হাওর, কাণ্ডজ্ঞান, জ্ঞান
- Update Time : ১২:৩৭:০১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২২ এপ্রিল ২০১৭
- / ১ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
অাজিজুস সামাদ ডন
আইনস্টাইনের বিখ্যাত দুটি উক্তি দিয়ে শুরু করি।
“তত্ত্বগত ভাবে তত্ত্ব এবং ব্যাবহারিক একই কিন্ত ব্যাবহারিক ক্ষেত্রে বিষয় দুটি এক নয়।”
“মহাবিশ্ব ও মানুষের অজ্ঞতা আসীম, তবে মহাবিশ্বের বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই।”
আমার জেলায় আমার এক নেতা আছেন যার নাম দিয়েছি আমি জ্ঞানেন্দ্র। আসলেই তার জ্ঞানের প্রশংসা করতে হয়। একেবারে জীবন্ত রাজনৈতিক তথ্য ভান্ডার একটা। এমনকি আমার বাবাও একবার বলেছিলেন, জ্ঞানেন্দ্রর কাছে চাইলে নাকি তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের ফোন নাম্বারও পাওয়া যাবে। এখন সমস্যা হল তার এই অসীম জ্ঞানই তাকে যদি কাণ্ডজ্ঞানহীন করে তোলে তাহলে তার সেই জ্ঞান কোন কাজে আসবে কি?
একটা সময় নাকি ছিল (এখনো আছে কিনা আমার জানা নেই। আমার অজ্ঞতা প্রকাশ সরাসরি করার মধ্য দিয়ে নিজেকে কাণ্ডজ্ঞানহীন হওয়া থেকে বাঁচালাম), যখন হিন্দু ধর্ম গ্রন্থ “বেদ” শুধুমাত্র ব্রাহ্মণদের পড়ার অধিকার ছিল, অন্যদের সেটা পড়ার কোন অধিকার ছিল না। আমি আবার কোরান শরীফ পড়া মানুষ এবং বেদ-বেদান্ত-বাইবেল-ত্রিপিটকের জ্ঞানে জ্ঞানান্বীত হবার আমার কোন সুযোগই নেই। সুতরাং আমি যখন কোন মানুষকে পিরিত হতে দেখি তখন আমার জ্ঞান অনুযায়ী সেই পিরিত মানুষটির পাশে যেয়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করি এবং মনে করি অন্যান্য ধর্ম গ্রন্থেও বোধহয় মানব সেবা বিষয়ে একই ধরনের কথা লেখা আছে। এই মনে করার জন্য যদি কেউ আমাকে কাণ্ডজ্ঞানহীন বলে বসেন তাহলে সত্যিই মনে বড় আঘাত পাবো।
এবার আমার জেলা সুনামগঞ্জে ভয়াবহ ফ্ল্যাশ ফ্লাড হয়েছে জানতে পেরে গত চার পাঁচ দিন আমার দুই উপজেলার বিভিন্ন হাওরে ঘুরেছি এবং হাওর পারের গ্রামের দুস্থ মানুষদের পাশে আমার সাধ্য অনুযায়ী দাঁড়াবার একটা ছোট্ট প্রয়াসে এগিয়ে গিয়েছি। এই মানুষগুলোকে দুস্থ বলাতে কেউ আবার আমাকে কাণ্ডজ্ঞানহীন বলবেন না দয়া করে। দুস্থ বলার কারন একটাই। আমি জানি ২০১৫ সালেও আমার এই দুই উপজেলার প্রায় সব কৃষকই বন্যার কারনে ৮০% ফসল ঘরে তুলতে পারে নাই। ২০১৬ সালে কিছু বেশী তুলেছে হয়তো। তারপরও আমি বলবো, এই অঞ্চলে গতবারও ৬০% ফসল ওঠেনি। সুতরাং এবারও যদি ৭০-৮০% ফসলহানী হয় তবে তারা খুব দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পরবে।
