০৩:৪০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬, ১৭ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

পরমপ্রিয় স্বাধীনতা তুমি কোথায়?

  • Update Time : ০৩:৩৫:৩২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ মার্চ ২০১৭
  • / ১ বার নিউজটি পড়া হয়েছে

ফুজায়েল আহমাদ নাজমুল

 

‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো – বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ ১৯৭১ সালে চারিদিকে তীব্রবেগে এই শ্লোগান উঠেছিলো। পাকিস্তানের শাসকদের শোষণ যখন চরম পর্যায়ে পৌছে তখন স্বাধিকার আদায়ে গোটা বাঙালি জাতি এই শ্লোগানে জেগে উঠেছিলো। সর্বস্তরের জনতার মাঝে এক তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিলো। একটি স্বাধীন সার্বভৌমত্ব দেশ জন্ম দেয়ার শপথে দলমত নির্বিশেষে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলো সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায়।

স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে ২৫ মার্চ একটি বেদনাবিধুর অধ্যায়। এদিন রাতে নিরস্ত্র ঘুমন্ত বাঙালির ওপর সশস্ত্র পাকিস্তানি বর্বর সেনাবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে। অপারেশন সার্চলাইটের নামে শিক্ষক, ছাত্র, শ্রমিকসহ নিরীহ বাঙালিদের নির্মমভাবে হত্যা করে। রাজনীতিক, পুলিশ, আনসার ও সেনাবাহিনীর জোয়ানসহ সাধারণ মানুষ কেউই এ বর্বর হামলা থেকে রেহাই পায়নি। বাঙালিদের ঘরবাড়ি তারা জ্বালিয়ে দেয়। তাদের হিংস্র আক্রমণে ঢাকা মৃতের শহরে পরিণত হয়। হাজার হাজার মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে পালিয়ে যায়। তাদের পৈশাচিক হত্যা আর ধ্বংসলীলা দেখে সমগ্র বিশ্ব বিবেক স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিলো। এরই প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া হয়। এরপর থেকে দেশের প্রতিটি প্রান্তরে শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ।

কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র-শিক্ষক, সরকারী-বেসরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী, কবি-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবি এবং সশস্ত্র বাহিনীর জোয়ান সহ দেশের অকুতোভয় সূর্যসন্তানরা দীর্ঘ নয় মাস তুমুল যুদ্ধ করে লাখো প্রাণের বিনিময়ে ছিনিয়ে আনে স্বাধীনতা। স্বাধিকার আদায়ের এ লড়াইয়ে লক্ষ লক্ষ বাঙালির খুন ঝরে সবুজে ঘেরা এ ভূখণ্ডে। লক্ষাধিক মা-বোনের ইজ্জত হয় লুণ্ঠিত পাকবাহিনীর হায়েনাদের হাতে। গৃহহীন হয় দেশের অধিকাংশ মানুষ। জন্মভূমির আত্মমর্যাদা রক্ষা ও স্বাধিকার আদায়ে যারা এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশের নাম লিখিয়েছে তাদের ত্যাগ ও কুরবানী ইতিহাসের পাতায় সোনালী হরফে লেখা থাকবে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার চার দশক পেরিয়ে গেলেও মানুষের আশা আকাংখার প্রতিফলন ঘটেনি আজও। গতানুগতিক ব্যবস্থার আড়ালে বন্দী মানবসত্তা। নানা দ্বিধা সংশয় হীনমন্যতা এবং সর্বোপরি সরল প্রাণ মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলার ন্যাক্কারজনক ট্রাডিশান চোখের দৃষ্টিতে পড়ছে এযাবতকাল। অথচ মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিলো অশুভ আর অকল্যাণের কালো অমানিশা ভেদ করে সৌভাগ্যের স্বর্ণ দ্বারের উম্মোচন; একটি বঞ্চিত-লাঞ্চিত, শোষিত এবং পশ্চাৎপদ জাতিকে আত্মপ্রত্যয়ে বলীয়ান হয়ে অকুতোভয়ে মাথা উচুঁ করে দাড়াবার এক অমোঘ আশ্বাস বাণী।

