কুরবানী দাতা, পশুর ধরণ ও প্রাসঙ্গিকতা : আখতার হুসাইন আতিক
- Update Time : ০৫:১৯:৫৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২০
- / ০ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
কুরবানী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি আদায় করা ওয়াজিব। এর উদ্দেশ্য হলো একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি। এতে কোনো প্রকার লৌকিকতা, অহংকার ও বড়ত্ব প্রকাশ গ্রহণযোগ্য নয়। বরং নিয়তের পরিশুদ্ধি ও আল্লাহর ভয়(তাক্বওয়া) মূখ্য বিষয়।
কুরবানির ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে অনুমিত হয় যে, আল্লাহ পাক যখন ইব্রাহীম আঃ কে হুকুম করলেন পুত্র ইসমাঈল আঃ কে কুরবানী করতে, তখন ইব্রাহীম আঃ কোনো আফসোস- আক্ষেপ করেননি, পুত্রের ভালোবাসা ত্যাগ করে নিশ্চিন্তে আল্লাহর হুকুম পালনার্থে ছেলেকে কুরবানী দিতে ধারালো ছুরিসহ মীনার ময়দানে উপস্থিত হলেন। দু চোখ বেঁধে পুত্র ইসমাঈলের গলায় ছুরি চালানোর মূহুর্তে আল্লাহ তা’য়ালা সন্তুষ্ট হয়ে জিব্রাঈল আঃ এর মাধ্যমে জান্নাতি একটি দুম্বা দিয়ে ইসমাঈলের পরিবর্তে কুরবানির জন্য পাঠালেন।আল্লাহ বললেন, ইব্রাহীম পরীক্ষায় তুমি উত্তীর্ণ। তোমার একনিষ্ঠতা আর একাগ্রতায় আমি সন্তুষ্ট হয়েগেছি।তোমাকে সন্তানহারা করা উদ্দেশ্য নয়, উদ্দেশ্য হলো তাক্বওয়া।
কুরআনে স্পষ্ট ইরশাদ হয়েছে,”তোমাদের কুরবানির জন্তুর মাংস, রক্ত আল্লাহর কাছে পৌছেনা, তোমাদের তাক্বওয়াই তাঁর কাছে পৌছে”।
কারা কুরবানী করবে?
প্রাপ্ত বয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন প্রত্যেক মুসলমান নর-নারী, যে ১০ জিলহজ্ব ফজর থেকে ১২ জিলহজ্ব সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব।
কুরবানির নেসাব:
যার নিকট একান্ত প্রয়োজনের অতিরিক্ত সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার দাম পরিমাণ বা তার বেশি অর্থ – সম্পদ থাকে, তার ওপর কুরবানী করা ওয়াজিব। অবশ্য কুরবানী ওয়াজিব না হওয়া সত্ত্বেও যদি কেউ কুরবানী করেন, তাহলে অনেক ছাওয়াবের অধিকারী হবেন। (রদ্দুল মুখতার ৬:২১১/ফাতহুল কাদীর ৮:৪২৩)
এ ব্যাপারে হাদীস শরীফে রাসূল সা. বলেছেন, ‘যার কুরবানির সামর্থ্য রয়েছে কিন্তু কুরবানী করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে’। (আত্তারগীব ওয়াত্তারহীব ২/১৫৫)
কুরবানির পশুর প্রকারভেদ:
ইসলামী বিধান মতে সর্বমোট ছয় প্রকারের পশু দিয়ে কুরবানী করা যায়। উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা। এসব পশু দ্বারা কুরবানী সহীহ হওয়ার দুটি শর্ত রয়েছে-
ক. গৃহপালিত হতে হবে। জংলী হলে কুরবানী হবে না । গৃহপালিত হওয়ার ক্ষেত্রে পশুর ‘মা’ কে দেখতে হবে। মা যদি জংলী হয়, ‘বাবা’ গৃহপালিত হলেও পশুটিকে জংলী ধরতে হবে। পক্ষান্তরে মা যদি গৃহপালিত হয় ‘বাবা’ জংলী হলেও পশুটিকে গৃহপালিত ধরা হবে।
