মে দিবস ও শ্রমিক ভাবনা
- Update Time : ১২:৩৩:৫৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ মে ২০১৮
- / ১ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
হুসাইন আহমদ মিসবাহ
আজ মহান মে দিবস। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। ইন্টারন্যাশনাল লেভার ডে। আমেরিকার শিকাগো শহরের “হে মার্কেটে”র শহীদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করে পালিত হয় দিনটি। ১৮৮৬ সালের এই দিনেই দৈনিক ৮ ঘন্টা শ্রমের দাবিতে ১১ জন শ্রমিক জীবন দেয়। পরে আর ৬ জনের ফাসী হয়। সেই থেকে দিবসটি পালিত হচ্ছে।
ঊনিশ শতকের প্রথম দিক। শ্রমিকরা ছিল শোষিত, বঞ্চিত। কাজ করতে হত সপ্তাহে ৬ দিন, ১০ থেকে ১২ ঘন্টা। পারিশ্রমিক মিলত নগন্য। অনিরাপদ পরিবেশে রোগ-ব্যধি, আঘাত, মৃত্যুই ছিল তাদের নির্মম সাথী। তাদের পক্ষ বলার মত কেউ ছিলনা।
১৮৬০ সালে শ্রমিকরা দৈনিক ৮ ঘন্টা শ্রম নির্ধারনের প্রথম দাবি জানায়। কিন্তু তাদের কোন শ্রমিক সংগঠন ছিলনা বলে এই দাবী জোরালো করা সম্ভব হয়নি। শ্রমিকরা বুঝতে পারে বণিক ও মালিক শ্রেণীর এই রক্ত শোষণ নীতির বিরুদ্ধে তাদের সংগঠিত হত হবে। ১৮৮০-৮১ সালের দিকে শ্রমিকরা প্রতিষ্ঠা করে Federation of Organized Trades and Labor Unions of the United States and Canada [১৮৮৬ সালে নাম পরিবর্তন করে করা হয় American Federation of Labor]। এই সংঘের মাধ্যমে শ্রমিকরা সংগঠিত হয়ে শক্তি অর্জন করতে থাকে। ১৮৮৪ সালে তারা ‘৮ ঘন্টা দৈনিক মজুরি’ নির্ধারনের প্রস্তাব পাশ করে এবং মালিক ও বণিক শ্রেণীকে এই প্রস্তাব কার্যকরের জন্য ১৮৮৬ সালের ১লা মে পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়।
কিন্তু বণিক-মালিক শ্রেণীর কোন ধরনের সাড়া না পেয়ে শ্রমিকরা ধীরে ধীরে প্রতিবাদি ও প্রস্তাব বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হতে থাকে। তখন “এলার্ম” নামক একটি পত্রিকার কলাম “একজন শ্রমিক ৮ ঘন্টা কাজ করুক কিংবা ১০ ঘন্টাই করুক, সে দাসই” শিরোনামে প্রকাশিত লেখা যেন জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢালে। জোরদার হয় ১লা মে’র প্রস্তুতি।
পাশাপাশি ১লা মে’কে মোকাবেলায় রাষ্ট্রীয় দমননীতির প্রস্তুতি চলতে থাকে। পুলিশ ও জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা শিকাগো সরকারকে অস্ত্র সংগ্রহে অর্থ দিয়ে সহযোগিত করে।
১লা মে ১৮৮৬ সালে সমগ্র যুক্ত্ররাষ্ট্রে প্রায় ৩,০০,০০০ (তিন লক্ষ) শ্রমিক তাদের কাজ ফেলে রাস্তায় নেমে আসে। শিকাগোতে শ্রমিক ধর্মঘট আহবান করা হয়, প্রায় ৪০,০০০ (চল্লিশ হাজার) শ্রমিক কাজ ফেলে শহরের কেন্দ্রস্থলে সমবেত হয়। অগ্নিঝরা বক্তৃতা, মিছিল, মিটিং, ধর্মঘট, বিপ্লবী আন্দোলনের হুমকি সবকিছুই মিলে ১লা মে উত্তাল হয়ে উঠে। আন্দোলনকারী শ্রমিকদের সংখ্যা বেড়ে পৌছায় প্রায় ১লক্ষতে। আন্দোলন চলতে থাকে।
হঠাৎ দূরে দাড়ানো পুলিশ দলের কাছে এক বোমার বিস্ফোরন ঘটে, এতে এক পুলিশ নিহত হয় এবং ১১ জন আহত হয়, পরে আরো ৬জন মারা যায়। পুলিশবাহিনীও শ্রমিকদের উপর অতর্কিতে হামলা শুরু। ১১ জন শ্রমিক শহীদ হন। পুলিশ হত্যা মামলায় আটজনকে অভিযুক্ত করা হয়। এক প্রহসনমূলক বিচারে ১৮৮৭ সালের ১১ই নভেম্বর উন্মুক্ত স্থানে ৬ জন শ্রমিকের ফাঁসি কার্যকর করে।
শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের “দৈনিক আট ঘন্টা কাজ করার” দাবী অফিসিয়াল স্বীকৃতি পায়। আর ১মে বা মে দিবস প্রতিষ্ঠা পায় শ্রমিকদের দাবী আদায়ের দিন হিসেবে।
শ্রমিকের গুরুত্ব:
শ্রমিককে কাজ দিয়ে বা শ্রমিকের পারিশ্রমিক দিয়ে আমরা ভাবি, শ্রমিকের প্রতি দয়া করছি। কিন্তু বাস্তবতা তার বিপরিত। শ্রমিককে কাজ বা পারিশ্রমিক দিয়ে আমরা দয়া করছিনা, বরং শ্রমিকরা আমাদের কাজ করে, পারিশ্রমিক নিয়ে, আমাদেরকে দয়া করছে। কিভাবে? বুঝিয়ে বলছি।
মনে করেন একজন রিক্সা শ্রমিক। সে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, আমাদেরকে ২/৪ কিঃমিঃ বহন করে। বিনিময়ে আমরা তাকে ১০/১৫ টাকার কাগজী নোট হাতে দিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলি! কিন্তু কখনো কি ভেবেছি! ১০/১৫ টাকার বিনিময়ে আমরা কি সে কাজ করতে পারবো? তারা যদি না করে, তাহলে আমাদের টাকা কি আমাদেরকে ২/৪ কিঃমিঃ বহন করে নিয়ে যেতে পারবে?