পরমপ্রিয় স্বাধীনতার জন্য মানুষ আজ হাহাকার করছে। কেউ কারাগারের অন্ধকার থেকে, কেউ গৃহবন্দিত্ব থেকে, কেউ রাজপথ থেকে, কেউ বক্তৃতার মঞ্চ থেকে, কেউ আদালত প্রাঙ্গন থেকে, কেউ সংবাদপত্রের অফিস থেকে, কেউ লেখার টেবিল থেকে, কেউ প্রবাস থেকে, কেউ সীমান্তের কিনারা থেকে চিৎকার করে পরমপ্রিয় স্বাধীনতাকে ডাকছে। স্বাধীনতা তুমি কোথায়? তুমি কোথায়? তুমি কোথায়? কিন্তু স্বাধীনতা এসবের ধারেকাছেও নেই। যারা ক্ষমতাসীন তাদের হাতে আজ স্বাধীনতা বন্দি। তারা যেমন চান তেমন করে সাজতে পারেন। নাচতে পারেন। লিখতে পারেন। বলতে পারেন। স্বাধীনতা যুদ্ধ তাদের কপাল খুলে দিয়েছে বলেই তারা স্বাধীনভাবে এগুলো পারছেন। এগুলো করছেন। আগামীতে যারা ক্ষমতায় যাবেন তারাও পারবেন। তারাও করবেন। আর এটাই বাস্তবতা।

৩০ লাখ শহীদের রক্ত এবং বহু ত্যাগের বিনিময়ে বাইরের পক্ষের শত্রুদের থেকে আমরা মুক্ত হতে পেরেছি। স্বাধীন হয়ে আমরা ঘরে ফিরেছি। কিন্তু ঘরের ভেতরে একটি সুন্দর ও সুখী সংসার গড়ে তুলতে আমরা ব্যার্থ হয়েছি রিতিমতো। হ্যা, সমাজ ও রাষ্ট্রের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ব্যক্তি জীবনে আমাদের অনেকের প্রাচুর্য এসেছে। আর্থিকভাবে আমরা অনেকেই লাভবান হয়েছি। কিন্তু সামষ্টিক জাতি হিসেবে আমাদের স্বচ্ছলতা অনেক পিছিয়ে। ধনীরা শুধু ধনী হচ্ছে আর গরীব শুধু গরীবই হচ্ছে। দেশের জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ এখনও দরিদ্রতার শেষ সীমার নীচে অবস্থান করছে। তাদের দারিদ্রতা বিমোচনে রাষ্ট্রের ভূমিকা সন্তোষজনক বলা যায় না।

স্বাধীনতার পরথেকে বারবার ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। কেউ জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতার মসনদে বসেছেন আবার কেউ স্বৈরাচারী কায়দায় বসেছেন। যে যেভাবেই বসুন না কেন, দেশ ও জাতির অবস্থার বিশেষ কোন পরিবর্তন তারা করতে পারেননি। পরিবর্তন করেছেন তারা তাদের নিজেদের। পরিবর্তন করেছেন তাদের পরিবার পরিজনদের।

আজকের সমাজে নীতিনৈতিকতা বলতে কিছুই নেই। নীতি, আদর্শ, নিষ্ঠা সব যেন আমরা ভূলতে বসেছি। সমাজের প্রতিটি স্থরে নীতিনৈতিকতার অবক্ষয় ঘটেছে চরমভাবে। অন্যায়, দুর্নীতি সমাজের আজ চরম ব্যাধি। সমাজের উপর থেকে একেবারে নীচ পর্যন্ত এ ব্যাধিতে আক্রান্ত। মানুষ স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছিলো, রক্ত দিয়েছিলো, প্রাণ দিয়েছিলো সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, দুর্নীতিমুক্ত একটি দেশ গড়তে। অসুস্থ রাজনীতি থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে। একটি সুন্দর, সুখী সমৃদ্ধশালী সমাজ ও রাষ্ট্র গড়তে। কিন্ত এগুলো কই? এগুলো আজও শুধু শ্লোগান আর বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।

