শিক্ষকদের পদযাত্রায় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা দুঃখজনক, লজ্জাজনক ও অবিশ্বাস্য
- Update Time : ০১:৩৪:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ৯ জুলাই ২০১৮
- / ১ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
জগন্নাথপুর পত্রিকা ডেস্ক :: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ‘কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর নৃশংস বর্বর হামলা চালানো হয়েছে। হাতুড়ি দিয়ে এভাবে নৃশংস হামলা আগে দেখিনি। যে অবস্থা চলছে, তাতে মানুষের নিরাপত্তা নেই। যারা আন্দোলন করেছে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়েছে। রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। এটি যৌক্তিক নয়। যে ঘটনা ঘটেছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক, লজ্জাজনক ও অবিশ্বাস্য। এটা পাকিস্তান বা বৃটিশ আমলেও ঘটেনি।
গতকাল দুপুরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘নিপীড়নবিরোধী শিক্ষকবৃন্দ’র ব্যানারে আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশে এসব কথা বলেন তিনি। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা, আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার, রিমান্ডে নেয়ার প্রতিবাদে এ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে সকাল ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে পদযাত্রায় অংশ নেন শিক্ষকরা।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজীম উদ্দীন খানের সঞ্চালনায় এ সময় উপস্থিত ছিলেন, আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরিন, অধ্যাপক ফাহমিদুল হক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক শিক্ষক আকমল হোসেন, ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক তাসনিম সিরাজ মাহবুব প্রমুখ। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আজ মানুষের নিরাপত্তা নেই, এই ঘটনা দ্বারা উপলব্ধি করি।
আক্রান্তদের হাসপাতাল থেকে কেন বের করে দেয়া হলো, সেটা তদন্ত করতে হবে। আর যারা আক্রমণ করেছে তারা দৃশ্যমান, চিহ্নিত। তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিতে হবে। তাদের আইনের অধীনে আনতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘কোটা আন্দোলন যৌক্তিক ও ন্যায়সংগত। এ জন্য ছেলে, মেয়ে, অভিভাবক, শিক্ষক সবাই এতে সমর্থন দিয়েছে। ৫৬ ভাগ কোটা অত্যন্ত অযৌক্তিক, অন্যায়। আন্দোলন করেছে বলে সরকার কমিটি করতে বাধ্য হয়েছে। কমিটি গঠনে সরকার বিলম্ব করেছে বলে ছাত্ররা আবার আন্দোলন করেছে। এই আন্দোলন যদি কন্টিনিউ না করতো তাহলে এই কমিটি গঠন হতো না।’
এ সময় তিনি কোটা সংস্কারের দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, ‘আন্দোলন করার কারণে শিক্ষার্থীকে হাতুড়িপেটা করা হয়েছে। মেয়েদের লাঞ্ছিত করা হয়েছে। চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। মিথ্যা হয়রানি মামলা দেয়া হয়েছে। নানা অপবাদ দেয়া হয়েছে। প্রতিবাদ করার অধিকার বন্ধ করা গণতন্ত্রবিরোধী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী। সকল ষড়যন্ত্রমূলক মামলা প্রত্যাহার চাই এবং হাতুড়িপেটাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড চাই।’ তিনি বলেন, ‘যে শিক্ষার্থীরা আহত হয়েছে, হাসপাতালে আছে, অজ্ঞাত স্থানে আছে, মামলার শিকার হয়েছে তাদের প্রতি উদ্বেগ থেকে আমরা আজকে এখানে এসেছি। কোটা সংস্কার আন্দোলন যখন তীব্র ছিল, তখন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ, শিক্ষক সমিতি এই যৌক্তিক আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছিল।
এই ন্যায়সংগত আন্দোলন করতে গিয়ে আমাদের সন্তানরা চার ধরনের অন্যায়ের শিকার হয়েছেন। তাদেরকে হাতুড়িপেটা করা হয়েছে। মেয়েদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে, গুরুতর আহত করা হয়। এটা প্রথম অন্যায়। দ্বিতীয় অন্যায় হচ্ছে আহতদের চিকিৎসা ব্যাহত করা হয়েছে। এই দেশের হাসপাতাল কোনো সরকার, ব্যক্তির নয়, রাজনৈতিক দলের হাসপাতাল নয়। এটা জনগণের অর্থে পরিচালিত হাসপাতাল। অথচ তাকে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তৃতীয় অন্যায় মিথ্যা হয়রানিমূলক মামলা দেয়া হয়েছে, চতুর্থ অন্যায় নানারকম অপবাদ দেয়া হয়েছে।’
