মালয়েশিয়ায় পাচারচক্রের ফাঁদে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা
- Update Time : ০৩:০২:০৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট ২০১৭
- / ১ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
জগন্নাথপুর পত্রিকা ডেস্ক :: মালয়েশিয়ায় ভয়ঙ্কর পাচারচক্রের ফাঁদে পা দিচ্ছে হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী। নাম সর্বস্ব সব কলেজের অসাধু এজেন্টদের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব খোয়াচ্ছে তারা। মালয়েশিয়ার দৈনিক দ্য স্টারের উদীয়মান সাংবাদিকদের একটি দল আন্ডারকভার অনুসন্ধান চালিয়ে এসব চক্রের মুখোশ উন্মোচন করেছে। আর.এইজ (জ.অএঊ) নামের ওই দলটির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে পাচার ফাঁদের ভয়াবহ চিত্র। পাচারকারীদের মুখ থেকে শোনা গেছে, বাংলাদেশিদের সহজ শিকার মনে করে না। দলটির পুরো অনুসন্ধান ভিডিও প্রতিবেদন হিসেবে তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব বাংলাদেশির কাছে স্বপ্ন বেচা হয়। বিদেশে পড়াশোনা আর কাজ করার স্বপ্ন দেখানো হয় তাদের। কিন্তু পরিবারের যাবতীয় গচ্ছিত অর্থ ব্যয় করে বিদেশ পাড়ি দেয়ার পর তারা পাচারের রূঢ় বাস্তবতায় আটকে পড়েন। অব্যাহতভাবে তাদের ব্ল্যাকমেইল করা হয়। ফাঁদে ফেলে হাতিয়ে নেয়া হয় আরো অর্থ। ভুঁইফোড় কলেজগুলোতে ভর্তি এবং স্টুডেন্ট ভিসার জন্য কেউ কেউ ২০ হাজার মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত খরচ করেন। বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ টাকা। কিন্তু ব্ল্যাকমেইলিংয়ে সেটা শুরু মাত্র। মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পরই ভুক্তোভোগীরা বুঝতে পারেন, এসব কলেজে আদতে সত্যিকারের কোন ক্লাস হয় না। তারা স্টুডেন্ট ভিসায় কাজ করতে পারেন না যেমনটা তাদের মিথ্যা বলা হয়েছিল। আর এ ‘ফি’ সে ফি’র নামে বানোয়াট খাতে অর্থ দাবি করা হয়।
এমন বিপদে পড়ার পর অবৈধভাবে অমানবিক পরিবেশের মধ্যে কাজ করা ছাড়া বেশিরভাগেরই কোনো গত্যন্তর থাকে না। নিয়মিত শোষণের শিকার হওয়ার আবর্তে আটকে পড়েন তারা। ঋণ শোধ করা আর বাড়ি ফেরার জন্য টিকিট কেনার অর্থ জড়ো করার তাগিদে উপার্জন তো তাদের করতেই হবে। অথবা, ওই এজেন্টদের ফের অর্থ দিয়ে স্টুডেন্ট ভিসা নবায়ন করা যেন আরেকটি বছর সেখানে কাজ করতে পারেন।
এমনই এক ভুক্তোভোগী (২৪) বলেন, ‘আমার বাড়ি ফিরে ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই কেননা, এজেন্টদের ফি বাবদ আমার পরিবার তাদের সমুদয় অর্থ ব্যয় করে ফেলেছে। এখন আমাকে আমার বাবার ওষুধের অর্থ জোগাতে এখানে কাজ করতে হবে।’
মালয়েশিয়া স্টারের আর.এইজ দলটি নিজেদের কারখানা মালিক পরিচয় দিয়ে পাচারকারী এজেন্টদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। সস্তায় শ্রমিক খুঁজছে বলে তাদের জানায়। পরিচয়ের সূত্র ধরে এক পর্যায়ে তাদের কলেজগুলোতে প্রবেশ করতে সক্ষম হন পরিচয় গোপন রাখা সাংবাদিকরা। অনুসন্ধানে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে এ চক্রের বিস্তৃতি ঢাকা পর্যন্ত।
