আজ, , ২৩শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

সংবাদ শিরোনাম :
«» জগন্নাথপুরে ছাত্রলীগ থেকে যারা পদত্যাগ করলেন «» শান্তিগঞ্জে কোটা সংস্কার আন্দোলনে উত্তাল রাজপথ, ঘন্টাব্যাপী সড়ক যোগাযোগ বন্ধ «» ইউপি চেয়ারম্যান আমির হোসেন রেজার প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করলেন পরিষদের ১১ মেম্বার «» সুনামগঞ্জে কোটা সংস্কারের সমর্থনে বিক্ষোভ, গ্রেফতার ১ «» সিলেটে এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত «» জগন্নাথপুরে দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি গ্রেফতার «» ছাত্রলীগ- পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষে নিহত- ৫, আহত কয়েকশ «» সিলেটে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা ওসমানী মেডিকেল কলেজ শিক্ষার্থীদের «» শান্তিগঞ্জে ব্যবসায়ীর ওপর দুর্বৃত্তের হামলা, টাকা-মোবাইল লুট «» ফেসবুকে নিজের লাশের ব্যাপারে যা বলেছিলেন আবু সাঈদ





বর্ষার জলে সৈয়দপুর: একাল ও সেকাল

সৈয়দ মবনু

 

সৈয়দপুর: জগন্নাথপুর উপজেলা ও সুনামগঞ্জ জেলার একটি গ্রাম। গোটা সুনামগঞ্জই ভাটি অঞ্চল। এখানে বন্যা বলতে কিছু ছিলো না এক সময়, সেটা ছিলো বর্ষা, যাকে গ্রামের ভাষায় বলা হতো ‘বাইরা’। আমার বাবা-চাচা বা গ্রাম থেকে আসা আত্মীয়রা বলতেন বাইরাত এই করবো, বাইরাত সেই হবে ইত্যাদি। বাইরা মানে গ্রামগুলোর চারদিকে টইটম্বুর পানি। নৌকা ছাড়া চলে না। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ী যেতে নৌকার বিকল্প নেই। বিয়েতে নৌকা, দূরে থেতে নৌকা, বাজারে যেতে নৌকা। মোটকথা নৌকা না থাকলে আপনি আতুর বা পঙ্গু। আমি ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দের আগের দিনগুলোর কথা বলছি। যাদের জন্ম এরপর তারা দেখেননি বর্ষায় সৈয়দপুরের মতো ভাটির গ্রামে কত জল হতো এবং প্রতিটি বাড়ী কেমন দ্বীপের মতো লাগতো।

সৈয়দপুরের ‘বাইরা’ নিয়ে আজ প্রথমে আমার স্মৃতি থেকে কিছু কথা বলবো এবং আপনারা বিচার করবেন আজকের বন্যার সাথে ‘বাইরার’ ব্যবধান কি?

 

আমি যখন পাঁচ বছরের তখন থেকে একটু একটু স্মৃতিচারণ করতে পারবো। আমাদের বছরে একবার গ্রামে যাওয়া হতো মা-বাবার সাথে এবং তা হতো বাইরায় বা বর্ষায়। হেমন্তে গোয়ালা বাজার থেকে পায়ে হেটে এতদূর যাওয়া অসম্ভব ছিলো বলে যাওয়া হতো না। খুব প্রয়োজন হলে বাবা যেতেন। আরও প্রয়োজন হলে আমরা অপেক্ষায় থাকতাম কাঁচা পথে কাদিমপুর বা নয়াবন্দর কখন গাড়ী যায়। আমাদের ছোটবেলা হেমন্তে বাড়ী গেলে মহিলা এবং বাচ্চারা পালকিতে যেতে হতো। কিংবা কোলে করে নিতে কেউ আসতেন গ্রাম থেকে। তবে আমাদের ভালো লাগতো হেটে-দৌড়ে যেতে। সেই সময় শেরপুর থেকে কুশিয়ারা নদী দিয়ে লঞ্চে রানিগঞ্জ যাওয়া যেতো। রানীগঞ্জ থেকে সৈয়দপুর যাওয়ার একটা পথ ছিলো। ছোটবেলা একবার, নাহয় দুইবার গিয়েছি।

