০৯:৩৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

প্লাস্টিক বোতল দিয়ে বাড়ি তৈরী করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি

  • Update Time : ০২:১৩:১৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ মে ২০১৭
  • / ১ বার নিউজটি পড়া হয়েছে

জগন্নাথপুর পত্রিকা ডেস্ক :: ঢাকা শহরের চারতলা বাড়িটি বিক্রি করে গ্রামে ফিরে বানিয়েছেন প্লাস্টিক বোতলের বাড়ি। গ্রামের ছোট ছোট দোকান থেকে কিনেছেন নানা ধরনের প্লাস্টিকের বোতল। আর সেই বোতলের বাড়ি তৈরি করে এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছেন এক দম্পতি। ঢাকার শেখ বোরহান উদ্দিন পোস্ট গ্রাজুয়েট বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে পরিবেশ বিজ্ঞানে অনার্স মাস্টার্স করেছেন দু’জনে। তাদের স্বপ্ন ছিল পরিবেশবান্ধব একটি বাড়ি তৈরি করবেন। তবে সেই দম্পতি শহর ছেড়ে গ্রামে বাড়ি করলেন কেন? এমন প্রশ্নে স্ত্রী আসমা বেগম বলেন, প্রত্যন্ত গ্রামের চারদিকে সবুজ বনানী আর ফসলের মাঠ। এমন দৃশ্য শহরের কোথায় পাওয়া যেত না। আমার জন্ম, শৈশব, কৈশোর-বড় হওয়া সব কিছু শহরে। গ্রামের কোলাহল মুক্ত চারদিকের পরিবেশ, সবুজ মাঠ আমাকে শিশুকাল থেকে টানছে।
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার চন্দ্রপুরের নওদাবাস গ্রামের আবদুল বারী মোক্তারের ছেলে রাশেদুল আলম গ্রামের একটি স্থানীয় স্কুল থেকে এসএসসি, এইচএসসি পাসের পর ঢাকার শেখ বোরহান উদ্দিন পোস্ট গ্রাজুয়েট বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে পরিবেশ বিজ্ঞানে অনার্স মাস্টার্স করেন। পড়াশোনাকালে ওই কলেজের ছাত্রী ও ঢাকার নবাব কাটরার নিমতলীর আফসার উদ্দিনের মেয়েকে বিয়ে করেন। এরপরে দুজনেই ওই কলেজে পার্ট টাইম অধ্যাপনা করেন প্রায় ৮ বছর। তাদের একটাই স্বপ্ন ছিল পরিবেশবান্ধব একটি বাড়ি তৈরি করা। প্লাস্টিকের বোতলের তৈরি বাড়ি পুরো গ্রামে বানানোর পরিকল্পনা দম্পতি রাশেদুল ও আছমার। অবশেষে প্লাস্টিকের বোতলে বালি ভরে দেয়াল তৈরিতে তারা সফল হন।
সোমবার সরজমিন দেখা গেছে, একদিকে বোতলে বালি ভরানোর কাজ চলছে। প্লান পরিকল্পনা অনুযায়ী বাড়ির ফাউন্ডেশন, ভিত্তি স্থাপন, নিলটন পুরো কাজেই সহযোগিতা করছে স্থানীয় শ্রমজীবী ও রাজমিস্ত্রিরা। মহিলা, পুরুষ শ্রমিকরা বোতলে বালি ভরাটের কাজ করেছে। স্থানীয় রাজমিস্ত্রি বালি ভর্তি বোতল দিয়ে দেয়াল তৈরি করছে। বোতলের বাড়ি দেখার জন্য প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আসছে। স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েরা আসছে দলে দলে। যতই দিন যাচ্ছে, উৎসুক মানুষের ভিড় বাড়ছে। প্রত্যন্ত গ্রামের এই বাড়িটি খুঁজে বের করতে এখন আর বেগ পেতে হয় না। ‘বোতলের বাড়ি যাবো’ বললেই মানুষ রাস্তা দেখিয়ে দেয়।

