নবীজি (সা.) ও সাহাবিদের সময়ে কুরবানির ঈদ কেমন ছিল?
- Update Time : ০৫:০৩:০৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৩ মে ২০২৬
- / ২ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
ডেস্ক রিপোর্ট :: মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা কেবল আনন্দের দিন নয়; এটি ত্যাগ, আনুগত্য, তাকওয়া এবং আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের এক মহিমান্বিত প্রতীক। এই ঈদের মূল ইতিহাস জড়িয়ে আছে হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর অবিস্মরণীয় কোরবানির ঘটনার সঙ্গে। মহান আল্লাহর নির্দেশে নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস উৎসর্গ করার যে অনন্য দৃষ্টান্ত তাঁরা স্থাপন করেছিলেন, তা আজও মুসলিম উম্মাহকে আত্মত্যাগের শিক্ষা দেয়।
ঈদুল আজহার প্রকৃত সৌন্দর্য ফুটে উঠেছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের জীবনে। তাদের ঈদ ছিল আড়ম্বরহীন, কিন্তু তাকওয়া, ইবাদত, মানবিকতা ও ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। কেমন ছিল সেই সময়ের কুরবানির ঈদ? চলুন জেনে নেওয়া যাক।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে জিলহজের চাঁদ দেখা যাওয়ার পর থেকেই ঈদুল আজহার প্রস্তুতি শুরু হয়ে যেত। সাহাবায়ে কেরাম এ সময় বেশি বেশি নফল ইবাদত করতেন, নিজেদের আত্মশুদ্ধিতে মনোযোগ দিতেন এবং তাকওয়া অর্জনের চেষ্টা করতেন। কুরবানিদাতারা চুল ও নখ না কাটার সুন্নতের প্রতি গুরুত্ব দিতেন।
হজরত হাফসা (রা.) থেকে বর্ণিত—
أَرْبَعٌ لَمْ يَكُنْ يَدَعُهُنَّ النَّبِيُّ ﷺ: صِيَامُ عَاشُورَاءَ، وَالْعَشْرُ، وَثَلَاثَةُ أَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ، وَرَكْعَتَانِ قَبْلَ الْغَدَاةِ
‘নবীজি (সা.) চারটি আমল কখনো ছাড়তেন না— আশুরার রোজা, জিলহজের প্রথম দশকের রোজা, প্রতি মাসে তিনটি রোজা এবং ফজরের আগে দুই রাকাত সুন্নত।’ (নাসাঈ ২৪১৬)
তখনকার ঈদ প্রস্তুতি ছিল বাহ্যিক সাজসজ্জার চেয়ে বেশি আধ্যাত্মিকতা, ইবাদত ও আল্লাহভীতির ওপর ভিত্তি করে।
নবীজি (সা.)-এর ঈদের দিন
ঈদের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.) ছোট-বড় সবার আনন্দের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতেন। বৈধ বিনোদনের প্রতিও তাঁর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। একবার ঈদের দিনে আবিসিনিয়ার কিছু লোক মদিনায় লাঠিখেলা প্রদর্শন করছিল। হজরত আয়েশা (রা.) খেলা দেখার আগ্রহ প্রকাশ করলে নবীজি (সা.) নিজেই তাকে পাশে দাঁড় করিয়ে খেলা দেখার সুযোগ করে দেন এবং খেলোয়াড়দের উৎসাহিত করেন।
মহানবী (সা.)-এর ঈদ উদযাপনে ছিল পরিচ্ছন্নতা, সরলতা, ইবাদত ও মানবিকতার অপূর্ব সমন্বয়। ঈদের দিন তিনি গোসল করতেন, সুগন্ধি ব্যবহার করতেন এবং উত্তম পোশাক পরিধান করতেন। ঈদুল আজহার দিন নামাজের আগে কিছু খেতেন না; কুরবানির গোশত দিয়েই প্রথম আহার করতেন।
তিনি এক রাস্তা দিয়ে ঈদগাহে যেতেন এবং অন্য রাস্তা দিয়ে ফিরে আসতেন। সাহাবিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন এবং সমাজের গরিব, অসহায় ও দুঃখী মানুষের খোঁজখবর নিতেন। ঈদের আনন্দ যেন কেবল বিত্তবানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে, সে বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।
নবীজি (সা.)-এর কুরবানি
ঈদুল আজহার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো কুরবানি। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ হাতে কুরবানি করতেন এবং ঈদের খুতবায় সাহাবিদের কুরবানির তাৎপর্য শিক্ষা দিতেন।
তিনি সাধারণত দুটি শিংওয়ালা সাদা-কালো বর্ণের বকরি কুরবানি করতেন। তবে বিদায় হজের সময় তিনি ১০০টি উট কুরবানি করেছিলেন। কুরবানি করার সময় তিনি আল্লাহর নাম উচ্চারণ করতেন এবং তাকবির দিতেন। কখনো সবার সামনে ঈদগাহেই কুরবানি করতেন। কুরবানির পশু নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন এবং ত্রুটিযুক্ত পশু কুরবানি করতে নিষেধ করেছেন।
তিনি কুরবানির গোশত নিজেও খেতেন এবং আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র মানুষের মাঝে বণ্টন করে দিতেন।
সাহাবিদের ঈদুল আজহা উদ্যাপন
সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সরাসরি শিক্ষাপ্রাপ্ত সৌভাগ্যবান মানুষ। ঈদুল আজহা উদযাপনের ক্ষেত্রে তারা সুন্নতের অনুসরণে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। নবীজি (সা.)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী তারা কুরবানির পশু নির্বাচনে যত্নবান হতেন। অনেকে আগে থেকেই পশুর পরিচর্যা করতেন এবং কুরবানির পর গরিবদের মাঝে গোশত বণ্টন করে দিতেন।
ঈদের দিন সাহাবিরা পরস্পরকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলতেন—
تَقَبَّلَ اللَّهُ مِنَّا وَمِنْكُمْ
‘আল্লাহ আমাদের ও তোমাদের নেক আমল কবুল করুন।’
সাহাবিদের কোরবানি ও তাকওয়ার শিক্ষা
মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করে সাহাবায়েকেরাম প্রতিবছর সামর্থ্য অনুযায়ী কুরবানি করতেন। কুরবানির পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে সওয়াবের সুসংবাদ তাদের হৃদয়ে আনন্দ ও উৎসাহ সৃষ্টি করত। তারা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন, কুরবানির মূল উদ্দেশ্য শুধু পশু জবাই নয়; বরং আল্লাহ তাআলার প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ এবং তাকওয়া অর্জন। তাই ত্যাগ, আনুগত্য ও খোদাভীতির শিক্ষা তারা নিজেদের জীবনাচরণে বাস্তবায়ন করেছিলেন।
নবীজি (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের ঈদুল আজহা ছিল সরলতা, তাকওয়া, মানবিকতা ও আত্মত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্ত। আজকের যুগে ঈদের বাহ্যিক চাকচিক্য যতই বাড়ুক না কেন, প্রকৃত ঈদের সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং আন্তরিক ইবাদতের মধ্যে। তাই আমাদের উচিত কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করা এবং নবীজি (সা.) ও সাহাবিদের আদর্শ অনুসরণ করে ঈদুল আজহাকে অর্থবহ করে তোলা।




