 

বর্তমানে গোয়ালাবাজার বা ভবের বাজার হয়ে যে রাস্তা তা তখন ছিলো না। তাই আমাদের সৈয়দপুর যাতায়াতে সুবিধা ছিলো বর্ষায় নৌকা। গোয়ালাবাজারে তখন নৌকার একটা বড় ঘাট বা টার্মিনাল ছিলো। শতশত নৌকা থাকতো এই টার্মিনালে। কেউ রিজার্ভ নিতেন আর কেউ লাইনের নৌকায় যেতেন। লাইনের নৌকাকে ‘গয়নার নাও’ বলা হতো। আমরা যখন গ্রামে যেতাম তখন রিজার্ভই যেতে হতো, মূলত দাদাজী গ্রাম থেকে আব্দুল্লাহ ভাই, হুশিয়ার আলী ভাই কিংবা অন্য কাউকে নৌকা এবং পথের খাদ্য সহ পাঠিয়ে দিতেন। আমাদের অনেকগুলো নৌকা ছিলো। একটা নৌকা ছিলো আশি হাত লম্বা (নিজে মেপে দেখিনি, সবাই বলতেন আশিহাতি নৌকা) এটাকে আমাদের বাড়ীর লোকেরা বলতেন ‘ঘাসের নাও’। আমাদের প্রচুর গরু ছিলো, তাই বর্ষায় হাওড় থেকে অনেক ঘাস আনতে হতো। সেই সময়ের অনেক ঘাস এখন দেখি শহরে সাক হয়ে প্রচুর মূল্যে বিক্রি হয়। আমাদের একটি ‘ছৈয়া নাও ” ছিলো, যাকে ‘ঘোমটি নাও’ ও বলা হতো। এটা বঙ্গবন্ধুর নির্বাচনীয় প্রতিক নৌকার মতোই দেখতে। এই নৌকা নিয়ে আব্দুল্লাহ ভাই বস হুশিয়ার আলী ভাই গোয়ালা বাজার আসতেন আমাদেরকে নিতে। আব্দুল্লাহ ভাই অনেক লম্বা মানুষ ছিলেন। আমার বড়চাচা সৈয়দ আব্দুল হান্নানের সাথে মুক্তিযুদ্ধে ছিলেন। তিনি সবসময় চাচার সাথে থাকতেন। নৌকা চালাতেন। চাচা সৈয়দপুর শাহারপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হলে আব্দুল্লাহ ভাই গ্রাম পুলিশ জাতীয় কোন একটা দায়িত্বে ছিলেন। আমাদের পরিবারের জন্য তার অনেক প্রেম ছিলো। আব্দুল্লাহ ভাইয়ের ছেলে ফকির আজিজ এখন নোহা গাড়ী চালায়। সেও আমাদের সাথে আব্দুল্লাহ ভাইয়ের মতো সম্পর্ক রাখে। হুশিয়ার আলী ভাই বংশগত সৈয়দ ছিলেন। এক সময় তাঁর পূর্বপুরুষ সৈয়দপুর গ্রামে সবচেয়ে ধনি ছিলো। এক অগ্নিকাণ্ডে তার দাদারা গরীব হয়ে যান। অভাবের কারণে হুশিয়ার আলী ভাই আমাদের বাড়ীতে চাকুরী করতেন। তিনি আমাদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। তাঁর পূর্বপুরুষ বা পইরদাদা আমার পইরদাদার মামাতো ভাই। হুশিয়ার আলী ভাই আমাদের বাসায়ও চাকুরী করেছেন। পরে আমি দেখেছি তিনি গ্রামে গয়নার নৌকা বাইতেন। নৌকার যুগ পরে হুশিয়ার আলী ভাই বেকার হয়ে যান। মাঝেমধ্যে সাহায্যের জন্য এলেও পরে আর জানিনা কি অবস্থা তাদের।

 

আমরা সেই সময় গোলাবাজার থেকে কাদিমপুর, শাহারপাড়া হয়ে সমুদ্রের মতো ঢেউ তোলা হাওড়, স্রোতবাহি নদী এবং বিভিন্ন খাল পেরিয়ে তখন সৈয়দপুর যেতে হতো।

