১১:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১৯ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আয়না : সৈয়দ শাহ নূর আহমেদ

  • Update Time : ০১:৪৪:৪৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২০
  • / ০ বার নিউজটি পড়া হয়েছে

আয়না কাচ বা অতি মসৃণ উজ্জ্বল ধাতুপ্রষ্ঠ যা থেকে আলো প্রতিফলিত হওয়ার ফলে কোন ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুর প্রতিবিম্ব সৃষ্টি হয়। যার আরেক নাম দর্পণ, বা আরশি ও বলা হয়ে থাকে।

 

আমার ঘরে কোন আয়না নেই,
অনেক দিন আগে সমসাময়িক অজুহাতে কোন একসময় আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম।

সে-ই তখন থেকে কেন যেন আয়নার প্রতি কিছুটা বিদ্বেষ তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

ব্যাপারটা এমন না যে, জগৎ লীলার সর্ব দোষে দোষী মহাপাপী বেয়াদব মূর্খ, অশিক্ষিত, অধর্ম, অযোগ্য, অভদ্র, গর্ধব, বেসুরা, বেশরম, ও অকৃতজ্ঞ একমাত্র আয়না। আর আমি সর্ব গুণে গুণী তা কিন্তু মোটেও নয়।

বরংচ সত্য বলতে একটুও দ্বিধাবোধ করি না যে, আসলে
আমি নিজেকে আয়নায় দেখার মতো কোনো যোগ্যতা বা মাহিত্য আছে বলে মনে করিনা।

কি লাভ নিজের চেহারা নিজে দেখে? হা করলে সেও হা করবে, সালাম করলে উত্তর দিবেনা সাথে সাথে ঐ সালাম বাক্য ই উচ্চারণ করবে।

কোন প্রশ্ন করলে ওই সমান প্রশ্ন ফেরত করবে,
ঘুরেফিরে উত্তরটা ও সে আমার কাছ থেকে শুনবে।

 

হঠাৎ একদিন একজন আমাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কি আমাকে চেনো? না তো, নিজের থেকে উত্তর দিলো
আমি আয়না।

চমকে উঠলাম, তার আপাদমস্তক বড় বড় লোলুপ চোখে বুলিয়ে নিলাম এবং বললাম তুমি কি কিছু বলবি?
হ্যা, আমি তোমাকে ভালোবাসি অনেক, অনেক ভালো লাগে।

বললাম তুমি কি আমাকে চেনো? ইতিপূর্বে আমাকে কোথাও দেখেছ? জি হ্যাঁ, সদা সর্বদা আমি তোমাকে দেখি,
তোমাকে শুনি, ঐ সেদিন ও মাগুরা নদীর তীরে কদম বৃক্ষের পাশে অরণ্য অটবি শিশির ভেজা বনে বসে ভাব গম্ভীর গলায় মধু মিশ্রিত সুরে স্বরচিত কবিতা পাঠ করছিলে,
তখন আমি কিন্তু তোমার ঠিক পিছনের বনবীথিকার একদম ভিতরে থেকে চুপি চুপি তোমাকে দেখছিলাম এবং শুনছিলাম।

আচ্ছা বলতো দেখি কোন কবিতা তখন আবৃত্তি করছিলাম?
কেন ঐযে, কবিতা টির নাম ছিল– অনিত্য।

 

চিরসুখীরা হয়তো ভুলে ও জানে তারা ব্যাথীতের ব্যাথায় লুকায়িত কতো বেদন? অব্যাক্ত ব্যাথায় বিরহে কাতর মোর এ মন বিরল দৃষ্টিতে বৃষ্টি ঝরা কান্নার শব্দ যেমন।

 

ঘন্ ঘন ক্ষণে বারে বারে দেখি প্রকৃতির
ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাস বহমান রত যত ক্রুধ।

কেঁপে কেঁপে উঠে আমার হৃদয় বাদ্যযন্ত্র
পাপীদের কভু কি হবে তাদের অপরাধ বোধ।

 

স্মৃতির নিশিতে ওই দূর গগনে ঝুলন্ত তাঁরা
অঘোর নয়নে দেখি মেঘের মাঝে তার প্রভা।

অন্ধ নিশিতে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে জোনাকিরা
যেমন ডুবুডুবু কিস্তিতে নাবিকের হাল ধরা।

 

ধনিকরা নিরবধি খোঁজে অনাবিল সুখ
দৈন্যরা লড়ে বাঁচার তরে দেখবে ভোরের মুখ।

গরীবের -ঘরে ঘরে হয়না রান্না দিনে একবার। দৌলতির অপেক্কায় থাকে হরেক রখম খাবার

 

অল্প-সুখে দরীদ্ররা হয়ে-পরে কাতর
ধনাট্যরা হর্ষ উল্লাসে মত্ত থাকে দিনভর
ভঙ্গুর পৃথিবীর ভদ্রলোকেরা বড় অসহায়
কভু কি পাবে সমতা সকলে এই ভবো ধরায়।

