টেকনাফে সুন্দরী রোহিঙ্গা মেয়েদের মা-বাবার সামনে দেয়া হচ্ছে বিয়ে ও চাকরির টোপ, আতঙ্কে পরিবার
- Update Time : ০৩:৩০:৩২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ অক্টোবর ২০১৭
- / ১ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
জগন্নাথপুর পত্রিকা ডেস্ক :: বাংলাদেশে রাত-বিরাতে টোকা পড়ে না দরোজায়। কোনো বাড়িতে সেয়ানা মেয়ে আছে সে খবর মিলিটারির কাছে পৌঁছে দেয়ার থাব্বেও (দালাল) নেই এদেশে। যখন-তখন হানা দিয়ে জোর করে তুলে নেয়া হয় না মেয়েদের। সে বাস্তবতা পড়ে আছে নাফ নদের ওপারে। তবু সুন্দরী মেয়েদের নিয়ে আতঙ্ক কাটছে না রোহিঙ্গাদের। বাংলাদেশে নিরাপদ পরিবেশ থাকলেও বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা তাদের মনে উসকে দিচ্ছে সে ভয়। সুন্দরী রোহিঙ্গা মেয়েদের মা-বাবার সামনে দেয়া হচ্ছে বিয়ে ও চাকরির টোপ। বিয়ে ও চাকরির কথা বলে ইতিমধ্যে কিছু মেয়েকে কক্সবাজার শহর ও ঢাকা-চট্টগ্রামে পাচার করেছে বিশেষ একটি চক্র। আর এ কাজে দালালের ভূমিকা পালন করছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝি (সর্দার) ও স্থানীয় কিছু দুর্বৃত্ত। হোটেল-মোটেলে জোনে পর্যটক ধরার জন্য দালালরা টোপ হিসেবে ব্যবহার করে সুন্দরী রোহিঙ্গা মেয়েদের- এমন অভিযোগ রয়েছে কক্সবাজারে। পলিথিনের তৈরি ঝুপড়ি ঘরের ভেতরে তাদের দিন কাটছে অন্ধকার দমবদ্ধ পরিবেশে। উখিয়ার কুতুপালং, ঘুমধুম, তুমব্রু, জামতলীসহ নতুন পুরনো একাধিক রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘুরে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের দুইপাশে এলোমেলোভাবে অবস্থান করে সাহায্যের প্রত্যাশায় হাতবাড়িয়ে দেয়া কিছু নারী। যাদের চেহারা রোদে পোড়া কালো। অপুষ্ট শরীর। কোলে-কাঁধে একাধিক সন্তান। রোহিঙ্গা নারীর কথা বললে এমন দৃশ্যই ভেসে ওঠে আমাদের চোখের পর্দায়। কিন্তু ক্যাম্পের ভেতরের দৃশ্য ঠিক এ রকম নয়। মহাসড়কের পাশ থেকে একটু ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে সে সব দৃশ্যপট। সেখানে শিশুদের ক্ষুধার চিৎকার, মায়েদের নীরব অশ্রুপাত, বাবাদের করুণ চাহনী যেমন আছে তেমনি চোখে পড়ে তরুণীদের। বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য রোহিঙ্গা মেয়ে বিয়ে করা বৈধ ছিল না কোনো সময়। কিন্তু প্রশাসনের অগোচরে অতীতে রোহিঙ্গাদের মেয়ে বিয়ে করার একটা প্রবণতা দেখা গিয়েছিল স্থানীয়দের। একইভাবে দেশের বিভিন্ন জেলার লোক রোহিঙ্গা মেয়ে বিয়ে করে নিয়ে গেছে নিজ নিজ এলাকায়। সে বাস্তবতাকে সামনে রেখে এবার রোহিঙ্গা মেয়ে বিয়ে করা বা ক্যাম্পে গিয়ে তেমন চেষ্টার ব্যাপারে কড়া নির্দেশ জারি করেছে সরকার। এমনকি বাংলাদেশের কোনো নাগরিক সে ধরনের কাজ করলে তার পাসপোর্ট বা নাগরিকত্ব বাতিলসহ কারাদণ্ডের ঘোষণাও দিয়েছে সরকার। কিন্তু সে নির্দেশনা লঙ্ঘন হচ্ছে কৌশলে। বিগত আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে নদীর স্রোতের মতো বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে রোহিঙ্গারা। আর তখনই স্থানীয় কিছু বখাটের হাতে সম্ভ্রমহানি ঘটেছে বহু রোহিঙ্গা মেয়ের। আশ্রয় দেয়ার কথা বলে বাড়িতে বা বিভিন্ন বাসায় নিয়ে তাদের সম্ভ্রম লুট করা হয়েছে। তখন পরিস্থিতি এতটাই নাজুক ছিল যে, এ ব্যাপারে মনোযোগ দেয়ার সুযোগ ছিল না প্রশাসনের। পরে স্থানীয় সচেতন লোকজনের সহযোগিতায় কিছু বখাটেকে আটক করে সাজা দেয় ভ্রাম্যমাণ আদালত। কিছু বখাটে শিকার হন একাকাবাসীর গণপিটুনির। তখন পরিস্থিতি দৃশ্যত স্বাভাবিক থাকলে কৌশলে তৎপর হয়ে ওঠে বিশেষ কিছু পাচার চক্র। তারা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝি ও স্থানীয় কিছু দুর্বৃত্তের সহায়তায় কিছু মেয়েকে পাচার করা হয় বিয়ের আশ্বাস, গার্মেন্টে শ্রমিক ও বাসা-বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে চাকরির লোভ দেখিয়ে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের অসহায়ত্বের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এবং বাবা-মাকে আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে ম্যানেজ করে তাদের সেয়ানা মেয়েদের নিয়ে গেছে ওইসব চক্র। বোরকা ও অলংকার পরিয়ে সুন্দরী মেয়েদের পাচারের সুবিধার্থে অনেক সময় পাচারকারীরা সঙ্গে নিয়ে যায় তাদের পরিবারের সদস্যদের। চলতি মাসে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানা পুলিশ চট্টগ্রাম ও ঢাকা অভিমুখে যাওয়ার পথে আটক করে বেশকিছু রোহিঙ্গা পরিবারকে ক্যাম্পে ফেরত পাঠিয়েছে।
সময় তখন বেলা ১১ টা। পালংখালীর বাঘঘোনা নতুন রোহিঙ্গা ক্যাম্প। সড়কের পশ্চিম পাশের টিলা পাহাড়ের বাঁক পেরিয়ে চলে গেছে মেঠোপথ। দুইপাশে সারি সারি কালো পলিথিনের ঝুপড়ি। সেখানেই রাস্তা থেকে নেমে একটি বস্তিতে ঢুকতেই ছুটে আসে একদল নাঙ্গাপুঙ্গা শিশু। তাদের এড়িয়ে একটু ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে দুই তরুণী। অলস বসে আছেন একটি ঝুপড়ির দরোজায়। সেদিকে এগিয়ে গেলে তারা ঢুকে পড়ে ঝুপড়ির ভেতরে। এমন দৃশ্য রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নতুন নয়। কাছে যেতেই ঝুপড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন মধ্যবয়স্ক এক নারী। তিনি করুণ চাহনী নিয়ে জিজ্ঞাসা করেন, কি জানতে চাই। তার নাম আরেফা খাতুন (ছদ্মনাম)। কথায় কথায় তিনি জানালেন, দুই সপ্তাহ আগে বাংলাদেশে ঢুকেছেন। এখনও পরিচয়পত্র করতে পারেননি। পাননি কোনো রিলিফ কার্ড। বিচ্ছিন্নভাবে পাওয়া ত্রাণ নিয়ে এ পর্যন্ত দিন পার করেছেন। আরেফাদের বাড়ি বুচিদং। তার স্বামী কৃষিকাজ করতেন। সেনা অভিযানের একপর্যায়ে গ্রামের অন্যপুরুষদের মতো তাকেও ডেকে নেয়া হয়েছিল পাড়ার একটি মাঠে। তারপর আর ফিরে আসেননি তিনি। আরেফা জানান, তার তিন মেয়ের একটি বিয়ে দিয়েছেন আগেই। এখন দুইটি অবিবাহিত মেয়েকে নিয়ে এসেছেন বাংলাদেশে। মেয়েদের ব্যাপারে জানতে চাইলে আরেফা খাতুন এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়ান। তারপর বলেন, মেয়ে দু’টো বড় হওয়ার পর থেকে বুচিদংয়ে তাদের