০৮:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬, ১৮ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আল্লামা হবিবুর রহমান মুহাদ্দিস ছাহেব হুজুর (র.) ইলমে দ্বীনের আলোকবর্তিকা : অধ্যক্ষ মঈনুল ইসলাম পারভেজ

  • Update Time : ১১:৩০:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২
  • / ১ বার নিউজটি পড়া হয়েছে

ভারত উপমহাদেশে প্রথম শ্রেণীর হাদীস বিশারদ হিসেবে যে মহান ব্যক্তিবর্গের নাম গণনা করা হয় তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন শায়খুল হাদীস আল্লামা মোঃ হবিবুর রহমান। কুরআন, হাদীস, আকাইদ ও ফিকহ, ইলমে কিরাআত সহ ইসলামী শরীয়াহ এর মৌলিক বিষয়ের পাশাপাশি রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজকল্যাণ, প্রশাসন, আইন ও বিচারসহ যাবতীয় জাগতিক মানবিক বিষয়ে তিনি গভীর জ্ঞানের অধিকারী। মূলত: শিক্ষার বহুমুখী শাখায় এ বিচরণই তাঁকে সাফল্যের স্বর্ণশিখরে অধিষ্ঠিত করেছে। বিশেষ করে ইখতেলাফী মাছাইলে বিভিন্ন মাযহাবের সমন্বয় সাধনে তার তুলনা তিনি নিজেই। আধ্যাত্মিক জগতেরও তিনি একজন রাহবার। কুরআনের তাফসিরে, হাদীসের তাদরিসে যিনি কাটাচ্ছেন পুরোটা জীবন। ইলমুল ওহীর জ্ঞান অর্জন ও তা হাজারো মুসলিম মানসে প্রতিস্থাপিত করার কাজে তিনি সত্যিই এক প্রশংসনীয় মুবাল্লীগে দ্বীন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের রঙে নিজের জীবনকে রঙিন করে তোলার প্রয়াস যে ক’জন উচুস্তরের বুযুর্গের মধ্যে বিদ্যমান শায়খুল হাদীস আল্লামা মো: হবিবুর রহমান তাঁদেরই একজন। রাহে লিল্লায় আপনাকে নিবেদিত করার মাধ্যমে একামতে দ্বীনের সুমহান দায়িত্ব পালন করে আজ পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন।

 

জন্ম: শায়খুল হাদীস আল্লামা মোঃ হবিবুর রহমান ১৯৪০ সালের ৩রা মার্চ সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার রারাই গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম দ্বীনদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা-মাওলানা মমতাজ আলী (র.) ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম ও পরহেজগার লোক। ফিকহ, আকাঈদ ও ফরাইজ শাস্ত্রে তিনি ছিলেন পারদর্শী। এতদঞ্চলের ফরাইজ সংক্রান্ত যাবতীয় সমস্যার তিনিই সমাধান প্রদান করতেন। এছাড়া তিনি সদালাপী, মিষ্টভাষী এবং এলাকার গরীব দুঃখীদের আশ্রয়স্থল বিশেষ করে মেহমান নোয়াজ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মাতা আমিনা খাতুন একজন ধার্মিক, পদানশীল, বিদুষী ও গুণবতী মহিলা হিসাবে এলাকায় ছিলেন খ্যাত। সাত ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়।

 

শিক্ষাজীবন: শায়খুল হাদীস আল্লামা মো: হবিবুর রহমান ছোট বেলায় পিতা মাওলানা মমতাজ আলী (র.) এর নিকট বুনিয়াদী শিক্ষা শুরু করেন। এলাকার প্রাইমারী স্কুলে কিছুদিন লেখাপড়া করেন। বাল্য বয়সেই বড়ভাই মাওলানা নজিবুর রহমানের সাথে লেখাপড়ার উদ্দেশ্যে বদরপুর (ভারত) চলে যান। বদরপুর সিনিয়র মাদরাসা হতে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপন করেন। তারপর সড়কের বাজার আহমদিয়া সিনিয়র মাদরাসায় ভর্তি হন এবং কৃতিত্বের সাথে মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপন করেন। এ সময় মেধাবী, সৎচরিত্রবান ও শিক্ষকদের প্রতি বিনীয় হিসেবে ছাত্র-শিক্ষক সবার একান্ত স্নেহভাজনে পরিণত হন। বিশেষ করে বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে বিশুদ্ধ কুরআন তেলাওয়াতের জন্য তাঁকেই আহবান করা হতো। অষ্টম শ্রেণীর জেলা ভিত্তিক বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। অতঃপর গাছবাড়ী জামেউল উলুম কামিল মাদরাসায় ভর্তি হয়ে ১৯৫৫ সালে পূর্ব পাকিস্তান মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত আলিম পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধা তালিকায় দ্বাদশ স্থান লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেন। উল্লেখ্য ইতোপূর্বে কেউ গাছবাড়ী জামেউল উলুম কামিল মাদরাসা থেকে আলিম পরীক্ষায় মেধাবৃত্তি লাভ করেননি। একই মাদরাসা হতে ১৯৫৭ সালে ফাযিল পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধা তলিকায় তৃতীয় স্থান এবং ১৯৫৯ সালে কামিল (হাদীস) পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে মেধা তালিকায় দ্বাদশ স্থান লাভ করেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পর দেশ-বিদেশের বিজ্ঞ মুহাক্কিক মুহাদ্দিসগণের নিকট থেকে ইলমে হাদীস অধ্যয়ন করে হাদীস শরীফের সনদ লাভ করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- শামসুল উলামা আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ছাহেব কিবলাহ ফুলতলী (র.) সিলেট সরকারী আলিয়া মাদরাসা সাবেক অধ্যক্ষ বাহরুল উলুম আল্লামা মুহাম্মদ হোসেন সিলেটী, ঢাকা আলিয়া মাদরাসার হেড মাওলানা শায়খুল হাদীস আল্লামা সৈয়দ আমিমুল ইহসান (র.), সিলেট সরকারী আলিয়া মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা শায়খ আব্দুল ওয়াহিদ সিলেটী (র.), মক্কা মুকাররামার হরম শরীফের সাবেক খতিব বহু গ্রন্থ প্রণেতা মধ্যপ্রাচ্য আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের ইমাম ড. শায়খ সৈয়দ মুহাম্মদ আলাভী মালিকী মক্কী (র.), পাকিস্থানের ড. তাহির আল কাদরী, সিরিয়ার বিশিষ্ট বুযুর্গ শায়খ আসআদ সাগিরজী বিন মুহাম্মদ সাঈদ হানাফী দামেশকী প্রমুখ। সড়কের বাজার আহমদিয়া সিনিয়র মাদরাসায় অধ্যয়নকালে তিনি সেখানকার কারী তজম্মুল আলী সাহেবের নিকট বিশুদ্ধ কুরআন শিক্ষা করেন। পরবর্তীতে মক্কা শরীফের বিশ্ব বরেণ্য কারী শায়খুল কুররা আহমদ হেজাজী মক্কী (র.)-এর সুযোগ্য উত্তরসূরী রইসুল কুররা ওয়াল মুফাসসিরীন শামছুল উলামা আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ছাহেব কিবলাহ ফুলতলী (র.)-এর নিকট অধ্যয়ন করে ইলমে কিরাতের চূড়ান্ত সনদ লাভ করেন।

 

আধ্যাত্মিক জীবন: তাযকিয়া ও ইহসানের পথেও তিনি একজন সাধক পুরুষ। ইমামে আহলে সুন্নাত, মুজাদ্দিদে যামান শামসুল উলামা আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ছাহেব কিবলাহ ফুলতলী (র.) এর হাতে বায়আত হয়ে তরীকতের খেলাফত লাভ করেন। ইলমে হাদীসের পাশাপাশি তিনি তরিকতের ও খিদমত আনজাম দিয়েছেন৷ দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাতে রাসূলুল্লাহর পূর্ণ অনুসরণের পাশাপাশি এপথে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য তিনি আজীবন প্রচেষ্টা চালিয়েছেন।

 

পারিবারিক জীবন: ব্যক্তিগত জীবনে আল্লামা মো: হবিবুর রহমান ১৯৬০ সালে বিয়ানীবাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আলহাজ্ব শফিকুল হক সাহেবের কন্যা আনোয়ারা খাতুনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। আনোয়ারা খাতুন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন না করলেও গৃহ শিক্ষকের মাধ্যমে কুরআন ও হাদিসের জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি আট সন্তানের জনক। তারা হলেন- মাওলানা আব্দুল আউয়াল হেলাল, ইংল্যান্ডের মাদরাসায়ে দারুল হাদীস লতিফিয়ায় অধ্যাপনা করছেন। মাওলানা আব্দুর রব বিলাল, তিনি বর্তমানে ইংল্যান্ডের এক মাদরাসায় অধ্যাপনা করছেন, মাওলানা আব্দুল বাতিন ফয়ছল, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করে বর্তমানে সিলেট শহরে ব্যবসা করছেন। মাওলানা আব্দুল বাকী খালেদ। ছোট ছেলে আব্দুল লতিফ শাহেদ বাল্যকালে ইন্তেকাল করেন। তিন মেয়ে যথাক্রমে রোকেয়া খাতুন, ছালমা খাতুন, ও শায়মা খাতুন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সংসার জীবন অতিবাহিত করছেন।