আজকের বাংলাদেশে মানবাধিকার বলতে কিছুই নেই। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নেই। মিডিয়া কর্মীর স্বাধীনতা নেই। নিরাপত্তা নেই। মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা নেই। একজন লেখকের লেখার স্বাধীনতা নেই। অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে সভা-সমাবেশ করার অধিকার নেই। নারীদের ইজ্জত আব্রুর নিরাপত্তা নেই। প্রতিদিন নারীরা নির্যাতন হচ্ছে। ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। দেশের কোনো না কোনো স্থানে প্রতিদিন মানুষ খুন হচ্ছে। গুম হচ্ছে। অপহরণ হচ্ছে। ঘর থেকে নিরাপরাধ মানুষদের মিথ্যা মামলা দিয়ে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় অপরাধীরা বিনা সাজায় জেল থেকে মুক্তি পাচ্ছে। আইন, আদালত, প্রশাসন সহ সবকিছু দলীয়করন করা হচ্ছে। সীমান্তে ভারতীয় বি এস এফ কর্তৃক দেশের মানুষ প্রায়ই হত্যার শিকার হচ্ছে। দেশের অকুতোভয় সূর্যসন্তানরা এসব পাওয়ার জন্য কি যুদ্ধ করেছিলো?

জাতি আজ হতাশ। চারিদিকে আতংক। সময়ের চাকা যতোই ঘুরছে মানুষের মনে ততোই দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ আর উৎকন্ঠা বেড়েই চলেছে। কিভাবে এ দেশ শান্তি হবে। কারা এ বর্বর সমাজ পরিবর্তনের উদ্যোগ নিবে। কবে মানুষ তার মৌলিক অধিকার ভোগ করতে পারবে। কখন জানমাল ইজ্জতের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। আর কত বছর অপেক্ষা করতে হবে বৈষম্যহীন সুন্দর একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার। এ সব কথা আজ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখে মুখে।

দীর্ঘ চারদশকে অসুস্থ রাজনীতি জাতিকে কি দিতে পেরেছে, আর বর্তমানে কি দিচ্ছে আজকে রাজনৈতিক নেতাদের ভাবতে হবে। আত্মসমালোচনা করতে হবে। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে ইতিহাস বিকৃত করা যাবে না। জাতীয় বিষয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে কেউ রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করলে জাতি ক্ষমা করবে না। স্বাধীনতা যুদ্ধের বিজয় এককক কোন দল বা গোষ্ঠীর কৃতিত্ব নয়। এ বিজয় অর্জনে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের অবদান রয়েছে। এখানে কাউকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বিজয়ের কৃতিত্ব, স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা, কে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি আর কে বিপক্ষের শক্তি এসব বিষয়ে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে তা অবসান হওয়া উচিত। এসব বিতর্ক সুস্থ রাজনীতি চর্চায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে প্রতিনিয়ত। উন্নতি ও অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাড়িয়েছে। মনে রাখবেন, অসুস্থ রাজনীতির চর্চা বন্ধ না হলে আমরা শুধু অর্থনৈতিকভাবেই পিছিয়ে পড়বো না, বিদেশেও অসভ্য জাতি হিসেবে চিহ্নিত হবো।

গোটা জাতির ভাগ্যের পরিবর্তনে দল-মত নির্বিশেষে সকলকে একযোগে কাজ করে যেতে হবে। উন্নত রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তা নিরসনে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। নিজেদের কল্যাণে নয়, দেশ ও জাতির কল্যাণে করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। ঐকমত্যে পৌছতে হবে। অতীতের সমস্ত ভেদাভেদ ও অন্তর্দন্দ্ব ভুলে জাতীয় কল্যাণের অনির্বাণ চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে সকলকে একযোগে কাজ করে যাওয়ার বিকল্প নেই।

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ

পরমপ্রিয় স্বাধীনতা তুমি কোথায়?