এ সময় তিনি বলেন, ‘যারা নিপীড়িত ছাত্রের পাশে দাঁড়াতে ভয় পায়, অথবা লোভের কাছে আত্মসমর্পণ করে আসতে চান না। তারা অবশ্যই নিন্দার যোগ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতিকে নিন্দা জানাচ্ছি। আমরা অতীতে দেখেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের পাশে থাকতো। অন্তত চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা করতো। আমরা সেই জায়গা থেকে সরে এসেছি। আমরা সকল ষড়যন্ত্রমূলক মামলা প্রত্যাহার চাই। যারা হাতুড়িপেটা করেছে আইনের অধ্যাপক হিসেবে বলছি ধারালো অস্ত্র দিয়ে গুরুতর আঘাত করা যাবজ্জীবন যোগ্য অপরাধ। যাবজ্জীবন যোগ্য অপরাধ যারা করেছে তাদের গ্রেপ্তার দাবি করছি।’
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক শিক্ষক আকমল হোসেন বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে। জামায়াত-শিবির ও বিএনপির সংশ্লিষ্টতা দেখানো হয়েছে। এখন যেকোনো দাবি তুললেই এ রকম করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। ছাত্রদের দাবি প্রত্যাখ্যান করার ভাষা নিন্দনীয়। সরকারি হাসপাতাল থেকে শিক্ষার্থীদের যেভাবে বের করে দেয়া হয়েছে, তাতে বোঝা যায় গণতন্ত্র কোন অবস্থায় আছে।’
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চেয়ে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক তাসনিম সিরাজ মাহবুব বলেন, ‘ভিন্নমতের বিরুদ্ধে গলা চেপে ধরার যে প্রবণতা তার নিন্দা জানাচ্ছি। হাসপাতাল থেকে শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা না করে বের করে দেয়ারও তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।’ এ সময় নিপীড়ন বিরোধী শিক্ষকদের পক্ষে পাঁচটি দাবি তুলে ধরেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরিন। দাবি সমূহের মধ্যে রয়েছে- সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সকল হামলাকারীর বিচার, আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের নামে করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, আক্রান্তদের চিকিৎসাব্যবস্থা সরকারকেই করতে হবে, নারী আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের বিচার এবং দ্রুত কোটা সংস্কারের প্রতিশ্রুত প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।
রাশেদের মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন:কোটা সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খানের মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং এন্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগ। রাশেদ এ বিভাগের ছাত্র। সকাল ১০টায় ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের এমবিএ ভবন এর সামনে এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে রাশেদসহ আটক অন্য শিক্ষার্থীদের অবিলম্বে মুক্তি দাবি এবং অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সন্ত্রাসীমূলক নির্বিচারে হামলার প্রতিবাদ জানানো হয়। মানববন্ধনে উপস্থিত ব্যাংকিং এন্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের শিক্ষার্থী নাজমুল রাফি বলেন, আমরা এখানে এসেছি রাশেদ ভাই সহ অন্য আটকদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে। তিনি অধিকার আন্দোলনে গিয়েছেন। তিনি কোনো অপরাধ করেননি। একই বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিয়া আফরিন বলেন, এই ক্যাম্পাস কারো একার নয়। কিন্তু এই ক্যাম্পাসে মেয়েদের উপরেও হামলা হয়েছে। আমরা এই হামলার বিচার চাই।
ভিসিকে স্মারকলিপি প্রগতিশীল ছাত্রজোটের: কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেছে প্রগতিশীল ছাত্রজোট। বিক্ষোভ শেষে ছাত্রজোটের পক্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের কাছে স্মারকলিপি দেয়া হয়। স্মারকলিপিতে চারটি দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিসমূহের মধ্যে রয়েছে- সন্ত্রাস-সহিংসতা, দখলদারি মুক্ত শিক্ষায় গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে; শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকরী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে; বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পুলিশি হয়রানি ও গ্রেপ্তার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে; আটক শিক্ষার্থীদের মুক্তির জন্য আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।



