 

রাজনৈতিক জীবন: অধ্যাপনা সমাজসেবা ও হাদীসে নববীর খেদমতের পাশাপাশি রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান লক্ষণীয়। ছাত্র জীবনে তিনি নেজামে ইসলামী পার্টির ছাত্র সংগঠন জমিয়তে তালাবায়ে আরাবিয়া’র সাথে সম্পৃক্ত হন এবং বিভিন্ন সময় এ সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৭ সালে আতাউর রহমান খাঁন শিক্ষা কমিশন রিপোর্টে ধর্মীয় শিক্ষাকে অবজ্ঞা এবং মাদরাসা শিক্ষাখাতে অর্থ বরাদ্ধ বন্ধের সুপারিশ করা হলো তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। ছাত্র জনতার আন্দোলনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

 

১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে নেজামে ইসলাম পার্টির মনোনয়নে তিনি তখনকার সিলেট-৭ আসনে (জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, কানাইঘাট) এম.এন.এ পদে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করে সম্মানজনক ভোট পান। ১৯৯৬ সালে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ সমর্থিত বাংলাদেশ আনজুমানে আল ইসলাহ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে সিলেট-৫ আসনে (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট) প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেন। দেশ, জাতি ও ইসলামের স্বার্থে সবকটি জাতীয় ও স্থানীয় আন্দোলনে তাঁর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বিশেষত: নাস্তিক, মুরতাদ বিরোধী আন্দোলনে তথা তাসলিমা নাসরিন, দাউদ হায়দার, সর্দার আলা উদ্দিন, আহমদ শরীফ, এনাম সহ আল্লাহদ্রোহীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি ১৯৯২ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সুন্নিয়তের পতাকাবাহী সংগঠন বাংলাদেশ আনজুমানে আল ইসলাহ এর কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তাছাড়া তিনি আমৃত্যু বাংলাদেশ আঞ্জুমানে আল-ইসলাহ এর স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।

 

রচনাবলী: শিক্ষকতা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও সামাজিক কর্মকান্ডে ব্যস্ততা থাকা সত্তে¡ও তিনি ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সতেরটি গ্রন্থ রচনা করেন। তাছাড়া তাঁর লিখিত প্রবন্ধ সমূহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৯১ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ১৯৯৩ সালের জানুয়ারী পর্যন্ত তাঁর সম্পাদনায় সিলেট শহর থেকে নিয়মিত ‘মাসিক শাহজালাল’ নামক সাহিত্য ও গবেষণা পত্রিকা প্রকাশিত হয়। তাঁর রচিত অপ্রকাশিত গ্রন্থ সমূহ হচ্ছে- (১) আল কাউলুল মাকবুল ফী মীলাদির রাসূল (উর্দ্দু ভাষায় রচিত তা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭৭ সালে। ১৯৯৮ সালে এ কিতাব খানার বঙ্গানুবাদ প্রকাশিত হয়। (২) দোয়ায়ে মাসনুনা ও তেত্রিশ আয়াতের ফযীলত। ১৯৯৬ সালে বাংলা ভাষায় এই বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়। ২০১২ সালে আগস্ট মাসে লন্ডন থেকে এ বইয়ের ইংরেজী অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। অনুবাদ করেন: মাওলানা ইউসুফ আহমদ। (৩) মাসআলায়ে উশর: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ। প্রথম প্রকাশকাল: জুন ২০০৬ সাল (৪) দুরূদ শরীফের ফযীলত ও ওযীফা (প্রথম প্রকাশকাল: ১৯৯৯ সাল, (৫) যিয়ারতে মদীনা মুনাওয়ারা (ফযীলত ও নিয়ম)। প্রথম প্রকাশকাল: মে ১৯৯৯ সাল (৬) আসহাবে বদর। প্রথম প্রকাশকাল: মে ১৯৯৮ সাল। (৭) ওযীফা। এ ওযীফাখানি প্রথম প্রকাশিত হয় ১মে ১৯৯৮। (৮) হাদিয়াতুল লাবীব ফী নাবযাতিন মিন সীরাতিন নাবিয়্যিল হাবীব। আরবী ভাষায় রচিত এ কিতাব খানা ২০১২ সালের জুলাই মাসে প্রথম প্রকাশিত হয়। ২০১২ সালের আগস্ট মাসে ‘সীরাতে হাবীবে খোদা’’ নামে এ কিতাব খানার বাংলা তরজমা প্রকাশিত হয়েছে। অনুবাদক মাওলানা আব্দুল আউয়াল হেলাল। (৯) যাখীরাতুল আহাদিসিল আরবাঈন ফি ফাদিয়িলি সায়্যিদিল মুরসালীন। এ কিতাবখানা জানুয়ারি ২০১১ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। (১০) কানযুল আরবাঈন ফী মানাকিবি আহলি বাইতিন নাবিয়্যিল আমীন। এ গ্রন্থটি জানুয়ারী ২০১১ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। (১১) তুহফাতুল লাবীব ফি আসানীদিল হাবিব। আরবী ভাষায় এ গ্রন্থটি ১৯৮৫ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। (১২) আত-তুহফাতুল লাতীফাহ ফি আহাদিসিল মুসালসালাতিন মুনীফাহ। আরবী ভাষায় রচিত এ কিতাব খানা অক্টোবর ২০০৯ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। (১৩) হজ্জ ও যিয়ারত (সংক্ষিপ্ত আহকাম ও নিয়ম)। বাংলা ভাষায় রচিত এ কিতাবখানা ২০০৩ সালে দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। (১৪) দালাইলুল খাইরাত। ইমাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ বিন আবু বকর আল জাযুলী আল হুসাইনী (র.) কর্তৃক আরবী ভাষায় প্রণীত দুরূদ শরীফের এ ওযীফা খানাকে তিনি স্বীয় মুরশিদ হযরত আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ছাহেব কিবলাহ ফুলতলী (র.) নির্দেশিত পদ্ধতিতে বিন্যন্ত করেছেন। ২০১০ সালের এপ্রিল মাসে এ কিতাবখানা প্রকাশিত হয়। (১৫) আল হিযবুল আযম। ইমাম মোল্লা আলী কারী (র.) প্রণীত এ কিতাব তাহকীক করেছেন তিনি। ২০১৬ সালে কিতাবখানা প্রকাশিত হয়। (১৬) দারসে হাদীস। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত হয়েছে দারসে হাদীস সিরিজের প্রথম গ্রন্থ। (১৭) সালাতুত তারাবীহ। ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে এ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়।

