সুনামগঞ্জে বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি: সচিবসহ ১৪০ জনের বিরুদ্ধে মামলা
- Update Time : ০৬:৩৮:০২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ আগস্ট ২০১৭
- / ১ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
বিপ্লব রায়, সুনামগঞ্জ থেকে :: সুনামগঞ্জের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে হাওরের একমাত্র ফসল ডুবে জেলাব্যাপী দুর্যোগ নেমে আসে। হাওরের হাজার কোটি টাকার ফসলহানির ঘটনায় এ মামলা করেছে জেলা আইনজীবী সমিতি। একই ঘটনায় সুনামগঞ্জবাসীকে নিয়ে কটাক্ষ করে বক্তব্য প্রদান করায় ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. শাহ কামালকেও আসামী করা হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)’র ১৫ কর্মকর্তা, ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণকাজের ৪৬ জন ঠিকাদার এবং প্রকল্প বাস্তায়ন কমিটির (পিআইসি) ৭৮ জনসহ এই মামলায় ১৪০ জনকে আসামী করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে সুনামগঞ্জর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ মুজিবুর রহমানের আদালতে জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. আব্দুল হক বাদী হয়ে এই মামলা দায়ের করেন। এর আগে এ ঘটনায় দুর্নীতির অভিযোগে ৬১ জনকে আসামী করে একটি মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
আদালতের বিচারক সুনামগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ মো. মুজিবুর রহমান মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্তের জন্য দুদকে প্রেরণের আদেশ দিয়েছেন। মামলায় সচিব ছাড়া অন্যদের বিরুদ্ধে হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতি ও সরকারি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। সচিবের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে দন্ড-বিধির ৫০৫ (এ) ধারার অভিযোগ। এই ধারায় উল্লেখ আছে, ‘কথা ইত্যাদি কর্তৃক অনিষ্টকর কার্য।’
জানা যায়, ক্রিমিনাল ল’এমেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট ১৯৫৮’এর ৪ (২) বিধি অনুযায়ী দায়ের করা নালিশ মামলায় বাঁধের কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত ৩৯ টি পিআইসি’র সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক, পাউবো’র সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল হাইসহ ১৫ জন পাউবো কর্মকর্তা, ৪৬ জন ঠিকাদার এবং ৩৯ টি পিআইসি’র সভাপতি-সম্পাদককে মামলার আসামী করা হয়েছে।
মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে আসামীদের বিরুদ্ধে দন্ডবিধির ১৬৬ ধারার অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা, সেই সঙ্গে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের (৫) ২ ধারার অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা পরিস্কারভাবে পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে।
মামলায় উল্লেখ করা সদর থানায় একই বিষয়ে দুদকের একটি মামলা রুজু থাকায় থানা কর্তৃপক্ষ নতুন মামলা গ্রহণ না করায় আদালতের আশ্রয়ে তারা এই মামলা রুজু করছেন বলে জানানো হয়।
এর আগে গত ২ জুলাই হাওরে ফসলহানির ঘটনায় সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানায় পাউবোর ১৫ কর্মকর্তা ও ৪৬ জন ঠিকাদারকে আসামি করে দুর্নীতির অভিযোগে একটি মামলা করেন দুদকের প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. ফারুক আহমদ। ওই মামলায় পাউবোর সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আফছার উদ্দিন ও বাঁধের কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইব্রাহিম ট্রেডার্স এর স্বত্বাধিকারী মো. বাচ্চু মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা এখন কারাগারে আছেন।
দুদকের মামলায় পাউবো কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, ঠিকাদারদের সঙ্গে অবৈধ যোগসাজশের অভিযোগ আনা হয়। ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে ঠিক সময়ে ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ শেষ না করে কৃষকদের ক্ষতি সাধনের অভিযোগ। আইনজীবীদের দায়ের করা মামলায় দুদকের দায়ের করা মামলার ৬১ আসামির সঙ্গে ত্রাণ সচিব এবং পিআইসির ৭৮ জনকে আসামি হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। দায়ের করা মামলার আসামির তালিকায় ১৪০ নম্বরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. শাহ কামালের নামও রয়েছে।
মামলার বাদী আবদুল হক এজহারে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. শাহ কামালকেও আসামী করার বিষয়টিও উল্লেখ করেন। ত্রাণ সচিব ফসলহানির ঘটনার সময় গত ১৯ এপ্রিল সুনামগঞ্জে আসেন। জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এক সভায় তিনি বলেন, দেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নামে একটা আইন আছে। এই আইনের ২২ ধারায় বলা আছে, কোনো এলাকার অর্ধেকের ওপরে জনসংখ্যা মারা গেলে ওই এলাকাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করতে হয়। না জেনে যারা এমন সস্তা দাবি জানায় তাদের কোনো প্রকার জ্ঞানই নেই।’ ত্রাণ সচিব অবজ্ঞার সুরে আরও বলেন, ‘কিসের দুর্গত এলাকা, একটি ছাগলও তো মারা যায়নি’-বাদী অভিযোগে এই মন্তব্যও উল্লেখ করেছেন। বাদী আবদুল হকের পক্ষে আদালতে মামলাটি দায়ের করেন সিনিয়র আইনজীবী মো. শহীদুজ্জামান চৌধুরী। এ সময় আদালতে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সৈয়দ শায়েখ আহমদসহ সমিতির শতাধিক আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন।
হাওরে ফসলহানির পর গত ১১ এপ্রিল জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্যরা দায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের সিদ্ধান্ত নেন। এ জন্য সমিতির পক্ষ থেকে একটি কমিটিও করা হয়। দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে মানববন্ধন করেন তাঁরা। পরে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
মামলার বাদী মো. আবদুল হক বলেন, আইনজীবী সমিতির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জেলার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের স্বার্থে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে।
সুনামগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) খায়রুল কবির রুমেন বলেন, আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্তের জন্য দুদককে নির্দেশ দিয়েছেন।
উল্লেখ্য : পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে ১৫৪টি হাওরের বোরো ফসল তলিয়ে যায়। ২৭ মার্চ থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত জেলায় এই ফসলহানির ঘটনা ঘটে। এতে ৩ লাখ ২৫ হাজার ৯৯০ জন কৃষক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হাওরে ফসলহানির পর ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে সর্বত্র।



























