০৬:৫৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৯ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ভিজিএফ তালিকায় নাম না থাকায় গ্রামে গ্রামে ক্ষোভ

  • Update Time : ০১:৪৬:২৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৫ মে ২০১৭
  • / ১ বার নিউজটি পড়া হয়েছে

বিশেষ প্রতিনিধি :: ভিজিএফ’এর তালিকা নিয়ে হাওর পাড়ের বেশিরভাগ গ্রামের কৃষকদের মধ্যেই ক্ষোভ বিরাজ করছে। ভিজিএফ তালিকায় অপেক্ষাকৃত দরিদ্র কৃষকদের নাম বাদ দেওয়া, দরিদ্রদের না দিয়ে প্রবাসী পরিবারের সদস্যদের দেবারও অভিযোগ রয়েছে। রোববার সকাল থেকে বিকাল ৪ টা পর্যন্ত সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দেখার হাওর পাড়ের আব্দুল্লাপুর ও দরিয়াবাজ গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে দরিদ্র অনেক কৃষক সামাজিক নিরাপত্তা সহায়তার কোন কর্মসূচীর আওতায়-ই আসেননি। সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্যরাও বলেছেন,‘অভিযোগ এবং ক্ষোভ মানুষের আছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তুলনায় ভিজিএফ কার্ড আমরা কম পেয়েছি। সকলকে দেওয়া সম্ভব হয়নি। এজন্য অনেকে ক্ষুব্ধ রয়েছেন।’ সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের আব্দুল্লাপুর ও দরিয়াবাজ দুটি পাশাপাশি গ্রাম। এই দুই গ্রামে প্রায় ২৬৫ কার্ডধারী কৃষক পরিবার রয়েছেন। এরমধ্যে ভিজিএফ’র তালিকায় ওঠেছে ৯০ পরিবারের নাম। ১০ টাকা কেজি’র চাল পায় দুই গ্রামে ৮০ পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত ৯৫ কৃষক পরিবার এখনো সহায়তার আওতায় আসেনি। এই অবস্থা কেবল দেখার হাওর পাড়ের এই দুই গ্রামে নয়। পুরো জেলাজুড়েই। আব্দুল্লাপুর গ্রামের বর্গাচাষী জ্যোতির্ময় দাস বললেন,‘নাম বললে গ্রামে মারামারি (ঝগরা-বিবাদ) হবে। আমার চেয়ে সামর্থবানরা ভিজিএফ পেয়েছে, অথচ. আমি পাইনি। আড়াই হাল (১০ একর) জমি চাষ করেছিলাম। এক হাজারে আড়াই মণ ধান দেবার কথা বলে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলাম। যাদের কাছ থেকে টাকা এনেছি কাউকে কাউকে আগামী মৌসুমে দেবার কথা বলেছি, কেউ কেউ আবার এভাবে মানছে না, তাদের টাকা কীভাবে দেই। নিজে চলি কীভাবে। ৬ সদস্যের পরিবার আমরা, কোন সহায়তাও পাইনি। দরিয়াবাজ গ্রামের দেওয়ান আলী’র স্ত্রী গোলাফি বেগম বলেন,‘কৃষি কাজ ছাড়া, আমাদের চলার কোন ব্যবস্থা নেই। ফসলের মৌসুমে কৃষি কাজ, বর্ষায় কিছু মাছ ধরে বিক্রি করা- এভাবেই চলি আমরা। এবার ১ হাল জমি আমার ছেলেরা ও তার বাবা মিলে করেছিলেন। এক ছটাক ধানও পাইনি। এখন হাওরে মাছও পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা কোন সহায়তাও পাইনি। আমরার চেয়ে যাদের অবস্থা একটু ভালও তারাও পেয়েছে।’ এই গ্রামের আব্দুজ জব্বারের ছেলে শামছুল ইসলাম একইভাবে বললেন,‘নাম বললে মন কষাকষি। বিদেশে বাবা ও ছেলে থাকে এমন পরিবারে ভিজিএফ কার্ড দেওয়া হয়েছে। অথচ আমরা ৪ ভাই আলাদা আলাদা খানা, আমরা কিছুই পাইনি।’ মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের দুই নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. জহুর আলী বলেন,‘আমার ওর্য়াডে জরীপ তালিকায় ৫১৭ পরিবারের খানা রয়েছে। এরমধ্যে ভিজিএফ বিতরণ করেছি আমরা ১৭৫ পরিবারের মধ্যে, অন্যরা আমার উপর ক্ষুব্ধ। এবার সকলেরই এক অবস্থা। বড় কৃষককের যা, দরিদ্র প্রান্তিক কৃষক বা বর্গা কৃষকের একই অবস্থা। সবাই সহায়তা চাচ্ছে। যারা পাচ্ছে, তারা ছাড়া অন্যরা গালিগালাজ করছে।’ আপনার বিরুদ্ধে গরিব মানুষকে না দিয়ে সিলেটের কালীঘাটে ব্যবসা রয়েছে এমন পরিবারকে ভিজিএফ কার্ড দেবার অভিযোগ উঠেছে কেন? এ ধরনের অভিযোগ অসত্য দাবি করে জহুর আলী বলেন, ‘কালীঘাটে ব্যবসা যাদের রয়েছে, তিনি আমাদের স্যার। আমি স্যারকে নয়। স্যারের ভাই একজন রয়েছেন প্যারালাইসিস রোগী, ওনাকে পরবর্তীতে তালিকা হলে সহযোগিতা করবো ভাবছি।’ কুমুদ রঞ্জন দাস নামে একজনের নাম তালিকায় উঠেছে। অথচ. তার চেয়ে দরিদ্র অনেকের নাম ওঠেনি? এমন প্রশ্নের জবাবে ইউপি সদস্য জহুর আলী বলেন,‘কুমুদ রঞ্জন দাসের নাম তালিকায় ওঠলেও তিনি এখনও চাল পাননি। কুমুদ বাবু চাল পেলে, আরো অনেকেই হয়তো পাবেন।’ ইউপি সদস্য জহুর আলী’র দাবি, অভিযোগ অনেকেই করতে পারেন। কিন্তু তারা স্বচ্ছতার সঙ্গেই ভিজিএফ তালিকা করেছেন। তিনি জানান, আব্দুল্লাপুরে প্রায় ৮৫ পরিবার কৃষক রয়েছেন। এরমধ্যে ৩০ পরিবার ভিজিএফ এবং ২০ পরিবার ফেয়ার প্রাইসের (১০ টাকা কেজি’র) চাল পান। ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য রেদোয়ান আলী বলেন, ‘আমার ওয়ার্ডে খানা প্রায় ৬৭৫ পরিবারের আছে, ১৪০ পরিবারকে ভিজিএফ দেওয়া হয়েছে। ১৫৯ পরিবার ফেয়ার প্রাইসের চাল পাচ্ছে, ২২ পরিবার ভিজিডি পাচ্ছে। বয়স্ক-বিধবা মিলিয়ে আরও ৭০ জনের মতো সহায়তা পাচ্ছে। এরপরও কোন সহায়তা পাচ্ছেন না এমন পরিবারের সংখ্যা বহু রয়েছে। আমার উপর এরা ক্ষুব্ধ। আমার ওয়ার্ডে আরও ২০০ ভিজিএফ হলে মানুষের ক্ষোভ কমবে।’ ওয়ার্ডের দরিয়াবাজে ১৮০ কৃষক পরিবার রয়েছে জানিয়ে রেদোয়ান বলেন,‘এই গ্রামে ভিজিএফ ৬০ পরিবার এবং ১০ টাকা কেজি’র চালও ৬০ পরিবারের মতো পায়।’ ভিজিএফ তালিকায় স্বচ্ছভাবে সকলকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে দাবি করে এই ইউপি সদস্য বলেন, ‘তালিকায় কোন প্রবাসী পরিবারের নাম নেই।’
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন,‘হাওর পাড়ের গ্রামগুলোয় ভিজিএফ চাহিদা থাকায় জেলা প্রশাসক আরও এক লাখ ভিজিএফ কার্ড চেয়ে চিঠি দিয়েছেন। ভিজিএফ তালিকায় অনিয়ম হয়েছে এ ধরনের কোন লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। পেলে সংশ্লিষ্টরা ব্যবস্থা নেবেন।’