আরবী ও ইসলামী শিক্ষা স¤প্রসারণে অবদান
শায়খুল হাদীস আল্লামা মো: হবিবুর রহমান বৃহত্তর সিলেট তথা বাংলাদেশ ও বহি:র্বিশ্বে আরবী ও ইসলামী শিক্ষা স¤প্রসারণে তিন ধারায় অবদান রাখে চলেছেন। প্রথমত: অর্ধশতাব্দীরও অধিককাল ধরে ইলমে হাদীস ও কুরআনুল কারিমের খিদমত আঞ্জাম দেয়ার মাধ্যমে। দ্বিতীয়ত: মাদরাসা, মসজিদ ও এতিমখানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। তৃতীয়ত: দাওয়াতী কাজের মাধ্যমে। প্রথমত: তিনি অর্ধশতাব্দীরও অধিকাকাল ব্যাপি মহাগ্রন্থ আল কুরআনুল কারিম ও ইলমে হাদীসের খিদমতে নিয়োজিত থেকে ইসলামী শিক্ষা বিস্তারে অসামান্য অবদান রেখে যাচ্ছেন। তিনি ১৯৫৯ সালের ৩ আগস্ট ইছামতি দারুল উলুম কামিল মাদরাসায় (প্রতিষ্ঠা সন-১৯৪৭) সহকারী মাওলানা পদে যোগদান করে ১৯৬৩ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সুনামের সাথে অধ্যাপনা করেন। ১৯৬৩ সালের ১০ এপ্রিল সিলেটের প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ফুলবাড়ি আজিরিয়া ফাযিল মাদরাসায় সহকারী মাওলানা পদে যোগদান এবং ২২ নভেম্বর ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত দক্ষতার সাথে অধ্যাপনা চালিয়ে যান। স্বীয় মুরশিদ আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ছাহেব কিবলাহ ফুলতলী (র.)-এর নির্দেশে ১৯৬৩ সালের ২৩ নভেম্বর সৎপুর দারুল হাদীস কামিল মাদরাসায় (প্রতিষ্ঠা সন-১৯৪৮) প্রধান মুহাদ্দিস হিসাবে যোগদান করেন। ১৯৭৪ সালের ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ইলমে হাদীসের খিদমাত আনজাম দেন। ১৯৭৪ সালের ১৫ জানুয়ারি ইছামতি দারুল উলুম কামিল মাদরাসায় অধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন। ১৯৭৬ সালে সৎপুর দারুল হাদীস কামিল মাদরাসা পরিচালনায় সমস্যা দেখা দেয়। সমস্যা নিরসন কল্পে স্থানীয় প্রশাসন ও এলাকাবাসীর অনুরোধে সে বছর ১১ সেপ্টেম্বর তিনি উক্ত মাদরাসায় অধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অল্প দিনের মধ্যে মাদরাসা স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে এলে ১৯৭৭ সালের ২ এপ্রিল সেখান থেকে চলে আসেন। ১৯৮২ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর আবারও তিনি ইছামতি দারুল উলুম কামিল মাদরাসা অধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন। অত্যন্ত সুনাম ও দক্ষতার সাথে অধ্যক্ষ ও শায়খুল হাদীসের দায়িত্ব পালন শেষে ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর নিয়মতান্ত্রিকভাবে অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৭৭ সালে তিনি সংযুক্ত আবর আমিরাতে গমন করেন। প্রথমে উম্মুল কুওয়াইন শহরে একটি মসজিদে ইমাম ও খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অল্পদিনের মধ্যে প্রতিযোগিতামূল পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি সে দেশের বিচার বিভাগে যোগদান করেন। ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে আসা পর্যন্ত তিনি উম্মুল কুওয়াইন কোর্টে বিচারক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি পূর্বোল্লিখিত মসজিদে খতিবের দায়িত্ব পালন করেন। উল্লেখ্য যে, আরব আমিরাতের কর্মজীবনে সরকারী ছুটির দিন তিনি মরুচারী বেদুইনদের অবৈতনিক শিক্ষা দান করতেন।

 

 

বিশেষ করে বয়স্ক বেদুইনদের কুরআন শরীফ সহিহ-শুদ্ধ তেলাওয়াত শিখাতেন। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও অধ্যবসায়ের ফলে তিলে তিলে ইছামতি মাদরাসা পূর্ব সিলেটের শ্রেষ্ঠতম ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। তাঁর একান্ত প্রচেষ্টায় মাদরাসার অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধিত হয়। মাদরাসার বিল্ডিং এবং সুবিশাল মসজিদ তার নীরব সাধনার স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমানে তিনি ইছামতি দারুল উলুম কামিল মাদরাসার প্রধান পৃষ্ঠপোষক এবং গভর্নিং বডির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। চাকুরী থেকে অবসর গ্রহনের পরও বর্তমান পর্যন্ত সপ্তাহে তিনদিন ইছামতি দারুল উলুম কামিল মাদরাসায় নিয়মিত বুখারী শরীফের দারস দিয়ে থাকেন। তাছাড়া তিনি দারুল কিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্টের অধিনে প্রধান কেন্দ্র ফুলতলী, হযরত শাহজালাল দারুস সুন্নাহ ইয়াকুবিয়া কামিল মাদরাসা কেন্দ্র, সোবহানীঘাট, সিলেট, ইছামতি দারুল হাদীস কামিল মাদরাসা কেন্দ্রে বিভিন্ন বছর পবিত্র রামাদ্বান মাসে বিশুদ্ধ কুরআন পাঠের খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন। বর্তমানে তিনি দারুল কিরাত জোবেদ আলী মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র বাবুর বাজার, ইছামতি দারুল হাদীস কামিল মাদরাসা কেন্দ্র ও মানিকপুর কেন্দ্রের নাজিম হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করছেন। দক্ষিণ সুরমা উপজেলার রাখালগঞ্জ বাজার জামে মসজিদে তিনি দীর্ঘদিন থেকে নিয়মিতভাবে দারসে হাদীস পেশ করছেন। নিজ বাড়িতে অনেক দিন যাবত নিয়মিতভাবে দারসে হাদীস পেশ করছেন, সেখানে সিলেটের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উস্তাদগণ দারস গ্রহণ করেন। তাঁর প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণায় গড়ে উঠেছে ‘মাওলানা ফখরুল ইসলাম শিক্ষা ট্রাস্ট’ ও প্রত্যক্ষ ‘আব্দুস সাত্তার শিক্ষা ট্রাস্ট’ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান বৃত্তি প্রদানের পাশাপাশি বইপত্র প্রদান করে ছাত্র-ছাত্রীদের সহায়তা করছে। তাছাড়া তিনি দীর্ঘদিন বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের ‘বোর্ড কমিটি’র সদস্য এবং সরকার অনুমোদিত মাদরাসা সমূহের সিলেট বিভাগ ভিত্তিক সংগঠন বাংলাদেশ আনজুমানে মাদারিছে আরাবিয়ার চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
দ্বিতীয়ত: তিনি বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় অনেক মাদরাসা মসজিদ ও এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করে ইসলামী শিক্ষা বিস্তারে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। তন্মধ্যে লালারগাঁও হাবিবিয়া হাফিজিয়া মাদরাসা, ভূরকী হাবিবিয়া হাফিজিয়া দাখিল মাদরাসা, রায়সন্তুষ হাফিজিয়া মাদরাসা, কেশবপুর হাফিজিয়া মাদরাসা, নজিপুর দারুল কুরআন হাবিবিয়া মাদরাসা, ইছামতি মাদরাসা মসজিদ, থানা বাজার জামে মসজিদ, আল-হাবীব জামে মসজিদ (রারাই)। তাছাড়া ২০০০ সালে থানাবাজার লতিফিয়া ফুরকানিয়া মাদরাসা সংলগ্ন স্থানে তিনি জমি ক্রয় করে থানাবাজার হাবিবিয়া হিফজুল কুরআন মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১১ সালে তিনি হাবিবিয়া হিফজুল কুরআন মাদরাসার সাথে একটি এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেন।

 

উল্লেখ্য যে, শাইখুল হাদীস আল্লামা মো: হবিবুর রহমান এর ব্যক্তিগত সংগ্রহে তিন হাজারের অধিক মুল্যবান কিতাবাদি রয়েছে। স্বীয় প্রতিষ্ঠিত আল-হাবিব জামে মসজিদের পাশে বর্তমানে একটি তিন তলা বিল্ডিং নির্মাণ কাজ চলছে। যেখানে তাঁর সংগৃহীত কিতাবাদি নিয়ে ‘আল-হাবীব গবেষণা গ্রন্থাগার’ অচিরেই যাত্রা শুরু করবে ইনশাআল্লাহ।তাছাড়া আল হাবিব জামে মসজিদে প্রতি মঙ্গলবার নিয়মিত হাদিস শরিফের দারস প্রদান করতেন।

 

তৃতীয়ত: এ মহান মনীষী অর্ধশতাব্দীরও অধিককালব্যাপী সাধারণ মানুষের কাছে কুরআন হাদীসের শিক্ষা পৌছে দেয়ার লক্ষ্যে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন মাহফিলে বয়ান পেশ করে দাওয়াতী কাজের মাধ্যমে ইসলামী শিক্ষা বিস্তারে অসামান্য অবদান রেখে আসছেন। বিয়ানীবাজার, বড়লেখা, ফেঞ্চুগঞ্জ, রাখালগঞ্জ, জগন্নাথপুর, সিলেট সদর সহ বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত তাফসীর ও দারসে হাদীসের মাহফিল করেন। তাছাড়া সিলেট বিভাগের প্রায় প্রতিটি মাদরাসার বার্ষিক জলছায় তিনি সভাপতি অথবা প্রধান অতিথি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বয়ান পেশ করে থাকেন। মহান আল্লাহপাক তাঁকে যেমন মেধা ও জ্ঞান দান করেছেন, তেমনি সেই জ্ঞান বিতরণের জন্য চিত্তকর্ষণ বয়ানের যোগ্যতাও দিয়েছেন। তাঁর বয়ান ও ওয়াজ শুনার জন্য দুর-দুরান্ত থেকে মানুষ চলে আসে। বানোয়াট কিচ্ছা-কাহিনী নয়; সরাসরি কুরআন ও হাদীসের আলোকে ওয়াজ করেন। সমাজের ত্রæটিবিচ্যুতিগুলো এটা দরদমাখাভাষা ও যুক্তিসহ উপস্থাপন করেন যে, মানুষ সহজেই অভিভূত হয়ে যায়। উনার ওয়াজকে সাধারণ মানুষের জন্য দারসুল কুরআন ও দারসুল হাদীস হিসাবে গন্য করা হয়। উনার আলোচনা অত্যন্ত সাজানো গুছানো ও পরিপাটি। কঠিন থেকে কঠিন বিষয়কে সহজ ও সাবলীল ভাষায় বিভিন্ন উদাহরণের মাধ্যমে সহজ করে বুঝানোর ক্ষেত্রে তাঁর তুলনা তিনি নিজেই। উনার আলোচনার আরেকটি দিক হলো- সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার ও বিদআতের বিরুদ্ধে মজবুত দলিল ও যুক্তির উপস্থাপন এবং আম্বিয়ায়ে কেরাম ও সাহাবায়ে কেরামের জীবন থেকে শিক্ষনীয় ঘটনা তুলে ধরা। ইসলামী শিক্ষা স¤প্রসারণে ও একামতে দ্বীনের দায়িত্ব পালনার্থে আল্লামা হবিবুর রহমান যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সিরিয়া, মরক্কো, ভারত, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে বিভিন্ন সময় সফর করেন। ১৯৮১ সালে তিনি স্বীয় পীর ও মুর্শিদ হযরত আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ছাহেব কিবলাহ ফুলতলী (র.) এর সাথে প্রথমবার যুক্তরাজ্য সফর করেন। এ সফরে তিনি গ্রেট বৃটেনের উল্লেখযোগ্য প্রতিটি শহরে বিভিন্ন মহফিলের মাধ্যমে মানুষের মাঝে ইসলামী শিক্ষার আলো বিতরনের মহান দায়িত্ব পালন করছেন।