 

সৈয়দপুরে গেলে আমরা বিভিন্ন বাড়ীতে নৌকা দিয়ে স্বপরিবারে দাওয়াতে যেতাম। প্রত্যেক বাড়ী ছিলো একেকটা দ্বীপ। প্রায় বাড়ীর সামনে কম হলেও চার-পাঁচ হাত জল থাকতো।

 

গোয়ালাবাজার থেকে সৈয়দপুর ভাটি ছিলো। প্রচুর জলের স্রোত ছিলো তখন সৈয়দপুরের দিকে। শাহারপাড়ার হাওড়-নদী, খাল-বিল হয়ে জল সৈয়দপুর হয়ে পশ্চিমের দিকে জগন্নাথপুর, জগদিশপুর, রানীগঞ্জ, সজনসিড়ি ইত্যাদি হয়ে জলের পথ ছিলো। আমরা যদি লুদরপুর থেকে তেঘরী পর্যন্ত সৈয়দপুরের পশ্চিম সীমানা চিহ্নিত করি তবে যে পানি পূর্বদিক থেকে এসে সৈয়দপুর অতিক্রম করে পশ্চিমের দিকে যেতে হয় সেখানে আগুনকোনা-ইশানকোনায় ছিলো দারা মিয়ার বাড়ীর খাল, নাফিতবাড়ীর খাল, বাজারের খাল, আগুনকোনার খাল, বড় গোপাট ইত্যাদি প্রায় বিশ-পঁচিশটি ছোট-বড় জলের পথ। ছিলো মাগুড়া নদীতে উত্তরে লুদরপুর হয়ে এবং দক্ষিণে তেঘরি হয়ে জল যাওয়ার পথ।

 

১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দের দিকে প্রায় বছরখানিক আমি সৈয়দপুর থেকে গ্রামের কওমী মাদরাসায় পড়েছি। তখন আমিও নৌকা চালানো শিখি। আমাকে একটা ছোট নৌকা বানিয়ে দিয়েছিলেন যা দিয়ে আমি মাদরাসায় যাওয়া-আসা করতে পারতাম। সৈয়দপুর কওমী মাদরাসা হলো নোয়াপাড়া। বাজারের খাল দিয়ে গিয়ে গোয়ালগাও হয়ে যেতে হতো মাদরাসায়। এই খালে খুব স্রোত ছিলো পশ্চিমের দিকে। আগুনকোনা ইশানকোনা থেকে পশ্চিমে যত খাল গিয়েছে প্রত্যেকটিতে এই সময় আমার কোন না কোন কারণে চলাফেরা হয়েছে। প্রতিটি খালই স্রোতবাহী ছিলো।

 

আরও পূর্ব থেকে সেই সময় যে প্রশস্তভাবে পাঙ্কা মেলে জল আসতো তা পশ্চিমে সেই পাঙ্কা মেলে যেতে পারতো না বলে স্রোত তৈরি হতো। যেগুলো যেতে পারতো না সেগুলো জট লাগতো। এই জট যাতে নিয়ন্ত্রণ করা যায় সেজন্য ছিলো বরদারা মাঠ, বাঘমারা মাঠ, হালিচারা মাঠ ইত্যাদি বড় বড় জলের ওয়েটিং রোম। ছিলো কাটাগাঙ। ছিলো প্রতিটি বাড়ীর সামনে বড় বড় খাল। আবার বাড়ীর বৃষ্টির জল যাতে সরাসরি মাঠে বা নদীতে গিয়ে জট তৈরী না করে সেজন্য ছিলো প্রতিটি বাড়ীর সামনে-পিছনে পুকুর বা দীঘি।

 

