বিশেষ প্রতিনিধি :: জগন্নাথপুর থানায় স্বাধীন বাংলার প্রথম পতাকা উত্তোলনকারী মরহুম ব্যারিস্টার মির্জা আব্দুল মতিনকে স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৬ বছরেও রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেয়া হয়নি। ৭১‘র রণাঙ্গনের অকুতোভয় এ বীর সন্তানকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেয়া হলেও দীর্ঘদিন থেকে তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান দেখানোর দাবি উঠলেও স্বাধীনতার ৪৬বছরেও রাষ্ট্রীয় সম্মান দেখানো হয়নি।ইতিহাসের পাতা থেকে জগন্নাথপুর থানার প্রথম বেসামরিক প্রশাসনিক প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম মির্জা আব্দুল মতিন ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের জগন্নাথপুর থানায় প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি জগন্নাথপুর, বিশ্বনাথ, নবীগঞ্জ, বালাগঞ্জ ও ছাতক থানার দক্ষিণাংশে অসংখ্য তরুন ও যুবকদের উদ্ধুদ্ধ করে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষনের উদ্দ্যোশে ভারত সীমান্তে পাঠিয়ে দেন। এক সময় পাকিস্তান বিমান বাহিনীর সহযোগিতায় পাকসেনারা কয়েক‘শ আধুনিক অস্ত্র-সস্ত্রে সজ্জিত হয়ে জগন্নাথপুর দখলে নেয়। এ সময় যথেষ্ট শক্তি না থাকার কারনে অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধোদের মতো তিনিও বাধ্য হয়ে জগন্নাথপুর ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। এ সুযোগে স্থানীয় রাজাকারদের সহযেগিতায় পাক হানাদাররা তার এবং আত্মীয়-স্বজনের পাকা ঘর সহ ৬টি বাড়ীতে অগ্নিসংযোগ করে বিধ্বস্ত করে দেয়। এ সময় তারা ব্যাপক লুটপাঠও চালায়। অন্যদিকে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কুশিয়ারা নদী দিয়ে পাকবাহিনীর যাতায়াত বন্ধ করার লক্ষে মার্কুলীসহ বিভিন্ন স্থানে আক্রমন করেন। এ সময় উপজেলার হলদিপুর ইউনিয়নের বেতাউকা গ্রামে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর অনেকে হতাহত হলে এক নৌকার মাঝি গুরুত্বর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করেন। পরে তিনি সুস্থ হয়ে উঠলে তাঁর নেতৃত্বে দিরাই থানা আক্রমন করা হয়। তবে ভারী অস্ত্রের অভাবে থানাটি দখল নিতে না পারলেও তাদের আক্রমনে অনেক পাকসেনা ও দোসর রাজাকার নিহত হয়।দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করার সময টেকের ঘাট সেক্টরের মেজর বাট , মেজর মুসলেহ উদ্দিন , ক্যাপ্টেন বার্মা , সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত , আব্দুজ জহুর ও আব্দুর হক এম.সি এ‘র সাথে যোগাযোগ রেখে তাদের নির্দেশ মতো তিনিও কাজ করেন। দেশ স্বধীনের পর তিনি তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের নিকট থেকে একটি চিটি পান। চিঠিটি পেয়ে আব্দুল হক এম.সি.এ ও কর্ণেল শওকতের সাথে দেখা করেন। পরে তাদের অনুরোধে জগন্নাথপুর থানার প্রথম বেসামরিক প্রশাসকের দায়িত্ব ভার গ্রহন করেন। এই থানার দুই শতাধিক রাজাকারের নিকট থেকে যখন অস্ত্র-সস্ত্র নেয়ার প্রচেষ্ঠা চালানো হয় তখন পরিস্থিতি আয়ত্বের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হলে তার অনুরোধে কর্ণেল শওকত তৎকালীন ক্যাপ্টেন হেলালকে জগন্নাথপুরে পাঠান। অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে উঠলে শরনার্থীরা দলে দলে দেশে আসতে শুরু করেন। এর কিছু দিনের মধ্যেই স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম কর্মী আব্দুল হক এম.সি.এ সড়ক দূর্ঘটনায় মারা যান। এর পরিপেক্ষিতে সুনামগঞ্জের এম.সি.এ আব্দুর রইসের সঙ্গে তার যোগাযোগ সম্ভব না হওয়ায় সিলেটের এম.সি.এ দেওয়ান ফরিদ গাজী চিঠিপত্র ও নিজস্ব প্রতিনিধি মারফত তার সাথে যোগাযোগ করেন। ৭২এর ৫ জানুয়ারী মির্জা আব্দুল মতিনকে পেশাগত জরুরী কাজে ঢাকা হাইকোর্টে যাওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। তাই সুনামগঞ্জের দেওয়ান উবেদুর রেজা চৌধুরী ও আব্দুজ জহুর এম.সি.এর সামনে আব্দুর রইস এম.সি.এ‘ কে জগন্নাথপুরের কার্যাভার গ্রহনের অনুরোধ করেন। ১১ জানুয়ারী জগন্নাথপুরে পৌছে স্থানীয়ভাবে কমিটি গঠনের পর তিনি তাকে অবসর দিবেন বলে জানান। কিন্তু দুঃখ জনক হলেও সত্যি যে, কল্যাবরেটারস অর্ডিন্যান্সে কতিপয় মুক্তিবাহিনী মির্জা আব্দুল মতিন ও তার ভাই স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রতক্ষ্যভাবে জড়িত লন্ডন ইউনিভার্সিটির প্রাক্তন ছাত্র মির্জা আব্দুল ওয়াহিদকে গ্রেফতার করে থানা হাজতে বন্দী করে। সেদিন রাত সাড়ে ৮টার দিকে মুক্তিযোদ্ধার নাম ব্যবহার করে কতিপয় লোক তার স্বজনদের ৬টি বাড়ীতে হামলা চালায়। হামলা চালিয়ে তারা শিশু সন্তান সহ ৫৮ জন নারী পুরুষকে ও ঘর থেকে বের করে দিয়ে ব্যাপক লুটপাট চালায়। লুটপাটকারীরা তাদের শেষ সম্বল মাত্র ১শ‘টি টাকাও নিয়ে যায়। পরদিন তাদেরকে সুনামগঞ্জ জেলে পাঠানো হয়। কিন্তু অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় জেলা জজের নির্দেশে তাদেরকে মুক্তি দেওয়া হয়। বীর মুক্তিযোদ্ধা মির্জা আব্দুল মতিনের পুত্র রাজনীতিবিধ ও ব্যবসায়ী মির্জা আবুল কাশেম স্বপন সুনামগঞ্জ জজ কোর্টের আইনজীবি এড ভোকেট মির্জা আবু তাহের মোহন জানান দেশ স্বাধীনের ৪৬ বছর অতিবাহিত হলেও এখনও আমার পিতা রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পাননী। মরনোত্তর রাষ্টীয় মর্যাদা প্রদানের দাবি জানান বীর মুক্তিযুদ্ধা মরহুম ব্যারিষ্টার মির্জা আব্দুল মতিনের পরিবারের সদস্য ও আত্মীয় স্বজনরা।
০৬:৩৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬, ১৮ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :




























