১০:১৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ১৯ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

তারা কখনো মন্ত্রী কখনো এমপি

  • Update Time : ০৫:৫৩:৪৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ আগস্ট ২০১৮
  • / ০ বার নিউজটি পড়া হয়েছে

জগন্নাথপুর পত্রিকা ডেস্ক :: ‘আমি … মন্ত্রী বলছি। সুপারিশসহ লোক পাঠাচ্ছি। কাজটি করে দেবেন।’ একজন, দুজন মন্ত্রী না। প্রভাবশালী মন্ত্রীদের সুপারিশ। এছাড়াও অনেক এমপি ও সচিবের সুপারিশ তো আছেই। লিখিত তদবিরে কাজ না হলেই ফোনে কল। পিএ পরিচয় দিয়ে কেউ একজন ফোনটি ধরিয়ে দেন ‘মন্ত্রী’র হাতে। তারপরই শুরু হয় নির্দেশ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জানা যায় তারা কেউই এমপি, মন্ত্রী নন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। নানা কৌশলে তদবির বাণিজ্য করতো তারা। ভুয়া নাম-পরিচয় ব্যবহার করে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য করতো। ইতিমধ্যে এই চক্রের তিন জনকে গ্রেপ্তার করেছে ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি)। স্বীকারোক্তি দিয়েছে তারা। এতে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য। বদলি বাণিজ্য ও সরকারিভাবে বিদেশ ভ্রমণ ও বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্যই মূলত কাজ করতো চক্রটি। দীর্ঘদিন নির্বিঘ্নে মন্ত্রী, এমপির জাল স্বাক্ষর ব্যবহার করে তদবির করছিলো এই চক্র মন্ত্রণালয়ে তদবির বাণিজ্য করতে গিয়েই একসময়ে নজরে পড়ে দায়িত্বশীল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের।

 

গত ১৫ই আগস্ট মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সুব্রত ঘোষ শুভ’র আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয় গ্রেপ্তারকৃত আব্দুল কুদ্দুস মিয়া। কুমিল্লা নার্সিং ইনস্টিটিউটের অফিস সহকারী তিনি। জবানবন্দিতে এই চক্রের অন্যতম হোতা হিসেবে আনিসুর রহমান ওরফে জামানের কথা উল্লেখ করেছে কুদ্দুস মিয়া। জবানবন্দিতে বলেছে, ‘আনিসুর বিভিন্ন নামে আমার সঙ্গে ফোনে কথা বলতো। একসময় তার নাম জামান বলতো। কখনো মিন্টু বলতো। কখনো মোশাররফ বলতো। আগে জানতাম না ওই লোকের নাম আনিসুর রহমান। সামনাসামনি জামান নামে পরিচয় দিতো।’ এই আনিসুরই তাকে প্রলোভন দেখিয়ে বিপথগামী করে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘২০১৬ সালের আগস্ট মাসের দিকে ছয় জন নার্স বিদেশে ট্রেনিংয়ের জন্য আবেদন করে। আবেদনে বড় অফিসারদের সুপারিশ থাকলে কাজ করতে সুবিধা হয়। জামান ওরফে আনিসের বড় বড় জায়গায় পরিচয় থাকায় তাকে ছয়টি আবেদন দেই সুপারিশ আনার জন্য। পরবর্তীতে সে ১৫-১৬টি আবেদন আমার কাছে দেয় অফিসে জমা দেয়ার জন্য। আমি সেকশনে চেষ্টা করেও জমা দিতে পারিনি। পরে আবেদনগুলো আনিসের কাছে দিয়ে দেই। পরে সেই আবেদনগুলো আনিসুর জমা দেয়।’

 

এছাড়াও পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আব্দুল কুদ্দুস মিয়া বলেছে, ঘটনার সময় সিলেট বিভাগের নার্সিং সুপারভাইজারের ডিলিং এসিস্ট্যান্ট হিসেবে মিডওয়াইফারী অধিদপ্তর শেরেবাংলা নগর ঢাকায় কর্মরত ছিল সে। ২০১৬ সালে তখন নার্সিং ট্রেনিং শাখার ডেপুটি ম্যানেজার আব্দুল বারী। আব্দুল বারী, মুক্তার ও আব্দুল লতিফ তাকে প্রথম এই অপকর্মে প্রলোভন দেখায়। তারা জানায়, কেউ বিদেশে ট্রেনিং নিতে চাইলে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। তাদের অনেক ক্ষমতা। ওই সময়ে আনিসুর রহমান ওরফে জামানের সঙ্গে পরিচয় হয় আব্দুল কুদ্দুসের। জামানের মাধ্যমে বদলি, বিদেশে ট্রেনিংসহ ছয় নার্সের তদবির সফলভাবে করিয়েছে আব্দুল কুদ্দুস। যে কাজ অন্য কেউ সহজে করতে পারতো না তা সফলভাবে করতো আনিসুর রহমান জামান। জামানের সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কয়েক কর্মকর্তার ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। অভিযোগ উঠেছে টাকার ভাগ পৌঁছাতো ঊর্ধ্বতন ওইসব কর্মকর্তা পর্যন্ত। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছে সিআইডি।

