শান্তিগঞ্জ সাব-রেজিস্টার অফিসে ভংকর জালিয়াতি! মামলা করেও মিলছে না প্রতিকার
- Update Time : ০৩:১৮:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ৮ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
নিজস্ব প্রতিবেদক :: সুনামগঞ্জ জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলা সাব-রেজিস্টার অফিসের ভংকর জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। দিনদিন এই অফিসটি দুর্নীতির আখড়ায় পরিনত হয়েছে। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়য়ে বদলে যায় মূল বালাম। মামলা করেও প্রতিকার মিলছে না নিরিহ মানুষের। মূল বালাম বদলের এমন অভিযোগের অনুসন্ধান করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে শান্তিগঞ্জ সাব-রেজিস্টার অফিসের ভংকর জালিয়াতি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২৫/০৩/২০২০ সালে শান্তিগঞ্জ উপজেলার পঞ্চাশ হাল মৌজার জে.এল. নং-সি,এস/এস.এ-২০৫, আর,এস/বি.এস-৫৭, খতিয়ান নং- সি,এস/এস.এ-২৪৫, নামজারী খতিয়ান নং-১৬১০, আর.এস/বি.এস-৬৬২, দাগ নং-সি.এস/এস.এ-১২২১, আর.এস/বি.এস-২১৬৯ দাগে লায়েক পতিত বর্তমালে খাল রকম ভূমির ২ শতাংশ জায়গা উপজেলার ফতেপুর গ্রামের মৃত সখী চরন বনিকের মেয়ে ও মৃত শীতেশ চন্দ্র দাসের স্ত্রী নীলিমা রানী দাসের কাছ থেকে দলিল মূলে বিগত ২৫ মার্চ ২০২০ সালে ক্রয় করেন, নোয়াখালী জেলার সোনইমুড়ি উপজেলার মানিক্যনগর গ্রামের বাসিন্দা মো. ফয়েজ উল্লা’র স্ত্রী মোছা. করিমা আক্তার মিলি। শান্তিগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল নং-৬৬৫, দলিল সম্পাদনের তারিখ: ২৫ মার্চ ২০২০ ইং। মূল দলিলে ক্রয়কিৃত ভূমির চৌহদ্দি: পূর্বে- ভিন্ন দাগে পুকুর, পশ্চিমে-বৈষ্ণর চরন সড়ক, উত্তরে- জগদীস তালুকদার ও দক্ষিণে-বিক্রিত দাগের অংশ।
পর্বতীতে বিগত ১০ জুন ২০২০ সালে একই দাগে মোছা. করিমা আক্তার মিলি’র স্বামী ও সৈয়দ আহমেদের পুত্র মো. ফয়েজ উল্ল্যা শান্তিগঞ্জ উপজেলার তেঘরিয়া গ্রামের বাসিন্দা মৃত বীরেন্দ্র তালুকদারের ছেলে জগদীস তালুকদারের কাছ থেকে দলিল মূলে ক্রয় করেন। শান্তিগঞ্জ সাব-রেজিস্টার অফিসের দলিল নং-৭৫৭। দলিল সম্পাদনের তারিখ: ১০ জুন ২০২০ ইং। মূল দলিলের ক্রয়কৃতি ভূমির চৌহদ্দি: পূর্বে- ভিন্ন দাগে পুকুর, পশ্চিমে-বৈষ্ণর চরন সড়ক, উত্তরে- বিক্রিত দাগের অবশিষ্ট ভূমি ও দক্ষিণে-অত্র দাগে খরিদ সূত্রে করিমা আক্তার মিলি।
