জগন্নাথপুরে ফসল হানি, থামছে না হাওর পারের কৃষকদের কান্না
- Update Time : ১২:১৬:৩৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ এপ্রিল ২০১৭
- / ১ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
নিজস্ব প্রতিবেদক :: সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে ফসল হানির ঘটনা সামাল দেয়ার আগেই কৃষকরা নানা মুখি সমস্যায় পড়েছেন। ঘরে নাই ভাত, মাথায় ঋণের বোঝা, বন্যায় তলিয়ে যাচ্ছে বাড়ি, বাজারে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। সব মিলিয়ে আগাম দুর্ভিক্ষের অসনি সংকেত বিরাজ করছে জগন্নাথপুরে। এমন অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত হাওর পারের কৃষকদের কান্না থামছে না। তাদের সাথে নি¤œ আয়ের সাধারণ মানুষ হয়ে পড়েছেন দিশেহারা। কারো মুখের দিকে থাকানো যাচ্ছে না। সবাই দুঃশ্চিনতায় ভারাক্রান্ত। বেঁচে থাকার তাগিদে পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রাণান্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকসহ খেটে খাওয়া মানুষজন। এ যেন এক অন্য জগন্নাথপুর। আগের সেই প্রবাসী অধ্যূষিত হাসি মাখা জগন্নাথপুর হারিয়ে গেছে দুর্ভিক্ষের বেড়াজালে। খাবার সংগ্রহ নিয়ে চলছে রীতিমত প্রতিযোগিতা। যা কখনো দেখা যায়নি। এমন চিত্র নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে। যে জগন্নাথপুরে মানুষের বাড়িতে মেহমান আসলে তারা আপ্রায়ন করাতে পারলে খুশি হতেন। এখন তারা নিজের খাবার সংগ্রহ করতে প্রতিযোগিতা করছেন।
জানাগেছে, জগন্নাথপুরে এবার বাম্পান বোরো ফসল উৎপাদিত হয়ে ছিল। হাওরে হাওরে সবুজের সমারোহ দেখে কৃষকদের মুখে ফুটে উঠে তৃপ্তির হাসি। হঠাৎ তাদের সকল আনন্দ ম্লান হয়ে যায়। দেখা দেয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ। শুরু হয় বৃষ্টি। আর থামতে চায় না। কখনো হালকা, কখনো মাঝারি আবার কখনো ভারী বৃষ্টিপাত হতে থাকে। বৃষ্টির পানিতে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পায়। এক পর্যায়ে অকাল বন্যার সৃষ্টি হয়।
গত ৩১ মার্চ বেড়িবাধে মাটি না কাটায় উপজেলার নারিকেলতলা, কুবাজপুর ও ইছগাঁও সহ ছোট ৩ টি হাওর তলিয়ে ফসল হানির ঘটনা ঘটে। ১ এপ্রিল বেড়িবাঁধ ভেঙে জগন্নাথপুর উপজেলার সবচেয়ে বড় নলুয়ার হাওর তলিয়ে যায়। এর পর এক এক করে উপজেলার সকল হাওর তলিয়ে গেছে। বিগত বছর পাকা-আধা পাকা ফসল তরিয়ে গেলেও এবার কাঁচা ফসল হানি হয়েছে।
ফসল হানির ঘটনায় জগন্নাথপুরের চিত্র বদলে যায়। হাওর পারের ক্ষগ্রিস্ত কৃষকদের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠে। এ যেন এক হৃদয় বিদারক দৃশ্য। এছাড়া অকাল বন্যায় উপজেলার নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানি বন্ধি হয়ে পড়েছেন হাওর পারের গ্রামের লোকজন। অনেকের বাড়ি-ঘরে পানি উঠে গেছে। আবার অনেকের বাড়ি-ঘরে পানি উঠতে চলেছে। বৃষ্টিপাত থামছে না। নদী ও হাওরে পানি বেড়েই চলেছে। এমতাবস্থায় অন্যত্র নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছন পানি বন্ধি লোকজন। তবে গবাদি-পশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা। উপজেলা