ঘরের কাজের লোক আমাদের সকল কাজ করে দেয়, আর আমরা পায়ের উপর পা তুলে দিনাতিপাত করি। বিনিময়ে তাদেরকেও দেই কিছু কাগজী মুদ্রা, সাথে উচ্ছিষ্ট খাবার। কখনো কি ভেবেছি! যদি তারা এই কাজ না করতো, টাকা দ্বারা কি সে কাজ হত? সাহেব ও বেগমকে কি কাজের ছেলে ও কাজের মেয়ে হওয়া লাগতোনা?
শ্রমিকরা যদি হাড়ভাঙ্গা খাটুনি দিয়ে ফসল না ফলাতো, তাহলে জিবিকা নির্বাহের তাগিদে সাহেবদেরকে কি হাল চাষ করতে হতনা? কাপড় শ্রমিকরা যদি কাপড় না বুনতো, সম্ভ্রম বাচাতে এলিট শ্রেণীকে কি কাপড় বুনতে হতনা? ইত্যাদি ইত্যাদি।
অর্থাৎ শ্রমিকরা যদি কাগজী মুদ্রার বিনিময়ে আমাদের কাজ করে না দিত, তাহলে হার্ড পরিশ্রমের সকল কাজ আমাদেরকেই করতে হত। আমাদের টাকা কোন কাজ করে দিতে পারেনা। শ্রমিকরা টাকার বিনিময়ে যা করে, আমরা টাকার বিনিময়ে তা করবোনা বা করতে পারবোনা। তাই সবাইকে শ্রমিকের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিৎ।
মনে রাখতে হবে, আজ যে শ্রমিক, কাল সে মালিক হয়ে যেতে পার। আর আজ যে মালিক, কাল সেও শ্রমিকে পরিণত হতে পারে। এর বাস্তব দৃষ্টান্ত সমাজে বিদ্ধমান।
ইসলামে শ্রমিক অধিকার :
সকল অধিকারের ক্ষেত্রেই ইসলাম সজাগ দৃষ্টি রাখার তাগিদ দিয়েছে। বান্দার অধিকার, আল্লাহর অধিকার, সবগুলো যথাযথ ভাবে আদায়ের নির্দেশ দিয়েছে। বিশেষ ভাবে গুরুত্বারোপ করেছে, শ্রমিক অধিকারে।
বিশ্বনবী মুহাম্মদ সা. বলেন,
اعطوا اجيرا اجره قبل ان يجف عرقه
অর্থাৎ শ্রমিকের গায়ের গাম শুকানোর পূর্বেই তার প্রারিশ্রমিক পরিশোধ কর। মানে, পরিশ্রম করার পর, শ্রমিক যে ক্লান্ত হয়, তার সেই ক্লান্তিভাব দূর হওয়ার আগেই তার প্রাপ্য তাকে বুঝিয়ে দিতে হবে, সেটাই ইসলামের নির্দেশ।
অন্য হাদিসে, রহমতের নবী সা. বলেন, “এ ব্যাপারে উত্তম হল, শ্রমিকের পুরো পারিশ্রমিক দেওয়ার পর তাকে আরো কিছু অতিরিক্ত হাদিয়া (বখশিশ) হিশেবে দেওয়া।” যাতে শ্রমিক উৎসাহী হয়, কাজে বেশি মনযোগী হয়। দাতাও সাওয়াব পান।
পাশাপাশি ইসলাম শ্রমিকের সাথে সুন্দর ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে। শ্রমিকদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে বলেছে। হযরত আনাস রা. বলেন, “আমি ১০ বছর নবী সা. এর ঘরে কাজ করেছি। কিন্তু এই ১০ বছরে নবী সা. আমাকে কোন দিন ধমক দেননি, কখনো কঠু কথা বলেন নি।”
তাই আমাদের উচিৎ, শ্রমিকের পারিশ্রমিক যথা সময় পরিশোধ করা। সাথে হাদিয়া হিশেবে অতিরিক্ত কিছু দেওয়া। শ্রমিকের সাথে সুন্দর আচরণ করা।
(লেখক : কলামিস্ট ও শিক্ষাবিদ। মোবাইল ০১৭১২ ১০০০৫৭)



















