জগন্নাথপুর পত্রিকা :: ব্রিটেনে আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দেয়ার শেষ তারিখ ১১ মে। এদিনই জানা যাবে এবার কে কোন আসনে প্রার্থী হচ্ছেন। অবশ্য প্রধান প্রধান দলগুলো ইতিমধ্যে নিজেদের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করেছে। সেসব তালিকা থেকে জানা যাচ্ছে যে, অন্তত ১১ জন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী মধ্যবর্তী এ নির্বাচনে লড়তে যাচ্ছেন।
এদের মধ্যে লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে ৭ জন, লিবারেল ডেমোক্রেটের ২ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ২ জনের নাম জানা গেছে। তবে এই সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। ২০১৫ সালের নির্বাচনে বিভিন্ন দল থেকে মোট ১১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। এরমধ্যে লেবার দলীয় তিনজন-রুশনারা আলী, রূপা হক ও টিউলিপ রেজওয়ানা সিদ্দিক নির্বাচিত হয়েছিলেন।
এ তিনজন এবারও স্ব স্ব আসন ধরে রাখার লড়াইয়ে নেমেছেন।
এবারের নির্বাচনে লেবার পার্টির প্রার্থীদের ৫জন- বেথনালগ্রীন এন্ড বো আসনে রুশানারা আলী, হ্যামস্টেড এন্ড কিলবার্ন আসনে টিউলিপ সিদ্দিক, ইলিং সেন্ট্রাল এন্ড অ্যাকটন আসনে ডঃ রুপা হক, ওয়েলিং এন্ড হ্যাটফিলড থেকে ব্যারিস্টার আনোয়ার বাবুল মিয়া এবং বেকেনহাম থেকে মেরিনা আহমেদ গতবারও নির্বাচন করেছিলেন। এবারও তারা স্ব স্ব আসনে দলটির প্রার্থী। এর পাশাপশি এবার স্কটল্যান্ডের এডিনবরা সাউথ ওয়েস্ট থেকে ফয়সল চৌধুরী এমবিই এবং পোর্টসমাউথ নর্থ থেকে আব্দুল্লাহ রুমেল খান লেবার দলের মনোনয়ন পেয়েছেন।
লিবারেল ডেমোক্রেট দলের প্রার্থী হয়ে লুটন সাউথ আসনে ২০১৫ সালে নির্বাচন করেছিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আশুক আহমদ এমবিই। এবারও তিনি একই আসনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। তার পাশাপাশি লিবারেল ডেমোক্র্যাট দল ডিসট্রিক্ট কাউন্সিলর সাজু মিয়াকে ওয়াইর ফরেস্ট আসনে মনোনয়ন দিয়েছে।
এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন দুজন। এদের মধ্যে আজমল মাশরুর পূর্ব লন্ডনের বেথনাল গ্রিন অ্যান্ড বো আসনে প্রার্থী হবেন। আর টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের সাবেক ডেপুটি মেয়র ওলিউর রহমান পাশ্ববর্তী পপলার অ্যান্ড লাইম হাউজ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
নিয়ম অনুযায়ী ব্রিটেনের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালে। প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে আকস্মিক নির্বাচন ঘোষণা করায় সময়ের স্বল্পতার কারণে দলগুলো প্রার্থী মনোনয়ন দেয়ার ক্ষেত্রে এবার প্রচলিত নিয়ম রক্ষা করতে পারেনি। লেবার পার্টি ও কনজারভেটিভ দল বলেছে, এমপিরা সরাসরি নিজ নিজ আসনে নির্বাচন করবেন। আর গত নির্বাচনে যেসব প্রার্থী পরাজিত হয়েছে তারাও চাইলে এবার স্ব স্ব আসনে নিজ নিজ দল থেকে প্রার্থী হতে পারবে। যেসব আসনে আগের নির্বাচনে হেরে যাওয়া প্রার্থীরা নির্বাচন করবেন না কিংবা যেসব আসনে নির্ধারিত প্রার্থী নেই-সেসব আসনে দলের কেন্দ্রীয় কমিটি প্রার্থী চূড়ান্ত করে দিবে।
