স্মরণঃ স্মৃতিতে অম্লান প্রিয় ওস্তাদ আলহাজ্ব হাফিজ মোঃ সফর আলী (রঃ)
- Update Time : ০৫:৩৮:২৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ আগস্ট ২০১৭
- / ১ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
হাফিজ মোঃ আসাদুজ্জামান আসাদ
মানুষ এই পৃথিবীতে চিরজীবি নয়। প্রত্যেক মানুষকে মৃত্যু নামক চিরন্তন নিয়তির স্বীকার হতে হয়। ক্ষণস্থায়ী এ পৃথিবীতে এমন কিছু কিছু মানুষ জন্মলাভ করেন, যারা তাঁদের অনুকরণীয় জীবনাদর্শ আর মহৎ কার্যাবলীর দ্বারা মানব হৃদয়ে অমরত্ব লাভ করে থাকেন। তাদের মধ্যে হযরত আল্লামা আলহাজ্ব হাফিজ মোঃ সফর আলী (রঃ) ছিলেন একজন ছুন্নী আলেমে দ্বীন,বিজ্ঞ হাফিজে কোরআন, মানুষ গড়ার কারিকর এবং পুরোধা ব্যক্তিত্ব।
সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার ৩-নং মীরপুর ইউনিয়নের অন্তর্গত হলিয়ার পাড়া গ্রামের ঐতিহ্যবাহী সারংবাড়ীতে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯৫০ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। তিনির বাবার নাম মরহুম মোঃ তবারক আলী। তেমন শিক্ষিত ছিলেন না,তবে পরহেজগার, নামাজী, মুত্তাকী ও সহজ সরলপ্রাণ মানুষ হিসেবে এলাকায় পরিচিত ছিলেন। তিনির মায়ের নাম মরহুমা মোছাঃ করফুল নেছা ছিলেন একজন গৃহিণী। বংশ পরিচয়ে তিনি ছিলেন হযরত পীর পেঁচন শাহ (রঃ) ও হযরত পীর লাল শাহ (রঃ) এর বংশধর। চার ভাই এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়।
সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান হিসেবে তাঁর চাচা (বাবার চাচাত ভাই, ঐ সময়ের জগন্নাথপুর থানার একমাত্র হাফিজে কোরআন,যিনি বৃহত্তর সিলেটের একজন স্বনামধন্য হাফিজ ও আলেমেদ্বীন ছিলেন) হযরত আল্লামা আলহাজ্ব হাফিজ আকবর আলী (রঃ) নিকট হতে অতি অল্প সময়ে মক্তব শিক্ষার পাশাপাশি পবিত্র কোরআন শরীফ হিফজ সম্পন্ন করেন।পরবর্তীতে চাচা ও ওস্তাদের অনুমতি নিয়ে সিলেটস্থ বরইকান্দি হুফ্ফাজুল কোরআন মাদরাসায় বছরখানেক অধ্যয়ন করেন এবং বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দাখিল পরীক্ষায় কৃতিত্বের সহিত উত্তীর্ণ হন এবং থানা বাজার কেরাত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হতে কেরাত ও তাজবীদের ওপর সার্টিফিকেট অর্জন করেন। অতিরিক্ত পারদর্শিতার জন্য তিনি আরবী, উর্দু ও ফারসী বিষয়ে ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। চিকিৎসা সেবার মহান ব্রত নিয়ে হোমিও প্যাথিকের ওপর ও লেখাপড়া করে স্থানীয় মীরপুর বাজার ও কেউন বাড়ী বাজারে ছোটখাটো চেম্বার খুলে মানব সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেন।
১৯৭৮ খ্রীষ্টাব্দে স্থাপিত অত্র এলাকার স্বনামধন্য ও প্রাচীন দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্টান হলিয়ার পাড়া জামেয়া কাদেরিয়া সুন্নিয়া দাখিল মাদরাসায় (বর্তমানে ফাজিল পর্যায়ে উন্নীত) প্রতিষ্টাকালীন শিক্ষক হিসেবে যোগদান করে ২০১৫ খ্রীষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে অবসর গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত অত্যন্ত সুনাম ও দক্ষতার সহিত দায়িত্ব পালন