অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও IBD’র বিস্তার: কোথায় সমাধান ?
- Update Time : ১২:২৯:৩০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
- / ৫ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
বিশ্ব আইবিডি দিবস ২০২৬
বর্তমান বিশ্বের অন্যতম বড় স্বাস্থ্যচ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো জীবনযাপনজনিত রোগের দ্রুত বিস্তার।
ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা কিংবা হৃদরোগের মতো সমস্যার পাশাপাশি এখন নীরবে বাড়ছে আরেকটি জটিল রোগ Inflammatory Bowel Disease IBD।
একসময় পশ্চিমা বিশ্বের রোগ হিসেবে পরিচিত এই অসুখ এখন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশেও গত কয়েক বছরে IBD রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা মনে করছেন। উদ্বেগের বিষয় হলো, অধিকাংশ মানুষ এখনও এই রোগ সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতন নন। ফলে অনেক রোগী দীর্ঘদিন ভুল চিকিৎসা নিয়ে জটিলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।
IBD মূলত অন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহজনিত রোগ।
এর প্রধান দুটি ধরন হলো Crohn’s Disease এবং Ulcerative Colitis। এই রোগে অন্ত্রের ভেতরে প্রদাহ সৃষ্টি হয়, যা ধীরে ধীরে রোগীর স্বাভাবিক জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে।
পেটব্যথা, দীর্ঘদিন পাতলা পায়খানা, মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া, ওজন কমে যাওয়া, দুর্বলতা, ক্ষুধামন্দা ইত্যাদি এর সাধারণ উপসর্গ।
অনেক সময় রোগীরা এসব সমস্যাকে সাধারণ গ্যাস্ট্রিক, আমাশয় বা খাদ্যজনিত সমস্যা মনে করে অবহেলা করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন অবহেলিত অবস্থায় থাকলে IBD অন্ত্রের স্থায়ী ক্ষতি, অপুষ্টি, এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
বিশ্বজুড়ে IBD বৃদ্ধির পেছনে আধুনিক জীবনযাপনকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নগরায়ন, ফাস্টফুড সংস্কৃতি, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ এবং শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া মানুষের অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে প্রভাবিত করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের খাদ্যাভ্যাস ও পরিবেশগত পরিবর্তন অন্ত্রের ভেতরে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট করছে। এই পরিবর্তন শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করে, ফলে শরীর নিজেই অন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রদাহ সৃষ্টি করতে শুরু করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সমস্যা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক দশক আগেও গ্রামবাংলার মানুষ প্রাকৃতিক ও ঘরোয়া খাবারের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু বর্তমানে শহর ও গ্রাম উভয় জায়গায়ই প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত তেল-চর্বি, কোমল পানীয় ও রাস্তার অস্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যবহার বেড়েছে। শিশু ও তরুণদের মধ্যে ফাস্টফুডের প্রতি আসক্তি উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব খাবারে অতিরিক্ত চিনি, লবণ, কৃত্রিম রং ও সংরক্ষণকারী উপাদান থাকে, যা অন্ত্রের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করতে পারে।
অন্যদিকে শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়াও একটি বড় কারণ।
প্রযুক্তিনির্ভর জীবন মানুষকে ক্রমেই অলস করে তুলছে।
দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা, মোবাইল ও কম্পিউটারে অতিরিক্ত সময় কাটানো এবং নিয়মিত ব্যায়ামের অভাব শরীরের বিপাকীয় কার্যক্রমের পাশাপাশি অন্ত্রের স্বাস্থ্যেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম অন্ত্রের প্রদাহ কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
মানসিক চাপও IBD বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আধুনিক জীবনে প্রতিযোগিতা, চাকরির অনিশ্চয়তা, পারিবারিক চাপ, সামাজিক উদ্বেগ এবং ডিজিটাল জীবনের অতিনির্ভরতা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর প্রভাব ফেলছে।
দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে এবং অন্ত্রের প্রদাহ বাড়িয়ে দিতে পারে।
অনেক IBD রোগীই জানান, মানসিক চাপ বাড়লে তাদের উপসর্গও বেড়ে যায়।
বাংলাদেশে আরেকটি বড় সমস্যা হলো অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার।
সামান্য জ্বর, সর্দি কিংবা পেটের সমস্যায় অনেক মানুষ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করেন। এতে অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস হয় এবং অন্ত্রের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়।
দীর্ঘমেয়াদে এটি IBD-এর ঝুঁকি বাড়াতে পারে। শুধু তাই নয়, অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের মতো বৈশ্বিক সমস্যাও তৈরি করছে।
ধূমপানও IBD-এর ক্ষেত্রে একটি বড় ঝুঁকির কারণ।
বিশেষ করে Crohn’s Disease-এর সঙ্গে ধূমপানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
ধূমপান অন্ত্রের রক্তপ্রবাহ কমিয়ে দেয় এবং প্রদাহ বাড়িয়ে তোলে।
একইভাবে পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব ও অনিয়মিত জীবনযাপন শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ছন্দ নষ্ট করে, যা দীর্ঘমেয়াদে রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
IBD শুধু শারীরিক সমস্যা নয়; এটি মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাও তৈরি করে।
একজন রোগী যখন দিনে বহুবার টয়লেটে যেতে বাধ্য হন, তখন তার স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়।
শিক্ষার্থী পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়তে পারে, চাকরিজীবী কর্মক্ষমতা হারাতে পারেন, এমনকি সামাজিক সম্পর্কেও দূরত্ব তৈরি হতে পারে।
দীর্ঘদিনের অসুস্থতা অনেক রোগীকে হতাশা ও উদ্বেগে ভোগায়।
তাহলে সমাধান কোথায়?