কিন্তু সাব-রেজিস্টার অফিসের মূল বালাম খোজতে গিয়ে দেখা যায় ভয়ংকর জালিয়াতি, মূল দলিলের সাথে মূল বালামের চৌহদ্দির মিল নেই! বালাম খোজে দেখা যায়, মোছা. করিমা আক্তার মিলি’র ক্রয়কৃত ভূমির চৌহদ্দি পরিবর্তন করে পূর্বে-আর.এস ২৪১৮ নং দাগের ভূমি, পশ্চিমে-অত্র দাগের অবশিষ্ট ভুমিতে জগদীশ, উত্তরে- আর.এস ২১৬৭ নং দাগে রাস্তা ও দক্ষিণে-আর.এস ২৪১৭ নং দাগের ভূমি লিপিবদ্ধ করা হয়। একই সাথে মো. ফয়েজ উল্ল্যা’র ক্রয়কৃত ভূমির চৌহদ্দি পরিবর্তন করে, সাব-রেজিস্টার অফিসের মূল বালামে পূর্বে- অত্র দাগে খরিদ সূত্রে করিমা আক্তার মিলি, পশ্চিমে-এস এ ১২০৭ নং দাগের ভূমি, উত্তরে- বৈষ্ণব চরন রাস্তা ও দক্ষিণে-এস এ ১২২২ নং দাগের ভূমি। মূল বালামে মূল দলিলের চৌহদ্দি পরিবর্তন কে করেছে এর দায় নিচ্ছেন সাব-রেজিস্টার অফিসের কেউ। বলছেন এটি অনাকাংখিত ও আশ্চর্যের বিষয়।
জানা যায়, ক্রয়কৃত ভূমিতে করিমা আক্তার মিলি ও তাঁর স্বামী মো. ফয়েজ উল্ল্যা দখলে গেলে, তেঘরিয়া গ্রামের ক্ষিতেশ চন্দ্র দাসের ছেলে সুজন চন্দ্র দাস ও তার দলবল বাঁধা প্রদান করে বলে যে, এই জায়গা আপনাদের নয়? জায়গাটি আমাদের। কিন্তু সুজনচন্দ্রের দাবির প্রেক্ষিতে তাঁর কাগজপত্র খোজাখোজি করে জানা যায়। এই দাগে সুজন চন্দ্রের জায়গা ছিল, সেটি অন্যত্র বিক্রয় করেছেন। এই দাগে সুজন চন্দ্র তালুকদারের কোন জায়গা অবশিষ্ট নাই বা পাওয়া যায়নি।
ভোক্তভোগী মো. ফয়েজ উল্ল্যা পবর্তীতে আইনের দারস্থ হয়ে মামলা দায়ের করেন। সুনামগঞ্জ সিনিয়র সহকারি জজ আদালতে স্বত্ব মোকদ্দমা দায়ের করেন। স্বত্ব মোকদ্দমা নং-৫৩৩/২০২১ ইং। মামলায় বিবাদী হিসেবে তেঘরিয়া গ্রামের মৃত ক্ষিতেশ চন্দ্র দাসের ছেলে সুজন চন্দ্র তালুকদার, মৃত তরনী কান্তের ছেলে অবনী কান্ত দাস ও সূর্য় মনি দাশের ছেলে অনিল চন্দ্র দাস।
পরবর্তীতে সুনামগঞ্জ জেলা জজ আদালতে স্বত্ব আপীল মোকদ্দমা-৬৭/২০২৪ ইং দায়ের করেন। মামলায় তিনি উল্লেখ করেন, শান্তিগঞ্জ সাব-রেজিস্টার অফিসের রক্ষিত মূল বালাম মূল দলিলের মধ্যে ভিন্নতা ও চৌহদ্দি বদল করে ভূমিখেকো চক্রের মাধ্যমে আমার জায়গা জবর দখল করার চেষ্ঠা করে আসছেন। তিনি আরো উল্লেখ করেন, বিবাদী/ রেসপেন্ডন্ট পক্ষ সাব-রেজিস্টার অফিসের অর্থাৎ কর্মচারীদেরকে বাধ্য বশিভুত করিয়া জাবেদা নকলে এবং মূল বালামে ভিন্ন চৌহদ্দি লিখিয়া রাখিয়াছেন। যা বিবাদীর কথার সাথে মিল রহিয়াছে। মামলাটি তদন্তেপূর্ব আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মহামান্য আদালত সুনামগঞ্জ জেলা রেজিস্টার ও মহা পরিদর্শক, নিবন্ধন ঢাকাকে আদেশ প্রদান করেন।
