বিশুদ্ধ কোরআন পাঠ শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিকতায় আল্লামা ফুলতলি (র.)-র বৈপ্লবিক অবদান- সৈয়দ মবনু
- Update Time : ০৫:১৯:৫৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৭
- / ১ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
বিশুদ্ধ কোরআন পাঠ শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিকতায় আল্লামাফুলতলি (র.)-র অবদান তাঁর জীবনের এক অনন্য কীর্তি। সহীহ কোরআন শিক্ষার জন্যও যে প্রতিষ্ঠান হতে পারে, কিংবা প্রজেক্ট করা যায় তা আল্লামাফুলতলি (র.)-এর আগে আমাদের দেশের সর্বসাধারণের তেমন একটা ধারণা ছিলো না। দারুল ক্বিরাত মজিদিয়া ফুলতলি ট্্রাষ্ট গঠনের মাধ্যমে ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে আল্লামা ফুলতলি (র.) তাঁর নিজ বাড়িতে সহীহ কোরআন পাঠের প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করেন। আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলি (র.)-র এই বৈপ্লবিক অবদানের কথা জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ রাখবে বলে আমাদের বিশ্বাস। লোকমুখে শোনা যায়, আল্লামা ফুলতলি (র.) প্রথম জীবনে বিভিন্ন অঞ্চলে পায়ে হেটে, ঘোড়ায় চড়ে দীর্ঘপথ অতিক্রম করে অবৈতনিকভাবে ক্বিরাতের দরস্ দিতেন। তিনি বিভিন্ন অঞ্চলে গেলে লোকেরা জামায়েত হয়ে যেতেন ক্বিরাত মশ্ক করতে। তিনি খুব ধৈর্য সহকারে উপস্থিত জনসাধারণকে ক্বিরাতের মশ্ক করিয়ে যেতেন। তাঁর এই কর্মময় জীবনের বিভিন্ন কথা আজও সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চলে কিংবদন্তীর মত ছড়িয়ে আছে। তাঁর এই সাধনা-চেষ্টারই ফসল ‘দারুল ক্বিরাত মজিদিয়া ফুলতলি ট্্রাষ্ট’। সাত সদস্য বিশিষ্ট ট্রাষ্টি বোর্ডে আল্লামা ফুলতলি (র.) শুরু থেকে আজীবন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। এই ট্্রাষ্ট মূলত তাঁর শ্রদ্ধাভাজন বাবা মরহুম হযরত মাওলানা মুফতি আব্দুল মজিদ চৌধুরী (র.)-এর নামানুসারে করা হয়েছে। আল্লামা ফুলতলি (র.) তাঁর ভূ-সম্পত্তির প্রায় ৩৩ একর জমি এই ট্রাষ্টের নামে ওয়াক্ফ করে দিয়ে ছিলেন। দেশ-বিদেশে এই ট্রাস্টের অসংখ্য শাখা রয়েছে। আমাদের একটা বিশ্বাস আল্লামা ফুলতলি (র.)-র অন্য সকল আমলের কথা বাদ দিয়েও যদি কিয়ামতের দিন শুধু কোরআন সহীহ করার আমলকে হিসাব করা হয় তবে মহান আল্লাহ পাক তাঁকে জান্নাতে দিয়ে দিবেন। ‘যারা কোরআন শিখে এবং যারা কোরআন শিখায় তারা মানবজাতির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ট’ হযরত রাসুল (স.)-এর এই ঘোষনাকে সামনে নিয়ে আমরা আল্লামা ফুলতলি (র.)-কে তাঁর সময়ের একজন শ্রেষ্ট মানুষ বলে স্বীকার করে নিতে পারি।
দ্বীনি শিক্ষা বিস্তারে অাল্লামা ফুলতলির অবদান
