছোট ভাই প্রণয় আচার্য্য সুদখোর মহাজনের জ্বালায় প্রায় দুই মাস ধরে পরিবার সদস্যদের কাছ থেকে বাড়ি ছাড়া। এ পর্যন্ত তিনি ছোট ভাইয়ের ঋণ বাবদ বিভিন্ন মহাজনদের সুদের লক্ষাধিক টাকা পরিশোধ করেছেন।

কমলগঞ্জের লেখক-গবেষক আহমদ সিরাজ জানান, অভাব অনটন, বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কৃষির অনগ্রসরতা এসব নানা কারণেই দরিদ্রতার ঘেরাটোপে প্রায়শই গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষ ক্ষুদ্রঋণের আশ্রয় নিতে হয়। নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিম্ন আয়ের মানুষের এমনিতেই চুলো জ্বলছে না। এর ওপর মহাজনী সুদসহ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ও সমিতি থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি শোধের চাপে দিশেহারা।

শমশেরনগর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক (তদন্ত) শামীম আকনজী বলেন, সুদ ব্যবসায়ীরা বেপরোয়ার কথাটি শুনেছি। এছাড়া সুদ ব্যবসার টাকার জন্য কারও বাড়ি, এমনকি ব্যাংকে চেক রেখেছে- এমন ঘটনা যদি কেউ থানায় অভিযোগ করে তাহলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ ব্যাপারে কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) জয়নাল আবেদীন বলেন, এ ব্যাপারে অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