ভোক্তভোগী মো. ফয়েজ উল্ল্যা বলেন, আমার বাড়ি নোয়াখালী জেলায়, দীর্ঘদিন ধরে শান্তিগঞ্জ উপজেলায় বসবাস করে আসছি। নিজের কোন জায়গা না থাকায় শান্তিগঞ্জের পঞ্চাশ হাল মৌজায় আমি ও আমার স্ত্রীর নামে আলাদা আলাদা ভাবে ৫ শতক জায়গা ক্রয় করি। কিন্তু আমার জায়গায় ভোগ দখল করতে গেলে তেঘরিয়া গ্রামের সুজন চন্দ্র সহ গ্রামের কয়েকজন বাঁধা প্রদান করলে আমি সুনামগঞ্জ সিনিয়র জজ আদালতে মামলা দায়ের করি। মামলার জবানবন্দি কালে জানতে পারি আমার জায়গার চৌহদ্দি মূল বালামের সাথে মূল দলিলে ভিন্নতা আছে। এ জন্য আদালত আমার মামলাটি খারিজ করেন। পরবর্তীতে আমি আপীল মামলা দায়ের করলে আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য জেলা সাব-রেজিস্টার ও মহা পরিদর্শক, নিবন্ধান ঢাকাকে নিদের্শ প্রদান করেন।
তিনি আরও বলেন, শান্তিগঞ্জ সাব-রেজিস্টার অফিসের এমন জালিয়াতির কারণে আমার ন্যায্য টাকা দিয়ে জায়গা কিনে ভোগ দখল করতে পারছি না। সাব-রেজিস্টার অফিসে ভূমি খোকু চক্রের দৌরাত্বা দিন দিন বেড়ে গেছে। আমি চাই আমার সুষ্ঠো বিচার। আমার টাকায় কেনা জমি আমাকেই দিতে হবে। সেই সাথে মূল দলিলের সাথে মূল বালাম সংশোধন করতে হবে।
তেঘরিয়া গ্রামের সুজন চন্দ্র তালুকদার জানান, এই দাগে আমার কাকাদের অংশ রয়েছে, আমি সেই কাকাদের জায়গা মৌখিক ভাবে ক্রয় করেছিলাম, পরে ফয়েজ উল্লার মামলা খারিজ হওয়ার পর আমার ৮ শতাংশ জায়গা অন্য গ্রহহীতার কাছে ওয়ারিশ সূত্রে বিক্রয় করেছেন আমার কাকারা। সাব-রেজিস্টার অফিসের মূল বালামে চৌহদ্দি পরিবর্তনের কথা আমার জানা নাই।
সাব-রেজিস্টার জামাল হোসেন জানান, আমি নতুন এসেছি, এটা আমার জানা নাই। কোর্ট যদি আমাদেরকে বালাম সংশোধনের জন্য আদেশ দেন, আমরা তা সংশোধন করে দিবো। জমি রেজিস্ট্রি করতে আমাদের অফিসে কোন হয়রানি আমার চোখে পড়েনি। তবে ক্রেতা বা গ্রহীতা কেউ যদি চালাকি করেন সেটা আমাদের দেখার বিষয় নয়। আমরা বৈধ কাগজ দেখে জমি রেজিস্ট্রি করে থাকি।
সুনামগঞ্জ জেলা রেজিস্টার মোস্তাফিজ আহমেদ জানান, বালাম ও দলিলের চৌহদ্দি পরিতর্বনের ঘটনা আমার জানা নাই। কোর্ট থেকেও কোন আদেশ আমি পাইনি। আপনার কাছ থেকেই এই প্রথম শুনলাম যে এই বিষয়ে মামলা হয়েছে ও আদালত আমাকে তদন্ত করার জন্য বলেছেন। কিন্তু অফিসিয়ালি আমি এখনো কোন ডকুমেন্ট পাইনি। কোর্টের আদেশ পেলে অবশ্যই তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




























