০৪:৫৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশে এত ইসলামি রাজনৈতিক সংগঠন থাকার পরও ইসলামিস্টরা পিছিয়ে কেন?

  • Update Time : ০৪:৩৩:২৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬
  • / ২ বার নিউজটি পড়া হয়েছে

সংকটের কারণ ও উত্তরণের পথ:

সালেহ নজীব আল আইয়ুবী

বাংলাদেশে ইসলামি রাজনীতির ইতিহাস দীর্ঘ। এ দেশে অসংখ্য ইসলামি রাজনৈতিক সংগঠন রয়েছে, রয়েছে বিপুলসংখ্যক আলেম-উলামা, মাদরাসাশিক্ষিত জনশক্তি এবং ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ। মসজিদ-মাদরাসা, ওয়াজ-মাহফিল ও বিভিন্ন ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইসলামপন্থীদের ব্যাপক জনসম্পৃক্ততাও রয়েছে। কিন্তু এত কিছু থাকার পরও প্রশ্ন থেকে যায় “ইসলামি রাজনৈতিক সংগঠনের সংখ্যা এত বেশি হওয়া সত্ত্বেও ইসলামপন্থীরা রাজনৈতিকভাবে কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারছে না কেন?

সমস্যাটি শুধু রাজনৈতিক কৌশলের নয়, এর শিকড় আরও গভীরে। আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো পারস্পরিক বিভক্তি। একই আদর্শ, একই ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং প্রায় অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা মানুষগুলো অনেক সময় পরস্পরের সহযোগী হওয়ার পরিবর্তে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন। সামান্য মতপার্থক্য কখনো কখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, আমরা নিজেদের শক্তি নিজেদের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করতে শুরু করি। ফলে যে শক্তি সমাজ ও রাষ্ট্রের ইতিবাচক পরিবর্তনে ব্যয় হওয়ার কথা ছিল, তার বড় একটি অংশ অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে নিঃশেষ হয়ে যায়।

মতপার্থক্য থাকা কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। ইসলামের ইতিহাসেও ইজতিহাদি ও রাজনৈতিক বিষয়ে মতভিন্নতা ছিল। কিন্তু মতভিন্নতা কখনো যেন পারস্পরিক বিদ্বেষ ও সম্পর্কচ্ছেদের কারণ না হয়, এটাই বড় শিক্ষা। আমাদের বুঝতে হবে, সবাইকে একই সংগঠনে আনতে না পারলেও অভিন্ন স্বার্থে সবাইকে সহযোগিতার একটি সংস্কৃতির মধ্যে আনা সম্ভব।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো ব্যক্তি ও নেতৃত্বকেন্দ্রিকতা। অনেক সময় আদর্শ ও প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ব্যক্তি বড় হয়ে ওঠেন। নেতার প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্য প্রয়োজন, কিন্তু কোনো ব্যক্তিই ভুলের ঊর্ধ্বে নন। সংগঠনকে ব্যক্তির জনপ্রিয়তার ওপর দাঁড় করিয়ে দিলে ব্যক্তি দুর্বল হলে সংগঠনও দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই ব্যক্তি নয়, আদর্শকে কেন্দ্র করে সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। পদ নয়, দায়িত্বকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রশংসার পাশাপাশি গঠনমূলক আত্মসমালোচনার পরিবেশও তৈরি করতে হবে।

আমাদের তৃণমূল সাংগঠনিক দুর্বলতাও গভীরভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বড় বড় কর্মসূচি, সম্মেলন ও বক্তব্য থাকলেও অনেক জায়গায় ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, গ্রাম ও মহল্লা পর্যায়ে নিয়মিত সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের ঘাটতি রয়েছে। অথচ রাজনৈতিক শক্তির প্রকৃত ভিত্তি হলো তৃণমূল। একজন কর্মী শুধু নির্বাচনের সময় সক্রিয় হলেই হবে না, তাকে নিয়মিত জনসম্পৃক্ততা, সামাজিক সেবা, দাওয়াত, রাজনৈতিক শিক্ষা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে গড়ে তুলতে হবে।

শুধু আবেগ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক শক্তি তৈরি করা যায় না। প্রয়োজন প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি। একজন ইসলামপন্থী কর্মীর ধর্মীয় জ্ঞান যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন সমকালীন রাজনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস, সমাজব্যবস্থা, প্রযুক্তি, গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা। ইলমের সঙ্গে হিকমাহ, আদর্শের সঙ্গে দক্ষতা এবং আবেগের সঙ্গে প্রজ্ঞার সমন্বয় ঘটাতে না পারলে সময়ের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া স্বাভাবিক।

