০৩:৪৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬, ৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক: উন্নয়নের পথে কেন বারবার ঝরছে প্রাণ?

  • Update Time : ০২:২৫:৪১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
  • / ১০ বার নিউজটি পড়া হয়েছে

নিরাপদ সড়ক কি শুধুই স্বপ্ন?: শফিক আহমদ শফি

ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করেন। ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য মহাসড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক দুর্ঘটনা জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে সিলেটের ওসমানীনগর অংশে কয়েকটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা যেন প্রশ্ন তুলছে—নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে আমরা আসলে কতটা প্রস্তুত?

সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ৭ আগস্ট সকালে। ওসমানীনগরের কাশিকাপন এলাকায় ইউনিক পরিবহন ও বেঙ্গল পরিবহনের দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নারী ও শিশুসহ ৯ জন নিহত হন এবং অন্তত ২৫ জন আহত হন। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে পরে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়।

এর মাত্র কয়েক দিন পর ২২ আগস্ট আবারও একই মহাসড়কের ওসমানীনগর উপজেলার ব্রাহ্মণগ্রাম এলাকায় ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। একটি তেলবাহী ট্যাংকলরি ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে একই পরিবারের তিনজনসহ চারজন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে একটি শিশুও ছিল। আরও কয়েকজন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।

এই ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না। কারণ, একই মহাসড়কের একই অঞ্চলে অল্প সময়ের ব্যবধানে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। স্থানীয়ভাবে অতিরিক্ত গতি, ওভারটেকিং, চালকদের অসতর্কতা এবং যানবাহনের প্রতিযোগিতামূলক চলাচলকে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। ৭ আগস্টের দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে পুলিশও অতিরিক্ত গতিকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিল।

তবে শুধু চালককে দায়ী করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। একটি সড়ক দুর্ঘটনা সাধারণত একাধিক কারণের সম্মিলিত ফল। চালকের দক্ষতা ও মানসিক সতর্কতার পাশাপাশি সড়কের নকশা, লেন ব্যবস্থাপনা, যানবাহনের ফিটনেস, গতি নিয়ন্ত্রণ, ওভারটেকিংয়ের সুযোগ, পর্যাপ্ত সাইন-সিগন্যাল এবং আইন প্রয়োগ—সবকিছুর সঙ্গে দুর্ঘটনার ঝুঁকি জড়িত।

ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে সড়ক উন্নয়ন ও নির্মাণকাজ চলমান থাকার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। জুলাই মাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অংশে বড় গর্ত, উন্নয়নকাজ, দুর্ঘটনা ও বিকল যানবাহনের কারণে দীর্ঘ যানজটের খবর পাওয়া যায়। এসব বিষয় সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় হলো দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন হলেও জনগণের প্রত্যাশা শুধু তদন্তে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষ চায় তদন্তের ফলাফল প্রকাশ হোক, প্রকৃত কারণ চিহ্নিত হোক এবং দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে সেখানে স্থায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

ঢাকা–সিলেট মহাসড়ককে নিরাপদ করতে কয়েকটি বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে নজর দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলোতে কার্যকর গতি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং বন্ধে নিয়মিত নজরদারি বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, বাস, ট্রাক, লরি ও গণপরিবহনের ফিটনেস এবং চালকদের লাইসেন্স ও কর্মঘণ্টা কঠোরভাবে তদারক করতে হবে। চতুর্থত, যেখানে সড়কের নকশা বা অবকাঠামোগত ত্রুটি রয়েছে, সেখানে দ্রুত প্রকৌশলগত সমাধান করতে হবে।

পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ ও চালকদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে হবে। যাত্রীদেরও দায়িত্ব রয়েছে—দ্রুতগতিতে গাড়ি চালাতে উৎসাহ না দেওয়া, ঝুঁকিপূর্ণ চালনা দেখলে প্রতিবাদ করা এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো।

সবচেয়ে বড় কথা, সড়ক শুধু যানবাহন চলাচলের জায়গা নয়; এটি মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। একটি দুর্ঘটনায় শুধু একজন মানুষ মারা যান না—একটি পরিবার তার উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারায়, সন্তান হারায় বাবা-মাকে, বাবা-মা হারান সন্তানকে। ২২ আগস্টের দুর্ঘটনায় একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যু সেই নির্মম বাস্তবতারই উদাহরণ।

ঢাকা–সিলেট মহাসড়ককে ‘মৃত্যুর সড়ক’ হিসেবে পরিচিত হওয়ার আগেই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। দুর্ঘটনা ঘটার পর ক্ষতিপূরণ বা তদন্তের চেয়ে দুর্ঘটনা প্রতিরোধই হতে হবে প্রধান লক্ষ্য। চালকের দায়িত্বশীলতা, যাত্রীদের সচেতনতা, যানবাহনের ফিটনেস, সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর নজরদারি—এই পাঁচটি বিষয় সমন্বিতভাবে নিশ্চিত করা গেলে প্রাণহানি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

মানুষ মহাসড়কে বের হয় নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য, মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে নয়। তাই ঢাকা–সিলেট মহাসড়কে আর একটি প্রাণও যেন অপ্রয়োজনে ঝরে না যায়—এটাই এখন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের কাছে সবচেয়ে বড় দাবি।

লেখক:
সাধারণ সম্পাদক,
সিলেট কেন্দ্রীয় লেখক ফোরাম, সিলেট।

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ

ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক: উন্নয়নের পথে কেন বারবার ঝরছে প্রাণ?