সমাধানের প্রথম ধাপ হলো সচেতনতা বৃদ্ধি। মানুষকে বুঝতে হবে যে দীর্ঘদিনের পেটব্যথা, পাতলা পায়খানা, রক্তমিশ্রিত মল বা ওজন কমে যাওয়া সাধারণ সমস্যা নয়। এসব উপসর্গ দীর্ঘদিন থাকলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। অনেক মানুষ লজ্জা বা অবহেলার কারণে চিকিৎসা নিতে দেরি করেন, যা রোগকে আরও জটিল করে তোলে।
দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফলমূল, আঁশযুক্ত খাবার ও পর্যাপ্ত পানি থাকতে হবে। অতিরিক্ত ফাস্টফুড, কোমল পানীয়, অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কমাতে হবে। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস শেখানো দরকার।
তৃতীয়ত, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়ামকে জীবনের অংশ করতে হবে। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম শরীরের সামগ্রিক সুস্থতার পাশাপাশি অন্ত্রের স্বাস্থ্যও ভালো রাখতে সাহায্য করে। একইসঙ্গে পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা জরুরি।
চতুর্থত, মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ কমানোর পরিবেশ তৈরি করা দরকার। ধ্যান, প্রার্থনা, সামাজিক যোগাযোগ ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে।
অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।
ফার্মেসি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইন প্রয়োগ জরুরি।
জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকেও এ ক্ষেত্রে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যায়ে ( Rural Medical Practitioner) চিকিৎসকদের IBD সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে রোগ দ্রুত শনাক্ত করা যায়।
একইসঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহ জরুরি, কারণ সঠিক তথ্য ছাড়া কার্যকর পরিকল্পনা নেওয়া সম্ভব নয়।
মিডিয়াও সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। টেলিভিশন, পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্বাস্থ্যবিষয়ক ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে মানুষকে IBD সম্পর্কে জানাতে হবে।
স্কুল-কলেজেও স্বাস্থ্যশিক্ষার অংশ হিসেবে অন্ত্রের স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত।
IBD কেবল একটি রোগ নয় এটি আধুনিক জীবনযাপনের প্রতিচ্ছবি। আমরা যত বেশি অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের দিকে ঝুঁকছি, তত বেশি এই ধরনের রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে। তাই শুধু চিকিৎসার ওপর নির্ভর করলেই হবে না আমাদের জীবনযাপনেও পরিবর্তন আনতে হবে।
সুস্থ জীবনযাপন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, মানসিক সুস্থতা এবং সচেতন স্বাস্থ্যনীতি এসবের সমন্বয়ই পারে IBD-এর বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করতে।
কারণ একটি সুস্থ জাতি গঠনের জন্য শুধু হাসপাতাল নয়, প্রয়োজন স্বাস্থ্যসচেতন সমাজও।
লেখক: মনজুরুল মাআবুদ: মাস্টার্স অব পাবলিক হেলথ (পুষ্টি ও স্বাস্থ্য) এসএমসি’র ব্লুস্টার স্বাস্থ্য সেবা দানকারী, বি ফার্মা। বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিল।




