ইসলামী রাজনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা হলো নির্বাচনকেন্দ্রিক অতিরিক্ত চিন্তা। রাজনীতি শুধু নির্বাচনের সময় সক্রিয় হওয়ার বিষয় নয়। মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে থাকা, দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া, শিক্ষা ও মানবিক কাজে ভূমিকা রাখা, তরুণদের নেতৃত্বে আনা, গবেষণা ও জনমত গড়ে তোলা, এসবও রাজনৈতিক কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জনগণ যদি বছরের পর বছর কোনো সংগঠনকে নিজেদের পাশে দেখতে পায়, তাহলে নির্বাচনের সময় সেই সম্পর্ক স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক আস্থায় রূপ নেয়।

বর্তমান যুগে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। এখানে ইসলামপন্থীদের আরও দক্ষ হতে হবে। শুধু আবেগনির্ভর বক্তব্য নয়, তথ্য, যুক্তি, সুন্দর ভাষা, ইতিবাচক কর্মসূচি এবং বাস্তবসম্মত সমাধান নিয়ে মানুষের সামনে হাজির হতে হবে। ইসলামপন্থীদের এমন একটি বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে তরুণ প্রজন্ম তাদের প্রশ্নের উত্তর পাবে এবং আধুনিক বিশ্বের জটিল সমস্যাগুলোর ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে বাস্তবসম্মত সমাধান দেখতে পাবে।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইসলামপন্থীদের নিজেদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি করা। সবাইকে এক সংগঠনে আসতেই হবে এমন কোনো বাস্তবতা নেই। কিন্তু অভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা করা, পরস্পরের ভালো কাজকে স্বীকার করা, অপ্রয়োজনীয় কাদা ছোড়াছুড়ি থেকে বিরত থাকা এবং বৃহত্তর স্বার্থে সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ করা অবশ্যই সম্ভব।

বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের সামনে আজ সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নতুন নতুন সংগঠন তৈরি করা নয়, বরং বিদ্যমান সংগঠনগুলোকে আরও দক্ষ, সুশৃঙ্খল, জনমুখী ও দায়িত্বশীল করে তোলা। সংগঠনের সংখ্যা দিয়ে শক্তি মাপা যায় না, শক্তি মাপতে হয় কর্মীর মান, নেতৃত্বের যোগ্যতা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, জনসম্পৃক্ততা এবং বাস্তব প্রভাব দিয়ে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, বিভক্ত জনশক্তি কখনো তার পূর্ণ শক্তি প্রকাশ করতে পারে না। একটি নদীর পানি শত খালে ছড়িয়ে গেলে তার প্রবাহ দুর্বল হয়ে যায়, কিন্তু সঠিক ব্যবস্থাপনায় সেই পানিই শক্তিশালী স্রোতে পরিণত হতে পারে। ইসলামপন্থীদের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন তেমনই বিভিন্ন সংগঠন থাকবে, মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু বৃহত্তর কল্যাণের জায়গায় সমন্বয় ও সহযোগিতার একটি শক্তিশালী সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।

অতএব আজ সময় এসেছে অন্যের ব্যর্থতার হিসাব করার আগে নিজেদের আয়নায় একবার তাকানোর। আমরা কোথায় দুর্বল, কেন কর্মীরা হতাশ হয়, কেন তরুণরা দূরে সরে যায়, কেন সংগঠনগুলো পরস্পরের শক্তিকে কাজে লাগাতে পারে না, এসব প্রশ্নের নির্মোহ উত্তর খুঁজতে হবে।

ইসলামপন্থীদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু কতগুলো সংগঠন আছে তার ওপর নয়, বরং তারা কতটা ঐক্যবদ্ধ, কতটা প্রশিক্ষিত, কতটা সুশৃঙ্খল, কতটা জনমুখী এবং কতটা প্রজ্ঞার সঙ্গে সময়কে মোকাবিলা করতে পারে, তার ওপর।

সংখ্যা নয়, মান। বিভাজন নয়, সহযোগিতা। ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা নয়, আদর্শকেন্দ্রিকতা। আবেগ নয়, প্রজ্ঞা। এই চারটি পরিবর্তন যদি বাস্তবে আনা যায়, তাহলে বাংলাদেশের ইসলামপন্থী রাজনীতি নতুন করে শক্তি, আস্থা ও কার্যকারিতা অর্জন করতে পারবে ইনশাআল্লাহ।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক: রাংজিয়ল জামেয়া নজীবিয়া ইসলামীয়া মাদ্রাসা, নূরজাহানপুর, গোলাপগঞ্জ, সিলেট- 01860278339

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ

বাংলাদেশে এত ইসলামি রাজনৈতিক সংগঠন থাকার পরও ইসলামিস্টরা পিছিয়ে কেন?