 

ব্রিটেনে অবস্থানর তাঁর ছাত্রগণের অনুরোধে ২০০৯ সালে তিনি একাধারে প্রায় নয়মাস সে দেশে অবস্থান করেন। সে সময় প্রতি শনিবার লন্ডনস্থ দারুল হাদীস লতিফিয়া শামায়েলে তিরমিযী নামক বিখ্যাত হাদিসের কিতাব সম্পূর্ণ দারস পেশ করেন। নিয়মিত সে দরসে ব্রিটেনের বিভিন্ন শহর থেকে প্রচুর সংখ্যক উলামা এবং সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ করতেন। দারস পূর্ণ হলে দুই শতাধিক আলিমকে শামায়েলে তিরমিযীর সনদ প্রদান করা হয়। বর্তমানেও ব্রিটেন সফরকালে বিভিন্ন শহরে (লন্ডন, লুটন, বার্মিংহাম, মানচেস্টার, ওল্ডহাম) রিয়াজুস সালেহীন এবং আদাবুল মুফরাদ নামক হাদিসের কিতাবদ্বয়ের দারস প্রদান করেন। ১৯৯৫ সালে তিনি দাওয়াতী সফরে যুক্তরাষ্ট্র গমন করেন। তাছাড়া ২০০৮ সালের অক্টোবর মাসে তিনি সিরিয়া সফর করেন। সে সময় দামেস্কের বিখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদগণের সাথে ব্যাপকভাবে সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- দামেষ্কের প্রখ্যাত হানাফী আলিম, আল ফিকহুল হানাফী ওয়া আদিল্লাতুহু সহ বহু মূল্যবান কিতাব প্রণেতা শায়খ ড. আসআদ মুহাম্মদ সাঈদ সাগিরজি, শায়খ ড. আজ্জাজ আল খতিব, শায়খ হিশাম বুরহানী, শায়খ আব্দুর রহমান হাম্মানী প্রমুখ। ২০১০ সালের এপ্রিল মাসে তিনি মরক্কো সফর করেন। ভারতের আসাম প্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তিনি বিভিন্ন সময়ে ব্যাপক দাওয়াতী সফর করেন। সেসব সফরে মাহফিলে যোগদান ছাড়াও উলামায়ে কেরামের চাহিদার প্রেক্ষিতে বিভিন্ন স্থানে হাদীস শরীফের দারস প্রদান করেন। ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে তিনি মিশরে দাওয়াতী সফর করেন। সেই সফরে কায়রো শহরে সাহাবি উকবা ইবন আমির (রা.) এর মাজার প্রাঙ্গণে, ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (র.)-এর মাজার প্রাঙ্গণ এবং ইতিহাস খ্যাত আল-আজহার মসজিদে হাদীস শরিফের দারস প্রদান করেন। উল্লেখ্য যে, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে তাঁর প্রেরণা ও নির্দেশনায় বিভিন্ন মসজিদ ও ইসলামী সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

 

ইন্তেকাল ও জানাযা: মহান এ হাদিস বিশারদ ৭ ফেব্রæয়ারি ২০২২ ইংরেজি রোজ সোমবার সন্ধ্যা ৬টায় মাওলায়ে হাকীকীর সাক্ষাতে চলে যান। ৮ ফেব্রæয়ারি ২০২২ ইংরেজি রোজ মঙ্গলবার বিকাল ৩টায় রারাই গ্রামের উত্তরের মাঠে জানাযা অনুষ্ঠিত হবে। আল্লাহ তায়ালা তাঁর জীবনের খিদমাতসমূহ কবুল করে তাঁকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।

 

তথ্য সূত্র: ১। মুহাম্মদ আব্দুন নূর সম্পাদিত, আহবাব স্মারক, মুহাম্মদ আব্দুন নূর, শায়খুল হাদীস আল্লামা হবিবুর রহমান ছাহেব: সংক্ষিপ্ত জীবনালেখ্য, (সিলেট : ৩১ জানুয়ারি ২০০৮ খ্রি.), পৃ. ৯৭।
২। মাও: শায়খ তাজুল ইসলাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫১।
৩। মুহাম্মদ আব্দুন নূর সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, পৃ. -৯৭
৪। দেওয়ান নুরুল আনোয়ার হোসেন চৌধুরী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৯০।
৫। মাও: শায়খ তাজুল ইসলাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫১।
৬। মুহাম্মদ আব্দুন নূর সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, পৃ. -৯৭।
৭। মো: আব্দুল আউয়াল হেলাল ও অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল হেকিম সম্পাদিত, প্রাগুক্ত,পৃ. ৭০।
৮। মুহাম্মদ আব্দুন নূর সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, পৃ. ৯৮।
৯। মো: আব্দুল আউয়াল হেলাল ও অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল হেকিম সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭০।
১০। মাও: শায়খ তাজুল ইসলাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫১।
১১। মাও: শায়খ তাজুল ইসলাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫১।
১২। মুহাম্মদ আব্দুন নূর সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, পৃ. ৯৯।
১৩। মাও: শায়খ তাজুল ইসলাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৩।
১৪। মুহাম্মদ আব্দুন নূর সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০০।
১৫। প্রাগুক্ত, পৃ. ১০১।
১৬। মাও: শায়খ তাজুল ইসলাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫২।
১৭। মুহাম্মদ আব্দুন নূর সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০১।
১৮। মাও: শায়খ তাজুল ইসলাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৩।
১৯। মুহাম্মদ আব্দুন নূর সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০২।
২০। মাও: শায়খ তাজুল ইসলাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৩।
২১। প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৩।
২২। মুহাম্মদ আব্দুন নূর সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, পৃ.১০২।
২৩। মো: আব্দুল আউয়াল হেলাল ও অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল হেকিম সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭০-৭১।
২৪। প্রাগুক্ত, পৃ. ৭০।
২৫। মো: আব্দুল আউয়াল হেলাল, শাইখুল হাদীস হবিবুর রহমান: সিলেটের কিংবদন্তি আলেম, যঃঃঢ়ং://ভধষবয২৪.পড়স (২০ আগস্ট ২০১৯ খ্রি.)।
২৬। মুহাম্মদ আব্দুন নূর সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, পৃ.১০০।
২৭। মাও: শায়খ তাজুল ইসলাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৩।
২৯। মো: আব্দুল আউয়াল হেলাল ও অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল হেকিম সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭১।
৩০। মুহাম্মদ আব্দুন নূর সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, পৃ. -১০১।
৩০। মো: আব্দুল আউয়াল হেলাল, শাইখুল হাদীস হবিবুর রহমান: সিলেটের কিংবদন্তি আলেম, যঃঃঢ়ং://ভধষবয২৪.পড়স (২০ আগস্ট ২০১৯ খ্রি.)।
৩১। মুহাম্মদ আব্দুন নূর সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০১
৩২। মো: আব্দুল আউয়াল হেলাল, শাইখুল হাদীস হবিবুর রহমান সিলেটের কিংবদন্তী আলেম, যঃঃঢ়ং://ভধষবয২৪.পড়স; ২০ অঁমঁংঃ ২০১৯ অউ.
৩৩। মো: আব্দুল আউয়াল হেলাল ও অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল হেকিম সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭১।
৩৪। মো: আব্দুল আউয়াল হেলাল, প্রাগুক্ত।

লেখক: কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক: বাংলাদেশ আনজুমানে আল ইসলাহ।

