১২:০৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬, ২১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
পুষ্টিকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রতিরোধভিত্তিক সুস্থ সমাজ
- Update Time : ১১:৫২:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ মে ২০২৬
- / ৭ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
বর্তমান বিশ্বে স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো এটি মূলত “রোগ হলে চিকিৎসা” এই ধারণার উপর দাঁড়িয়ে আছে। মানুষ অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসকের কাছে যায়, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে, ওষুধ গ্রহণ করে-এবং সুস্থ হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু আধুনিক জনস্বাস্থ্য চিন্তায় ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, এই পদ্ধতি একা যথেষ্ট নয়। বরং অসুস্থ হওয়ার আগেই সুস্থ থাকার ব্যবস্থা তৈরি করা বেশি কার্যকর, কম ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই। আর এই প্রতিরোধভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে “পুষ্টি”।
পুষ্টি শুধুমাত্র পেট ভরানোর বিষয় নয়, এটি শরীরের প্রতিটি কোষের কার্যকারিতা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, মানসিক বিকাশ এবং কর্মক্ষমতার সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। একজন মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস তার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যের ভিত্তি তৈরি করে। সঠিক পুষ্টি না থাকলে শিশু অপুষ্টিতে ভোগে, কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়, গর্ভবতী মায়েরা নানা জটিলতায় পড়েন এবং বয়স্কদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই স্বাস্থ্যব্যবস্থার কেন্দ্রে পুষ্টিকে স্থান দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পুষ্টি একটি জটিল ও বহুমাত্রিক জনস্বাস্থ্য সমস্যা। একদিকে এখনও অনেক শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে, অন্যদিকে শহরাঞ্চলে অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ ও অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসের কারণে স্থূলতা দ্রুত বাড়ছে। এই দুই বিপরীতধর্মী সমস্যাকে একসাথে “ডাবল বার্ডেন অব ম্যালনিউট্রিশন” বলা হয়। এর ফলে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, কিডনি রোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধুমাত্র ওষুধের মাধ্যমে এই সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়, প্রয়োজন খাদ্যাভ্যাসের মৌলিক পরিবর্তন।
পুষ্টিকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে প্রথমেই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার কাঠামোর সাথে পুষ্টিকে একীভূত করতে হবে। একজন রোগী যখন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসবেন, তখন তার রোগ নির্ণয়ের পাশাপাশি তার খাদ্যাভ্যাস মূল্যায়ন করা উচিত। রোগ অনুযায়ী নির্দিষ্ট খাদ্যপরামর্শ প্রদান বাধ্যতামূলক করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীকে শুধু ওআরএস দেওয়াই যথেষ্ট নয়, তাকে সহজপাচ্য খাবার যেমন ভাত, কলা, খিচুড়ি খাওয়ার পরামর্শ দিতে হবে। ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে কার্বোহাইড্রেট নিয়ন্ত্রণ, আঁশযুক্ত খাবার বৃদ্ধি এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের গুরুত্ব তুলে ধরতে হবে। উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য লবণ কমানো এবং তেলযুক্ত খাবার পরিহার করার পরামর্শ দিতে হবে।
মাতৃ ও শিশুপুষ্টি এই ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।
গর্ভাবস্থায় মায়ের পুষ্টির ঘাটতি থাকলে শিশুর জন্ম ওজন কম হয় এবং তার ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। তাই গর্ভবতী নারীদের জন্য সুষম খাদ্য, আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড সাপ্লিমেন্ট এবং নিয়মিত পুষ্টি কাউন্সেলিং নিশ্চিত করতে হবে। শিশুর জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শুধুমাত্র মায়ের দুধ খাওয়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি শিশুর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও পূর্ণাঙ্গ পুষ্টির উৎস। এরপর ছয় মাস বয়স থেকে ধীরে ধীরে পুষ্টিকর সম্পূরক খাবার চালু করতে হবে, যাতে শিশুর বৃদ্ধি স্বাভাবিক থাকে।
স্কুলভিত্তিক পুষ্টি শিক্ষা একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।
