মুসলিম নির্যাতন ও নিধন : উত্তরণ কোন পথে? : হাফিজ মাওলানা সৈয়দ রেজওয়ান অাহমদ
- Update Time : ১০:০৩:৪৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মার্চ ২০১৯
- / ৫ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
আজ অধিক সংখ্যক মুসলমানের দেশে মুসলমানদে নির্যাতন ও নিধন করা হচ্ছে। চারদিকে আজ নির্যাতিত নিষ্পেষিত মুসলমানের কান্না শোনা যাচ্ছে।
জাগ্রত কোন বিবেক আল্লাহু আকবার ধ্বনির আওয়াজ শুনায়ে জাগাবে কী?
আজ থেকে প্রায় ১৫০০ শত বছর পূর্বে মহানবী সা. বলেছিলেন, ‘এমন এক সময় আসবে যখন মুসলমানরা সংখ্যায় অধিক হবে, তদুপরি তারা কাফের-মুশরিক, নাস্তিক-মুরতাদ তথা বিধর্মী পরাশক্তির ফেলা জালে আবদ্ধ হয়ে নানা বিপদের সম্মুখীন হবে।’ এর কারণ হবে তারা ঐক্যের বন্ধনে থাকবে না।
ঐক্যবদ্ধতার গুরুত্ব অপরিসীম। মহান রাব্বুল অালামিন আল কুরআনে সমস্ত মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ থাকার তাগিদ দিয়েছেন। ইরশাদ হচ্ছে, অর্থাৎ “তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধর, আর পরস্পর পৃথক হয়ো না।” (আল্-কুরআন ৩ : ১০৩ ) ঐক্যতা সম্পর্কে মহানবী সা. বলেছেন, অর্থাৎ ‘আল্লাহর সাহায্য দলবদ্ধ জামাতের ওপর।’ যেখানে ঐক্য নেই সেখানে খোদায়ি সাহায্য আশা করা আকাশ কুসুম ছাড়া কিছুই নয়। এ থেকেই আমরা অনুভব করতে পারি মুসলমানদের অধঃপতনের পেছনে মূল কারণ কী?
মুসলিম উম্মাহর পতনের কারণ :
৪র্থ খলীফা হযরত আলী রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, মহানবী সা. বলেছেন, মানুষের সামনে এমন একটা যুগ আসবে যখন নামমাত্র ইসলামের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না, আল-কুরআনের আক্ষরিক তিলাওয়াত ছাড়া আর কিছুই থাকবে না। তাদের মসজিদগুলো হবে বাহ্যিক দিক দিয়ে জাঁকজমকপূর্ণ কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা হবে হেদায়াতশূন্য। আর তাদের আলেমগণ হবে আকাশের নিচে জমিনের উপরে সবচেয়ে নিকৃষ্ট। কারণ তাদের মধ্য থেকে দ্বীন সম্পর্কে ফিতনা প্রকাশ পাবে। অতঃপর সে ফিতনা তাদের দিকেই প্রত্যাবর্তন করবে।” (বায়হাকী)
মহানবী সা. মুসলিম উম্মাহর পরবর্তী অবস্থা সম্পর্কে যেসব ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন তার মধ্যে রয়েছে-
১. নামে মাত্র ইসলাম নাম থাকবে :
মানবতার কল্যাণে যে ইসলাম বা জীবন ব্যবস্থা পৃথিবীতে এসেছে সেই ইসলামের বাস্তব প্রতিফলন সমাজে থাকবে না। শুধু নামে থাকবে ইসলাম। মহাগ্রন্থ আল-কোরআনে দলে দলে বিভক্ত হওয়ার বিষয়ে সতর্কবাণী উল্লেখ পূর্বক খুবই সূক্ষ্মভাবে ঘোষণা করেছেন, “তারপর লোকেরা তাদের মাঝে তাদের দ্বীনকে বহুভাগে বিভক্ত করেছে। প্রত্যেক দলই তাদের কাছে যা আছে তা নিয়ে উৎফুল্ল।” (আল কুরআন ২৩ : ৫৩)। “যারা নিজদের দ্বীনকে বিভক্ত করেছে এবং যারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে (তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না)। প্রত্যেক দলই নিজদের যা আছে তা নিয়ে আনন্দিত।” (আল কুরআন ৩০ : ৩২)
২. আল-কুরআনের আক্ষরিক তিলাওয়াত ছাড়া আর কিছুই থাকবে না:
