ওলীপুরীর দেওয়া চিঠি নিয়ে মুখ খুললেন বিকেএম আমিরের ৩ মুরুব্বি
- Update Time : ০৩:১৯:৫১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
- / ২ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
ডেস্ক রিপোর্ট :: বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের (বিকেএম) আমির মাওলানা মামুনুল হকের সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থান ঘিরে কওমি অঙ্গনে মওদুদী ও সালাফি মতাদর্শের প্রভাব নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এ পরিস্থিতিতে ‘আকিদা, দেওবন্দিয়ত ও কওমি ঐতিহ্যের সুরক্ষায়’ মামুনুল হকের তিন মুরুব্বির কাছে ছয় পৃষ্ঠার একটি লিখিত চিঠি পাঠিয়েছেন হবিগঞ্জের মাদ্রাসা নূরে মদিনার পরিচালক ও খ্যাতিমান আলেম মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলীপুরী। সম্প্রতি সিলেটের ঐতিহ্যবাহী আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে খাদিমুল কোরআন পরিষদের তাফসির মাহফিলে মাওলানা মামুনুল হককে অতিথি করার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে স্থানীয় আলেমদের একটি অংশ অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাদের একাংশের বক্তব্য, মামুনুল হক জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আছেন। তিনি নিজের অবস্থান পরিষ্কার না করেও কওমি সমাজের প্রতিনিধিত্বের দাবি করায় বিভ্রান্তি বাড়ছে। এ নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে আসার পর ওলীপুরীর চিঠির বিষয়বস্তু কওমি অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। এ অবস্থায় চিঠির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবস্থান জানতে মাওলানা মামুনুল হকের তিন মুরুব্বির সঙ্গে কথা বলেছে গণমাধ্যম। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকালে ওলীপুরীর পাঠানো চিঠি পাওয়ার সত্যতা স্বীকার করে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেন তারা।
চিঠিতে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, পূর্বে দেওয়া এক বক্তব্যে মাওলানা মামুনুল হক বলেছিলেন, তার কোনো বক্তব্য বা কর্মকাণ্ডে কারও আপত্তি থাকলে তা যেন তার তিন মুরুব্বির কাছে পেশ করা হয়। তাদের ফয়সালা তিনি মেনে চলবেন বলেও জানিয়েছিলেন। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী মামুনুল হকের মুরুব্বি মিরপুরের মাদ্রাসা দারুর রাশাদের শিক্ষাসচিব মাওলানা লিয়াকত আলী, গাজীপুরের অধ্যক্ষ শাহ মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরী (দেওনার পীর) ও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হকের কাছে চিঠিটি পাঠান ওলীপুরী।
চিঠির বিষয়ে মাওলানা লিয়াকত আলী জানান, চিঠিটি যখন তার কাছে পৌঁছায়, তখন তিনি অসুস্থ ছিলেন এবং কিছু ব্যস্ততাও ছিল। বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘চিঠিটি তো মূলত তিনজনকে দেওয়া হয়েছে। তাই আমরা চেয়েছিলাম তিনজন একসঙ্গে বসে পরামর্শ করে জবাবটা দেব। এখন আমরা তিনজন বসে পরামর্শ করে জবাবটা দেব ইনশাআল্লাহ।’
এদিকে মাওলানা মাহফুজুল হক লিখিত জবাবের পরিবর্তে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি জানান, চিঠিতে যেসব বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে, তা কেবল লিখিত জবাব দেওয়ার মতো বিষয় নয়; বরং মুখোমুখি আলোচনার বিষয়।
তিনি বলেন, ‘আমরা চিঠি পেয়েছি, তবে চিঠির বিষয়গুলো এমন যে, এটা লিখিত জবাব দেওয়ার মতো কিছু না। এটা হলো সাক্ষাতে কথা বলার মতো বিষয়। ওলীপুরী সাহেব তো ওইরকমভাবে সাক্ষাতে কথা বলার মতো কোনো উদ্যোগ নেননি। আমরা মনে করি এখানে মাওলানা মামুনুল হকসহ সবাই বসে কথা বলা দরকার। তো কোনো সময় সরাসরি সাক্ষাতে বসার উদ্যোগ নিলে ইনশাআল্লাহ আমরা কথা বলব।’