Update Time : ০৪:৩৩:২৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬

সংকটের কারণ ও উত্তরণের পথ:

সালেহ নজীব আল আইয়ুবী

বাংলাদেশে ইসলামি রাজনীতির ইতিহাস দীর্ঘ। এ দেশে অসংখ্য ইসলামি রাজনৈতিক সংগঠন রয়েছে, রয়েছে বিপুলসংখ্যক আলেম-উলামা, মাদরাসাশিক্ষিত জনশক্তি এবং ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ। মসজিদ-মাদরাসা, ওয়াজ-মাহফিল ও বিভিন্ন ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইসলামপন্থীদের ব্যাপক জনসম্পৃক্ততাও রয়েছে। কিন্তু এত কিছু থাকার পরও প্রশ্ন থেকে যায় “ইসলামি রাজনৈতিক সংগঠনের সংখ্যা এত বেশি হওয়া সত্ত্বেও ইসলামপন্থীরা রাজনৈতিকভাবে কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারছে না কেন?

সমস্যাটি শুধু রাজনৈতিক কৌশলের নয়, এর শিকড় আরও গভীরে। আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো পারস্পরিক বিভক্তি। একই আদর্শ, একই ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং প্রায় অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা মানুষগুলো অনেক সময় পরস্পরের সহযোগী হওয়ার পরিবর্তে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন। সামান্য মতপার্থক্য কখনো কখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, আমরা নিজেদের শক্তি নিজেদের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করতে শুরু করি। ফলে যে শক্তি সমাজ ও রাষ্ট্রের ইতিবাচক পরিবর্তনে ব্যয় হওয়ার কথা ছিল, তার বড় একটি অংশ অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে নিঃশেষ হয়ে যায়।

মতপার্থক্য থাকা কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। ইসলামের ইতিহাসেও ইজতিহাদি ও রাজনৈতিক বিষয়ে মতভিন্নতা ছিল। কিন্তু মতভিন্নতা কখনো যেন পারস্পরিক বিদ্বেষ ও সম্পর্কচ্ছেদের কারণ না হয়, এটাই বড় শিক্ষা। আমাদের বুঝতে হবে, সবাইকে একই সংগঠনে আনতে না পারলেও অভিন্ন স্বার্থে সবাইকে সহযোগিতার একটি সংস্কৃতির মধ্যে আনা সম্ভব।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো ব্যক্তি ও নেতৃত্বকেন্দ্রিকতা। অনেক সময় আদর্শ ও প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ব্যক্তি বড় হয়ে ওঠেন। নেতার প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্য প্রয়োজন, কিন্তু কোনো ব্যক্তিই ভুলের ঊর্ধ্বে নন। সংগঠনকে ব্যক্তির জনপ্রিয়তার ওপর দাঁড় করিয়ে দিলে ব্যক্তি দুর্বল হলে সংগঠনও দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই ব্যক্তি নয়, আদর্শকে কেন্দ্র করে সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। পদ নয়, দায়িত্বকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রশংসার পাশাপাশি গঠনমূলক আত্মসমালোচনার পরিবেশও তৈরি করতে হবে।

আমাদের তৃণমূল সাংগঠনিক দুর্বলতাও গভীরভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বড় বড় কর্মসূচি, সম্মেলন ও বক্তব্য থাকলেও অনেক জায়গায় ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, গ্রাম ও মহল্লা পর্যায়ে নিয়মিত সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের ঘাটতি রয়েছে। অথচ রাজনৈতিক শক্তির প্রকৃত ভিত্তি হলো তৃণমূল। একজন কর্মী শুধু নির্বাচনের সময় সক্রিয় হলেই হবে না, তাকে নিয়মিত জনসম্পৃক্ততা, সামাজিক সেবা, দাওয়াত, রাজনৈতিক শিক্ষা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে গড়ে তুলতে হবে।

শুধু আবেগ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক শক্তি তৈরি করা যায় না। প্রয়োজন প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি। একজন ইসলামপন্থী কর্মীর ধর্মীয় জ্ঞান যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন সমকালীন রাজনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস, সমাজব্যবস্থা, প্রযুক্তি, গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা। ইলমের সঙ্গে হিকমাহ, আদর্শের সঙ্গে দক্ষতা এবং আবেগের সঙ্গে প্রজ্ঞার সমন্বয় ঘটাতে না পারলে সময়ের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া স্বাভাবিক।