Update Time : ০২:২৫:৪১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬

নিরাপদ সড়ক কি শুধুই স্বপ্ন?: শফিক আহমদ শফি

ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করেন। ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য মহাসড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক দুর্ঘটনা জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে সিলেটের ওসমানীনগর অংশে কয়েকটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা যেন প্রশ্ন তুলছে—নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে আমরা আসলে কতটা প্রস্তুত?

সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ৭ আগস্ট সকালে। ওসমানীনগরের কাশিকাপন এলাকায় ইউনিক পরিবহন ও বেঙ্গল পরিবহনের দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নারী ও শিশুসহ ৯ জন নিহত হন এবং অন্তত ২৫ জন আহত হন। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে পরে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়।

এর মাত্র কয়েক দিন পর ২২ আগস্ট আবারও একই মহাসড়কের ওসমানীনগর উপজেলার ব্রাহ্মণগ্রাম এলাকায় ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। একটি তেলবাহী ট্যাংকলরি ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে একই পরিবারের তিনজনসহ চারজন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে একটি শিশুও ছিল। আরও কয়েকজন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।

এই ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না। কারণ, একই মহাসড়কের একই অঞ্চলে অল্প সময়ের ব্যবধানে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। স্থানীয়ভাবে অতিরিক্ত গতি, ওভারটেকিং, চালকদের অসতর্কতা এবং যানবাহনের প্রতিযোগিতামূলক চলাচলকে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। ৭ আগস্টের দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে পুলিশও অতিরিক্ত গতিকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিল।

তবে শুধু চালককে দায়ী করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। একটি সড়ক দুর্ঘটনা সাধারণত একাধিক কারণের সম্মিলিত ফল। চালকের দক্ষতা ও মানসিক সতর্কতার পাশাপাশি সড়কের নকশা, লেন ব্যবস্থাপনা, যানবাহনের ফিটনেস, গতি নিয়ন্ত্রণ, ওভারটেকিংয়ের সুযোগ, পর্যাপ্ত সাইন-সিগন্যাল এবং আইন প্রয়োগ—সবকিছুর সঙ্গে দুর্ঘটনার ঝুঁকি জড়িত।

ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে সড়ক উন্নয়ন ও নির্মাণকাজ চলমান থাকার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। জুলাই মাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অংশে বড় গর্ত, উন্নয়নকাজ, দুর্ঘটনা ও বিকল যানবাহনের কারণে দীর্ঘ যানজটের খবর পাওয়া যায়। এসব বিষয় সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় হলো দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন হলেও জনগণের প্রত্যাশা শুধু তদন্তে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষ চায় তদন্তের ফলাফল প্রকাশ হোক, প্রকৃত কারণ চিহ্নিত হোক এবং দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে সেখানে স্থায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

ঢাকা–সিলেট মহাসড়ককে নিরাপদ করতে কয়েকটি বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে নজর দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলোতে কার্যকর গতি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং বন্ধে নিয়মিত নজরদারি বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, বাস, ট্রাক, লরি ও গণপরিবহনের ফিটনেস এবং চালকদের লাইসেন্স ও কর্মঘণ্টা কঠোরভাবে তদারক করতে হবে। চতুর্থত, যেখানে সড়কের নকশা বা অবকাঠামোগত ত্রুটি রয়েছে, সেখানে দ্রুত প্রকৌশলগত সমাধান করতে হবে।

পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ ও চালকদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে হবে। যাত্রীদেরও দায়িত্ব রয়েছে—দ্রুতগতিতে গাড়ি চালাতে উৎসাহ না দেওয়া, ঝুঁকিপূর্ণ চালনা দেখলে প্রতিবাদ করা এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো।

সবচেয়ে বড় কথা, সড়ক শুধু যানবাহন চলাচলের জায়গা নয়; এটি মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। একটি দুর্ঘটনায় শুধু একজন মানুষ মারা যান না—একটি পরিবার তার উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারায়, সন্তান হারায় বাবা-মাকে, বাবা-মা হারান সন্তানকে। ২২ আগস্টের দুর্ঘটনায় একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যু সেই নির্মম বাস্তবতারই উদাহরণ।

ঢাকা–সিলেট মহাসড়ককে ‘মৃত্যুর সড়ক’ হিসেবে পরিচিত হওয়ার আগেই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। দুর্ঘটনা ঘটার পর ক্ষতিপূরণ বা তদন্তের চেয়ে দুর্ঘটনা প্রতিরোধই হতে হবে প্রধান লক্ষ্য। চালকের দায়িত্বশীলতা, যাত্রীদের সচেতনতা, যানবাহনের ফিটনেস, সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর নজরদারি—এই পাঁচটি বিষয় সমন্বিতভাবে নিশ্চিত করা গেলে প্রাণহানি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

মানুষ মহাসড়কে বের হয় নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য, মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে নয়। তাই ঢাকা–সিলেট মহাসড়কে আর একটি প্রাণও যেন অপ্রয়োজনে ঝরে না যায়—এটাই এখন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের কাছে সবচেয়ে বড় দাবি।

লেখক:
সাধারণ সম্পাদক,
সিলেট কেন্দ্রীয় লেখক ফোরাম, সিলেট।

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