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ

আল্লামা হবিবুর রহমান মুহাদ্দিস ছাহেব হুজুর (র.) ইলমে দ্বীনের আলোকবর্তিকা : অধ্যক্ষ মঈনুল ইসলাম পারভেজ

Update Time : ১১:৩০:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২

ভারত উপমহাদেশে প্রথম শ্রেণীর হাদীস বিশারদ হিসেবে যে মহান ব্যক্তিবর্গের নাম গণনা করা হয় তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন শায়খুল হাদীস আল্লামা মোঃ হবিবুর রহমান। কুরআন, হাদীস, আকাইদ ও ফিকহ, ইলমে কিরাআত সহ ইসলামী শরীয়াহ এর মৌলিক বিষয়ের পাশাপাশি রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজকল্যাণ, প্রশাসন, আইন ও বিচারসহ যাবতীয় জাগতিক মানবিক বিষয়ে তিনি গভীর জ্ঞানের অধিকারী। মূলত: শিক্ষার বহুমুখী শাখায় এ বিচরণই তাঁকে সাফল্যের স্বর্ণশিখরে অধিষ্ঠিত করেছে। বিশেষ করে ইখতেলাফী মাছাইলে বিভিন্ন মাযহাবের সমন্বয় সাধনে তার তুলনা তিনি নিজেই। আধ্যাত্মিক জগতেরও তিনি একজন রাহবার। কুরআনের তাফসিরে, হাদীসের তাদরিসে যিনি কাটাচ্ছেন পুরোটা জীবন। ইলমুল ওহীর জ্ঞান অর্জন ও তা হাজারো মুসলিম মানসে প্রতিস্থাপিত করার কাজে তিনি সত্যিই এক প্রশংসনীয় মুবাল্লীগে দ্বীন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের রঙে নিজের জীবনকে রঙিন করে তোলার প্রয়াস যে ক’জন উচুস্তরের বুযুর্গের মধ্যে বিদ্যমান শায়খুল হাদীস আল্লামা মো: হবিবুর রহমান তাঁদেরই একজন। রাহে লিল্লায় আপনাকে নিবেদিত করার মাধ্যমে একামতে দ্বীনের সুমহান দায়িত্ব পালন করে আজ পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন।

 

জন্ম: শায়খুল হাদীস আল্লামা মোঃ হবিবুর রহমান ১৯৪০ সালের ৩রা মার্চ সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার রারাই গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম দ্বীনদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা-মাওলানা মমতাজ আলী (র.) ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম ও পরহেজগার লোক। ফিকহ, আকাঈদ ও ফরাইজ শাস্ত্রে তিনি ছিলেন পারদর্শী। এতদঞ্চলের ফরাইজ সংক্রান্ত যাবতীয় সমস্যার তিনিই সমাধান প্রদান করতেন। এছাড়া তিনি সদালাপী, মিষ্টভাষী এবং এলাকার গরীব দুঃখীদের আশ্রয়স্থল বিশেষ করে মেহমান নোয়াজ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মাতা আমিনা খাতুন একজন ধার্মিক, পদানশীল, বিদুষী ও গুণবতী মহিলা হিসাবে এলাকায় ছিলেন খ্যাত। সাত ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়।

 

শিক্ষাজীবন: শায়খুল হাদীস আল্লামা মো: হবিবুর রহমান ছোট বেলায় পিতা মাওলানা মমতাজ আলী (র.) এর নিকট বুনিয়াদী শিক্ষা শুরু করেন। এলাকার প্রাইমারী স্কুলে কিছুদিন লেখাপড়া করেন। বাল্য বয়সেই বড়ভাই মাওলানা নজিবুর রহমানের সাথে লেখাপড়ার উদ্দেশ্যে বদরপুর (ভারত) চলে যান। বদরপুর সিনিয়র মাদরাসা হতে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপন করেন। তারপর সড়কের বাজার আহমদিয়া সিনিয়র মাদরাসায় ভর্তি হন এবং কৃতিত্বের সাথে মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপন করেন। এ সময় মেধাবী, সৎচরিত্রবান ও শিক্ষকদের প্রতি বিনীয় হিসেবে ছাত্র-শিক্ষক সবার একান্ত স্নেহভাজনে পরিণত হন। বিশেষ করে বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে বিশুদ্ধ কুরআন তেলাওয়াতের জন্য তাঁকেই আহবান করা হতো। অষ্টম শ্রেণীর জেলা ভিত্তিক বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। অতঃপর গাছবাড়ী জামেউল উলুম কামিল মাদরাসায় ভর্তি হয়ে ১৯৫৫ সালে পূর্ব পাকিস্তান মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত আলিম পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধা তালিকায় দ্বাদশ স্থান লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেন। উল্লেখ্য ইতোপূর্বে কেউ গাছবাড়ী জামেউল উলুম কামিল মাদরাসা থেকে আলিম পরীক্ষায় মেধাবৃত্তি লাভ করেননি। একই মাদরাসা হতে ১৯৫৭ সালে ফাযিল পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধা তলিকায় তৃতীয় স্থান এবং ১৯৫৯ সালে কামিল (হাদীস) পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে মেধা তালিকায় দ্বাদশ স্থান লাভ করেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পর দেশ-বিদেশের বিজ্ঞ মুহাক্কিক মুহাদ্দিসগণের নিকট থেকে ইলমে হাদীস অধ্যয়ন করে হাদীস শরীফের সনদ লাভ করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- শামসুল উলামা আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ছাহেব কিবলাহ ফুলতলী (র.) সিলেট সরকারী আলিয়া মাদরাসা সাবেক অধ্যক্ষ বাহরুল উলুম আল্লামা মুহাম্মদ হোসেন সিলেটী, ঢাকা আলিয়া মাদরাসার হেড মাওলানা শায়খুল হাদীস আল্লামা সৈয়দ আমিমুল ইহসান (র.), সিলেট সরকারী আলিয়া মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা শায়খ আব্দুল ওয়াহিদ সিলেটী (র.), মক্কা মুকাররামার হরম শরীফের সাবেক খতিব বহু গ্রন্থ প্রণেতা মধ্যপ্রাচ্য আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের ইমাম ড. শায়খ সৈয়দ মুহাম্মদ আলাভী মালিকী মক্কী (র.), পাকিস্থানের ড. তাহির আল কাদরী, সিরিয়ার বিশিষ্ট বুযুর্গ শায়খ আসআদ সাগিরজী বিন মুহাম্মদ সাঈদ হানাফী দামেশকী প্রমুখ। সড়কের বাজার আহমদিয়া সিনিয়র মাদরাসায় অধ্যয়নকালে তিনি সেখানকার কারী তজম্মুল আলী সাহেবের নিকট বিশুদ্ধ কুরআন শিক্ষা করেন। পরবর্তীতে মক্কা শরীফের বিশ্ব বরেণ্য কারী শায়খুল কুররা আহমদ হেজাজী মক্কী (র.)-এর সুযোগ্য উত্তরসূরী রইসুল কুররা ওয়াল মুফাসসিরীন শামছুল উলামা আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ছাহেব কিবলাহ ফুলতলী (র.)-এর নিকট অধ্যয়ন করে ইলমে কিরাতের চূড়ান্ত সনদ লাভ করেন।

 

আধ্যাত্মিক জীবন: তাযকিয়া ও ইহসানের পথেও তিনি একজন সাধক পুরুষ। ইমামে আহলে সুন্নাত, মুজাদ্দিদে যামান শামসুল উলামা আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ছাহেব কিবলাহ ফুলতলী (র.) এর হাতে বায়আত হয়ে তরীকতের খেলাফত লাভ করেন। ইলমে হাদীসের পাশাপাশি তিনি তরিকতের ও খিদমত আনজাম দিয়েছেন৷ দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাতে রাসূলুল্লাহর পূর্ণ অনুসরণের পাশাপাশি এপথে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য তিনি আজীবন প্রচেষ্টা চালিয়েছেন।

 

পারিবারিক জীবন: ব্যক্তিগত জীবনে আল্লামা মো: হবিবুর রহমান ১৯৬০ সালে বিয়ানীবাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আলহাজ্ব শফিকুল হক সাহেবের কন্যা আনোয়ারা খাতুনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। আনোয়ারা খাতুন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন না করলেও গৃহ শিক্ষকের মাধ্যমে কুরআন ও হাদিসের জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি আট সন্তানের জনক। তারা হলেন- মাওলানা আব্দুল আউয়াল হেলাল, ইংল্যান্ডের মাদরাসায়ে দারুল হাদীস লতিফিয়ায় অধ্যাপনা করছেন। মাওলানা আব্দুর রব বিলাল, তিনি বর্তমানে ইংল্যান্ডের এক মাদরাসায় অধ্যাপনা করছেন, মাওলানা আব্দুল বাতিন ফয়ছল, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করে বর্তমানে সিলেট শহরে ব্যবসা করছেন। মাওলানা আব্দুল বাকী খালেদ। ছোট ছেলে আব্দুল লতিফ শাহেদ বাল্যকালে ইন্তেকাল করেন। তিন মেয়ে যথাক্রমে রোকেয়া খাতুন, ছালমা খাতুন, ও শায়মা খাতুন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সংসার জীবন অতিবাহিত করছেন।