Update Time : ০৩:৩৫:৩২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ মার্চ ২০১৭

ফুজায়েল আহমাদ নাজমুল

 

‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো – বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ ১৯৭১ সালে চারিদিকে তীব্রবেগে এই শ্লোগান উঠেছিলো। পাকিস্তানের শাসকদের শোষণ যখন চরম পর্যায়ে পৌছে তখন স্বাধিকার আদায়ে গোটা বাঙালি জাতি এই শ্লোগানে জেগে উঠেছিলো। সর্বস্তরের জনতার মাঝে এক তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিলো। একটি স্বাধীন সার্বভৌমত্ব দেশ জন্ম দেয়ার শপথে দলমত নির্বিশেষে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলো সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায়।

স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে ২৫ মার্চ একটি বেদনাবিধুর অধ্যায়। এদিন রাতে নিরস্ত্র ঘুমন্ত বাঙালির ওপর সশস্ত্র পাকিস্তানি বর্বর সেনাবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে। অপারেশন সার্চলাইটের নামে শিক্ষক, ছাত্র, শ্রমিকসহ নিরীহ বাঙালিদের নির্মমভাবে হত্যা করে। রাজনীতিক, পুলিশ, আনসার ও সেনাবাহিনীর জোয়ানসহ সাধারণ মানুষ কেউই এ বর্বর হামলা থেকে রেহাই পায়নি। বাঙালিদের ঘরবাড়ি তারা জ্বালিয়ে দেয়। তাদের হিংস্র আক্রমণে ঢাকা মৃতের শহরে পরিণত হয়। হাজার হাজার মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে পালিয়ে যায়। তাদের পৈশাচিক হত্যা আর ধ্বংসলীলা দেখে সমগ্র বিশ্ব বিবেক স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিলো। এরই প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া হয়। এরপর থেকে দেশের প্রতিটি প্রান্তরে শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ।

কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র-শিক্ষক, সরকারী-বেসরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী, কবি-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবি এবং সশস্ত্র বাহিনীর জোয়ান সহ দেশের অকুতোভয় সূর্যসন্তানরা দীর্ঘ নয় মাস তুমুল যুদ্ধ করে লাখো প্রাণের বিনিময়ে ছিনিয়ে আনে স্বাধীনতা। স্বাধিকার আদায়ের এ লড়াইয়ে লক্ষ লক্ষ বাঙালির খুন ঝরে সবুজে ঘেরা এ ভূখণ্ডে। লক্ষাধিক মা-বোনের ইজ্জত হয় লুণ্ঠিত পাকবাহিনীর হায়েনাদের হাতে। গৃহহীন হয় দেশের অধিকাংশ মানুষ। জন্মভূমির আত্মমর্যাদা রক্ষা ও স্বাধিকার আদায়ে যারা এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশের নাম লিখিয়েছে তাদের ত্যাগ ও কুরবানী ইতিহাসের পাতায় সোনালী হরফে লেখা থাকবে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার চার দশক পেরিয়ে গেলেও মানুষের আশা আকাংখার প্রতিফলন ঘটেনি আজও। গতানুগতিক ব্যবস্থার আড়ালে বন্দী মানবসত্তা। নানা দ্বিধা সংশয় হীনমন্যতা এবং সর্বোপরি সরল প্রাণ মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলার ন্যাক্কারজনক ট্রাডিশান চোখের দৃষ্টিতে পড়ছে এযাবতকাল। অথচ মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিলো অশুভ আর অকল্যাণের কালো অমানিশা ভেদ করে সৌভাগ্যের স্বর্ণ দ্বারের উম্মোচন; একটি বঞ্চিত-লাঞ্চিত, শোষিত এবং পশ্চাৎপদ জাতিকে আত্মপ্রত্যয়ে বলীয়ান হয়ে অকুতোভয়ে মাথা উচুঁ করে দাড়াবার এক অমোঘ আশ্বাস বাণী।