ছোটবেলা থেকেই বাবার হাত ধরে এই হাওরপারে যখনই গিয়েছি তখন নৌকায় দাঁড় বাওয়াটা ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় কাজগুলোর মাঝে অন্যতম। তারসাথে গুণ টানা আর নৌকায় বসে ছিপ দিয়ে মাছ ধরা তো ছিলই। বাবা আমাদের এই হাওরের পানি খাওয়াতে খুব ইনসিস্ট করতেন। আমরাও খেতাম। প্রথম দিকে খেতাম বাধ্য হয়ে, কারন, গ্রামে টিওবয়েল ছিলনা। একটু বড় হবার পরেই অবশ্য বাড়িতে টিউবয়েল পেয়েছি কিন্ত ততদিনে টিউবয়েলের সেই লোহাযুক্ত পানির স্বাদের চেয়ে খড়স্রোতা বহমান হাওরের পানিই ভাল লাগতো। এখন তো আর হাওরের পানি খেতে হয়না। প্রতি ঘরে ঘরে রয়েছে টিউবয়েল। আর আমাদের মত শহুরে মানুষগুলোর বোতলের পানির সৌখিনতা তো রয়েছেই। তাই হাওরের মাঝে ঘুরতে ঘুরতে প্রথমে খেয়ালই করিনি হাওরের পানির রং টা এখন কি বা গন্ধটা কি রকম। কিছু দূর যাবার পরেই দেখি মরা মাছ ভেসে যাচ্ছে পাশ দিয়ে। তখন দেখলাম আরো অনেক মরা মাছই ভেসে যাচ্ছে, দেখলাম পানির রঙ শহরের ড্রেনের পানির মত কালো আর গন্ধটাও সেই ড্রেনের পানির মতই। এবার বোধহয় এই হাওর পারের মানুষ গুলোকে দুস্থ বললে কেউ কাণ্ডজ্ঞানহীন বলবেন না।
ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি আমার হাওর পারের গ্রামের মানুষ গুলোকে। তখন অবশ্য তাদের আন্তরিকতাকে আত্নীয়তা হিসেবে দেখতাম। আর গত প্রায় ১৩/১৪ বছর হল যখন রাজনৈতিক আগ্রহ নিয়ে যাওয়া শুরু করলাম তখন এই আন্তরিকতার মাঝে একটা আত্নার সম্পর্কের টান অনুভব করেছি। যেটাই হোকনা কেন, এত বছরে বহু বন্যা হয়েছে, বহু দুর্যোগ গিয়েছে এই হাওর পারের মানুষ গুলোর উপর দিয়ে, গিয়েছি তাদের পাশে, সান্তনা দিয়েছি কিন্ত কখনোই এই মানুষ গুলো তাদের দুঃখের কথা বলেনি। এবার কয়েকটি গ্রামে গিয়ে যখন সান্তনা দিচ্ছি তখন অবাক হলাম, বিস্মিত হলাম। বহু মানুষ মুখ ফুটে জানালো যে, তাদের খাবারের বন্দোবস্ত আর কিছুদিনের মাঝেই শেষ হবে। আমি যদি পারি যেন তাদের জন্য কিছু করার চেষ্টা করি। জানালো, আগামী ফসল কিভাবে তারা ফলাবার চেষ্টায় নামবে সেটা তাদের জানা নেই। কিছু মানুষের কৃষি ঋন শোধ করা নিয়ে দুশ্চিন্তা। তার সাথে দাদন ব্যাবসায়ীরা তো তাদের এই অবস্থায় ঝাপিয়ে পরবেই। অথচ বন্যা এখনো শুরুই হয় নাই, সবে ফ্লাশ ফ্লাড। এবার বোধহয় এই মানুষ গুলোকে দুস্থ বললে কেউ কাণ্ডজ্ঞানহীন বলবেন না।