ছোটবেলা থেকেই যদি শিশুদের সুষম খাদ্যের গুরুত্ব শেখানো যায়, তাহলে তারা ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করতে পারবে। স্কুলে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ওজন ও উচ্চতা পরিমাপ এবং পুষ্টি বিষয়ক ক্লাস চালু করা যেতে পারে। কিশোর-কিশোরীদের জন্য আয়রন ও ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবারের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি, কারণ এই বয়সে পুষ্টির ঘাটতি ভবিষ্যতে রক্তস্বল্পতা ও অন্যান্য সমস্যার কারণ হতে পারে।
কমিউনিটি পর্যায়ে পুষ্টি সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করা প্রয়োজন। গ্রাম ও শহরের বিভিন্ন এলাকায় স্বাস্থ্য ক্যাম্পের আয়োজন করে ওজন, বডি মাস ইনডেক্স (BMI), রক্তচাপ ও রক্তে গ্লুকোজ পরীক্ষা করা যেতে পারে। এসব ক্যাম্পে অংশগ্রহণকারীদের ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী পরামর্শ প্রদান করলে তারা সহজেই নিজের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনতে পারবে। স্থানীয় খাদ্যসম্পদের উপর ভিত্তি করে সস্তা ও পুষ্টিকর খাদ্যতালিকা তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
ফার্মেসি ও প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো (এসএমসি ব্লুস্টার সেবা কেন্দ্র) পুষ্টিকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ প্রথমে ফার্মেসিতে যায়, সেখান থেকেই পরামর্শ নেয়। যদি ফার্মেসি কর্মীরা পুষ্টি বিষয়ে প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করেন এবং রোগীকে উপযুক্ত খাদ্যপরামর্শ দিতে পারেন, তাহলে রোগ নিয়ন্ত্রণ অনেক সহজ হয়ে যায়। “Nutrition Corner” চালুর মাধ্যমে ওজন, BMI, রক্তচাপ পরিমাপ এবং খাদ্যপরামর্শ প্রদান করা যেতে পারে। এতে রোগী শুধুমাত্র ওষুধের উপর নির্ভর না করে নিজের জীবনযাত্রা পরিবর্তনের মাধ্যমে সুস্থ থাকার দিকে মনোযোগী হবে।
প্রযুক্তির ব্যবহার পুষ্টিকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। মোবাইল অ্যাপ, এসএমএস বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে সহজ ভাষায় পুষ্টি বিষয়ক তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, দৈনন্দিন খাদ্যতালিকা, ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বিশেষ পরামর্শ, বা শিশুদের পুষ্টি সম্পর্কিত তথ্য নিয়মিত প্রচার করা যেতে পারে। এতে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে এবং তারা নিজেরাই স্বাস্থ্যকর সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবে।
তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অনেক মানুষ এখনও পুষ্টির গুরুত্ব সম্পর্কে অজ্ঞ। ফাস্টফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের সহজলভ্যতা এবং আকর্ষণীয় প্রচারণার কারণে মানুষ স্বাস্থ্যকর খাবার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এছাড়া অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক পরিবার পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার সংগ্রহ করতে পারে না। এই সমস্যাগুলো সমাধান করতে হলে সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সকল স্তরের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
সস্তা কিন্তু পুষ্টিকর খাবার- যেমন ডাল, ডিম, শাকসবজি, ছোট মাছ- এসবের ব্যবহার বাড়াতে হবে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত খাদ্যের উপর নির্ভরতা বাড়ালে পুষ্টির চাহিদা পূরণ করা সহজ হবে। পাশাপাশি গণমাধ্যমের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়ে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে। টেলিভিশন, পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সব জায়গায় পুষ্টির গুরুত্ব তুলে ধরতে হবে।
পুষ্টিকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিয়মিত ফলো-আপ। একবার পরামর্শ দিলেই হবে না; রোগীর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরামর্শ পরিবর্তন করতে হবে। এতে রোগ নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকর হবে এবং রোগীর মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে।
পুষ্টিকে কেন্দ্র করে স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা একটি সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। এর মাধ্যমে আমরা শুধু রোগ প্রতিরোধই করতে পারি না, বরং একটি সুস্থ, কর্মক্ষম ও সচেতন জাতি গড়ে তুলতে পারি। চিকিৎসা ব্যয় কমানো, জীবনমান উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য পুষ্টিকেন্দ্রিক এই দৃষ্টিভঙ্গি এখন অপরিহার্য।
স্বাস্থ্যব্যবস্থার এই পরিবর্তন কোনো বিলাসিতা নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি দায়িত্ব।
লেখক:-
মনজুরুল মা আবুদ
মাস্টার্স অব একাউন্টিং
সহকারি অধ্যাপক (হিসাববিজ্ঞান)
মাস্টার্স অব পাবলিক হেলথ
(স্বাস্থ্য ও পুষ্টি)।



