পরমপ্রিয় স্বাধীনতার জন্য মানুষ আজ হাহাকার করছে। কেউ কারাগারের অন্ধকার থেকে, কেউ গৃহবন্দিত্ব থেকে, কেউ রাজপথ থেকে, কেউ বক্তৃতার মঞ্চ থেকে, কেউ আদালত প্রাঙ্গন থেকে, কেউ সংবাদপত্রের অফিস থেকে, কেউ লেখার টেবিল থেকে, কেউ প্রবাস থেকে, কেউ সীমান্তের কিনারা থেকে চিৎকার করে পরমপ্রিয় স্বাধীনতাকে ডাকছে। স্বাধীনতা তুমি কোথায়? তুমি কোথায়? তুমি কোথায়? কিন্তু স্বাধীনতা এসবের ধারেকাছেও নেই। যারা ক্ষমতাসীন তাদের হাতে আজ স্বাধীনতা বন্দি। তারা যেমন চান তেমন করে সাজতে পারেন। নাচতে পারেন। লিখতে পারেন। বলতে পারেন। স্বাধীনতা যুদ্ধ তাদের কপাল খুলে দিয়েছে বলেই তারা স্বাধীনভাবে এগুলো পারছেন। এগুলো করছেন। আগামীতে যারা ক্ষমতায় যাবেন তারাও পারবেন। তারাও করবেন। আর এটাই বাস্তবতা।

৩০ লাখ শহীদের রক্ত এবং বহু ত্যাগের বিনিময়ে বাইরের পক্ষের শত্রুদের থেকে আমরা মুক্ত হতে পেরেছি। স্বাধীন হয়ে আমরা ঘরে ফিরেছি। কিন্তু ঘরের ভেতরে একটি সুন্দর ও সুখী সংসার গড়ে তুলতে আমরা ব্যার্থ হয়েছি রিতিমতো। হ্যা, সমাজ ও রাষ্ট্রের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ব্যক্তি জীবনে আমাদের অনেকের প্রাচুর্য এসেছে। আর্থিকভাবে আমরা অনেকেই লাভবান হয়েছি। কিন্তু সামষ্টিক জাতি হিসেবে আমাদের স্বচ্ছলতা অনেক পিছিয়ে। ধনীরা শুধু ধনী হচ্ছে আর গরীব শুধু গরীবই হচ্ছে। দেশের জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ এখনও দরিদ্রতার শেষ সীমার নীচে অবস্থান করছে। তাদের দারিদ্রতা বিমোচনে রাষ্ট্রের ভূমিকা সন্তোষজনক বলা যায় না।

স্বাধীনতার পরথেকে বারবার ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। কেউ জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতার মসনদে বসেছেন আবার কেউ স্বৈরাচারী কায়দায় বসেছেন। যে যেভাবেই বসুন না কেন, দেশ ও জাতির অবস্থার বিশেষ কোন পরিবর্তন তারা করতে পারেননি। পরিবর্তন করেছেন তারা তাদের নিজেদের। পরিবর্তন করেছেন তাদের পরিবার পরিজনদের।

আজকের সমাজে নীতিনৈতিকতা বলতে কিছুই নেই। নীতি, আদর্শ, নিষ্ঠা সব যেন আমরা ভূলতে বসেছি। সমাজের প্রতিটি স্থরে নীতিনৈতিকতার অবক্ষয় ঘটেছে চরমভাবে। অন্যায়, দুর্নীতি সমাজের আজ চরম ব্যাধি। সমাজের উপর থেকে একেবারে নীচ পর্যন্ত এ ব্যাধিতে আক্রান্ত। মানুষ স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছিলো, রক্ত দিয়েছিলো, প্রাণ দিয়েছিলো সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, দুর্নীতিমুক্ত একটি দেশ গড়তে। অসুস্থ রাজনীতি থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে। একটি সুন্দর, সুখী সমৃদ্ধশালী সমাজ ও রাষ্ট্র গড়তে। কিন্ত এগুলো কই? এগুলো আজও শুধু শ্লোগান আর বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।