আমি আইনের মানুষ নই। আইনের বইয়ের আর আইনের ফাঁক ফোকরও আমার জানা নেই। আমি সাধারন মানুষ। সরকারি আইন বা নীতিমালা সংক্রান্ত বিষয়েও তেমন জ্ঞান রাখিনা। কিন্ত পেটে ক্ষিধে থাকলে যে খেতে হবে সেটা বুঝি। আমার ঘরে টাকা না থাকলে প্রয়োজনে দাঁদনে টাকা যোগাড় করে হলেও ক্ষিধের জ্বালা মেটাবো সেটা ভালো করেই বুঝি। এই সাধারন মানুষের মাঝে যাদের প্রান্তিকসীমায় বসবাস, সেই গ্রাম পর্যায়ের মানুষগুলোর মাঝে অন্তত ন্যায্য দামে চাল পাবার আশা তো থাকতে হবে। চাহিদা আর যোগানের মাঝে সাযুজ্য আনার জন্য যা করা প্রয়োজন সেটা করার কথা বললেও কি কাণ্ডজ্ঞানহীন কথা হয়ে যাবে কিনা বুঝতে পারছিনা।
বর্তমান আইন অনুযায়ী সুনামগঞ্জ জেলাকে দুর্গত অঞ্চল ঘোষনার প্রয়োজন আমিও দেখি না। কিন্ত সেটার বিরুদ্ধাচরণ করতে গিয়ে বর্বরোচিত ভাষা প্রয়োগেরও প্রয়োজন দেখিনা আমি। আইন মানুষই তৈরি করে এবং সেই আইন যুগোপযোগীকরণের দায়ীত্ত্বও মানুষেরই। সরকারী নীতিমালা আমার মত সাধারন মানুষের কাছে অনেকটা ব্রাহ্মণত্ব এর বাইরের মানুষের জন্য বেদ, এই বিষয়ে আমি সিডিউল কাস্ট। তবে এটুকু বুঝি যে, খুব পুরনো কোন আইন কে যদি মানুষের জন্য যুগোপযোগী করার প্রয়োজনীয়তা থাকে, সেটা করে নিতে বা মানুষের প্রয়োজনের সাথে তাল মিলিয়ে নতুন নামে নতুন নীতিমালা তৈরি করতে অসুবিধা থাকার কথা নয়। দুর্গত অঞ্চল ঘোষনা করার জন্য ৫০% মানুষ মরে রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ এর বিখ্যাত কবিতাটির শিরোনাম “বাতাসে লাশের গন্ধ” হবার প্রয়োজন নেই। হাওর ভরা মাছ মরেই যে দুর্গন্ধ তৈরি হয়েছে সেটার সাথে আরও দুই চারটা গরু-ছাগল মরারও প্রয়োজন নেই। যাদের জবাবদিহিতা নেই সেই আমলা মুরুব্বীদের কাছ থেকে কান্ডজ্ঞানের শিক্ষা নেবারও আমার প্রয়োজন নেই। অন্তত আমি যে হাওর গুলোতে গিয়েছি সেই হাওর পারের মানুষ গুলো লংগরখানা বা দান খয়রাত কখনো চায়নি। কেউ যদি মানুষের দুর্দশা নিয়ে রাজনীতি করা বা অন্য কোন খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে সুনামগঞ্জ জেলাকে দুর্গত অঞ্চল ঘোষনার দাবী জানিয়ে থাকে তবে উপরে উল্লেখিত বিষয় গুলোর নিশ্চয়তা প্রদান করতে পারলে তাদের মুখেও চুনকালি পরবে।
সবশেষে একটি কাণ্ডজ্ঞানহীন কথা বলেই ফেলি। বাবার সাথে থাকার কারনেই হোক আর গত প্রায় ১৪ বছর হাওর অঞ্চলে বেশী সময় দেয়ার কারনেই হোক, যে অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে, সেই অভিজ্ঞতার সাথে যদি কিছু জ্ঞানী লোকের সমন্বয় সাধন করে কাজ করার সুযোগ পাওয়া যায়, তবে ভবিষ্যৎ বন্যায় কম ফসলহানীর ব্যাবস্থা করা সম্ভব বলে আমার মনে হয়। আর ভেরি বাঁধ নিয়ে শত-শত কোটি টাকার যে দুর্নীতির কথা উঠছে প্রতি বছর, সেটা খুঁজে বের করার জন্যও শুধু একটা সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সহজ ভাষায় সোজা কথা বললাম।
লেখাটি লেখকের ফেইসবুক টাইমলাইন থেকে




