ইসলামী রাজনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা হলো নির্বাচনকেন্দ্রিক অতিরিক্ত চিন্তা। রাজনীতি শুধু নির্বাচনের সময় সক্রিয় হওয়ার বিষয় নয়। মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে থাকা, দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া, শিক্ষা ও মানবিক কাজে ভূমিকা রাখা, তরুণদের নেতৃত্বে আনা, গবেষণা ও জনমত গড়ে তোলা, এসবও রাজনৈতিক কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জনগণ যদি বছরের পর বছর কোনো সংগঠনকে নিজেদের পাশে দেখতে পায়, তাহলে নির্বাচনের সময় সেই সম্পর্ক স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক আস্থায় রূপ নেয়।

বর্তমান যুগে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। এখানে ইসলামপন্থীদের আরও দক্ষ হতে হবে। শুধু আবেগনির্ভর বক্তব্য নয়, তথ্য, যুক্তি, সুন্দর ভাষা, ইতিবাচক কর্মসূচি এবং বাস্তবসম্মত সমাধান নিয়ে মানুষের সামনে হাজির হতে হবে। ইসলামপন্থীদের এমন একটি বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে তরুণ প্রজন্ম তাদের প্রশ্নের উত্তর পাবে এবং আধুনিক বিশ্বের জটিল সমস্যাগুলোর ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে বাস্তবসম্মত সমাধান দেখতে পাবে।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইসলামপন্থীদের নিজেদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি করা। সবাইকে এক সংগঠনে আসতেই হবে এমন কোনো বাস্তবতা নেই। কিন্তু অভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা করা, পরস্পরের ভালো কাজকে স্বীকার করা, অপ্রয়োজনীয় কাদা ছোড়াছুড়ি থেকে বিরত থাকা এবং বৃহত্তর স্বার্থে সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ করা অবশ্যই সম্ভব।

বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের সামনে আজ সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নতুন নতুন সংগঠন তৈরি করা নয়, বরং বিদ্যমান সংগঠনগুলোকে আরও দক্ষ, সুশৃঙ্খল, জনমুখী ও দায়িত্বশীল করে তোলা। সংগঠনের সংখ্যা দিয়ে শক্তি মাপা যায় না, শক্তি মাপতে হয় কর্মীর মান, নেতৃত্বের যোগ্যতা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, জনসম্পৃক্ততা এবং বাস্তব প্রভাব দিয়ে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, বিভক্ত জনশক্তি কখনো তার পূর্ণ শক্তি প্রকাশ করতে পারে না। একটি নদীর পানি শত খালে ছড়িয়ে গেলে তার প্রবাহ দুর্বল হয়ে যায়, কিন্তু সঠিক ব্যবস্থাপনায় সেই পানিই শক্তিশালী স্রোতে পরিণত হতে পারে। ইসলামপন্থীদের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন তেমনই বিভিন্ন সংগঠন থাকবে, মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু বৃহত্তর কল্যাণের জায়গায় সমন্বয় ও সহযোগিতার একটি শক্তিশালী সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।

অতএব আজ সময় এসেছে অন্যের ব্যর্থতার হিসাব করার আগে নিজেদের আয়নায় একবার তাকানোর। আমরা কোথায় দুর্বল, কেন কর্মীরা হতাশ হয়, কেন তরুণরা দূরে সরে যায়, কেন সংগঠনগুলো পরস্পরের শক্তিকে কাজে লাগাতে পারে না, এসব প্রশ্নের নির্মোহ উত্তর খুঁজতে হবে।

ইসলামপন্থীদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু কতগুলো সংগঠন আছে তার ওপর নয়, বরং তারা কতটা ঐক্যবদ্ধ, কতটা প্রশিক্ষিত, কতটা সুশৃঙ্খল, কতটা জনমুখী এবং কতটা প্রজ্ঞার সঙ্গে সময়কে মোকাবিলা করতে পারে, তার ওপর।

সংখ্যা নয়, মান। বিভাজন নয়, সহযোগিতা। ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা নয়, আদর্শকেন্দ্রিকতা। আবেগ নয়, প্রজ্ঞা। এই চারটি পরিবর্তন যদি বাস্তবে আনা যায়, তাহলে বাংলাদেশের ইসলামপন্থী রাজনীতি নতুন করে শক্তি, আস্থা ও কার্যকারিতা অর্জন করতে পারবে ইনশাআল্লাহ।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক: রাংজিয়ল জামেয়া নজীবিয়া ইসলামীয়া মাদ্রাসা, নূরজাহানপুর, গোলাপগঞ্জ, সিলেট- 01860278339

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