০৩:২৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ২০ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসলামে ঐক্যের রূপরেখা

  • Update Time : ০৯:৪৬:৩২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ এপ্রিল ২০২২
  • / ৫ বার নিউজটি পড়া হয়েছে

মূল: মাওলানা ওহিদুদ্দিন খান, তর্জমা: মওলবি আশরাফ

 

আপনি যদি কোনো মুসলিম নেতার সাক্ষাতে যান, অথবা কোনো প্রতিষ্ঠানে যান, প্রত্যেকেই তাদের কার্যক্রমের লম্বা লিস্ট আপনার সামনে উপস্থাপন করবে। সব জায়গাতেই আপনি সাফল্যের জয়গান শুনবেন। আমাদের নেতৃবৃন্দ এবং প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বক্তব্যমাফিক খুব চমৎকার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তাদের কার্যক্রম যদি সামগ্রিক চোখে দেখা হয়, তাহলে দেখা যাবে এ কিছুই না। ব্যক্তির অবস্থান থেকে বেরিয়ে সামগ্রিক অবস্থানে যাওয়ার নামই ‘মুসলিম উম্মাহ’, অথচ কী আশ্চর্য— উম্মাহর প্রত্যেকেই তাদের কাজে সফল কিন্তু সামগ্রিকভাবে ইসলাম এখনও পরাজিত। ছোট ছোট বিভিন্ন দলের সাফল্যের মিনার দাঁড় করানো কীভাবে ‘জয়ের’ প্রমাণ হতে পারে, যেখানে গোটা মুসলিম জাতি ব্যর্থতায় পর্যবসিত?

 

এই ফলাফলের কারণ হলো যাকে ইসলামি কাজ বলা হচ্ছে তা প্রকৃতপক্ষে ইসলামি কাজ নয়। এই সবই ব্যক্তিবিশেষের কাজ-কারবার। এই জন্য ব্যক্তির ছত্রছায়ায় সাফল্যের দেখা মিললেও সামগ্রিক অবস্থানে তার নিশানাও দেখা যাচ্ছে না। লোকজন নিজেদের কর্মকাণ্ডে ইসলামের লেবেল লাগিয়ে রেখেছে, তাই মূল ইসলামে তার কোনো প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। একটি বড় শহরে এক লাখেরও বেশি লাভবান দোকানদার আছেন, যারা সকাল থেকে সন্ধ্যা বিক্রিবাট্টা চালায়। আপনি যদি তাদের লাভের কথা জিজ্ঞেস করেন, তারা সপ্রশংস তার বর্ণনা দিবে। কিন্তু ওই লাভের টাকা পাহাড় পরিমাণ হলেও জাতির স্বার্থে তা কিছুই না। কারণ সবার আয় তার নিজের জন্য, কোথাও ‘একত্র’ করার জন্য নয়। তো প্রত্যেক দোকানদার তার লাভের টাকা ব্যক্তিজীবন ও ঘরবাড়ি উন্নত করবে, কিন্তু জাতির এতে কিছুই আসবে-যাবে না। তার পরিবর্তন কেবলই তার সাফল্য, জাতির এখানে কোনো কিছুই নাই। বর্তমান মুসলমানদের কায়-কারবারও এখন থেকে বুঝে নিন। যতই তারা ইসলামের জিকির করুক, যতই জাঁকজমকপূর্ণ সাইনবোর্ড লাগাক, তাদের কাজ গুটিকয়েক মানুষের জন্য, সামগ্রিক মুসলমানদের জন্য নয়।

 

জুতা-কাপড়ের ব্যবসা মানুষ এই জন্য করে যে এতে লাভের দেখা পাবে। এরকম লাভের নিয়তে কেউ যদি ইসলামি কাজ করে, তাতে লাভ পাবে ঠিক, কিন্তু আল্লাহর দৃষ্টিতে তা ইসলামি কাজ নয়। কেননা ইসলামে আমল ও কাজের মূল হলো নিয়ত। যদি একমাত্র আল্লাহকে খুশি করার জন্য কাজ করে থাকে, তখনই গিয়ে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। এরপর সে পার্থিব উপায়-উপকরণ হিসেবে যে-কাজই করুক না কেন, আল্লাহ তাতে বরকত দিবেন।