 

রাজনৈতিক জীবন: অধ্যাপনা সমাজসেবা ও হাদীসে নববীর খেদমতের পাশাপাশি রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান লক্ষণীয়। ছাত্র জীবনে তিনি নেজামে ইসলামী পার্টির ছাত্র সংগঠন জমিয়তে তালাবায়ে আরাবিয়া’র সাথে সম্পৃক্ত হন এবং বিভিন্ন সময় এ সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৭ সালে আতাউর রহমান খাঁন শিক্ষা কমিশন রিপোর্টে ধর্মীয় শিক্ষাকে অবজ্ঞা এবং মাদরাসা শিক্ষাখাতে অর্থ বরাদ্ধ বন্ধের সুপারিশ করা হলো তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। ছাত্র জনতার আন্দোলনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

 

১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে নেজামে ইসলাম পার্টির মনোনয়নে তিনি তখনকার সিলেট-৭ আসনে (জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, কানাইঘাট) এম.এন.এ পদে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করে সম্মানজনক ভোট পান। ১৯৯৬ সালে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ সমর্থিত বাংলাদেশ আনজুমানে আল ইসলাহ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে সিলেট-৫ আসনে (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট) প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেন। দেশ, জাতি ও ইসলামের স্বার্থে সবকটি জাতীয় ও স্থানীয় আন্দোলনে তাঁর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বিশেষত: নাস্তিক, মুরতাদ বিরোধী আন্দোলনে তথা তাসলিমা নাসরিন, দাউদ হায়দার, সর্দার আলা উদ্দিন, আহমদ শরীফ, এনাম সহ আল্লাহদ্রোহীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি ১৯৯২ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সুন্নিয়তের পতাকাবাহী সংগঠন বাংলাদেশ আনজুমানে আল ইসলাহ এর কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তাছাড়া তিনি আমৃত্যু বাংলাদেশ আঞ্জুমানে আল-ইসলাহ এর স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।

 

রচনাবলী: শিক্ষকতা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও সামাজিক কর্মকান্ডে ব্যস্ততা থাকা সত্তে¡ও তিনি ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সতেরটি গ্রন্থ রচনা করেন। তাছাড়া তাঁর লিখিত প্রবন্ধ সমূহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৯১ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ১৯৯৩ সালের জানুয়ারী পর্যন্ত তাঁর সম্পাদনায় সিলেট শহর থেকে নিয়মিত ‘মাসিক শাহজালাল’ নামক সাহিত্য ও গবেষণা পত্রিকা প্রকাশিত হয়। তাঁর রচিত অপ্রকাশিত গ্রন্থ সমূহ হচ্ছে- (১) আল কাউলুল মাকবুল ফী মীলাদির রাসূল (উর্দ্দু ভাষায় রচিত তা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭৭ সালে। ১৯৯৮ সালে এ কিতাব খানার বঙ্গানুবাদ প্রকাশিত হয়। (২) দোয়ায়ে মাসনুনা ও তেত্রিশ আয়াতের ফযীলত। ১৯৯৬ সালে বাংলা ভাষায় এই বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়। ২০১২ সালে আগস্ট মাসে লন্ডন থেকে এ বইয়ের ইংরেজী অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। অনুবাদ করেন: মাওলানা ইউসুফ আহমদ। (৩) মাসআলায়ে উশর: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ। প্রথম প্রকাশকাল: জুন ২০০৬ সাল (৪) দুরূদ শরীফের ফযীলত ও ওযীফা (প্রথম প্রকাশকাল: ১৯৯৯ সাল, (৫) যিয়ারতে মদীনা মুনাওয়ারা (ফযীলত ও নিয়ম)। প্রথম প্রকাশকাল: মে ১৯৯৯ সাল (৬) আসহাবে বদর। প্রথম প্রকাশকাল: মে ১৯৯৮ সাল। (৭) ওযীফা। এ ওযীফাখানি প্রথম প্রকাশিত হয় ১মে ১৯৯৮। (৮) হাদিয়াতুল লাবীব ফী নাবযাতিন মিন সীরাতিন নাবিয়্যিল হাবীব। আরবী ভাষায় রচিত এ কিতাব খানা ২০১২ সালের জুলাই মাসে প্রথম প্রকাশিত হয়। ২০১২ সালের আগস্ট মাসে ‘সীরাতে হাবীবে খোদা’’ নামে এ কিতাব খানার বাংলা তরজমা প্রকাশিত হয়েছে। অনুবাদক মাওলানা আব্দুল আউয়াল হেলাল। (৯) যাখীরাতুল আহাদিসিল আরবাঈন ফি ফাদিয়িলি সায়্যিদিল মুরসালীন। এ কিতাবখানা জানুয়ারি ২০১১ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। (১০) কানযুল আরবাঈন ফী মানাকিবি আহলি বাইতিন নাবিয়্যিল আমীন। এ গ্রন্থটি জানুয়ারী ২০১১ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। (১১) তুহফাতুল লাবীব ফি আসানীদিল হাবিব। আরবী ভাষায় এ গ্রন্থটি ১৯৮৫ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। (১২) আত-তুহফাতুল লাতীফাহ ফি আহাদিসিল মুসালসালাতিন মুনীফাহ। আরবী ভাষায় রচিত এ কিতাব খানা অক্টোবর ২০০৯ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। (১৩) হজ্জ ও যিয়ারত (সংক্ষিপ্ত আহকাম ও নিয়ম)। বাংলা ভাষায় রচিত এ কিতাবখানা ২০০৩ সালে দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। (১৪) দালাইলুল খাইরাত। ইমাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ বিন আবু বকর আল জাযুলী আল হুসাইনী (র.) কর্তৃক আরবী ভাষায় প্রণীত দুরূদ শরীফের এ ওযীফা খানাকে তিনি স্বীয় মুরশিদ হযরত আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ছাহেব কিবলাহ ফুলতলী (র.) নির্দেশিত পদ্ধতিতে বিন্যন্ত করেছেন। ২০১০ সালের এপ্রিল মাসে এ কিতাবখানা প্রকাশিত হয়। (১৫) আল হিযবুল আযম। ইমাম মোল্লা আলী কারী (র.) প্রণীত এ কিতাব তাহকীক করেছেন তিনি। ২০১৬ সালে কিতাবখানা প্রকাশিত হয়। (১৬) দারসে হাদীস। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত হয়েছে দারসে হাদীস সিরিজের প্রথম গ্রন্থ। (১৭) সালাতুত তারাবীহ। ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে এ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়।