৮ জুন এর নির্বাচনকে সামনে রেখে গত ৩ মে প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে রানীর সাথে দেখা করে আনুষ্ঠানিকভাবে পার্লামেনেন্টর বিলুপ্তি ঘোষণা করেন। এরপরই মূলত শুরু হয় নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার। ইতিমধ্যে লেবার পার্টি, কনজারভেটিভ পার্টি ও লিবারেল ডেমোক্র্যাটস পার্টি বিচ্ছিন্নভাবে তাদের কিছু কিছু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেছে। তবে কোনো দলই এখনো নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ইশতেহার ঘোষণা করেনি। আগামী ১৫ তারিখের মধ্যে সকল দল তাদের আনুষ্ঠানিক ইশতেহার ঘোষণা করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
লেবার পার্টি এবার লন্ডনে মোট ৭৩টি আসনের মধ্যে ৩৮জন মহিলা এবং ৩৫জন পুরুষকে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। এই প্রার্থীদের মধ্যে কেবলমাত্র রুশানারা আলী ছাড়া সকলের ক্ষেত্রেই জয়ের ব্যাপারে আশংকা রয়েছে। গত নির্বাচনে ভোটের ব্যবধান সবচেয়ে কম ছিলো রুপা হকের। তার সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিলো মাত্র ২৭৪ ভোট। সংবাদপত্রের সূত্র অনুযায়ী এই আসনটি লন্ডনের মধ্যে লেবারের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সীট। ২০১৫ সালে টিউলিপ সিদ্দিক হ্যামস্টেড অ্যান্ড কিলবার্ন আসনে ২৩ হাজার ৯শ ৭৭ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। কনজারভেটিভ পার্টির প্রার্থী সাইমন মার্কাস পান ২২ হাজার ৮শ ৪৯ ভোট। মাত্র ১১৩৮ ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন টিউলিপ। এই আসনে এথনিক মাইনোরিটি ভোটারদের সংখ্যা তেমন না থাকায় আবারও তাকে কঠিন নির্বাচনী পরীক্ষায় মুখোমুখি হতে হবে।
বেথনালগ্রীন অ্যান্ড বো আসন থেকে দুবার এমপি নির্বাচিত হন রুশনারা আলী। ২০১৫ সালে প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ২৪ হাজার ৩শ ১৭ ভোট বেশি পেয়ে নির্বাচিত হন। রুশনারার প্রাপ্ত ভোট ছিল ৩২ হাজার ৩শ ৮৭। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কনজারভেটিভ পার্টির মেথিউ স্মিথ পেয়েছিলেন ৮ হাজার ৭০ ভোট।
এবার এই আসনে জনপ্রিয় মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ইমাম আজমল মাশরুর স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাই তাঁর পুঁজি। ২০১০ সালের নির্বাচনে তিনি লিবারেল ডেমোক্রেট পার্টির প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১০ হাজার ২১০ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছিলেন। আর তখন রুশানারা আলী পেয়েছিলেন ২১ হাজার ৭৮৪ ভোট। এবারে নির্বাচনে আজমল মশরুরকে তার সাবেক দল লিবারেল ডেমোক্রেট পার্টির বিরুদ্ধেও লড়তে হবে। ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার কারণে রুশানারা আবারও আসনটি ধরে রাখতে পারবেন বলে মনে করা হচ্ছে। ওয়েলিং এন্ড হার্টফিলড কনজারভেটিভ পার্টির নিরাপদ আসন। এই আসনের এমপি হচ্ছেন টরি পার্টির সাবেক চেয়ারম্যান গ্র্যান্ড শ্যাপস। গতবার একি আসনে নির্বাচন করে আনোয়ার বাবুল পান ১৩ হাজার ১২৮ ভোট। বিজয়ী প্রার্থী গ্র্যান্ড শ্যাপস পান ২৫ হাজার ২৮১ ভোট। তার সংখ্যাগরিষ্টতা ছিলো ১২ হাজার ১৫৩ ভোট।
বেকেনহামও কনজারভেটিভ পার্টির নিরাপদ আসন। বাঙালী মেরিনা আহমেদ গত নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে ভোট পান ৯ হাজার ৪৮৪। আর বিজয়ী প্রার্থী বব স্টুয়ার্ট পান ২৭ হাজার ৯৫৫ ভোট। তার সংখ্যাগরিষ্টতা ১৮ হাজার ৪৭১ ভোট।
পোর্টসমাউথ নর্থ আসনটিও টোরির নিরাপদ আসন। এই আসনে গত নির্বাচনে লেবার পার্টির জন ফেরেট ১০ হাজার ৮০৬ ভোট পান। আর বিজয়ী প্রার্থী কনজারভেটিভ পার্টি পেনি মর্ডান্ট পান ২১ হাজার ৩৪৩ ভোট। এখানে সংখ্যাগরিষ্টতা ১০ হাজার ৫৩৭ ভোট। এবার এই আসনে বাঙালী প্রার্থী রুমেল খানকে জিততে হলে এই সংখ্যাগরিষ্টতার বেশী ভোট পেতে হবে।
স্কটল্যান্ডের এডিনবারা সাউথ ওয়েস্ট আসনটি লেবার পার্টির ছিলো। লেবার পার্টির সাবেক চ্যান্সেলার আলিস্টার ডালিং ২০১০ সাল পর্যন্ত এই আসনের এমপি ছিলেন। ২০১৫ সালের নির্বাচনে স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি (এসএনপি)‘র জোয়ারে লেবার পার্টি আসনটি হারায়। এই আসনের বর্তমান এমপি এসএনপির জোয়ানা চেরির সংখ্যাগরিষ্ঠতা ৮ হাজার ১৩৫ ভোট। লেবার পার্টির প্রার্থী রিকি হেন্ডারসন গতবার পেয়েছিলেন ১৪ হাজার ৩৩ ভোট। আর বিজয়ী প্রার্থী জোয়ানা পেয়েছেন ২২ হাজার ১৬৮ ভোট। নতুন করে ৫ হাজার ভোট টানতে পারলে ফয়সল চৌধুরী আসনটিতে জয় পেতে পারেন। বাঙালি নতুন প্রার্থীদের মধ্যে ফয়সল চৌধুরীর আসনেই কেবল ভোটের পার্থক্য সবচেয়ে কম।
লুটন সাউথ আসনটি মুলত লেবারের নিরাপদ আসন। এখানে গেবিন শুকার ২০১৫ সালের নির্বাচনে ১৮ হাজার ৬৬০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। একই আসনে গত নির্বাচনে লিবারেল ডেমোক্রেট থেকে প্রার্থী হয়ে আশুক আহমদ এমবিই ৩ হাজার ১৮৩ ভোট পান। এই আসনে দ্বিতীয় স্থান লাভ করে কনজারভেটিভ পার্টির ক্যাটি রেডমন্ড। তার প্রাপ্ত ভোট ছিলো ১২ হাজার ৯৪৯।
পপলার এন্ড লাইম হাউজ লেবারের নিরাপদ আসন। এখানে লেবারের সাবেক এমপি রয়েছেন জীম ফিটজপ্রেট্রিক। এই আসনে তার সংখ্যাগরিষ্ঠতা ১৬ হাজার ৯২৪ ভোট। স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ওলিউর রহমান কি করেন সেটাই এখানে দেখার বিষয়।
গত নির্বাচনে ২ দশমিক ৪ মিলিয়ন মানুষ ভোটার তালিকায় তাদের নাম নিবন্ধন করেনি। ৮ জুন এর নির্বাচনে ভোট দেয়ার জন্য আগামী ২২ মে পর্যন্ত ভোটার তালিকায় নাম নিবন্ধন করা যাবে।




