আরেক মুরুব্বি অধ্যক্ষ শাহ মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরীও (দেওনা পীর) চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে বর্তমানে তিনি বাইরে অবস্থান করায় পরে বিস্তারিত মতামত জানাবেন বলে উল্লেখ করেন। ফোনালাপে কালবেলাকে তিনি বলেন, ‘চিঠি এসেছে। তবে এখন আমি একটু বাইরে আছি। চিঠিটি সামনে নিয়ে আপনাকে পরে বিস্তারিত জানাব ইনশাআল্লাহ।’
চিঠিতে ওলীপুরীর মূল আপত্তি ও উত্থাপিত প্রশ্ন
দীর্ঘ চিঠিতে মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলীপুরী আকিদা ও কওমি-দেওবন্দী আদর্শ রক্ষায় বেশ কিছু তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন তুলে ধরেছেন। চিঠিতে উত্থাপিত প্রধান বিষয়গুলো হলো—
১. আকিদাগত তুলনা ও বিভ্রান্তির আশঙ্কা: মাওলানা মামুনুল হকের এক বক্তব্যে চার মাজহাব (হানাফি, মালেকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি) এবং সালাফি ও মওদুদীবাদের আকিদার মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই বলে উল্লেখ করার বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করেছেন ওলীপুরী। তার বক্তব্য, চার মাজহাবের আকিদার সঙ্গে সালাফি ও মওদুদীবাদীদের আকিদার মৌলিক ও ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। কওমি অঙ্গনের শীর্ষ আলেম হিসেবে মামুনুল হকের এমন মন্তব্য সাধারণ আলেম ও শিক্ষার্থীদের মওদুদীবাদ ও সালাফিবাদের দিকে ধাবিত করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
২. ‘দাঁড়িপাল্লা’ মার্কা বিতর্ক: নির্বাচনি প্রচারে ‘মওদুদীবাদের’ দলীয় প্রতীক দাঁড়িপাল্লাকে ইনসাফ ও ওলামায়ে কেরামের প্রতীক হিসেবে আখ্যা দেওয়ার সমালোচনা করেন ওলীপুরী। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যেসব দল আকাবির, সাহাবা ও সালাফদের সঙ্গে বে-ইনসাফি করেছে, তাদের প্রতীক কীভাবে আলেমদের মার্কা হতে পারে। উল্লেখ্য, দাঁড়িপাল্লা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনি প্রতীক।
৩. দেওবন্দি-হানাফি আকিদা সংশোধনের ঘোষণা: মাওলানা মামুনুল হক কর্তৃক দেওবন্দি ও হানাফিদের আকিদা সংশোধনের আহ্বানকে অনভিপ্রেত এবং শত বছরের ঐতিহ্যের ওপর আঘাত হিসেবে চিহ্নিত করেন ওলীপুরী।
৪. রাজনৈতিক ঐক্যের নজির: মওদুদীবাদীদের সঙ্গে মামুনুল হকের রাজনৈতিক ঐক্যকে হজরত শাইখুল হিন্দ (রহ.)-এর কংগ্রেসের সঙ্গে ঐক্যের নজির হিসেবে উপস্থাপনকে বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেন ওলীপুরী। চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, মাওলানা মামুনুল হকের পিতা শায়খুল হাদিস মাওলানা আজিজুল হক (রহ.) বুখারি শরিফের ব্যাখ্যাগ্রন্থে মওদুদীর বিভিন্ন বিভ্রান্তির দলিলভিত্তিক খণ্ডন করে গেছেন। এখানে মওদুদীবাদী বলতে ওলীপুরী জামায়াতে ইসলামীকে বুঝিয়েছেন।
৫. ‘আকিদাতুল জিহাদিয়া’ পরিভাষা: জিহাদকে মূল আকিদা হিসেবে উপস্থাপন এবং ‘আকিদাতুল জিহাদিয়া’ পরিভাষা ব্যবহারের শাস্ত্রীয় ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ওলীপুরী। একই সঙ্গে দেওবন্দি আকিদার সঠিক ব্যাখ্যার দাবি জানান তিনি।
উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে মুরুব্বি হিসেবে উল্লিখিত মাওলানা লিয়াকত আলীকে সম্প্রতি নিজের রাজনৈতিক অভিভাবক (মুরুব্বি) হিসেবে উল্লেখ করেছেন মাওলানা মামুনুল হক। তবে মাওলানা মাহফুজুল হক ও অধ্যক্ষ শাহ মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরীকে তিনি মুরুব্বি হিসেবে অনুসরণ করেন কি না, তা কালবেলা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হতে পারেনি। ওলীপুরীর চিঠি এবং মাওলানা মাহফুজুল হক ও অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান চৌধুরীর বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে তাঁদের মুরুব্বি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি কালবেলার নিজস্ব কোনো মূল্যায়ন নয়।
ওলীপুরীর পাঠানো ছয় পৃষ্ঠার চিঠি