আরবী ও ইসলামী শিক্ষা স¤প্রসারণে অবদান
শায়খুল হাদীস আল্লামা মো: হবিবুর রহমান বৃহত্তর সিলেট তথা বাংলাদেশ ও বহি:র্বিশ্বে আরবী ও ইসলামী শিক্ষা স¤প্রসারণে তিন ধারায় অবদান রাখে চলেছেন। প্রথমত: অর্ধশতাব্দীরও অধিককাল ধরে ইলমে হাদীস ও কুরআনুল কারিমের খিদমত আঞ্জাম দেয়ার মাধ্যমে। দ্বিতীয়ত: মাদরাসা, মসজিদ ও এতিমখানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। তৃতীয়ত: দাওয়াতী কাজের মাধ্যমে। প্রথমত: তিনি অর্ধশতাব্দীরও অধিকাকাল ব্যাপি মহাগ্রন্থ আল কুরআনুল কারিম ও ইলমে হাদীসের খিদমতে নিয়োজিত থেকে ইসলামী শিক্ষা বিস্তারে অসামান্য অবদান রেখে যাচ্ছেন। তিনি ১৯৫৯ সালের ৩ আগস্ট ইছামতি দারুল উলুম কামিল মাদরাসায় (প্রতিষ্ঠা সন-১৯৪৭) সহকারী মাওলানা পদে যোগদান করে ১৯৬৩ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সুনামের সাথে অধ্যাপনা করেন। ১৯৬৩ সালের ১০ এপ্রিল সিলেটের প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ফুলবাড়ি আজিরিয়া ফাযিল মাদরাসায় সহকারী মাওলানা পদে যোগদান এবং ২২ নভেম্বর ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত দক্ষতার সাথে অধ্যাপনা চালিয়ে যান। স্বীয় মুরশিদ আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ছাহেব কিবলাহ ফুলতলী (র.)-এর নির্দেশে ১৯৬৩ সালের ২৩ নভেম্বর সৎপুর দারুল হাদীস কামিল মাদরাসায় (প্রতিষ্ঠা সন-১৯৪৮) প্রধান মুহাদ্দিস হিসাবে যোগদান করেন। ১৯৭৪ সালের ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ইলমে হাদীসের খিদমাত আনজাম দেন। ১৯৭৪ সালের ১৫ জানুয়ারি ইছামতি দারুল উলুম কামিল মাদরাসায় অধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন। ১৯৭৬ সালে সৎপুর দারুল হাদীস কামিল মাদরাসা পরিচালনায় সমস্যা দেখা দেয়। সমস্যা নিরসন কল্পে স্থানীয় প্রশাসন ও এলাকাবাসীর অনুরোধে সে বছর ১১ সেপ্টেম্বর তিনি উক্ত মাদরাসায় অধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অল্প দিনের মধ্যে মাদরাসা স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে এলে ১৯৭৭ সালের ২ এপ্রিল সেখান থেকে চলে আসেন। ১৯৮২ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর আবারও তিনি ইছামতি দারুল উলুম কামিল মাদরাসা অধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন। অত্যন্ত সুনাম ও দক্ষতার সাথে অধ্যক্ষ ও শায়খুল হাদীসের দায়িত্ব পালন শেষে ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর নিয়মতান্ত্রিকভাবে অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৭৭ সালে তিনি সংযুক্ত আবর আমিরাতে গমন করেন। প্রথমে উম্মুল কুওয়াইন শহরে একটি মসজিদে ইমাম ও খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অল্পদিনের মধ্যে প্রতিযোগিতামূল পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি সে দেশের বিচার বিভাগে যোগদান করেন। ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে আসা পর্যন্ত তিনি উম্মুল কুওয়াইন কোর্টে বিচারক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি পূর্বোল্লিখিত মসজিদে খতিবের দায়িত্ব পালন করেন। উল্লেখ্য যে, আরব আমিরাতের কর্মজীবনে সরকারী ছুটির দিন তিনি মরুচারী বেদুইনদের অবৈতনিক শিক্ষা দান করতেন।

 

 

বিশেষ করে বয়স্ক বেদুইনদের কুরআন শরীফ সহিহ-শুদ্ধ তেলাওয়াত শিখাতেন। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও অধ্যবসায়ের ফলে তিলে তিলে ইছামতি মাদরাসা পূর্ব সিলেটের শ্রেষ্ঠতম ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। তাঁর একান্ত প্রচেষ্টায় মাদরাসার অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধিত হয়। মাদরাসার বিল্ডিং এবং সুবিশাল মসজিদ তার নীরব সাধনার স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমানে তিনি ইছামতি দারুল উলুম কামিল মাদরাসার প্রধান পৃষ্ঠপোষক এবং গভর্নিং বডির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। চাকুরী থেকে অবসর গ্রহনের পরও বর্তমান পর্যন্ত সপ্তাহে তিনদিন ইছামতি দারুল উলুম কামিল মাদরাসায় নিয়মিত বুখারী শরীফের দারস দিয়ে থাকেন। তাছাড়া তিনি দারুল কিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্টের অধিনে প্রধান কেন্দ্র ফুলতলী, হযরত শাহজালাল দারুস সুন্নাহ ইয়াকুবিয়া কামিল মাদরাসা কেন্দ্র, সোবহানীঘাট, সিলেট, ইছামতি দারুল হাদীস কামিল মাদরাসা কেন্দ্রে বিভিন্ন বছর পবিত্র রামাদ্বান মাসে বিশুদ্ধ কুরআন পাঠের খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন। বর্তমানে তিনি দারুল কিরাত জোবেদ আলী মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র বাবুর বাজার, ইছামতি দারুল হাদীস কামিল মাদরাসা কেন্দ্র ও মানিকপুর কেন্দ্রের নাজিম হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করছেন। দক্ষিণ সুরমা উপজেলার রাখালগঞ্জ বাজার জামে মসজিদে তিনি দীর্ঘদিন থেকে নিয়মিতভাবে দারসে হাদীস পেশ করছেন। নিজ বাড়িতে অনেক দিন যাবত নিয়মিতভাবে দারসে হাদীস পেশ করছেন, সেখানে সিলেটের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উস্তাদগণ দারস গ্রহণ করেন। তাঁর প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণায় গড়ে উঠেছে ‘মাওলানা ফখরুল ইসলাম শিক্ষা ট্রাস্ট’ ও প্রত্যক্ষ ‘আব্দুস সাত্তার শিক্ষা ট্রাস্ট’ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান বৃত্তি প্রদানের পাশাপাশি বইপত্র প্রদান করে ছাত্র-ছাত্রীদের সহায়তা করছে। তাছাড়া তিনি দীর্ঘদিন বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের ‘বোর্ড কমিটি’র সদস্য এবং সরকার অনুমোদিত মাদরাসা সমূহের সিলেট বিভাগ ভিত্তিক সংগঠন বাংলাদেশ আনজুমানে মাদারিছে আরাবিয়ার চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
দ্বিতীয়ত: তিনি বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় অনেক মাদরাসা মসজিদ ও এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করে ইসলামী শিক্ষা বিস্তারে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। তন্মধ্যে লালারগাঁও হাবিবিয়া হাফিজিয়া মাদরাসা, ভূরকী হাবিবিয়া হাফিজিয়া দাখিল মাদরাসা, রায়সন্তুষ হাফিজিয়া মাদরাসা, কেশবপুর হাফিজিয়া মাদরাসা, নজিপুর দারুল কুরআন হাবিবিয়া মাদরাসা, ইছামতি মাদরাসা মসজিদ, থানা বাজার জামে মসজিদ, আল-হাবীব জামে মসজিদ (রারাই)। তাছাড়া ২০০০ সালে থানাবাজার লতিফিয়া ফুরকানিয়া মাদরাসা সংলগ্ন স্থানে তিনি জমি ক্রয় করে থানাবাজার হাবিবিয়া হিফজুল কুরআন মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১১ সালে তিনি হাবিবিয়া হিফজুল কুরআন মাদরাসার সাথে একটি এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেন।

 

উল্লেখ্য যে, শাইখুল হাদীস আল্লামা মো: হবিবুর রহমান এর ব্যক্তিগত সংগ্রহে তিন হাজারের অধিক মুল্যবান কিতাবাদি রয়েছে। স্বীয় প্রতিষ্ঠিত আল-হাবিব জামে মসজিদের পাশে বর্তমানে একটি তিন তলা বিল্ডিং নির্মাণ কাজ চলছে। যেখানে তাঁর সংগৃহীত কিতাবাদি নিয়ে ‘আল-হাবীব গবেষণা গ্রন্থাগার’ অচিরেই যাত্রা শুরু করবে ইনশাআল্লাহ।তাছাড়া আল হাবিব জামে মসজিদে প্রতি মঙ্গলবার নিয়মিত হাদিস শরিফের দারস প্রদান করতেন।

 

তৃতীয়ত: এ মহান মনীষী অর্ধশতাব্দীরও অধিককালব্যাপী সাধারণ মানুষের কাছে কুরআন হাদীসের শিক্ষা পৌছে দেয়ার লক্ষ্যে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন মাহফিলে বয়ান পেশ করে দাওয়াতী কাজের মাধ্যমে ইসলামী শিক্ষা বিস্তারে অসামান্য অবদান রেখে আসছেন। বিয়ানীবাজার, বড়লেখা, ফেঞ্চুগঞ্জ, রাখালগঞ্জ, জগন্নাথপুর, সিলেট সদর সহ বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত তাফসীর ও দারসে হাদীসের মাহফিল করেন। তাছাড়া সিলেট বিভাগের প্রায় প্রতিটি মাদরাসার বার্ষিক জলছায় তিনি সভাপতি অথবা প্রধান অতিথি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বয়ান পেশ করে থাকেন। মহান আল্লাহপাক তাঁকে যেমন মেধা ও জ্ঞান দান করেছেন, তেমনি সেই জ্ঞান বিতরণের জন্য চিত্তকর্ষণ বয়ানের যোগ্যতাও দিয়েছেন। তাঁর বয়ান ও ওয়াজ শুনার জন্য দুর-দুরান্ত থেকে মানুষ চলে আসে। বানোয়াট কিচ্ছা-কাহিনী নয়; সরাসরি কুরআন ও হাদীসের আলোকে ওয়াজ করেন। সমাজের ত্রæটিবিচ্যুতিগুলো এটা দরদমাখাভাষা ও যুক্তিসহ উপস্থাপন করেন যে, মানুষ সহজেই অভিভূত হয়ে যায়। উনার ওয়াজকে সাধারণ মানুষের জন্য দারসুল কুরআন ও দারসুল হাদীস হিসাবে গন্য করা হয়। উনার আলোচনা অত্যন্ত সাজানো গুছানো ও পরিপাটি। কঠিন থেকে কঠিন বিষয়কে সহজ ও সাবলীল ভাষায় বিভিন্ন উদাহরণের মাধ্যমে সহজ করে বুঝানোর ক্ষেত্রে তাঁর তুলনা তিনি নিজেই। উনার আলোচনার আরেকটি দিক হলো- সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার ও বিদআতের বিরুদ্ধে মজবুত দলিল ও যুক্তির উপস্থাপন এবং আম্বিয়ায়ে কেরাম ও সাহাবায়ে কেরামের জীবন থেকে শিক্ষনীয় ঘটনা তুলে ধরা। ইসলামী শিক্ষা স¤প্রসারণে ও একামতে দ্বীনের দায়িত্ব পালনার্থে আল্লামা হবিবুর রহমান যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সিরিয়া, মরক্কো, ভারত, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে বিভিন্ন সময় সফর করেন। ১৯৮১ সালে তিনি স্বীয় পীর ও মুর্শিদ হযরত আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ছাহেব কিবলাহ ফুলতলী (র.) এর সাথে প্রথমবার যুক্তরাজ্য সফর করেন। এ সফরে তিনি গ্রেট বৃটেনের উল্লেখযোগ্য প্রতিটি শহরে বিভিন্ন মহফিলের মাধ্যমে মানুষের মাঝে ইসলামী শিক্ষার আলো বিতরনের মহান দায়িত্ব পালন করছেন।