 

সিআইডি জানিয়েছে, ঘটনাটি ২০১৬ সালের। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সেবা অধিদপ্তরের স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর উন্নয়ন কর্মসূচিভুক্ত নার্সিং এডুকেশন অ্যান্ড সার্ভিসেস প্রোগ্রামের আওতায় বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য নার্সিং কর্মকর্তাদের কাছ থেকে দরখাস্ত আহ্বান করা হয়। এতে আবেদনকৃতদের মধ্যে ১৭ জনের আবেদনে প্রভাবশালী মন্ত্রী, এমপি ও সচিবের সুপারিশ দৃষ্টিগোচর হয় কর্তৃপক্ষের। এতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, রেলমন্ত্রী, খাদ্যমন্ত্রী, সংসদ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, শেখ ফজলে নুর তাপস, শেখ ফজলে হোসেন বাদশাহসহ কয়েক জন সচিবেরও স্বাক্ষর রয়েছে। বিষয়টি যাচাই করলে দেখা যায় স্বাক্ষরগুলো জাল।

 

পরে ওই বছরের ১৭ই আগস্ট এ বিষয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করা হয়। মামলার তদন্তভার সিআইডি গ্রহণ করার পর গত ১২ই আগস্ট বিশেষ পুলিশ সুপার সৈয়দা জান্নাত আরার নির্দেশে ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাজিব ফারহানের নেতৃত্বে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। কুমিল্লা ও চাঁদপুর থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হচ্ছে, চাঁদপুর শাহারাস্তি থানার রায়শ্রী গ্রামের মৃত আবুল খায়েরের পুত্র সিনিয়র স্টাফ নার্স আবু ইউসুফ (৩৬), বাগেরহাটের মোড়লগঞ্জের সানখিভাঙ্গা গ্রামের মৃত আব্দুর রশিদ তালুকদারের পুত্র সিনিয়র স্টাফ নার্স রুহুল বাশার তালুকদার (৪৫), কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দির তালতলি গ্রামের মৃত হাসেম মিয়ার পুত্র অফিস সহকারী আব্দুল কুদ্দুস মিয়া (৪৫)। এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নিউটন কুমার দত্ত বিপিএম বলেন, ইতিমধ্যে ঘটনার অনেক তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। গ্রেপ্তারকৃতদের একজন আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। এ ঘটনায় আরো যারা জড়িত তদন্ত অনুসারে তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানান তিনি।

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ

তারা কখনো মন্ত্রী কখনো এমপি

Update Time : ০৫:৫৩:৪৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ আগস্ট ২০১৮

জগন্নাথপুর পত্রিকা ডেস্ক :: ‘আমি … মন্ত্রী বলছি। সুপারিশসহ লোক পাঠাচ্ছি। কাজটি করে দেবেন।’ একজন, দুজন মন্ত্রী না। প্রভাবশালী মন্ত্রীদের সুপারিশ। এছাড়াও অনেক এমপি ও সচিবের সুপারিশ তো আছেই। লিখিত তদবিরে কাজ না হলেই ফোনে কল। পিএ পরিচয় দিয়ে কেউ একজন ফোনটি ধরিয়ে দেন ‘মন্ত্রী’র হাতে। তারপরই শুরু হয় নির্দেশ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জানা যায় তারা কেউই এমপি, মন্ত্রী নন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। নানা কৌশলে তদবির বাণিজ্য করতো তারা। ভুয়া নাম-পরিচয় ব্যবহার করে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য করতো। ইতিমধ্যে এই চক্রের তিন জনকে গ্রেপ্তার করেছে ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি)। স্বীকারোক্তি দিয়েছে তারা। এতে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য। বদলি বাণিজ্য ও সরকারিভাবে বিদেশ ভ্রমণ ও বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্যই মূলত কাজ করতো চক্রটি। দীর্ঘদিন নির্বিঘ্নে মন্ত্রী, এমপির জাল স্বাক্ষর ব্যবহার করে তদবির করছিলো এই চক্র মন্ত্রণালয়ে তদবির বাণিজ্য করতে গিয়েই একসময়ে নজরে পড়ে দায়িত্বশীল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের।

 