খ. কুরবানীর পশুগুলো নির্দিষ্ট বয়সের হতে হবে। উট কমপক্ষে পাঁচ বছর বয়সের হওয়া জরুরী। গরু এবং মহিষ কমপক্ষে দুই বৎসর, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে এক বছর হওয়া জরুরী। তবে ভেড়া ও দুম্বার ক্ষেত্রে এটুকু ছাড় আছে যদি ৬/৭ মাসেই এক বছর বয়সের ভেড়া বা দুম্বার মতো মোটা তাজা হয়ে যায় তাহলে তা দ্বারা কুরবানী করা বৈধ হবে; নতুবা নয়।পক্ষান্তরে উট,গরু, মহিষ এবং বকরির ক্ষেত্রে বর্ণিত বয়সের একদিন কম হলেও তা দ্বারা কুরবানী বৈধ হবে না।
উল্লেখ্য, কুরবানীর পশুর বয়স আরবী মাস ও বৎসর হিসেবে গণনা করা হবে। (শামী: ৯/৪৬৫-৬৬)
হরিণের দ্বারা কুরবানি করা:
হরিণের গোশত হালাল। তবে হরিণ জংলী হওয়ার কারণে তা দিয়ে কুরবানী জায়েয হবে না। এমনকি তা গৃহপালিত হয়ে গেলেও কুরবানী বৈধ নয়। (ফতোয়া আলমগিরী:৫/২৯৭)
পশুর দাঁত হওয়া বয়সের আলামত মাত্র:
যে পশুর যতটুকু বয়স হলে কুরবানী বৈধ হয় ততটুকু বয়সে তার দুটো দাঁত গজায়। তাই এ দাঁতগুলোকে বয়সজনিত দাঁত বলা হয়। এ দাঁতগুলো কুরবানীর উপযুক্ত হওয়ার আলামত বা চিহ্ন। তাই প্রত্যেক পশুর পর্যাপ্ত বয়স হলেই কুরবানী বৈধ। দাঁত দেখা যাক বা না যাক।
তবে এক্ষেত্রে বয়স পূর্ণ হওয়ার নিশ্চিত প্রমাণ থাকতে হবে। যেহেতু দিন-তারিখ নির্ণয় করে বয়সের ব্যাপার নিশ্চিত হওয়া কঠিন তাই আল্লাহ তা’য়ালার অশেষ রহমত যে, কুরবানীদাতার সুবিধার্থে এ বয়স পূর্ণ হওয়ার আলামত স্বরূপ দুটি দাঁত গজিয়ে দেন।
অর্থাৎ, বয়স পূর্ণ হলেও দাঁত কখনো কখনো নাও গজাতে পারে কিন্তু দাঁত গজালে বয়স পূর্ণ না হয়ে পারে না। মূলত দাঁতের কথা হাদীসে নেই বয়সের কথাই হাদীসে বলা আছে। (তাফসীরে বাইযাবী, ১/৬)
কুরবানির পশুর বয়স:
এখানে শরীয়তের নীতিমালা হচ্ছে- কুরবানীর ব্যাপারে পশুর সর্বনিম্ন যে বয়স হওয়া বাধ্যতামূলক তার এক ঘণ্টা কম হলেও কুরবানী সহীহ হবে না । তাই এ ব্যাপারে সর্বাধিক সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরী।
সংশ্লিষ্ট প্রসঙ্গে বলতে চাই,কুরবানী দাতা নিজে কুরবানী করা উত্তম। তবে যদি কেউ সহীহ পদ্ধতিতে জবাই করতে না পারেন, সেক্ষেত্রে অন্যের সাহায্য নিতে পারেন। কিন্তু জবাইয়ের বিনিময়ে কুরবানির গোশত্ বা চামড়ার দ্বারা লেনদেন করা যাবে না।বরং প্রয়োজনে জবাইকারীকে আলাদা তার মজুরী দিতে অসুবিধা নেই।
চামড়া প্রসঙ্গ:
অন্যতম আরেকটি বিষয় হচ্ছে কুরবানির পশুর চামড়া বা তার মূল্য। এটা মসজিদ- মাদরাসার নির্মাণ কাজে দান করা জায়েজ নেই। তা হলো গরীব – মিসকিনের প্রাপ্য। এক্ষেত্রেও গরীব আত্মীয়- স্বজনকে দিলে ছাওয়াব বেশি হবে।
আবার মাদরাসার গরীব ফান্ডে চামড়া বা তার মূল্য প্রদান করলে দুটি লাভ হবে।
১. গরীব-মিসকিনকে দেয়ার ছাওয়াব ও
২. ধর্মীয় শিক্ষায় সাহায্য – সহযোগিতা করার ছাওয়াব।
রাব্বে কারীম যেন সামর্থ্যবানদের সঠিক নিয়ম- পদ্ধতি অনুসরণ করে পরিশুদ্ধ নিয়তে তাঁর সন্তুষ্টিকল্পে কুরবানী করার এবং সার্বিক ইবাদত- বন্দেগিতে রাসূল সা. এর তরীক্বায় জীবনযাপনের তাওফিক দান করেন।
লেখক: তরুণ আলেম ও শিক্ষক।



