কুরআনকে সম্পূর্ণভাবে মেনে চললে সকল সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে। এ সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, “আর আমি তোমার ওপর কিতাব নাজিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনা, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ।” (আল কুরআন- ১৬ : ৮৯)। বর্তমান সময়ের মুসলমানগণ আল-কুরআনকে তিলাওয়াত সর্বস্ব কিতাবে পরিণত করেছে। এ কথার দ্বারা এটা মনে করার সুযোগ নেই যে, কোরআন তিলাওয়াত করা যাবে না। বরং আল-কুরআন তিলাওয়াত করলে আপনি অবশ্যই প্রতি হরফে ১০টি করে নেকি পাবেন। আল-কুরআনের হক হচ্ছে তাকে তিলাওয়াত করতে হবে, জানতে হবে, বুঝতে হবে, বাস্তব জীবনে কুরআনের বিধান মেনে চলতে হবে।
৩. হেদায়াতশূন্য জাঁকজমকপূর্ণ মসজিদ : রাসূল সা.-এর জামানায় মসজিদ ছিল সকল কাজের কেন্দ্রবিন্দু। তখন রাষ্ট্রীয় সচিবালয় ছিল মসজিদ। এখানে মানুষ নামাজ আদায় করত, নসীহত শুনত, তালিম-তারবিয়াত হতো, মতনৈক্যের ফয়সালা করা হতো। বর্তমানে আমাদের সমাজে নামাজ আদায় করা ছাড়া মানুষের পরিবর্তনের জন্য উপযুক্ত স্পৃহা দেয়া হচ্ছে বলে মনে হয় না। মুসলিম বিদ্বেষীদের মোকাবেলায় সাহসী কোন রাহবার এগিয়ে অাসা সমময়ের দাবী বলে করছি।
মুসলিম জাতির আদর্শিক পিতা হযরত ইবরাহীমের আ.-এর আদর্শ অনুসরণ করত রাসূল সা. একটি সুসংগঠিত জাতি তৈরি করেছিলেন। আমরা আজ সে আদর্শে উদাসীন হয়ে নানা দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছি। এ যেন মহনবীর সেই মহাবাণীর জ্বলন্ত প্রমাণ। রাসূল (সা.) বলেছেন, “বনি ইসরাঈলরা বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছিল আর আমার উম্মতরা তেহাত্তর দলে বিভক্ত হয়ে যাবে। তন্মধ্যে একটি ছাড়া বাকিরা জাহান্নামে যাবে। সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন সে দল কোনটি? রাসূল সা. বললেন, ‘আমি আমার সাহাবিদের নিয়ে যে কাজ করেছি এ কাজগুলো যারা করবে তারাই হবে জান্নাতি’। (তিরমিজি) এ সকল দলগুলো তৈরি হয়েছে খোলাফায়ে রাশেদীনের পর থেকে অদ্যাবধি সমাজের এক শ্রেণির আলেমগণের মাধ্যেমে।
বর্তমান সময়ে সারা পৃথিবীর মুসলমানরা নানা দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে এটাই মুসলিম বিশ্বের পতনের বহুবিধ কারণের মধ্যে অন্যতম একটি কারণ। একজন মুসলমান আর একজন মুসলমানকে বরদাস্ত করতে পারে না। বাংলাদেশেও বর্তমানে সবচেয়ে বেশি অনৈক্য, দলাদলি ও বিভেদ রয়েছে মুসলমানদের মধ্যে।
এমতাবস্থায় আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে কোরআন-সুন্নাহ, মহানবী সা ও সাহাবায়ে কেরামদের জীবনাদর্শ বেশি বেশি চর্চা করে করে নিজেদের মধ্যে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করি এবং অপর মুসলমান ভাইকে নবীজী সা. ও সাহাবাবায়ে কেরামের অাদর্শ বাস্তবায়নে উদ্ধুদ্ধ করি। বিজয় মুসলমানদের হবেই। ইনশাল্লাহ।
লেখক: অধ্যক্ষ, সৈয়দপুর ফাজিল মাদ্রাসা, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ।




