জীবনের শুরু থেকে আল্লামা ফুলতলি (র.) দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে বেশ যত্নশীল ছিলেন। তিনি অসংখ্য মাদরাসা, মক্তব প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশ-বিদেশে অসংখ্য মাদরাসা, মক্তব, মসজিদ প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত কিংবা তাঁর অনুপ্রেরণায় প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সংখ্যা এতো অধিক যে তালিকা লিখতে গেলে প্রচুর স্থানের প্রয়োজন। মৃত্যুকালিন সময়েও তাঁর সরাসরি নির্দেশনায় কিংবা তত্ত্ববধানে প্রায় দু’শ মাদরাসা পরিচালিত হতো। আল্লামা ফুলতলি (র.) বাংলাদেশ আলিয়া মাদরাসার শিক্ষকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ জমিয়াতুল মুদাররেছীন’-এর উপদেষ্টা এবং বৃহত্তর সিলেট ভিত্তিক মাদরাসা শিক্ষকদের সংগঠন ‘আন্জুমানে মাদারিছে আরাবিয়া’-র পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। দ্বীনি শিক্ষা প্রচার এবং প্রসারে আল্লামা ফুলতলি (র.)-এর এই অবদান আমাদের জাতীয় ইতিহাসে গৌরবোজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
বৃদ্ধা নিবাস
মানুষের শিশুকাল আর বৃদ্ধকাল খুব অসহায়ত্বের ভেতর কাটে। শিশুকালের অসহায়ত্ব তেমন বুঝা না গেলেও বৃদ্ধকালের অসহাত্ব হাড়ে হাড়ে অনুভব করে মানুষ। অনেক বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধাকে তার সন্তানেরা অসহ্যকরও মনে করে বিভিন্ন কথা-বার্তার মাধ্যমে কষ্ট দিতে দেখা যায়। যদিও পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তা’আলার ঘোষনা রয়েছে-‘ পিতা মাতার সাথে উত্তম ব্যবহার করো; যদি তাঁদের একজন কিংবা উভয় তোমাদের সামনে বার্ধক্যে উপনীত হন তবে তুমি তাদের প্রতি উহঃ শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না এবং বলো তাদেরকে শিষ্টাচারপূর্ণ কথা। এবং তাদের সামনে ভালোবাসার সাথে নম্রভাবে বাহু নত করে দাও এবং বলো, হে মালিক! তাঁরা শৈশবে আমাকে যেভাবে স্নেহ-যত্নে লালন-পালন করেছেন, তুমি তাদের প্রতি সেভাবে সদয় হও।(সুরা বনি ইসরাঈল, ২৩-২৪)। অনেক বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধাকে আমরা দেখে থাকি নিজের মৃত্যু কামনায় চোখের জল ফেলতে। আবার অনেককে দেখার মতো লোকও নেই। বিশেষ করে এক্ষেত্রে মহিলারা বেশি অসহায়ত্বে থাকেন। হযরত নবি করিম (স.) মহান আল্লাহর কাছে নিজের বাদ্ধক্য থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। বিভিন্ন দেশে সরকারীভাবে বৃদ্ধা নিবাসের ব্যবস্থা থাকলেও বাংলাদেশে তা নেই। বেসরকারীভাবে এই সংস্কৃতি এখনও ব্যাপকহারে তেমন প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি। আল্লামাফুলতলি (র.) তাঁর নিজ গ্রাম ফুলতলিতে বৃদ্ধা মহিলাদের জন্য একটা বৃদ্ধা নিবাস প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। তাঁর এই কর্ম থেকে আমাদের শিক্ষা নিয়ে শুধু মাদ্রাসা আর মসজিদ নিয়ে নয়, সামাজিক এবিষয়টিও ভাবতে হবে।
ফ্রি চিকিৎসা কেন্দ্র স্হান
অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান এবং চিকিৎসা মানব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনগুলোর অন্যতম। সুস্বাস্থ্য একটি বিশাল নিয়ামত। হযরত মুসা (আ.)-এর জীবনের একটি ঘটনা প্রচলিত আছে যে, একদিন তিনি আল্লাহকে প্রশ্ন করলেন-হে মাবুদ, কিছুক্ষনের জন্য যদি তুমি মুসা হয়ে যাও আর আমি হয়ে যাই আল্লাহ। তুমি আমাকে যে সুযোগ দিয়েছো সেই সুযোগ তোমাকে আমি দেই, তাহলে তুমি আমার কাছে কি প্রার্থনা করতে? সুবহানাল্লাহ, আল্লাহ তখন উত্তরে বলেন-এমন হলে আমি তোমার কাছে সুস্বাস্থ্য কামনা করতাম। এই ঘটনার সত্য-মিথ্যা নিয়ে আমাদের আলোচনার প্রয়োজন নেই। সুস্বাস্থ্য যে অতন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফজিলত তা হযরত নবি করিম (স.)