পাহাড়ে অনেক ছোট ছোট ঝরনা বয়। কিন্তু সেসব কেবলই পানির স্রোত, এর বেশি কিছু নয়। আল্লাহর কুদরতে যখন কয়েকটা ঝরনা এক হয়ে যায়, তখন যে স্রোতধারা বয়, সেখান থেকে নদীর উৎপত্তি হয়।

আল্লাহ মুসলমানদের কাছ থেকে ঠিক এমনটিই চান, আমরা বড় কিছু করার জন্য যেন একাট্টা হই। কুরআনে এরশাদ করেন— ‘আল্লাহ ওইসব লোকদের পছন্দ করেন যারা তার রাস্তায় একত্রে লড়াই করে, যেন-বা তারা সীসাঢালা প্রাচীর।’ (সুরা সফ, আয়াত ৪)

তো ওই কাজই কেবল আল্লাহর কাছে ইসলামি কাজ, যা সমষ্টির স্বার্থে হয়। মানুষ তো কাজ করবে তার নিজ জায়গা থেকে, কিন্তু তার কাজ যেন দিনশেষে এক নদীর রূপ ধারণ করে। অন্যথায় ছোট ছোট ঝরনার বহমান থাকলে সে কোনো উপকারেই আসবে না।

মুসলমান যদি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অধীনে কাজ করে, তাহলে তার কাজ ব্যক্তিগত কাজের মতোই বেফায়দা। সে যদি আদতেই আল্লাহর জন্য কাজ করে থাকে, তাহলে অসম্ভব যে তার কাজ কেবল নিজেকেই কেন্দ্র করে হবে অথবা অন্যের সাথে মিলে এক বড় নদীতে পরিণত হবে না।

লোহার ছোট ছোট কণা ওইসময় পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন থাকে, যতক্ষণ না তাদের ওপর চুম্বক ধরা না হয়। বালুর ওপর একটা চুম্বক ধরা হলে যেমন আশপাশ থেকে লোহার কণা ছোট আসে, তেমনই কাজ যদি প্রকৃতঅর্থেই আল্লাহর জন্য হয় তাহলে আল্লাহর সত্তা এক মহা চুম্বক পাথরের মতো সবাইকে এক করে ফেলবে।

মুসলমানদের সবধরনের চেষ্টাপ্রচেষ্টার পরও বিচ্ছিন্নতা কেবল ওইসময় হতে পারে যখন তার কাজ স্রেফ নিজের জন্য হয়।

একতাবদ্ধ কাজের জন্য যখন কয়েকজন মানুষ একাট্টা হয়, তখন নানাধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সামনে পড়ে। কারও মেজাজ চড়া থাকে, কেউ আবার বেশি অভিযোগ করে, কারও দুর্বলতার কারণে সঙ্গীর ওপর চাপ পড়ে, কখনো বলার আগ্রহকে দমিয়ে কেবল শুনে যেতে হয়, কখনো অন্যের জন্য নিজের আসন ছেড়ে দিতে হয়, মোটকথা প্রতিনিয়ত এরকম কোনো ঘটনার সামনে পড়তে হয় যেখানে ব্যক্তির নিজেকে ছোট করতে হয়, কোরবানি দিতে হয়।

এই পরিস্থিতিতেই মানুষকে ঐক্যবন্ধনের পরীক্ষা দিতে হয়। নিজের স্বার্থ ত্যাগ করে অন্য ভাইকে প্রাধান্য দেওয়া, অর্থাৎ কোরবানিই হলো একতাবদ্ধ হওয়ার প্রধান ঘটক। যেই জাতির সাধারণ সদস্যদের মধ্যে এই আবেগ আগ্রহ জেগে উঠবে, তাদের মধ্যে নিশ্চিতভাবেই ঐক্য হওয়া সম্ভব। তারাই পারবে অনেক বড় বড় সমস্যা অনায়াসেই সমাধান করে ফেলতে।