সদরের সাথে তারা নৌকা যোগে চলাচল করছেন। জানতে চাইলে নলুয়ার হাওর পারের গ্রাম ভূরাখালি গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক দিলদার হোসেন, মাসুক মিয়া, আবুল কালাম, আব্দুন নুর, আশ্রব উল্লাহ, ছাতির মিয়া, দাস নোয়াগাঁও গ্রামের ধলু মিয়া, বারুত মিয়া, লিটন দাস, অনিল দাস, দলু দাস, রসময় দাস, চিলাউড়া গ্রামের ফজলু মিয়া, গোলজার মিয়া, জামাল মিয়া, সোনা মিয়া, নুর মিয়া, ছায়াদ মিয়াসহ অনেকে বলেন, হাওর তলিয়ে ফসল হানিতে ঘরে নাই ভাত। এলাকায় নিদান দেখা দিয়েছে। তার উপর ঋণের বোঝা। জমি চাষাবাদ কালীন সময়ে ধানুয়া লগ্নির ঋণ এখন চাপ দিচ্ছ। এর মধ্যে বন্যার পানি বেড়ে বাড়ি-ঘর তলিয়ে যাচ্ছে। ঢেউয়ের কবল থেকে বাড়ি বাঁচাতে বাঁশের আড় তৈরি করার ক্ষমতা আমাদের নেই। গোলায় নেই গবাদি-পশুর খাদ্য। বাজারে বেড়েছে চালসহ নিত্যপণের দাম। কেনার ক্ষমতা নেই। পরিবারের লোকজনদের নিয়ে কোথায় যাবো, কি খাব বুঝে উঠতে পারছি না।
উপজেলার ভূরাখালি গ্রামের বাসিন্দা জগন্নাথপুর হাওর উন্নয়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, চলে গেছে ধান, পেটে নাই ভাত। গরুর নাই খাদ্য। বন্যার পানিতে ডুবে যাচ্ছে বাড়ি। ক্ষগ্রিস্ত কৃষকসহ গরীব লোকজন পড়েছেন নানা মুখি বিপদে। তাই জগন্নাথপুরকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করার দাবিতে ৬ এপ্রিল বৃহস্পতিবার জগন্নাথপুরে মানববন্ধন কর্মসূচি পালনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
এদিকে-আগাম দুর্ভিক্ষের আশঙ্কায় শঙ্কিত হয়ে ক্ষত্রিগ্রন্থ কৃষকসহ জন সাধারণ খাবার সংগ্রহ করতে প্রতিযোগিতা শুরু করেছেন। প্রতি দিন জগন্নাথপুর সদর বাজার সহ উপজেলার সকল হাট-বাজারের চাল, আটা, ময়দা, তেল, ডালসহ নিত্যপণ্য কিনতে দোকানে ভীড় করছেন ক্রেতারা। অনেক দোকানে লাইন দিয়ে কার আগে কে এমন প্রতিযোগিতা করে মামালামল কিনছেন ক্রেতারা। এ সুযোগে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাড়িয়ে দিয়েছেন নিত্যপণ্যের দাম। এছাড়া পৌর শহরের রাস্তা-ঘাটে বৃষ্টির পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। ভাঙ্গাচোরা সড়কগুলো বেহাল দশায় পরিণত হয়েছে। এতে জন ভোগান্তি বেড়েছে। প্রতিনিয়ত বিদ্যুতের ভেলকিবাজি তো রয়েছে। সব মিলিয়ে এক কঠিন পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
যদিও বাজার নিয়ন্ত্রনে জগন্নাথপুর উপজেলা প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। অসৎ চাল ব্যবসায়ীদের করা হচ্ছে জরিমানা। গতকাল বুধবার জগন্নাথপুর পৌরসভার মেয়রের উদ্যোগে দিন ব্যাপী পৌর এলাকায় মাইকিং করা হয়েছে। এতে ব্যবসায়ীদের প্রতি আহবান করা হয়েছে, এ দুঃসময়ে যেন নিত্যপণ্যের দাম না বাড়ানো হয়। এছাড়া বাজার নিয়ন্ত্রনে রাখতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বাজার বণিক সমিতি, বাজার তদারক কমিটিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহন করেছেন। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সকল শ্রেণি-পেশার লোকজন আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।






















