২রা জুলাই, জামেয়ার ইতিহাসে এক কালরাত, সে রাতে যা ঘটেছিল : শাহ মমশাদ আহমদ
- Update Time : ০৫:৪৮:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ জুলাই ২০২১
- / ০ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
১৯৯৪সালের কথা নাস্তিক লেখিকা তাসলিমা নাসরিন ধারাবাহিকভাবে ইসলামদ্রোহী কয়েকটি বই লিখলো, কুরআন, হাদীস ও প্রিয় নবী (সঃ) কে কটাক্ষ করে তার লিখিত লেখা তৎকালীন কয়েকটি পত্রিকায়ও ছাপা হল, কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি,কোথাও প্রতিবাদ নেই, সারা দেশ নীরব, এমনি মুহুর্তে মুজাহিদে মিল্লাত প্রিন্সিপাল আল্লামা হাবীবুর রহমান (রহঃ)সিলেট থেকেই গর্জে উঠলেন।
সাহাবা সৈনিক পরিষদের উদ্যোগে তিন দফা দাবীতে সিলেট থেকে আন্দোলনের সুচনা হলো।
প্রিন্সিপাল (রহঃ) ছিলেন পরিষদের আহ্বায়ক, আমাকে সদস্য সচিব মনোনীত করা হল। তিন দফা দাবীর মধ্যে ছিল,
১-অবিলম্বে তাসলিমা নাসরিন কে গ্রেফতার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। ২-তার লিখিত সকল বই বাজেয়াপ্ত, প্রকাশনা নিষিদ্ধ করা। ৩-ধর্মদ্রোহীতার শাস্তি মৃত্যুদন্ডের বিধান প্রনয়ণ।
জনবিক্ষোভে সিলেট উত্তাল হয়ে উঠলো, পর্যায়ক্রমে সিলেটে চারদিন স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালিত হলো, সারা বিশ্বে নাস্তিক বিরুধী আন্দোলনের খবর ছড়িয়ে পড়ল, বিবিসি প্রিন্সিপাল (রহঃ) এর সাক্ষাৎকার সম্প্রচার করল, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন প্রিন্সিপাল (রহঃ)এর নাম উল্লেখকরে তার নেতৃত্বে বিক্ষোভে ক্ষুদ্ধ হয়ে তাসলিমার নিরাপত্তা দাবী জানালো।
প্রিন্সিপাল (রহঃ)সারা দেশে আন্দোলন ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে ঢাকায় অবস্থান করে দেশের শীর্ষ উলামায়ে কেরামের শরনাপন্ন হলেন, যথাযথ মুল্যায়ন পেলেন না, অনেকেই আন্দোলন সফলে সন্দিহান ছিলেন কিন্তু মর্দে মুজাহিদ প্রিন্সিপাল (রহঃ) দমবার ব্যক্তি নন, তার দৃঢ়তা দেখে শায়খুল হাদীস আল্লামা আজীজুল হক (রহঃ) আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহন করলেন,বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, কিংবদন্তি লেখক মাওলানা মুহিউদ্দিন খান (রহঃ) ও সহযোগিতা করলেন। ৫ই জুন, বায়তুল মুকাররাম মসজিদের উত্তর গেইটে ঢাকায় সর্বপ্রথম তাসলিমার ফাসির দাবীতে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়, প্রিন্সিপাল (রহঃ) সভাপতিত্ব করেন, শায়খুল হাদীস আল্লামা আজীজুল হক (রহঃ) ছিলেন প্রধান অতিথি, আমরা সিলেট থেকে কয়েকটি গাড়ী নিয়ে সমাবেশে অংশ গ্রহণ করি, ছাত্র নেতা আলহাজ্ব আতাউর ভাই ও বক্তব্য রাখেন, সাহাবা সৈনিক পরিষদের সদস্য সচিব হিসেবে আমিও কিছু কথা বলার সুযোগ পাই। এর পরই সারা দেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ৩০শে জুন দেশব্যাপী সকাল সন্ধ্যা হরতাল আহ্বান করা হল,স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালিত হল,কিশোর গঞ্জে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে ছাত্র মজলিস কর্মী কিশোর আরমান শাহাদাত বরন করলেন,পরদিন ছিল শুক্রবার, শহীদ আরমান হত্যার প্রতিবাদে দেশব্যাপী বিক্ষোভের আহ্বান করা হয়েছে, আন্দোলনের সিপা্হসালার প্রিন্সিপাল (রহঃ) কোর্টপয়েন্টে সমাবেশ ও মিছিলের ডাক দিলেন। বাদ জুম্মা, সমাবেশস্থলে মিছিলের পর মিছিল আসতে লাগলো, জনতার বাধভাঙ্গা জোয়ার, সবার চোখে প্রিয় ভাই আরমান হারানোর ক্ষুদ্ধ দাবানল, বক্ষে শোকের ব্যথা। আমি সমাবেশ পরিচালনায় ছিলাম, সমাবেশের মধ্যমনি হযরত প্রিন্সিপাল (রহঃ) সবেমাত্র উপস্থিত হয়েছেন, মুহুর্মুহু শ্লোগান চলছে, এমনি মুহুর্তে তৎকালীন বি এন পি সরকারের প্রভাবশালী পাটমন্ত্রী কর্নেল (অবঃ) হান্নান শাহ’র গাড়ীবহর সমাবেশস্থল ভেদ করে যেতে চাইলে বাধ সাধে বিক্ষুব্ধ জনতা, মন্ত্রীর গাড়ী ভাংচুর হয়, মন্ত্রী ও আহত হন।পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছুড়ে সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এঘটনায় ক্ষুদ্ধ হয়ে মন্ত্রী প্রিন্সিপাল (রহ) কে চরম শিক্ষা দেয়ার হুমকি দেন, সিটি পয়েন্টে জনসমাবেশ করে প্রতিশোধ নেয়ার প্রকাশ্য সংকল্প ব্যক্ত করেন। ২রা জুলাই, গভীর রাত, তিন শতাধিক পুলিশ জামেয়া মাদানিয়া কাজির বাজার ক্যাম্পাস ঘেরাও করে, ঘুমন্ত ছাত্রদের উপর নেমে আসে অমানবিক নির্যাতন, বেদম লাঠিচার্জ করে, ঘুম থেকে উঠিয়ে কোমলমতি এতিম ছাত্রদের কান ধরে উঠবস করায়, প্রিন্সিপাল রহ কে খুজতে থাকে। আল্লাহর মেহেরবানী সে রাত সন্ধ্যা পরপরই প্রিন্সিপাল (রহঃ) এর ঘনিষ্ট বন্ধু, সিলেটের সাবেক পৌর চেয়ারম্যান বাবরুল হুসেন বাবুল গোয়েন্দা নজরদারি এড়িয়ে হুজুরকে আত্মগোপনে নিয়ে যান।
ফজর অবধি পুলিশের তান্ডব চলে, তল্লাশীর নামে পুলিশ ব্যাপক ভাংচুর করে। আলহাজ্ব আতাউর রহমান, মুখলিস ভাই এর সাথে আমি সহ ৪৮জন ছাত্র- শিক্ষক কে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যায়। ৩ রা জুলাই, আলহাজ্ব আতাউর রহমান, মুখলিস ভাই, আমি সহ ১৮ জনকে রেখে বাকীদের ছেড়ে দেয়। আমাদের জেল হাজতে প্রেরন করে।
তৎকালীন জামেয়ার শিক্ষা সচিব, সাহাবা সৈনিক পরিষদের যুগ্নআহ্বায়ক, উস্তাদে মুহতারাম আল্লামা নেজাম উদ্দিন (রহঃ) আমাদের সাথে জামেয়ায় অবস্থান করলেও কৌশলে গ্রেফতার এড়াতে সক্ষম হন, উদোম শরীরে হুজুর মসজিদে কুরআন শরীফ সামনে নিয়ে তেলাওয়াত করা শুরু করেন, এভাবে পুলিশের চোখে ধুলো দিতে সক্ষম হন।
জামেয়ায় প্রিন্সিপাল (রহঃ)কে না পেয়ে পুলিশের বিশেষ একটি টিম তার সুবিদ বাজার কলাপাড়াস্থ বাসায় তল্লাশি চালায়, হুজুরের সাহেবজাদা জামেয়ার বর্তমান প্রিন্সিপাল মাওলানা সামিউর রহমান মুসা তখন মক্তব পাঞ্জমের ছাত্র,মুফতি ইউসুফ, ছাত্র মজলিসের কেন্দ্রিয় সভাপতি তারেক বিন হাবীব তখন শিশু, পুলিশের আচরনে তাদের কান্নায় আশপাশের বাসার লোকজন জাগ্রত হয়ে গেলে পুলিশ হুজুরের ছোট ভাই হাজী লুৎফুর রহমান (রহঃ)কে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে আসে, পরে অবশ্য থাকে ছেড়ে দেয়।
প্রিন্সিপাল (রহঃ) এর অনুপস্থিতিতে আল্লামা নেজাম উদ্দিন (রহঃ)এর নেতৃত্বে আমাদের মুক্তির দাবীতে আন্দোলন শুরু হয়, গ্রেফতারের ভয় উপেক্ষা করে প্রিন্সিপাল (রহঃ) ও আত্মগোপন থেকে বের হয়ে আসেন।
আমাদের মুক্তি আন্দোলনে আল্লামা গহরপুরী (রহঃ) ফুলতলীর পীর সাহেব (রঃ) একাত্মতা ঘোষণা করে কয়েকটি সমাবেশে অংশ গ্রহণ করেন, ঢাকা থেকে শায়খুল হাদীস আল্লামা আজীজুল হক (রহঃ) মুফতি ফজলুল হক আমিনী (রহঃ), মাওলানা মুহি উদ্দিন খান (রহঃ) সিলেট এসে আমাদের মুক্তির দাবীতে সমাবেশে যোগ দেন, কারাগারে আমাদের শান্তনা দেন। কোর্ট পয়েন্ট মহা অবস্থান ধর্মঘট কর্মসূচি ও পালিত হয়, অবশেষে প্রবল আন্দোলনের চাপে একমাস সাত দিন পর প্রসাশন আমাদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। লেখক: মুহাদ্দিস ও কলামিস্ট, সিলেট।



