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ

ইসলামে ঐক্যের রূপরেখা

Update Time : ০৯:৪৬:৩২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ এপ্রিল ২০২২

মূল: মাওলানা ওহিদুদ্দিন খান, তর্জমা: মওলবি আশরাফ

 

আপনি যদি কোনো মুসলিম নেতার সাক্ষাতে যান, অথবা কোনো প্রতিষ্ঠানে যান, প্রত্যেকেই তাদের কার্যক্রমের লম্বা লিস্ট আপনার সামনে উপস্থাপন করবে। সব জায়গাতেই আপনি সাফল্যের জয়গান শুনবেন। আমাদের নেতৃবৃন্দ এবং প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বক্তব্যমাফিক খুব চমৎকার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তাদের কার্যক্রম যদি সামগ্রিক চোখে দেখা হয়, তাহলে দেখা যাবে এ কিছুই না। ব্যক্তির অবস্থান থেকে বেরিয়ে সামগ্রিক অবস্থানে যাওয়ার নামই ‘মুসলিম উম্মাহ’, অথচ কী আশ্চর্য— উম্মাহর প্রত্যেকেই তাদের কাজে সফল কিন্তু সামগ্রিকভাবে ইসলাম এখনও পরাজিত। ছোট ছোট বিভিন্ন দলের সাফল্যের মিনার দাঁড় করানো কীভাবে ‘জয়ের’ প্রমাণ হতে পারে, যেখানে গোটা মুসলিম জাতি ব্যর্থতায় পর্যবসিত?

 

এই ফলাফলের কারণ হলো যাকে ইসলামি কাজ বলা হচ্ছে তা প্রকৃতপক্ষে ইসলামি কাজ নয়। এই সবই ব্যক্তিবিশেষের কাজ-কারবার। এই জন্য ব্যক্তির ছত্রছায়ায় সাফল্যের দেখা মিললেও সামগ্রিক অবস্থানে তার নিশানাও দেখা যাচ্ছে না। লোকজন নিজেদের কর্মকাণ্ডে ইসলামের লেবেল লাগিয়ে রেখেছে, তাই মূল ইসলামে তার কোনো প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। একটি বড় শহরে এক লাখেরও বেশি লাভবান দোকানদার আছেন, যারা সকাল থেকে সন্ধ্যা বিক্রিবাট্টা চালায়। আপনি যদি তাদের লাভের কথা জিজ্ঞেস করেন, তারা সপ্রশংস তার বর্ণনা দিবে। কিন্তু ওই লাভের টাকা পাহাড় পরিমাণ হলেও জাতির স্বার্থে তা কিছুই না। কারণ সবার আয় তার নিজের জন্য, কোথাও ‘একত্র’ করার জন্য নয়। তো প্রত্যেক দোকানদার তার লাভের টাকা ব্যক্তিজীবন ও ঘরবাড়ি উন্নত করবে, কিন্তু জাতির এতে কিছুই আসবে-যাবে না। তার পরিবর্তন কেবলই তার সাফল্য, জাতির এখানে কোনো কিছুই নাই। বর্তমান মুসলমানদের কায়-কারবারও এখন থেকে বুঝে নিন। যতই তারা ইসলামের জিকির করুক, যতই জাঁকজমকপূর্ণ সাইনবোর্ড লাগাক, তাদের কাজ গুটিকয়েক মানুষের জন্য, সামগ্রিক মুসলমানদের জন্য নয়।

 

জুতা-কাপড়ের ব্যবসা মানুষ এই জন্য করে যে এতে লাভের দেখা পাবে। এরকম লাভের নিয়তে কেউ যদি ইসলামি কাজ করে, তাতে লাভ পাবে ঠিক, কিন্তু আল্লাহর দৃষ্টিতে তা ইসলামি কাজ নয়। কেননা ইসলামে আমল ও কাজের মূল হলো নিয়ত। যদি একমাত্র আল্লাহকে খুশি করার জন্য কাজ করে থাকে, তখনই গিয়ে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। এরপর সে পার্থিব উপায়-উপকরণ হিসেবে যে-কাজই করুক না কেন, আল্লাহ তাতে বরকত দিবেন।