 

বাহ চমৎকার। তো এখন বলো আমি কি করতে পারি তোমার জন্য।

 

কিছুই করতে হবে না, মানে, মানে- আমি তোমাকে নিয়ে সংসার করবো, ঘুরে বেড়াবো সারা পৃথিবী, পাড়ি দেবো জীবনের সাগর, দুজনা মিলে গল্প করবো ঐ আকাশের চাঁদের সাথে, কারণ সেও বড্ড একা, দাওয়াত দেবো রমজানের শেষে শাওয়ালের প্রথম দিনে ঈদের জামাতে।

 

আমি অবাক স্তব্ধ হয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে তার কথাগুলো শুনলাম। আর ভাবতে থাকলাম এতো জীবন যাকে ঘৃণা করলাম, না শুনলাম নিজের থেকে কিছু বলতে।

যে সারাক্ষণ নির্বাক নিস্তেজ, নিষ্প্রাণ, জড় পদার্থের মতো এক পায়ে ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকতো।

আজ সে কিনা এত মন মুগ্ধ সাবলীল ভাষায় সুন্দর করে মিষ্টি ও কামনীয় আওয়াজে কথা বলে।

 

আমি এক দিকে পুলকিত, আনন্দে আত্মহারা, অন্যদিকে বিষন্ন, বিস্ময়ীত হলাম।

তার এই ভিন্ন অনন্য, অনুপম, অদ্বিতীয়, মসৃণ চেহারা দেখে, আমি আপ্লুত, এবং তার স্বকীয়তা দেখে হতভম্ব হয়ে কিছু না বলে চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঘরে ঢুকলাম।

ওমা- পিছনে চেয়ে দেখি আমার ঘরে সে ও এসে হাজির।
আমি অত্যন্ত সৌভাগ্যবান, অন্যরা আয়নায় শুধু নিজের চেহারা দেখে আর আমার আয়না নিজে থেকে আমাকে দেখে।

আমি এখন কথা বলি আয়নার সাথে। আমি হাসি, আমি খাবার খাই, আমি ঘুরে বেড়াই, আমি চিল্লাই, আমি কাঁদি, আমি বাজারে যাই, গানগাই, রাতে ঘুমাই, আমার আয়নার সাথে।। আয়না আমিও তোমাকে বড্ড ভালোবাসি।।

 

 

লেখক: যুক্তরাজ্য প্রবাসী, গ্রাম: বুধরাইল, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ।

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ

আয়না : সৈয়দ শাহ নূর আহমেদ

Update Time : ০১:৪৪:৪৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২০

আয়না কাচ বা অতি মসৃণ উজ্জ্বল ধাতুপ্রষ্ঠ যা থেকে আলো প্রতিফলিত হওয়ার ফলে কোন ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুর প্রতিবিম্ব সৃষ্টি হয়। যার আরেক নাম দর্পণ, বা আরশি ও বলা হয়ে থাকে।

 

আমার ঘরে কোন আয়না নেই,
অনেক দিন আগে সমসাময়িক অজুহাতে কোন একসময় আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম।

সে-ই তখন থেকে কেন যেন আয়নার প্রতি কিছুটা বিদ্বেষ তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

ব্যাপারটা এমন না যে, জগৎ লীলার সর্ব দোষে দোষী মহাপাপী বেয়াদব মূর্খ, অশিক্ষিত, অধর্ম, অযোগ্য, অভদ্র, গর্ধব, বেসুরা, বেশরম, ও অকৃতজ্ঞ একমাত্র আয়না। আর আমি সর্ব গুণে গুণী তা কিন্তু মোটেও নয়।

বরংচ সত্য বলতে একটুও দ্বিধাবোধ করি না যে, আসলে
আমি নিজেকে আয়নায় দেখার মতো কোনো যোগ্যতা বা মাহিত্য আছে বলে মনে করিনা।

কি লাভ নিজের চেহারা নিজে দেখে? হা করলে সেও হা করবে, সালাম করলে উত্তর দিবেনা সাথে সাথে ঐ সালাম বাক্য ই উচ্চারণ করবে।

কোন প্রশ্ন করলে ওই সমান প্রশ্ন ফেরত করবে,
ঘুরেফিরে উত্তরটা ও সে আমার কাছ থেকে শুনবে।

 

হঠাৎ একদিন একজন আমাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কি আমাকে চেনো? না তো, নিজের থেকে উত্তর দিলো
আমি আয়না।

চমকে উঠলাম, তার আপাদমস্তক বড় বড় লোলুপ চোখে বুলিয়ে নিলাম এবং বললাম তুমি কি কিছু বলবি?
হ্যা, আমি তোমাকে ভালোবাসি অনেক, অনেক ভালো লাগে।