প্রতিটি দিন কেটেছে আতংকে। সুন্দরী মেয়ে দেখলেই হানা দেয় পুলিশ ও মিলিটারি। মগের ছেলেরা আরও ভয়ঙ্কর। তাই তিনি মক্তবে কোরআন শিক্ষার পর মেয়েদের বাড়ির বাইরে যেতে দেননি। বেড়া দেয়া আঙ্গিনার মধ্যেই কেটেছে তাদের দিন। এবার সেনা অভিযানের পর তাই সম্পদ রক্ষার চেয়ে মেয়েদের সম্ভ্রম রক্ষায় ছিল আমাদের সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়। এপাড়া-ওপাড়া বনজঙ্গল ঘুরে বাংলাদেশে এসেছি। এখানে আসার পর কয়েকজন আমার মেয়েদের বিয়ের কথা নিয়ে এসেছে। আমাকে টাকা-পয়সাও দিতে চেয়েছে। কিন্তু তাদের চিনি না, জানি না। কিভাবে তাদের হাতে যুবতী মেয়েকে তুলে দেবো? আরেফা বলেন, ইজ্জত আর জীবন দু’টোই হারানোর ভয় ছিল আরাকানে। বাংলাদেশে জীবনের ভয় নেই, কিন্তু অন্য ভয় তো কাটছে না। সময় তখন বিকাল ৪টা। বালুখালী নতুন ক্যাম্পে গিয়ে দেখা গেল অন্যরকম একটি দৃশ্য। রাস্তা থেকে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে কিছুটা এগোলেই সামনে যে পাহাড়টি পড়ে তার পুরোটা জুড়েই বসেছে রোহিঙ্গাদের পলিথিনের ঝুপড়ি। কিছুটা সামনে যেতেই একটি ঝুপড়ির মুখে দেখা গেল পরিপাটি পোশাকে অলংকার সজ্জিত এক তরুণীর। বয়স ষোল থেকে সতেরোর কোটায়। মেয়েটিকে নিয়ে গোল করে বসে কথা বলছে বিভিন্ন বয়সের কয়েকজন নারী। সেদিকে এগিয়ে গেলে মেয়েটি ঢুকে পড়ে ঝুপড়ির অন্ধকারে। সামনের মেয়েরা জানায়, তার নাম জমিলা। মেয়েটির বিয়ে হয়েছে, জামাই তাকে পুরনো ক্যাম্পে নিয়ে যাবে। খানিকটা দূরে একজন বয়োবৃদ্ধ নারীর কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, শুনেছি মেয়েটির বাবা বলিবাজারের সম্পন্ন গৃহস্থ ছিল। পালিয়ে আসার সময় স্বর্ণপাতি নিয়ে এসেছে। শুনেছি, এখানে কক্সবাজারে নাকি ভালো ঘরে মেয়েটির বিয়ে হয়ে গেছে। আজ মেয়েটিকে নিয়ে যাবে।
বালুখালী টিভি রিলে স্টেশনের উত্তর-পশ্চিমপাশ জুড়ে বসেছে বিশাল নতুন রোহিঙ্গা ক্যাম্প। সেখানে একটি চা-বিড়ির দোকান দিয়েছেন পুরনো ক্যাম্পের একজন রোহিঙ্গা। তিনি জানান, বনবিভাগের জায়গা হলেও প্রথমে ঝুপড়ি তৈরির জন্য অনেকের কাছেই জমির মালিক সেজে নগদ অর্থ আর স্বর্ণাংলকার হাতিয়ে নিয়েছে স্থানীয় কিছু দুর্বৃত্ত। এ ব্যাপারে প্রশাসনের কড়া নজরদারী থাকলেও নানা কৌশলে অপৎপরতা লিপ্ত রয়েছে ঘাপটি মেরে থাকা দুর্বৃত্তরা। কেবল তাই নয়, মাঝিদের হাত করে সুন্দরী মেয়েদের বিয়ে ও চাকরি আশ্বাস দিয়ে পাচারকারীদের সহযোগিতা করছে এসব দুর্বৃত্ত। দোকানদার রোহিঙ্গা তার সন্তানকে দোকানে বসিয়ে ইশারায় একটু দূরে ডেকে নেয়। তারপর জানায়, কুতুপালং আমতলা পুরাতন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কয়েকটি পরিবার আগেই বিপথগামী হয়েছে। কয়েকবছর আগে সেখানে একটি বাড়িতে অচেনা লোকজনের আনাগোনা শুরু হয়। বাড়িতে দুইটি সুন্দরী মেয়ে ছিল। আমরা শুনেছি বড় বোনের সঙ্গে কক্সবাজারের এক লোকের বিয়ে হয়েছে। কিন্তু মাস যেতেই দেখি সেই লোক নেই অন্য আরেকজন আসা-যাওয়া করে। সুত্র: মানবজমিন





