আজকের বাংলাদেশে মানবাধিকার বলতে কিছুই নেই। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নেই। মিডিয়া কর্মীর স্বাধীনতা নেই। নিরাপত্তা নেই। মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা নেই। একজন লেখকের লেখার স্বাধীনতা নেই। অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে সভা-সমাবেশ করার অধিকার নেই। নারীদের ইজ্জত আব্রুর নিরাপত্তা নেই। প্রতিদিন নারীরা নির্যাতন হচ্ছে। ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। দেশের কোনো না কোনো স্থানে প্রতিদিন মানুষ খুন হচ্ছে। গুম হচ্ছে। অপহরণ হচ্ছে। ঘর থেকে নিরাপরাধ মানুষদের মিথ্যা মামলা দিয়ে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় অপরাধীরা বিনা সাজায় জেল থেকে মুক্তি পাচ্ছে। আইন, আদালত, প্রশাসন সহ সবকিছু দলীয়করন করা হচ্ছে। সীমান্তে ভারতীয় বি এস এফ কর্তৃক দেশের মানুষ প্রায়ই হত্যার শিকার হচ্ছে। দেশের অকুতোভয় সূর্যসন্তানরা এসব পাওয়ার জন্য কি যুদ্ধ করেছিলো?

জাতি আজ হতাশ। চারিদিকে আতংক। সময়ের চাকা যতোই ঘুরছে মানুষের মনে ততোই দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ আর উৎকন্ঠা বেড়েই চলেছে। কিভাবে এ দেশ শান্তি হবে। কারা এ বর্বর সমাজ পরিবর্তনের উদ্যোগ নিবে। কবে মানুষ তার মৌলিক অধিকার ভোগ করতে পারবে। কখন জানমাল ইজ্জতের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। আর কত বছর অপেক্ষা করতে হবে বৈষম্যহীন সুন্দর একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার। এ সব কথা আজ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখে মুখে।

দীর্ঘ চারদশকে অসুস্থ রাজনীতি জাতিকে কি দিতে পেরেছে, আর বর্তমানে কি দিচ্ছে আজকে রাজনৈতিক নেতাদের ভাবতে হবে। আত্মসমালোচনা করতে হবে। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে ইতিহাস বিকৃত করা যাবে না। জাতীয় বিষয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে কেউ রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করলে জাতি ক্ষমা করবে না। স্বাধীনতা যুদ্ধের বিজয় এককক কোন দল বা গোষ্ঠীর কৃতিত্ব নয়। এ বিজয় অর্জনে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের অবদান রয়েছে। এখানে কাউকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বিজয়ের কৃতিত্ব, স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা, কে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি আর কে বিপক্ষের শক্তি এসব বিষয়ে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে তা অবসান হওয়া উচিত। এসব বিতর্ক সুস্থ রাজনীতি চর্চায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে প্রতিনিয়ত। উন্নতি ও অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাড়িয়েছে। মনে রাখবেন, অসুস্থ রাজনীতির চর্চা বন্ধ না হলে আমরা শুধু অর্থনৈতিকভাবেই পিছিয়ে পড়বো না, বিদেশেও অসভ্য জাতি হিসেবে চিহ্নিত হবো।

গোটা জাতির ভাগ্যের পরিবর্তনে দল-মত নির্বিশেষে সকলকে একযোগে কাজ করে যেতে হবে। উন্নত রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তা নিরসনে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। নিজেদের কল্যাণে নয়, দেশ ও জাতির কল্যাণে করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। ঐকমত্যে পৌছতে হবে। অতীতের সমস্ত ভেদাভেদ ও অন্তর্দন্দ্ব ভুলে জাতীয় কল্যাণের অনির্বাণ চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে সকলকে একযোগে কাজ করে যাওয়ার বিকল্প নেই।

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