সংগঠন শুধু নামে নয়, কর্মচঞ্চলতাই তার প্রাণশক্তি: সালেহ নজীব আল আইয়ুবী
- Update Time : ০৫:৪০:৫০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬
- / ১৭ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
তৃণমূল সংগঠনকে শক্তিশালী করার তাত্ত্বিক ও বাস্তবভিত্তিক কিছু ভাবনা।
শুধু সংগঠনের নাম থাকলেই সংগঠন শক্তিশালী হয় না, কমিটি থাকলেই সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত হয় না। একটি সংগঠনের প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে তার কর্মচঞ্চলতা, কর্মীদের পারস্পরিক সম্পর্ক, নেতৃত্বের প্রতি আস্থা, নিয়মিত কার্যক্রম এবং সুস্পষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক কর্মপরিকল্পনার ওপর।
একটি সংগঠনের কেন্দ্র যতই শক্তিশালী হোক, যদি তার ওয়ার্ড, ইউনিয়ন বা তৃণমূল শাখাগুলো নিষ্ক্রিয় থাকে, তাহলে সেই শক্তি কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। বিপরীতে, ছোট ছোট শাখাগুলো যদি নিয়মিত বৈঠক, প্রশিক্ষণ, সামাজিক কর্মকাণ্ড, জনসম্পৃক্ততা ও সাংগঠনিক কর্মসূচির মাধ্যমে সক্রিয় থাকে, তাহলে ধীরে ধীরে পুরো সংগঠন একটি জীবন্ত ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
সাংগঠনিক কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলো তৃণমূল। কারণ এখানেই কর্মী তৈরি হয়, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং সংগঠনের আদর্শ বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়।
প্রতিটি ওয়ার্ড শাখার জন্য নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। মাসে কতটি বৈঠক হবে, কতজন নতুন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ হবে, কতটি সামাজিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে, কতজন কর্মী প্রশিক্ষণ নেবে, এসব বিষয়কে পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।
মনে রাখতে হবে, সংগঠন শুধু দায়িত্বের কাঠামো নয়, সংগঠন মূলত মানুষের সমষ্টি। তাই কর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সহযোগিতা ও আস্থার সম্পর্ক না থাকলে সাংগঠনিক কাঠামো দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
একজন কর্মী যেন মনে করেন “আমি একা নই, আমার পাশে আমার সহকর্মীরা আছেন।”
নিয়মিত বসা, পরামর্শ করা, একে অপরের খোঁজ নেওয়া, অসুস্থতা ও বিপদে পাশে দাঁড়ানো এবং আনন্দ-বেদনায় অংশ নেওয়া সাংগঠনিক সম্পর্ককে গভীর করে। সম্পর্ক যত দৃঢ় হবে, সংকটের সময় সংগঠন তত বেশি ঐক্যবদ্ধ থাকবে।
একটি সংগঠন যদি শুধু নিজেদের অভ্যন্তরীণ সভা-সমাবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হতে পারে।
মানুষের সুখ-দুঃখের অংশীদার হতে হবে। শিক্ষা, মানবসেবা, অসহায় মানুষের সহযোগিতা, দুর্যোগকালীন সহায়তা, পরিচ্ছন্নতা, রক্তদান,, সামাজিক সচেতনতা, নিজেদের আদর্শ ও সামর্থ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিভিন্ন কল্যাণমূলক কাজে সম্পৃক্ত হওয়া প্রয়োজন।
মানুষকে শুধু সংগঠনের কর্মী হিসেবে নয়, সমাজের একজন মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে।
জনগণের পাশে থাকার দীর্ঘমেয়াদি অভিজ্ঞতাই একটি সংগঠনের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে।
কাজ করা আর পরিকল্পিতভাবে কাজ করা এক বিষয় নয়।
প্রতিটি শাখার জন্য স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন। যেমন: কর্মী বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ, সামাজিক যোগাযোগ, নতুন পরিবারে পৌঁছানো, জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম কিংবা সাংগঠনিক দক্ষতা উন্নয়ন।
তবে টার্গেট যেন শুধু সংখ্যার খেলা না হয়। টার্গেটের সঙ্গে থাকতে হবে মান, ধারাবাহিকতা ও মূল্যায়ন।
মাসের শুরুতে পরিকল্পনা, মাঝপথে তদারকি এবং মাস শেষে মূল্যায়ন, এই তিনটি ধাপ সাংগঠনিক কর্মপদ্ধতিকে অনেক বেশি কার্যকর করতে পারে।