প্রথমে এটাকে পাগলামি বলে উড়িয়ে দিয়েছেন অনেকে। ভাইয়েরা, আত্মীয়-স্বজনরা সবাই এর বিরোধিতা করেছেন। কিন্তু রাশেদুলকে দমাতে পারেনি। সে একাই বিভিন্ন এলাকা থেকে বোতল সংগ্রহ করেন। ভাংগারির দোকানে দোকানে গিয়ে তিনি সংগ্রহ  করেন তার প্রয়োজন মতো ৪০ মণের বেশি প্লাস্টিকের বোতল। গত ফেব্রুয়ারির ১ তারিখ তাদের ‘ম্যারেজ ডে’ ছিল। ওই দিনটি বেছে নেয় শুভদিন হিসেবে। শুরু করেন স্বপ্নের বাড়ি নির্মাণের কাজ।
‘ইকো হাউস’ বা বোতলের বাড়ি সম্পর্কে আসমা জানান, ফেলে দেয়া প্লাস্টিক বোতল খুব সহজে সংগ্রহ করা যায়। একটি মাঝারি বোতল সাধারণত ১০ ইঞ্চি, এর ব্যাস সাড়ে ৩ ইঞ্চি। অর্থাৎ একটি ইটের সমান। একটি ইটের দাম পড়ে ১০ টাকা। আর একটি বোতল ক্রয়, বালু ভরা সব মিলে ৩ টাকার ঊর্ধ্বে নয়। ইটে আর বোতলে সিমেন্ট ব্যবহার প্রায় সমান। এতে ব্যয় সাশ্রয় অর্ধেকের বেশি। বোতলের বাড়ি ৮ মাত্রার ভূমিকম্প  সহনীয়। বালু সাধারণত গরম বা ঠাণ্ডা দ্রুত চুষে নেয়। যে কারণে গরমের সময় ঠাণ্ডা রাখে এবং ঠাণ্ডার সময় গরম রাখে। বাংলাদেশের ৮০ ভাগ মানুষ কাঁচা ঘরবাড়িতে বসবাস করে। বাঁশ, কাঠ, টিনের বেড়া দিতে যে টাকা দরকার, তা দিয়ে নিজেরাই ইচ্ছা করলে প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে পাকা দেয়াল নির্মাণ করতে পারবেন। কঁচাঘরে প্রতি বছর খুঁটি দিতে হয়। ঝড় বাদলের ভয়তো আছেই। তাছাড়া নির্মাণের প্রচলিত উপাদানের তুলনায় প্লাস্টিকের বোতলের দাম অনেক কম। তাই একটি বাড়ির ৬টি রুম করতে খরচ হচ্ছে মাত্র ৪ লক্ষ টাকা। রাশেদুল বলেন, তিন মাস আগে শুরু করেছি বোতলের বাড়ির কাজ। তখন এলাকার সবাই বলেছেন অনেক কিছু। তবে এখন সবাই দেখতে আসে। এমনকি অনেকেই বাড়ি তৈরি করতে আগ্রহী হচ্ছে।
কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী পারভেজ নেওয়াজ খান বলেন, প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে তৈরি বাড়ি পরিবেশবান্ধব হলেও এটি ব্যবহারের আগে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন হওয়া উচিত। তিনি আশাবাদ জানিয়ে বলেন, দরিদ্র মানুষদের কাছে এ ধরনের বাড়ি মডেল হিসেবে কাজ করবে। রাশেদুল দম্পতির বোতল হাউজের সঙ্গে প্রকৌশলগত দিক সমন্বয় করলে এটি আরো নিরাপদ ও টেকসই হবে বলে  তিনি জানান।

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ

প্লাস্টিক বোতল দিয়ে বাড়ি তৈরী করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি

Update Time : ০২:১৩:১৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ মে ২০১৭

জগন্নাথপুর পত্রিকা ডেস্ক :: ঢাকা শহরের চারতলা বাড়িটি বিক্রি করে গ্রামে ফিরে বানিয়েছেন প্লাস্টিক বোতলের বাড়ি। গ্রামের ছোট ছোট দোকান থেকে কিনেছেন নানা ধরনের প্লাস্টিকের বোতল। আর সেই বোতলের বাড়ি তৈরি করে এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছেন এক দম্পতি। ঢাকার শেখ বোরহান উদ্দিন পোস্ট গ্রাজুয়েট বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে পরিবেশ বিজ্ঞানে অনার্স মাস্টার্স করেছেন দু’জনে। তাদের স্বপ্ন ছিল পরিবেশবান্ধব একটি বাড়ি তৈরি করবেন। তবে সেই দম্পতি শহর ছেড়ে গ্রামে বাড়ি করলেন কেন? এমন প্রশ্নে স্ত্রী আসমা বেগম বলেন, প্রত্যন্ত গ্রামের চারদিকে সবুজ বনানী আর ফসলের মাঠ। এমন দৃশ্য শহরের কোথায় পাওয়া যেত না। আমার জন্ম, শৈশব, কৈশোর-বড় হওয়া সব কিছু শহরে। গ্রামের কোলাহল মুক্ত চারদিকের পরিবেশ, সবুজ মাঠ আমাকে শিশুকাল থেকে টানছে।
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার চন্দ্রপুরের নওদাবাস গ্রামের আবদুল বারী মোক্তারের ছেলে রাশেদুল আলম গ্রামের একটি স্থানীয় স্কুল থেকে এসএসসি, এইচএসসি পাসের পর ঢাকার শেখ বোরহান উদ্দিন পোস্ট গ্রাজুয়েট বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে পরিবেশ বিজ্ঞানে অনার্স মাস্টার্স করেন। পড়াশোনাকালে ওই কলেজের ছাত্রী ও ঢাকার নবাব কাটরার নিমতলীর আফসার উদ্দিনের মেয়েকে বিয়ে করেন। এরপরে দুজনেই ওই কলেজে পার্ট টাইম অধ্যাপনা করেন প্রায় ৮ বছর। তাদের একটাই স্বপ্ন ছিল পরিবেশবান্ধব একটি বাড়ি তৈরি করা। প্লাস্টিকের বোতলের তৈরি বাড়ি পুরো গ্রামে বানানোর পরিকল্পনা দম্পতি রাশেদুল ও আছমার। অবশেষে প্লাস্টিকের বোতলে বালি ভরে দেয়াল তৈরিতে তারা সফল হন।
সোমবার সরজমিন দেখা গেছে, একদিকে বোতলে বালি ভরানোর কাজ চলছে। প্লান পরিকল্পনা অনুযায়ী বাড়ির ফাউন্ডেশন, ভিত্তি স্থাপন, নিলটন পুরো কাজেই সহযোগিতা করছে স্থানীয় শ্রমজীবী ও রাজমিস্ত্রিরা। মহিলা, পুরুষ শ্রমিকরা বোতলে বালি ভরাটের কাজ করেছে। স্থানীয় রাজমিস্ত্রি বালি ভর্তি বোতল দিয়ে দেয়াল তৈরি করছে। বোতলের বাড়ি দেখার জন্য প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আসছে। স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েরা আসছে দলে দলে। যতই দিন যাচ্ছে, উৎসুক মানুষের ভিড় বাড়ছে। প্রত্যন্ত গ্রামের এই বাড়িটি খুঁজে বের করতে এখন আর বেগ পেতে হয় না। ‘বোতলের বাড়ি যাবো’ বললেই মানুষ রাস্তা দেখিয়ে দেয়।

