সিলেটে দিনে হয় উৎসব, রাতে আতঙ্কের নগরী!
- Update Time : ০৪:০৮:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৫ জুলাই ২০১৮
- / ০ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
জগন্নাথপুর পত্রিকা ডেস্ক :: সমানতালে চলছে প্রচারণা। মাইকিং, মিছিল, শোডাউন, গণসংযোগে কেউ কারো থেকে পিছিয়ে নেই। বাধা নেই, নেই হট্টগোল। ফেস্টুন, পোস্টারে ছেঁয়ে গেছে পুরো নগরী। পিছিয়ে নেই কেউ কারো থেকে। ৭ মেয়র প্রার্থীর পাশাপাশি বিভিন্ন ওয়ার্ডের স্থানীয় কাউন্সিলর প্রার্থীর প্রচারণাও চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে বেলা দুইটার পর থেকে প্রচার মাইকের দখলে শহর। খণ্ড খণ্ড মিছিল আর প্রচারপত্র বিলি চলতে থাকে সন্ধ্যা অবদি। তবে এ চিত্র দিনের। দিনে প্রচার-প্রচারণায় হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চললেও রাতের বেলার চিত্র অনেকটা ভিন্ন। বাড়ি বাড়ি পুলিশের অভিযান আর গ্রেপ্তারের ভয়ে আতঙ্কে থাকেন অনেকে। ভয়ে নিজ বাড়িতে রাতযাপন করেন না তারা। একপ্রকার গা-ঢাকা দিয়েই থাকতে হয়। দিনের ভোট উৎসবে সব পক্ষের অংশগ্রহণ থাকলেও, রাতের এই আতঙ্ক একপক্ষের। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে। শুধু রাজনীতিবিদ নন, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবী নগরবাসীকেও টার্গেট করা হচ্ছে এই অভিযানে। এক্ষেত্রে সরকারদলীয় মেয়র প্রার্থীর নেতাকর্মী-সমর্থকরা সম্পূর্ণ নিরাপদ। বিএনপি ও জামায়াত বলছে, নির্বাচনী মাঠ দখলে নিতে এবং অরাজকতা সৃষ্টি করতে পরিকল্পিতভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বদর উদ্দিন কামরান বলছেন, গ্রেপ্তারকৃতরা বিভিন্ন মামলার আসামি। এক্ষেত্রে পুলিশ তাদেরকে গ্রেপ্তার করতেই পারে। এসব আসামিকে এড়িয়ে চলতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের পরামর্শও দেন কামরান।
গত কযেকদিন সিলেট সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, দিনের বেলা উৎসবমুখর পরিবেশেই চলছে প্রার্থীদের প্রচারণা। নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে প্রচারণায় মুখর হয়ে উঠছে ভোটের মাঠ। মেয়র প্রার্থীদের পাশাপাশি ২৭ ওয়ার্ডের ১৯৩ জন সাধারণ ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থীর প্রচারণাও চলছে জোরেশোরে। সিলেট নগরপিতার আসনে বসতে এবার ৭ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী বদরুজ্জামান সেলিম বসে যাওয়ায় নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন ৬ জন। তিন প্রার্থী আওয়ামী লীগের বদর উদ্দিন কামরান, সদ্য বিদায়ী মেয়র বিএনপির আরিফুল হক চৌধুরী ও জামায়াতের আমীর নাগরিক ফোরামের প্রার্থী এহসানুল মাহবুব জুবায়ের গণসংযোগে ভোর থেকে রাত পর্যন্ত ব্যস্ত থাকছেন। অন্যদিকে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় খণ্ড খণ্ড মিছিল, প্রার্থীর পক্ষে গণসংযোগ ও প্রচারপত্র বিলি করছেন তাদের অনুসারীরা। নগরের বিভিন্ন পয়েন্টে, অলিতে-গলিতে শোভা পাচ্ছে তাদের পোস্টার, ফেস্টুন। প্রচার-প্রচারণায়ও হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে সবখানে। ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে নির্বাচনী মাঠেও হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। যোগ্য ও জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে কেউ কাউকে পিছিয়ে রাখতে পারছেন না। সাদা চোখে দিনের এ চিত্র দেখে একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের স্বপ্ন দেখছেন নগরবাসী। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সিলেটের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সমপ্রীতির কারণেই একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে।