 

ব্রিটেনে অবস্থানর তাঁর ছাত্রগণের অনুরোধে ২০০৯ সালে তিনি একাধারে প্রায় নয়মাস সে দেশে অবস্থান করেন। সে সময় প্রতি শনিবার লন্ডনস্থ দারুল হাদীস লতিফিয়া শামায়েলে তিরমিযী নামক বিখ্যাত হাদিসের কিতাব সম্পূর্ণ দারস পেশ করেন। নিয়মিত সে দরসে ব্রিটেনের বিভিন্ন শহর থেকে প্রচুর সংখ্যক উলামা এবং সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ করতেন। দারস পূর্ণ হলে দুই শতাধিক আলিমকে শামায়েলে তিরমিযীর সনদ প্রদান করা হয়। বর্তমানেও ব্রিটেন সফরকালে বিভিন্ন শহরে (লন্ডন, লুটন, বার্মিংহাম, মানচেস্টার, ওল্ডহাম) রিয়াজুস সালেহীন এবং আদাবুল মুফরাদ নামক হাদিসের কিতাবদ্বয়ের দারস প্রদান করেন। ১৯৯৫ সালে তিনি দাওয়াতী সফরে যুক্তরাষ্ট্র গমন করেন। তাছাড়া ২০০৮ সালের অক্টোবর মাসে তিনি সিরিয়া সফর করেন। সে সময় দামেস্কের বিখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদগণের সাথে ব্যাপকভাবে সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- দামেষ্কের প্রখ্যাত হানাফী আলিম, আল ফিকহুল হানাফী ওয়া আদিল্লাতুহু সহ বহু মূল্যবান কিতাব প্রণেতা শায়খ ড. আসআদ মুহাম্মদ সাঈদ সাগিরজি, শায়খ ড. আজ্জাজ আল খতিব, শায়খ হিশাম বুরহানী, শায়খ আব্দুর রহমান হাম্মানী প্রমুখ। ২০১০ সালের এপ্রিল মাসে তিনি মরক্কো সফর করেন। ভারতের আসাম প্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তিনি বিভিন্ন সময়ে ব্যাপক দাওয়াতী সফর করেন। সেসব সফরে মাহফিলে যোগদান ছাড়াও উলামায়ে কেরামের চাহিদার প্রেক্ষিতে বিভিন্ন স্থানে হাদীস শরীফের দারস প্রদান করেন। ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে তিনি মিশরে দাওয়াতী সফর করেন। সেই সফরে কায়রো শহরে সাহাবি উকবা ইবন আমির (রা.) এর মাজার প্রাঙ্গণে, ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (র.)-এর মাজার প্রাঙ্গণ এবং ইতিহাস খ্যাত আল-আজহার মসজিদে হাদীস শরিফের দারস প্রদান করেন। উল্লেখ্য যে, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে তাঁর প্রেরণা ও নির্দেশনায় বিভিন্ন মসজিদ ও ইসলামী সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

 

ইন্তেকাল ও জানাযা: মহান এ হাদিস বিশারদ ৭ ফেব্রæয়ারি ২০২২ ইংরেজি রোজ সোমবার সন্ধ্যা ৬টায় মাওলায়ে হাকীকীর সাক্ষাতে চলে যান। ৮ ফেব্রæয়ারি ২০২২ ইংরেজি রোজ মঙ্গলবার বিকাল ৩টায় রারাই গ্রামের উত্তরের মাঠে জানাযা অনুষ্ঠিত হবে। আল্লাহ তায়ালা তাঁর জীবনের খিদমাতসমূহ কবুল করে তাঁকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।

 

তথ্য সূত্র: ১। মুহাম্মদ আব্দুন নূর সম্পাদিত, আহবাব স্মারক, মুহাম্মদ আব্দুন নূর, শায়খুল হাদীস আল্লামা হবিবুর রহমান ছাহেব: সংক্ষিপ্ত জীবনালেখ্য, (সিলেট : ৩১ জানুয়ারি ২০০৮ খ্রি.), পৃ. ৯৭।
২। মাও: শায়খ তাজুল ইসলাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫১।
৩। মুহাম্মদ আব্দুন নূর সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, পৃ. -৯৭
৪। দেওয়ান নুরুল আনোয়ার হোসেন চৌধুরী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৯০।
৫। মাও: শায়খ তাজুল ইসলাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫১।
৬। মুহাম্মদ আব্দুন নূর সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, পৃ. -৯৭।
৭। মো: আব্দুল আউয়াল হেলাল ও অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল হেকিম সম্পাদিত, প্রাগুক্ত,পৃ. ৭০।
৮। মুহাম্মদ আব্দুন নূর সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, পৃ. ৯৮।
৯। মো: আব্দুল আউয়াল হেলাল ও অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল হেকিম সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭০।
১০। মাও: শায়খ তাজুল ইসলাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫১।
১১। মাও: শায়খ তাজুল ইসলাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫১।
১২। মুহাম্মদ আব্দুন নূর সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, পৃ. ৯৯।
১৩। মাও: শায়খ তাজুল ইসলাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৩।
১৪। মুহাম্মদ আব্দুন নূর সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০০।
১৫। প্রাগুক্ত, পৃ. ১০১।
১৬। মাও: শায়খ তাজুল ইসলাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫২।
১৭। মুহাম্মদ আব্দুন নূর সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০১।
১৮। মাও: শায়খ তাজুল ইসলাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৩।
১৯। মুহাম্মদ আব্দুন নূর সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০২।
২০। মাও: শায়খ তাজুল ইসলাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৩।
২১। প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৩।
২২। মুহাম্মদ আব্দুন নূর সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, পৃ.১০২।
২৩। মো: আব্দুল আউয়াল হেলাল ও অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল হেকিম সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭০-৭১।
২৪। প্রাগুক্ত, পৃ. ৭০।
২৫। মো: আব্দুল আউয়াল হেলাল, শাইখুল হাদীস হবিবুর রহমান: সিলেটের কিংবদন্তি আলেম, যঃঃঢ়ং://ভধষবয২৪.পড়স (২০ আগস্ট ২০১৯ খ্রি.)।
২৬। মুহাম্মদ আব্দুন নূর সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, পৃ.১০০।
২৭। মাও: শায়খ তাজুল ইসলাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৩।
২৯। মো: আব্দুল আউয়াল হেলাল ও অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল হেকিম সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭১।
৩০। মুহাম্মদ আব্দুন নূর সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, পৃ. -১০১।
৩০। মো: আব্দুল আউয়াল হেলাল, শাইখুল হাদীস হবিবুর রহমান: সিলেটের কিংবদন্তি আলেম, যঃঃঢ়ং://ভধষবয২৪.পড়স (২০ আগস্ট ২০১৯ খ্রি.)।
৩১। মুহাম্মদ আব্দুন নূর সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০১
৩২। মো: আব্দুল আউয়াল হেলাল, শাইখুল হাদীস হবিবুর রহমান সিলেটের কিংবদন্তী আলেম, যঃঃঢ়ং://ভধষবয২৪.পড়স; ২০ অঁমঁংঃ ২০১৯ অউ.
৩৩। মো: আব্দুল আউয়াল হেলাল ও অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল হেকিম সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭১।
৩৪। মো: আব্দুল আউয়াল হেলাল, প্রাগুক্ত।

লেখক: কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক: বাংলাদেশ আনজুমানে আল ইসলাহ।

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