-এর হাদিস থেকেও আমরা জানতে পারি। হাদিসের কিতাবগুলোতে চিকিৎসা বিষয়ক পৃথক অধ্যায়ই রয়েছে। বর্তমান বাংলাদেশের সরকারী হাসপাতালগুলোতে নিম্নমানের থাকা-খাওয়া এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা, সরকারী ডাক্তারদের প্রাইভেট চিকিৎসা ব্যবসা, আর বেসরকারী ক্লিনিকগুলোর গলাকাটা পদ্ধতির ফলে দরিদ্র মানুষগুলো সুচিকিৎসার অভাবে সুস্বাস্থ্য থেকে প্রায় বঞ্চিত বলতে হবে। আল্লামাফুলতলি (র.) দরিদ্র মানুষদের সুচিকিৎসার জন্য তাঁর নিজ গ্রামে একটি ফ্রি চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করে গেছেন। তিনি একটা শুরু করে গেলেন তাঁর নিজ গ্রামে, আমরা যদি এই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আমাদের প্রত্যেকের গ্রামে এভাবে ফ্রি চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারি তবে আমরা গোটা জাতি এক সময় চিকিৎসা বিষয়ক অসুবিধা থেকে মুক্তি লাভ করতে পারি। হয়তো কেউ বলতে পারেন ফুলতলি সাহেবের সুযোগ ছিলো যোগ্যতার এবং অর্থের, আমাদের তা নেই। সাধারণ দৃষ্টিতে কথাটা সত্য হলেও পরিকল্পিত কর্মের জন্য এটা কোন বিষয় নয়। আমরা হয়তো তাঁর মতো একা পারবো না, কিন্তু সংঘবদ্ধ হলে কেনো সম্ভব হবে না? আল্লাহর হুকুমে নিশ্চিত সম্ভব। এখানে প্রয়োজন শুধু সৎ উদ্যোগের। আশা করি আমরা সবাই এপথে এগিয়ে আসবো।
শিক্ষা কল্যাণ প্রকল্প
বাংলাদেশের প্রধান সমস্যাগুলোর একটি অন্যতম সমস্যা শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা। আর এই পিছিয়ে থাকার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে একটি হলো অর্থনৈতিক সমস্যা। আল্লামা ফুলতলি (র.) গরীব-দুঃস্থ ছাত্রদের সাহায্যার্থে ‘লতিফিয়া শিক্ষা কল্যাণ প্রকল্প’ নামে শিক্ষা বৃত্তি প্রকল্প চালু করেন। এই প্রকল্প থেকে প্রতি বছর অসংখ্য ছাত্রকে বৃত্তি দেওয়া হয়।
এতিমখানা
আদরের সাথে কেউ যদি একজন এতিমের মাথায় হাত রাখে তার প্রতি মহান আল্লাহ সন্তোষ্ট হয়ে যান। এটা হাদিসের কথা। আল্লামা ফুলতলি (র.) তাঁর জীবদ্দশায় ‘ লতিফিয়া এতিমখানা’ নামে একটি বিশাল আকারের এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করে মূলত তাঁর মাওলাকে সন্তোষ্ট করতে চেয়েছেন। বিভিন্ন স্থান থেকে এতিমরা এই প্রতিষ্ঠানে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে থাকা, খাওয়া এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা লাভ করে থাকেন।
লঙ্গরখানা
অসহায় ও প্রতিবন্ধীদের মধ্যে বিনামূল্যে খাদ্য বিতরণের স্থায়ী প্রকল্প হিসেবে তিনি তাঁর নিজ গ্রাম ফুলতলিতে একটি লঙ্গরখানা চালু করেছিলেন।
এ ছাড়াও আরো অসংখ্য কর্ম রয়েছে তাঁর সমাজ উন্নয়ন প্রকল্পে। আল্লামাফুলতলি (র.) এর এই কর্মগুলো সামনে নিয়ে আমরা বলতে পারি তিনি শুধু খানকা কেন্দ্রিক পির ছিলেন না। মাটি এবং মানুষের প্রতিও তাঁর দায়িত্ববোধ ছিলো। আর এই দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ময়দানে খুব সরব হয়ে উঠতেন।
(চলবে)



