তবে দিনের এ চিত্র রাতে একেবারেই অনুপস্থিত। প্রথমদিকে রাতেও সমানতালে প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছে প্রার্থীরা। কিন্তু নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসছে, আর পাল্টে যাচ্ছে এই চিত্র। সরকারদলীয় প্রার্থীর বাইরে অন্যদের জন্য রাত এখন আতঙ্ক। তাই প্রচারণার পরিবর্তে গ্রেপ্তার এড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন নেতাকর্মীরা। এমনকি নিজের বাড়িতেও অবস্থান করতে পারছেন না তারা। রাত হলেই তাদের খুঁজে নিতে হয় নিরাপদ কোনো আশ্রয়। সিলেটের একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুমারপাড়া, নয়া সড়ক, কাজিটুলা, শাহী ঈদগাহ, মিরাবাজার, শিবগঞ্জ, শেখঘাটসহ নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে রাত ১২টা বা তারও পর দোকানপাট খোলা রাখা হতো। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে ১০টা না বাজতেই দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। ব্যসায়ীদের অভিযোগ, গভীররাতে পুলিশ ওই এলাকায় অভিযান চালায়। পুলিশি এই অভিযান এড়াতে তারা নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ব্যবসা গুটিয়ে নেন।
এদিকে গত সেমাবার রাতেও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। মঙ্গলবার ভোরে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বিএনপি প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর ঘনিষ্ঠজন জুরেজ আবদুল্লাহ গুলজারকে। তার পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, সোমবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে নগরীর হাওয়াপাড়ার বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, বিএনপির দলীয় একটি মারামারি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে সিলেটে রোববার ভোর ৪টার দিকে জেলা মুক্তিযোদ্ধা দলের আহ্বায়ক বিএনপি নেতা মুক্তিযোদ্ধা আবদুুর রাজ্জাকের ছেলে রুহেন রাজ্জাককে আটক করেছে পুলিশ। পরিবারের সদস্যরা জানায়, গভীর রাতে পুলিশ আবদুর রাজ্জাকের রায়নগর রাসোস ৬০নং বাসায় ব্যাপক তল্লাশি চালিয়ে তাকে না পেয়ে তার ছেলে রুহেন রাজ্জাককে ধরে নিয়ে যায়। বৃহস্পতিবার রাতে আটক করা হয় ধানের শীষের দুই কর্মী। প্রথমে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি অস্বীকার করে। ঘটনার প্রতিবাদে আরিফ তার লোকজন নিয়ে উপপুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেয়। পরে তাদেরকে ওসমানী থানার একটি মামলায় গ্রেপ্তারের কথা জানায় পুলিশ। পরে এ ঘটনায় গত রোববার রাতে পুলিশি কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগ এনে ৩৯ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করে পুলিশ। ওই মামলায় গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ প্রতিদিনই বিএনপির কর্মী সমর্থকদের বাড়িতে হানা দিচ্ছে। এসব ঘটনায় বিএনপি নেতাকর্মীরা অনেকটাই বাড়ি ছাড়া। এ ব্যাপারে বিএনপির সিলেট মহানগর সহসভাপতি সালেহ আহমেদ খসরু বলেন, পুলিশি হয়রানির কারণে তাদের বেশির ভাগ নেতাকর্মী রাতে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। তিনি নিজেও রাতে বাড়িতে থাকেন না। এই নেতা বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই ভূমিকার কারণে শান্ত সিলেটের নির্বাচনী পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই।
এদিকে রাতে পুলিশি হয়রানির এই অভিযোগের ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই আরেক মেয়র প্রার্থী এহসানুল মাহবুব জুবায়েরও। অভিযোগ, তার নেতাকর্মীদের বাড়িতে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। ফলে তাদের অনেক নেতাকর্মীই রাতে গা-ঢাকা দেন।



