পাহাড়ে অনেক ছোট ছোট ঝরনা বয়। কিন্তু সেসব কেবলই পানির স্রোত, এর বেশি কিছু নয়। আল্লাহর কুদরতে যখন কয়েকটা ঝরনা এক হয়ে যায়, তখন যে স্রোতধারা বয়, সেখান থেকে নদীর উৎপত্তি হয়।

আল্লাহ মুসলমানদের কাছ থেকে ঠিক এমনটিই চান, আমরা বড় কিছু করার জন্য যেন একাট্টা হই। কুরআনে এরশাদ করেন— ‘আল্লাহ ওইসব লোকদের পছন্দ করেন যারা তার রাস্তায় একত্রে লড়াই করে, যেন-বা তারা সীসাঢালা প্রাচীর।’ (সুরা সফ, আয়াত ৪)

তো ওই কাজই কেবল আল্লাহর কাছে ইসলামি কাজ, যা সমষ্টির স্বার্থে হয়। মানুষ তো কাজ করবে তার নিজ জায়গা থেকে, কিন্তু তার কাজ যেন দিনশেষে এক নদীর রূপ ধারণ করে। অন্যথায় ছোট ছোট ঝরনার বহমান থাকলে সে কোনো উপকারেই আসবে না।

মুসলমান যদি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অধীনে কাজ করে, তাহলে তার কাজ ব্যক্তিগত কাজের মতোই বেফায়দা। সে যদি আদতেই আল্লাহর জন্য কাজ করে থাকে, তাহলে অসম্ভব যে তার কাজ কেবল নিজেকেই কেন্দ্র করে হবে অথবা অন্যের সাথে মিলে এক বড় নদীতে পরিণত হবে না।

লোহার ছোট ছোট কণা ওইসময় পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন থাকে, যতক্ষণ না তাদের ওপর চুম্বক ধরা না হয়। বালুর ওপর একটা চুম্বক ধরা হলে যেমন আশপাশ থেকে লোহার কণা ছোট আসে, তেমনই কাজ যদি প্রকৃতঅর্থেই আল্লাহর জন্য হয় তাহলে আল্লাহর সত্তা এক মহা চুম্বক পাথরের মতো সবাইকে এক করে ফেলবে।

মুসলমানদের সবধরনের চেষ্টাপ্রচেষ্টার পরও বিচ্ছিন্নতা কেবল ওইসময় হতে পারে যখন তার কাজ স্রেফ নিজের জন্য হয়।

একতাবদ্ধ কাজের জন্য যখন কয়েকজন মানুষ একাট্টা হয়, তখন নানাধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সামনে পড়ে। কারও মেজাজ চড়া থাকে, কেউ আবার বেশি অভিযোগ করে, কারও দুর্বলতার কারণে সঙ্গীর ওপর চাপ পড়ে, কখনো বলার আগ্রহকে দমিয়ে কেবল শুনে যেতে হয়, কখনো অন্যের জন্য নিজের আসন ছেড়ে দিতে হয়, মোটকথা প্রতিনিয়ত এরকম কোনো ঘটনার সামনে পড়তে হয় যেখানে ব্যক্তির নিজেকে ছোট করতে হয়, কোরবানি দিতে হয়।

এই পরিস্থিতিতেই মানুষকে ঐক্যবন্ধনের পরীক্ষা দিতে হয়। নিজের স্বার্থ ত্যাগ করে অন্য ভাইকে প্রাধান্য দেওয়া, অর্থাৎ কোরবানিই হলো একতাবদ্ধ হওয়ার প্রধান ঘটক। যেই জাতির সাধারণ সদস্যদের মধ্যে এই আবেগ আগ্রহ জেগে উঠবে, তাদের মধ্যে নিশ্চিতভাবেই ঐক্য হওয়া সম্ভব। তারাই পারবে অনেক বড় বড় সমস্যা অনায়াসেই সমাধান করে ফেলতে।

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