বললাম তুমি কি আমাকে চেনো? ইতিপূর্বে আমাকে কোথাও দেখেছ? জি হ্যাঁ, সদা সর্বদা আমি তোমাকে দেখি,
তোমাকে শুনি, ঐ সেদিন ও মাগুরা নদীর তীরে কদম বৃক্ষের পাশে অরণ্য অটবি শিশির ভেজা বনে বসে ভাব গম্ভীর গলায় মধু মিশ্রিত সুরে স্বরচিত কবিতা পাঠ করছিলে,
তখন আমি কিন্তু তোমার ঠিক পিছনের বনবীথিকার একদম ভিতরে থেকে চুপি চুপি তোমাকে দেখছিলাম এবং শুনছিলাম।

আচ্ছা বলতো দেখি কোন কবিতা তখন আবৃত্তি করছিলাম?
কেন ঐযে, কবিতা টির নাম ছিল– অনিত্য।

 

চিরসুখীরা হয়তো ভুলে ও জানে তারা ব্যাথীতের ব্যাথায় লুকায়িত কতো বেদন? অব্যাক্ত ব্যাথায় বিরহে কাতর মোর এ মন বিরল দৃষ্টিতে বৃষ্টি ঝরা কান্নার শব্দ যেমন।

 

ঘন্ ঘন ক্ষণে বারে বারে দেখি প্রকৃতির
ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাস বহমান রত যত ক্রুধ।

কেঁপে কেঁপে উঠে আমার হৃদয় বাদ্যযন্ত্র
পাপীদের কভু কি হবে তাদের অপরাধ বোধ।

 

স্মৃতির নিশিতে ওই দূর গগনে ঝুলন্ত তাঁরা
অঘোর নয়নে দেখি মেঘের মাঝে তার প্রভা।

অন্ধ নিশিতে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে জোনাকিরা
যেমন ডুবুডুবু কিস্তিতে নাবিকের হাল ধরা।

 

ধনিকরা নিরবধি খোঁজে অনাবিল সুখ
দৈন্যরা লড়ে বাঁচার তরে দেখবে ভোরের মুখ।

গরীবের -ঘরে ঘরে হয়না রান্না দিনে একবার। দৌলতির অপেক্কায় থাকে হরেক রখম খাবার

 

অল্প-সুখে দরীদ্ররা হয়ে-পরে কাতর
ধনাট্যরা হর্ষ উল্লাসে মত্ত থাকে দিনভর
ভঙ্গুর পৃথিবীর ভদ্রলোকেরা বড় অসহায়
কভু কি পাবে সমতা সকলে এই ভবো ধরায়।

 

বাহ চমৎকার। তো এখন বলো আমি কি করতে পারি তোমার জন্য।

 

কিছুই করতে হবে না, মানে, মানে- আমি তোমাকে নিয়ে সংসার করবো, ঘুরে বেড়াবো সারা পৃথিবী, পাড়ি দেবো জীবনের সাগর, দুজনা মিলে গল্প করবো ঐ আকাশের চাঁদের সাথে, কারণ সেও বড্ড একা, দাওয়াত দেবো রমজানের শেষে শাওয়ালের প্রথম দিনে ঈদের জামাতে।

 

আমি অবাক স্তব্ধ হয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে তার কথাগুলো শুনলাম। আর ভাবতে থাকলাম এতো জীবন যাকে ঘৃণা করলাম, না শুনলাম নিজের থেকে কিছু বলতে।

যে সারাক্ষণ নির্বাক নিস্তেজ, নিষ্প্রাণ, জড় পদার্থের মতো এক পায়ে ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকতো।

আজ সে কিনা এত মন মুগ্ধ সাবলীল ভাষায় সুন্দর করে মিষ্টি ও কামনীয় আওয়াজে কথা বলে।

 

আমি এক দিকে পুলকিত, আনন্দে আত্মহারা, অন্যদিকে বিষন্ন, বিস্ময়ীত হলাম।

তার এই ভিন্ন অনন্য, অনুপম, অদ্বিতীয়, মসৃণ চেহারা দেখে, আমি আপ্লুত, এবং তার স্বকীয়তা দেখে হতভম্ব হয়ে কিছু না বলে চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঘরে ঢুকলাম।

ওমা- পিছনে চেয়ে দেখি আমার ঘরে সে ও এসে হাজির।
আমি অত্যন্ত সৌভাগ্যবান, অন্যরা আয়নায় শুধু নিজের চেহারা দেখে আর আমার আয়না নিজে থেকে আমাকে দেখে।

আমি এখন কথা বলি আয়নার সাথে। আমি হাসি, আমি খাবার খাই, আমি ঘুরে বেড়াই, আমি চিল্লাই, আমি কাঁদি, আমি বাজারে যাই, গানগাই, রাতে ঘুমাই, আমার আয়নার সাথে।। আয়না আমিও তোমাকে বড্ড ভালোবাসি।।

 

 

লেখক: যুক্তরাজ্য প্রবাসী, গ্রাম: বুধরাইল, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ।

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