প্রথমে এটাকে পাগলামি বলে উড়িয়ে দিয়েছেন অনেকে। ভাইয়েরা, আত্মীয়-স্বজনরা সবাই এর বিরোধিতা করেছেন। কিন্তু রাশেদুলকে দমাতে পারেনি। সে একাই বিভিন্ন এলাকা থেকে বোতল সংগ্রহ করেন। ভাংগারির দোকানে দোকানে গিয়ে তিনি সংগ্রহ  করেন তার প্রয়োজন মতো ৪০ মণের বেশি প্লাস্টিকের বোতল। গত ফেব্রুয়ারির ১ তারিখ তাদের ‘ম্যারেজ ডে’ ছিল। ওই দিনটি বেছে নেয় শুভদিন হিসেবে। শুরু করেন স্বপ্নের বাড়ি নির্মাণের কাজ।
‘ইকো হাউস’ বা বোতলের বাড়ি সম্পর্কে আসমা জানান, ফেলে দেয়া প্লাস্টিক বোতল খুব সহজে সংগ্রহ করা যায়। একটি মাঝারি বোতল সাধারণত ১০ ইঞ্চি, এর ব্যাস সাড়ে ৩ ইঞ্চি। অর্থাৎ একটি ইটের সমান। একটি ইটের দাম পড়ে ১০ টাকা। আর একটি বোতল ক্রয়, বালু ভরা সব মিলে ৩ টাকার ঊর্ধ্বে নয়। ইটে আর বোতলে সিমেন্ট ব্যবহার প্রায় সমান। এতে ব্যয় সাশ্রয় অর্ধেকের বেশি। বোতলের বাড়ি ৮ মাত্রার ভূমিকম্প  সহনীয়। বালু সাধারণত গরম বা ঠাণ্ডা দ্রুত চুষে নেয়। যে কারণে গরমের সময় ঠাণ্ডা রাখে এবং ঠাণ্ডার সময় গরম রাখে। বাংলাদেশের ৮০ ভাগ মানুষ কাঁচা ঘরবাড়িতে বসবাস করে। বাঁশ, কাঠ, টিনের বেড়া দিতে যে টাকা দরকার, তা দিয়ে নিজেরাই ইচ্ছা করলে প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে পাকা দেয়াল নির্মাণ করতে পারবেন। কঁচাঘরে প্রতি বছর খুঁটি দিতে হয়। ঝড় বাদলের ভয়তো আছেই। তাছাড়া নির্মাণের প্রচলিত উপাদানের তুলনায় প্লাস্টিকের বোতলের দাম অনেক কম। তাই একটি বাড়ির ৬টি রুম করতে খরচ হচ্ছে মাত্র ৪ লক্ষ টাকা। রাশেদুল বলেন, তিন মাস আগে শুরু করেছি বোতলের বাড়ির কাজ। তখন এলাকার সবাই বলেছেন অনেক কিছু। তবে এখন সবাই দেখতে আসে। এমনকি অনেকেই বাড়ি তৈরি করতে আগ্রহী হচ্ছে।
কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী পারভেজ নেওয়াজ খান বলেন, প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে তৈরি বাড়ি পরিবেশবান্ধব হলেও এটি ব্যবহারের আগে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন হওয়া উচিত। তিনি আশাবাদ জানিয়ে বলেন, দরিদ্র মানুষদের কাছে এ ধরনের বাড়ি মডেল হিসেবে কাজ করবে। রাশেদুল দম্পতির বোতল হাউজের সঙ্গে প্রকৌশলগত দিক সমন্বয় করলে এটি আরো নিরাপদ ও টেকসই হবে বলে  তিনি জানান।

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