এক এজেন্ট সাংবাদিক দলের একজনকে জানায় যে সে কুয়ালালামপুরের এক কলেজ মালিকের জন্য কাজ করে। আর সে মালয়েশিয়ায় ৮ হাজারের বেশি বাংলাদেশিকে পাচার করেছে। নেপালি নাগরিক ওই এজেন্ট বলে, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ফাঁদে ফেলানো খুবই সহজ আর দ্রুত তাদের কাছ থেকে অর্থ পাওয়া যায়। সে আরো বলে, ‘এমন ২০০ বা ৩০০ জনকে নিয়ে আসুন, তাদের বিভিন্ন কলেজে ভাগ করে দিন, এরপর আপনি অনেক অর্থ বানাতে পারবেন।’
ভুক্তোভোগী এসব বাংলাদেশি ক্ল্যাং ভ্যালির জমকালো শহরগুলোর কাছেই বসবাস করে এবং কাজ করে। গোপনে কষ্টে দিনাতিপাত করে তারা।
সাইবার জায়ায় এক অস্থায়ী বস্তি এলাকায় বাস করা এমন এক বাংলাদেশি বলেন, ‘এখানে আমাদের বসবাসের পরিবেশ ঢাকার বস্তির আবর্জনার স্তূপের থেকে খারাপ।’ বর্তমানে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করা এই বাংলাদেশিকে মালয়েশিয়ায় পড়ানোর জন্য তার পরিবারকে ঋণ করতে হয়েছিল। ওই ঋণ শোধ করাতে তারা মাসে ২১ হাজার টাকা (১১০০ রিঙ্গিত) কিস্তি পরিশোধ করে। এখন সে মাসে উপার্জন করে ১৫০০ রিঙ্গিত। সে আরো জানায়, ‘আমার কলেজে আনুমানিক ২০০-২৫০ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ছিল। কিন্তু শুধু ৩০-৩৫ জন তাদের ভিসা নবায়ন করেছে (পড়াশোনা চালিয়ে যাবার জন্য)। বাকিরা কোথায় আমরা জানি না।’
অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে আর.এইজ টিম পাচারের শিকার হওয়া ৩০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থীকে খুঁজে পেয়েছে। এছাড়াও এমন অন্তত ৩০টি কলেজের কথা জানতে পেরেছেন তারা যেগুলো পাচারকারীদের সঙ্গে কাজ করেছে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
আর.এইজ দলের এক সাংবাদিক শিক্ষার্থী পরিচয় দিয়ে এমন একটি কলেজে গেলে সেখানকার এক কর্মচারী তাকে ভর্তি না হতে সতর্ক করে দেন। ওই নারী কর্মচারী তাকে বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব (মালয়েশিয়ান) লোকজন এলে আমি তাদের বলবো এখানে পড়াশোনা না করতে।’ তিনি আরো বলেন, ‘চারপাশে চেয়ে দেখো, পুরো জায়গাটা খালি! আমি চাবো না কোনো মালয়েশিয়ান শিক্ষার্থী এখানে আটকে থাকুক।’
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালেও দ্য স্টারের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল বহুসংখ্যক বিদেশি শিক্ষার্থী ভুয়া কলেজের মাধ্যমে পাচারের শিকার হচ্ছে। ২০১৫-তে মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষা বিষয়ক মন্ত্রণালয় এমন ৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী লাইসেন্স বাতিল করেন। এরপর থেকে আরো ২৬টি এমন প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে বা নবায়ন করা হয় নি।
পাচারচক্রের ফাঁদে পড়া ভুক্তোভোগী আরেকজন বলেন, ‘আমি এখানে পড়াশোনা করতে এসেছিলাম। শুধু পড়তে। কিন্তু এখন আমার স্বপ্ন ভেঙেচুরে গেছে।




