গত ১৫ই আগস্ট মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সুব্রত ঘোষ শুভ’র আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয় গ্রেপ্তারকৃত আব্দুল কুদ্দুস মিয়া। কুমিল্লা নার্সিং ইনস্টিটিউটের অফিস সহকারী তিনি। জবানবন্দিতে এই চক্রের অন্যতম হোতা হিসেবে আনিসুর রহমান ওরফে জামানের কথা উল্লেখ করেছে কুদ্দুস মিয়া। জবানবন্দিতে বলেছে, ‘আনিসুর বিভিন্ন নামে আমার সঙ্গে ফোনে কথা বলতো। একসময় তার নাম জামান বলতো। কখনো মিন্টু বলতো। কখনো মোশাররফ বলতো। আগে জানতাম না ওই লোকের নাম আনিসুর রহমান। সামনাসামনি জামান নামে পরিচয় দিতো।’ এই আনিসুরই তাকে প্রলোভন দেখিয়ে বিপথগামী করে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘২০১৬ সালের আগস্ট মাসের দিকে ছয় জন নার্স বিদেশে ট্রেনিংয়ের জন্য আবেদন করে। আবেদনে বড় অফিসারদের সুপারিশ থাকলে কাজ করতে সুবিধা হয়। জামান ওরফে আনিসের বড় বড় জায়গায় পরিচয় থাকায় তাকে ছয়টি আবেদন দেই সুপারিশ আনার জন্য। পরবর্তীতে সে ১৫-১৬টি আবেদন আমার কাছে দেয় অফিসে জমা দেয়ার জন্য। আমি সেকশনে চেষ্টা করেও জমা দিতে পারিনি। পরে আবেদনগুলো আনিসের কাছে দিয়ে দেই। পরে সেই আবেদনগুলো আনিসুর জমা দেয়।’

 

এছাড়াও পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আব্দুল কুদ্দুস মিয়া বলেছে, ঘটনার সময় সিলেট বিভাগের নার্সিং সুপারভাইজারের ডিলিং এসিস্ট্যান্ট হিসেবে মিডওয়াইফারী অধিদপ্তর শেরেবাংলা নগর ঢাকায় কর্মরত ছিল সে। ২০১৬ সালে তখন নার্সিং ট্রেনিং শাখার ডেপুটি ম্যানেজার আব্দুল বারী। আব্দুল বারী, মুক্তার ও আব্দুল লতিফ তাকে প্রথম এই অপকর্মে প্রলোভন দেখায়। তারা জানায়, কেউ বিদেশে ট্রেনিং নিতে চাইলে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। তাদের অনেক ক্ষমতা। ওই সময়ে আনিসুর রহমান ওরফে জামানের সঙ্গে পরিচয় হয় আব্দুল কুদ্দুসের। জামানের মাধ্যমে বদলি, বিদেশে ট্রেনিংসহ ছয় নার্সের তদবির সফলভাবে করিয়েছে আব্দুল কুদ্দুস। যে কাজ অন্য কেউ সহজে করতে পারতো না তা সফলভাবে করতো আনিসুর রহমান জামান। জামানের সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কয়েক কর্মকর্তার ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। অভিযোগ উঠেছে টাকার ভাগ পৌঁছাতো ঊর্ধ্বতন ওইসব কর্মকর্তা পর্যন্ত। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছে সিআইডি।

 

সিআইডি জানিয়েছে, ঘটনাটি ২০১৬ সালের। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সেবা অধিদপ্তরের স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর উন্নয়ন কর্মসূচিভুক্ত নার্সিং এডুকেশন অ্যান্ড সার্ভিসেস প্রোগ্রামের আওতায় বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য নার্সিং কর্মকর্তাদের কাছ থেকে দরখাস্ত আহ্বান করা হয়। এতে আবেদনকৃতদের মধ্যে ১৭ জনের আবেদনে প্রভাবশালী মন্ত্রী, এমপি ও সচিবের সুপারিশ দৃষ্টিগোচর হয় কর্তৃপক্ষের। এতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, রেলমন্ত্রী, খাদ্যমন্ত্রী, সংসদ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, শেখ ফজলে নুর তাপস, শেখ ফজলে হোসেন বাদশাহসহ কয়েক জন সচিবেরও স্বাক্ষর রয়েছে। বিষয়টি যাচাই করলে দেখা যায় স্বাক্ষরগুলো জাল।

 

পরে ওই বছরের ১৭ই আগস্ট এ বিষয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করা হয়। মামলার তদন্তভার সিআইডি গ্রহণ করার পর গত ১২ই আগস্ট বিশেষ পুলিশ সুপার সৈয়দা জান্নাত আরার নির্দেশে ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাজিব ফারহানের নেতৃত্বে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। কুমিল্লা ও চাঁদপুর থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হচ্ছে, চাঁদপুর শাহারাস্তি থানার রায়শ্রী গ্রামের মৃত আবুল খায়েরের পুত্র সিনিয়র স্টাফ নার্স আবু ইউসুফ (৩৬), বাগেরহাটের মোড়লগঞ্জের সানখিভাঙ্গা গ্রামের মৃত আব্দুর রশিদ তালুকদারের পুত্র সিনিয়র স্টাফ নার্স রুহুল বাশার তালুকদার (৪৫), কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দির তালতলি গ্রামের মৃত হাসেম মিয়ার পুত্র অফিস সহকারী আব্দুল কুদ্দুস মিয়া (৪৫)। এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নিউটন কুমার দত্ত বিপিএম বলেন, ইতিমধ্যে ঘটনার অনেক তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। গ্রেপ্তারকৃতদের একজন আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। এ ঘটনায় আরো যারা জড়িত তদন্ত অনুসারে তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানান তিনি।

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