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ

ভিজিএফ তালিকায় নাম না থাকায় গ্রামে গ্রামে ক্ষোভ

Update Time : ০১:৪৬:২৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৫ মে ২০১৭

বিশেষ প্রতিনিধি :: ভিজিএফ’এর তালিকা নিয়ে হাওর পাড়ের বেশিরভাগ গ্রামের কৃষকদের মধ্যেই ক্ষোভ বিরাজ করছে। ভিজিএফ তালিকায় অপেক্ষাকৃত দরিদ্র কৃষকদের নাম বাদ দেওয়া, দরিদ্রদের না দিয়ে প্রবাসী পরিবারের সদস্যদের দেবারও অভিযোগ রয়েছে। রোববার সকাল থেকে বিকাল ৪ টা পর্যন্ত সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দেখার হাওর পাড়ের আব্দুল্লাপুর ও দরিয়াবাজ গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে দরিদ্র অনেক কৃষক সামাজিক নিরাপত্তা সহায়তার কোন কর্মসূচীর আওতায়-ই আসেননি। সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্যরাও বলেছেন,‘অভিযোগ এবং ক্ষোভ মানুষের আছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তুলনায় ভিজিএফ কার্ড আমরা কম পেয়েছি। সকলকে দেওয়া সম্ভব হয়নি। এজন্য অনেকে ক্ষুব্ধ রয়েছেন।’ সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের আব্দুল্লাপুর ও দরিয়াবাজ দুটি পাশাপাশি গ্রাম। এই দুই গ্রামে প্রায় ২৬৫ কার্ডধারী কৃষক পরিবার রয়েছেন। এরমধ্যে ভিজিএফ’র তালিকায় ওঠেছে ৯০ পরিবারের নাম। ১০ টাকা কেজি’র চাল পায় দুই গ্রামে ৮০ পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত ৯৫ কৃষক পরিবার এখনো সহায়তার আওতায় আসেনি। এই অবস্থা কেবল দেখার হাওর পাড়ের এই দুই গ্রামে নয়। পুরো জেলাজুড়েই। আব্দুল্লাপুর গ্রামের বর্গাচাষী জ্যোতির্ময় দাস বললেন,‘নাম বললে গ্রামে মারামারি (ঝগরা-বিবাদ) হবে। আমার চেয়ে সামর্থবানরা ভিজিএফ পেয়েছে, অথচ. আমি পাইনি। আড়াই হাল (১০ একর) জমি চাষ করেছিলাম। এক হাজারে আড়াই মণ ধান দেবার কথা বলে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলাম। যাদের কাছ থেকে টাকা এনেছি কাউকে কাউকে আগামী মৌসুমে দেবার কথা বলেছি, কেউ কেউ আবার এভাবে মানছে না, তাদের টাকা কীভাবে দেই। নিজে চলি কীভাবে। ৬ সদস্যের পরিবার আমরা, কোন সহায়তাও পাইনি। দরিয়াবাজ গ্রামের দেওয়ান আলী’র স্ত্রী গোলাফি বেগম বলেন,‘কৃষি কাজ ছাড়া, আমাদের চলার কোন ব্যবস্থা নেই। ফসলের মৌসুমে কৃষি কাজ, বর্ষায় কিছু মাছ ধরে বিক্রি করা- এভাবেই চলি আমরা। এবার ১ হাল জমি আমার ছেলেরা ও তার বাবা মিলে করেছিলেন। এক ছটাক ধানও পাইনি। এখন হাওরে মাছও পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা কোন সহায়তাও পাইনি। আমরার চেয়ে যাদের অবস্থা একটু ভালও তারাও পেয়েছে।’ এই গ্রামের আব্দুজ জব্বারের ছেলে শামছুল ইসলাম একইভাবে বললেন,‘নাম বললে মন কষাকষি। বিদেশে বাবা ও ছেলে থাকে এমন পরিবারে ভিজিএফ কার্ড দেওয়া হয়েছে। অথচ আমরা ৪ ভাই আলাদা আলাদা খানা, আমরা কিছুই পাইনি।’ মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের দুই নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. জহুর আলী বলেন,‘আমার ওর্য়াডে জরীপ তালিকায় ৫১৭ পরিবারের খানা রয়েছে। এরমধ্যে ভিজিএফ বিতরণ করেছি আমরা ১৭৫ পরিবারের মধ্যে, অন্যরা আমার উপর ক্ষুব্ধ। এবার সকলেরই এক অবস্থা। বড় কৃষককের যা, দরিদ্র প্রান্তিক কৃষক বা বর্গা কৃষকের একই অবস্থা। সবাই সহায়তা চাচ্ছে। যারা পাচ্ছে, তারা ছাড়া অন্যরা গালিগালাজ করছে।’ আপনার বিরুদ্ধে গরিব মানুষকে না দিয়ে সিলেটের কালীঘাটে ব্যবসা রয়েছে এমন পরিবারকে ভিজিএফ কার্ড দেবার অভিযোগ উঠেছে কেন? এ ধরনের অভিযোগ অসত্য দাবি করে জহুর আলী বলেন, ‘কালীঘাটে ব্যবসা যাদের রয়েছে, তিনি আমাদের স্যার। আমি স্যারকে নয়। স্যারের ভাই একজন রয়েছেন প্যারালাইসিস রোগী, ওনাকে পরবর্তীতে তালিকা হলে সহযোগিতা করবো ভাবছি।’ কুমুদ রঞ্জন দাস নামে একজনের নাম তালিকায় উঠেছে। অথচ. তার চেয়ে দরিদ্র অনেকের নাম ওঠেনি? এমন প্রশ্নের জবাবে ইউপি সদস্য জহুর আলী বলেন,‘কুমুদ রঞ্জন দাসের নাম তালিকায় ওঠলেও তিনি এখনও চাল পাননি। কুমুদ বাবু চাল পেলে, আরো অনেকেই হয়তো পাবেন।’ ইউপি সদস্য জহুর আলী’র দাবি, অভিযোগ অনেকেই করতে পারেন। কিন্তু তারা স্বচ্ছতার সঙ্গেই ভিজিএফ তালিকা করেছেন। তিনি জানান, আব্দুল্লাপুরে প্রায় ৮৫ পরিবার কৃষক রয়েছেন। এরমধ্যে ৩০ পরিবার ভিজিএফ এবং ২০ পরিবার ফেয়ার প্রাইসের (১০ টাকা কেজি’র) চাল পান। ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য রেদোয়ান আলী বলেন, ‘আমার ওয়ার্ডে খানা প্রায় ৬৭৫ পরিবারের আছে, ১৪০ পরিবারকে ভিজিএফ দেওয়া হয়েছে। ১৫৯ পরিবার ফেয়ার প্রাইসের চাল পাচ্ছে, ২২ পরিবার ভিজিডি পাচ্ছে। বয়স্ক-বিধবা মিলিয়ে আরও ৭০ জনের মতো সহায়তা পাচ্ছে। এরপরও কোন সহায়তা পাচ্ছেন না এমন পরিবারের সংখ্যা বহু রয়েছে। আমার উপর এরা ক্ষুব্ধ। আমার ওয়ার্ডে আরও ২০০ ভিজিএফ হলে মানুষের ক্ষোভ কমবে।’ ওয়ার্ডের দরিয়াবাজে ১৮০ কৃষক পরিবার রয়েছে জানিয়ে রেদোয়ান বলেন,‘এই গ্রামে ভিজিএফ ৬০ পরিবার এবং ১০ টাকা কেজি’র চালও ৬০ পরিবারের মতো পায়।’ ভিজিএফ তালিকায় স্বচ্ছভাবে সকলকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে দাবি করে এই ইউপি সদস্য বলেন, ‘তালিকায় কোন প্রবাসী পরিবারের নাম নেই।’
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন,‘হাওর পাড়ের গ্রামগুলোয় ভিজিএফ চাহিদা থাকায় জেলা প্রশাসক আরও এক লাখ ভিজিএফ কার্ড চেয়ে চিঠি দিয়েছেন। ভিজিএফ তালিকায় অনিয়ম হয়েছে এ ধরনের কোন লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। পেলে সংশ্লিষ্টরা ব্যবস্থা নেবেন।’

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