একজন দায়িত্বশীল নেতার কাজ কেবল কর্মীদের দিয়ে কাজ করানো নয়, বরং কর্মীদের তৈরি করা।
ভালো নেতৃত্ব কর্মীদের দায়িত্ব দেয়, তাদের কথা শোনে, ভুল হলে সংশোধন করে, সফল হলে উৎসাহিত করে এবং প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ায়।
সিনিয়র ও জুনিয়রের মধ্যে যদি দূরত্ব তৈরি হয়, তাহলে সাংগঠনিক প্রাণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই অভিজ্ঞদের জ্ঞান এবং নবীনদের উদ্যম, এই দুইয়ের সমন্বয় ঘটানো অত্যন্ত জরুরি।
অভিজ্ঞতা পথ দেখাবে, তারুণ্য গতি দেবে, এই সমন্বয়েই সংগঠন এগিয়ে যায়।
আরেকটি কথা: কর্মী সংখ্যা বৃদ্ধি করাই সাংগঠনিক সাফল্যের শেষ কথা নয়। দক্ষ, দায়িত্বশীল, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও আদর্শনিষ্ঠ কর্মী তৈরি করাই প্রকৃত সাফল্য।
তাই নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পাঠচক্র, আলোচনা, সাংগঠনিক শিক্ষা ও দায়িত্বভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
আজকের কর্মীকে আগামী দিনের দায়িত্বশীল হিসেবে গড়ে তুলতে না পারলে সংগঠন ব্যক্তি-নির্ভর হয়ে পড়ে। আর ব্যক্তি-নির্ভর সংগঠন নেতৃত্বের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
স্মরণ রাখতে হবে, যে কাজের মূল্যায়ন নেই, সেই কাজের ধারাবাহিকতা অনেক সময় থাকে না।
প্রতিটি স্তরে নির্দিষ্ট সময় পরপর মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন, কী পরিকল্পনা ছিল, কী অর্জিত হয়েছে, কোথায় ব্যর্থতা এসেছে এবং কেন এসেছে।
মূল্যায়নের উদ্দেশ্য যেন কাউকে ছোট করা না হয়, বরং ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা আরও কার্যকর করা হয়।
অনেক সংগঠনের সমস্যা হলো: কোনো একটি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক তৎপরতা, তারপর দীর্ঘ নীরবতা।
এভাবে সংগঠন দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হয় না। সাংগঠনিক শক্তি তৈরি হয় ছোট ছোট কাজের নিয়মিত ও ধারাবাহিক অনুশীলনের মাধ্যমে।
প্রতিদিনের সামান্য যোগাযোগ, সাপ্তাহিক বৈঠক, মাসিক মূল্যায়ন এবং নিয়মিত সামাজিক সম্পৃক্ততা, এসব ছোট উদ্যোগই একসময় বড় সাংগঠনিক শক্তিতে পরিণত হয়।
তবে সংগঠনকে মজবুত করতে শুধু নতুন কমিটি নয়, নতুন কর্মচাঞ্চল্য প্রয়োজন। শুধু পদ নয়, প্রয়োজন দায়িত্ববোধ। শুধু কর্মী সংখ্যা নয়, প্রয়োজন প্রশিক্ষিত কর্মী। শুধু সভা নয়, প্রয়োজন মাঠের কাজ। শুধু অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক নয়, প্রয়োজন সমাজের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক। আর শুধু পরিকল্পনা নয়, প্রয়োজন পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ও মূল্যায়ন।
তাই আজ প্রতিটি শাখাকে এবং নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে:
আমরা কি শুধু একটি শাখা, নাকি একটি কর্মচঞ্চল সাংগঠনিক ইউনিট?
প্রতিটি ওয়ার্ড যদি জেগে ওঠে, প্রতিটি কর্মী যদি দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে, প্রতিটি শাখা যদি নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে এবং কর্মীদের মধ্যে যদি ভ্রাতৃত্ব ও আস্থার সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তাহলে সংগঠনের শক্তি শুধু সংখ্যায় নয়, গুণে, কর্মে, গ্রহণযোগ্যতায় ও স্থায়িত্বে প্রকাশ পাবে।
শক্তিশালী কেন্দ্রের জন্য শক্তিশালী তৃণমূল দরকার, আর শক্তিশালী তৃণমূল গড়ে ওঠে সচেতন নেতৃত্ব, প্রশিক্ষিত কর্মী, পারস্পরিক সম্পর্ক, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও পরিকল্পিত কর্মতৎপরতার সমন্বয়ে।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক: রাংজিয়ল জামেয়া নজীবিয়া ইসলামীয়া মাদ্রাসা, নূরজাহানপুর, গোলাপগঞ্জ, সিলেট- 01860278339




























