ইফতারি প্রথা সিলেট অঞ্চলের সংস্কৃতি, অপসংস্কৃতি নয়!
- Update Time : ১০:১২:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ জুন ২০১৮
- / ৪ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
সালাহ উদ্দিন সাজু
আমাদের সমাজে অনেক সংস্কার বা সংস্কৃতি রয়েছে, যেগুলো আমাদের পূর্র্ পুরুষরা খুব মেনে চলতেন, কিন্তু আজ আমাদের অতি আধুনিকতার জন্য তা কু-সংস্কারে পরিণত হচ্ছে। আবার আমাদের ধারাই অনেক কু-সংস্কার বিলুপ্ত হচ্ছে। প্রথমেই আমাদের জানতে হবে এটা আমরা কোথায় পেলাম এবং কি রকম ভাবে এসেছে, আমরা কিভাবে পালন করছি?
বৃহত্তর জনপদ সিলেট, নিজস্ব ইতিহাস-ঐতিহ্যে ভাস্বর। আপন স্বকীয়তায় এখানকার মানুষ উদ্ভাসিত। সিলেটের মানুষের চাল-চলন, আতিথেয়তা, সংস্কৃতি, স্বতন্ত্র ঐতিহ্যের সুনাম দেশ ছাড়িয়ে সুদূর বিদেশেও বিস্তৃত। অতিথি আপ্যায়নে সিলেটের মানুষের রয়েছে দারুণ সুখ্যাতি।
তেমনি অতিথি হিসেবে কারো বাড়িতে যাবার সময় নানান কিসিমের মৌসুমী ফল-ফলাদি, মিষ্টি-মিঠাই বা পছন্দমতো যে কোনো জিনিস সঙ্গে করে নেওয়ার রেওয়াজও এখানে অনেক পুরনো। বিশেষ করে সিলেটের একান্ত আপন ঐতিহ্য হচ্ছে রমজান মাসে মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে ইফতারি নিয়ে যাওয়ার রেওয়াজ। সিলেটি ভাষায় যেটাকে বলা হয় ‘ফুরির বাড়ি ইফতারি’।
সিলেটের বেশ কয়েকজন প্রবীণ ও বয়স্ক ব্যক্তির সঙ্গে আলাপ করে জানা গেল, রমজান মাসে জামাই বাড়িতে (মেয়ের শ্বশুরবাড়ি) ইফতারি দেওয়া সিলেটের বহুল প্রচলিত ঐতিহ্য। আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে ইফতারি দেওয়ার রীতি আবহমানকাল ধরে চলে আসছে।
আধুনিকতার এই যুগেও অনেকে নতুন আত্মীয়ের বাড়ির ইফতার খাবার জন্য সুদূর প্রবাস থেকেও দেশে আসেন। আবার অনেকের মেয়ে জামাইয়ের সঙ্গে বিদেশে থাকলেও লোক মারফত জামাইর দেশের বাড়িতে ইফতারির জন্য টাকা প্রেরণ অথবা ইফতারি প্রদান করতে শোনা যায়।
নিজ উদ্যোগে আত্বীয় স্বজনদের নিয়ে সওয়াবের আশায় ইফতারের আয়োজন এবং বায়না করে শশুর বাড়ী থেকে ইফতারী খাওয়া এক নয়। মেয়ের বাড়ী থেকে যদি নিজ উদ্যোগে ইফতারী নিয়ে মেয়ের শশুর বাড়ীতে জামাই, বিয়াই, বিয়াইনদের সাথে ইফতার করেন সেটা সামাজিক সুস্থ প্রথার অন্তর্ভূক্ত।কিন্তু অপর দিকে যদি কেউ বাধ্য করে ইফতারী খায় তবে তা কখনো রমজানের পবিত্রতা রক্ষার মধ্যে পরে না। রমজানের পবিত্রতা রক্ষা হবে তখনই যখন অন্যকে কষ্ট থেকে রক্ষা করা যাবে, অশান্তি থেকে সরিয়ে নিয়ে আসা যাবে।
বর্তমান সময়ের দাবী পবিত্র রমজান মাসে ঢাকডোল পিটিয়ে শশুর বাড়ী থেকে চূক্তি করে ইফতারী খাওযার প্রথাকে সমাজ থেকে বিতারিত করা।
ঢাকডোল পিটিয়ে এবং বায়না করে ইফতারী খাওয়ার পক্ষে আমি নই, তবে আমি যতটুকু বুঝি, একটা মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার সময় হলে তার পরিবার যে কতটুকু সাফার করে তা একমাত্র ভুক্তভুগীরাই জানে। আমরা শুধু ইসলাম নিয়ে টানা হেছড়া করতেছি, যার জন্য এই ইসলাম ধর্ম আজ প্রতিষ্ঠিত, আমাদের রাসুল করিম (সঃ)’এর মেয়ের যখন বিয়ে হয়েছিল তখন কিভাবে হয়েছিল আর এখন কিভাবে হচ্ছে। এই জায়গাটা কি একটু লক্ষ্য করার দরকার না? আজকাল কিছু কিছু লোকের টাকা হয়ে গেছে তাই নাম প্রচারের জন্য ঢাকডোল পিটিয়ে ইফতারী খাওয়ানোর প্রবনতা বৃদ্ধি পাইছে। তাই বলে আগুন দেখে ফরিং জলে পুড়ে মরার দরকার কি? আজ পর্যন্ত তো দেখলাম না যে, গাড়ি দিতে হবে, নগদ বিশলাখ টাকা দিতে হবে, বিশ বড়ি স্বর্ন দিতে হবে, এই যে যৌতুক প্রথাটা চলছে তার বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে বা একটা ষ্টেটাস দিতে। ঐ যৌতুক প্রথাটা কি ইসলাম ধর্মে হারাম না? একটা মেয়ের বিয়ে দিতে ৫থেকে ৭লাখ টাকা খরচ হচ্ছে, অপর দিকে বিয়ের ১ম বছর ইফতারী বাবত খরচ হচ্ছে ১০থেকে ১২হাজার টাকা।তার মানে কি এই নয় যে, ‘গাছের গোড়ায় পোকা রেখে আগায় ধরে টানাটানি’।
বর্তমান সমাজে হাতে গোনা কিছু পরিবারে অপসংস্কৃতির ইফতারী বিদ্যমান রয়েছে। আর এটা থেকে পরিত্রানের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন জনসচেনতা। যুব সমাজকেই এই সচেতনতা বৃদ্ধিতে
কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। সবচেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে নারীদের সচেতন করা। নারীদের কানাকানি আর ফিসফিসানি অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন অপসংস্কৃতি চমৎকার কারণ। যেমন ইচ্ছানুযায়ী আত্বীয় স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীদেরকে নিয়ে ইফতার করা হল সুস্থ সংস্কৃতি ও সয়াবের কাজ, অপরদিকে চাপিয়ে দেওয়া ইফতারী হলো অপসংস্কৃতি। সৃতরাং অবশ্যই প্রথমে আমাদেরকে বুঝতে হবে এবং নারীদেরকে বুঝাতে হবে সংস্কৃতি আর অপসংস্কৃতির মধ্যকার পার্থক্য “আঙ্গুলের নখ লম্বা হলে নখ কাঁটতে হয়, আঙ্গুল নয়”।
তাই আমাদের অনেক দিনের সোনালী ইতিহাস লালনের মাধ্যমে পূর্র্ পুরুষের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে ইফতারীর নামে বল প্রয়োগকে না বলি এবং সুস্থ সংস্কৃতির ধারা অব্যাহত রাখি।
লেখক: কলামিস্ট ও সংগঠক।




