সৈয়দপুরের পূর্ব থেকে পশ্চিমে খাল দিয়ে গিয়ে হাওড়ে যাওয়ার আগে জল যদি ওভার হয়ে যায় তবে তা নিয়ন্ত্রণের জন্য রয়েছে হাড়িকোনা গোলের মাঠ, নোয়াপাড়ায় মাদরাসার সামনের বিশাল মাঠ ও বিল এবং পুকুর। এদিক থেকে আব্দুল কাইয়ূম মেম্বারের বাড়ীর দক্ষিণ ও পূর্বপাশ দিয়ে পশ্চিমপাড়া লম্বাহাটির সামন দিয়ে পানি পশ্চিমে যাওয়ার পথ ছিলো। পূর্বের বেশিরভাগ পানি ডাক্তার সৈয়দ আব্দুল হক (র.) এর বাড়ীর সামনের ডর দিয়ে হাওড়ে গিয়ে পরতো। এই ডরে ভয় করার মতো প্রচুর স্রোত থাকতো। মনে করা হতো এখনে জ্বীন-ভূত আছে। তেঘরির দিকে একটা ডর আছে। সেদিকেও পানি চলে যেতো শিবগঞ্জ হয়ে পশ্চিমে। ইত্যাদি পূর্ব থেকে পশ্চিমে জল যাওয়ার যে সকল পথ ছিলো এবং প্রত্যের বাড়ীর পাশে যে জলব্যাংক, জলাশয়, ডুবা, খাল ছিলো সেগুলো আজও কি আছে প্রত্যেকের নিজস্ব গতিতে। হিসাব মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন, কেন আজ একটু বৃষ্টি দিলেই বাড়ি জলে ডুবে যায়?

 

আজকের বন্যা পরিস্থিতিকে সামনে নিয়ে আমার এই লেখা। ২০২২ খ্রিস্টাব্দে সৈয়দপুরে যে ভায়াবহ বন্যা হয়েছিলো তখন একদিন গ্রামে গিয়ে ভেবেছিলাম এই বন্যা থেকে বাঁচার উপায় কি? বর্তমান ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আবুল হাসান আমার আত্মীয় ছাড়াও বয়স্যবন্ধু হওয়ায় তখন এক আলোচনার ফাঁকে বলছিলাম গ্রামের খালগুলো উদ্ধারের পদক্ষেপ নিতে। আমি এরপর থেকে যার সাথেই কথা হয় তা বলে থাকি। কিন্তু কে শোনে কার কথা। বন্যা আসলে সবাই শুধু ত্রাণ বিতরণকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।

 

আমাদের স্মরণ রাখতে হবে এখানে যেমন সড়ক, দালানবাড়ী, বিদ্যুৎ ইত্যাদি প্রয়োজন তেমনি পর্যাপ্ত নদী, হাওড়, পুকুর, দীঘি, খাল, বিল, ডুবা, ড্রেন, নালা ইত্যাদি প্রয়োজন। বাংলাদেশকে বলা হয় নদী মাতৃক দেশ। নদীগুলো হেমন্তে পানিশূন্য হয়ে যায়। নদী ও হাওড় ভরাট হচ্ছে, কিন্তু কেন?

 

এই ভারাটের পিছনে কারণ এই স্রোতবাহি জলের স্রোত থেমে যাওয়া। পানির স্রোতে যে বালু, পাথর বা পলি আসে সেগুলো পানি থেমে গেলে বসে যায়। ফলে দিনদিনে পানির জায়গা ভরাট হয়ে যাচ্ছে। পানির গতিপথ রোধ না করলে এই ভরাট হতো না। বরং আরও খনন হতো। পানি যদি খাল বিল, নদী-নালা, হাওড় সঠিকভাবে ব্যবহার করে নিজের গতিতে চলতে পারতো তাহলে আমাদের এই সংকটের সম্মুখীন হতে হতোনা। সৈয়দপুর বন্যা সমস্যার সমাধান ততদিন হবে না যতদিন আমরা পানিকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেবো না। সৈয়দপুরে এখন যে পানি আসে তা আগেও আসতো। কিন্তু আগে তা নিষ্কাসনের পথ ছিলো, পানি জমা থাকার জন্য বড় বড় মাঠ, খাল, বিল ছিলো। এখন এগুলো আর নেই। ভাবতে হবে, সমাধান করতে হবে, নতুবা প্রতি বছর বন্যার মূখোমূখি হতে হবে। লেখক: কবি ও গবেষক।

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