করে গেছেন। হলিয়ার পাড়া মাদরাসায় শিক্ষকতার পাশাপাশি সম্পূর্ণ নিজ ব্যবস্থাপনায় তাঁর বাড়ীতে হিফজুল কোরআন বিভাগ চালু করেন। নিয়মিত ১৫ থেকে ২০ জন ছাত্রকে কোন প্রকার পারিশ্রমিক ছাড়াই কোরআন শিক্ষা দিতেন,যা ছিল সম্পূর্ণ লিওয়াজহিল্লাহ। ঐ সময়ের ছাত্রদের মধ্যে আমি ও একজন ছিলাম। তিনি ছিলেন হাজার হাজার আলিমে দ্বীন ও হাফিজে কোরআনের ওস্তাদ। তিনির হাতেগড়া ছাত্ররা আজ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্টানের অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, সুপার /প্রধান শিক্ষক, অধ্যাপক, প্রভাষক, সহকারী শিক্ষকের পদ অলংকৃত করে আছেন। এছাড়া ও দেশে বিদেশে অনেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভালো অবস্থানে আছেন,যা তাঁর কষ্টের ফল।
সাংসারিক জীবনে তিনি ছিলেন বিবাহিত। তিনি ১৯৬৮ খ্রীস্টাব্দে মীরপুরস্থ ঐতিহবাহী নজিপুর নয়া বাড়ী নিবাসী, উপজেলার ৩ নং মীরপুর ইউনিয়ন পরিষদের স্বনামধন্য সাবেক চেয়ারম্যান, হলিয়ার পাড়া মাদরাসার অন্যতম প্রতিষ্টাতা, বিশিষ্ট ইসলামী ব্যক্তিত্ব মরহুম আলহাজ্ব আব্দুল বারী সাহেবের একমাত্র কন্যা মোছাঃ সজিবুন নেছার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
দাম্পত্য জীবনে তিনি ৫ ছেলে ও ৩ মেয়ের জনক। বড় ছেলে মোঃ জাহির উদ্দিন মাদরাসায় দাখিল পর্যন্ত লেখাপড়া করে বেশ কিছুদিন যুক্তরাজ্য প্রবাসী ছিলেন, মেঝো ছেলে মোঃ রফিক উদ্দিন ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করে বর্তমানে মীরপুর বাজারের একজন প্রতিষ্টিত ব্যবসায়ী এবং উপজেলা জাতীয় পার্টির রাজনীতির সাথে সরাসরি জড়িত, ৩য় ছেলে মোঃ মিজানুর রহমান মিজান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সিলেট এম,সি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএসএস ডিগ্রী লাভ করেন এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সিলেট মেট্রোপলিটন ল’ কলেজ থেকে এলএলবি, জালালাবাদ টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বি-এড ডিগ্রী লাভ করে প্রায় ১ বছর সিলেট জজ কোর্টে শিক্ষানবিশ এডভোকেট ছিলেন।মীরপুর পাবলিক হাই স্কুলে শিক্ষক স্বল্পতায় ২০১০ খ্রীস্টাব্দ থেকে ৩ বছর সেখানে অত্যন্ত সুনাম এবং দক্ষতার সহিত শিক্ষকতা করেন। বর্তমানে হলিয়ার পাড়া ফাজিল(ডিগ্রী) মাদরাসায় শিক্ষকতায় নিয়োজিত আছেন এবং উপজেলা বিএনপির রাজনীতির সাথে সরাসরি জড়িত। ৪র্থ ছেলে হাফিজ মোঃ তাজ উদ্দিন বাবুল একজন ভালো হাফিজে কোরআন।দীর্ঘদিন যাবৎ অত্যন্ত সুনামের সাথে উপজেলার বিভিন্ন জামে মসজিদে মাহে রমজানে খতমে তারাবীর নামাজ পড়িয়ে আসছেন পাশাপাশি ব্যবসা বানিজ্যের সাথে জড়িত, ৫ম ছেলে মোঃ হাফিজ উদ্দিন এসএসসি পাশ করার পর ভাইদের ব্যবসা বানিজ্যে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। ৩ মেয়ের মধ্যে মোছাঃ হাজেরা বেগম শিবলী ও মোছাঃ খাদিজা বেগম শেলী বিবাহিতা এবং সর্বকনিষ্ঠা মেয়ে মোছাঃ মারজানা বেগম লাভলী বর্তমানে সিলেট এম,সি কলেজে বিএসসি(পাস) এ অধ্যয়নরত।
তিনি ১৯৯৮ খ্রীস্টাব্দে পবিত্র মক্কা ও মদিনা জিয়ারত সহ হজ্বের যাবতীয় আনুসঙ্গিক কার্য্য সমাধা করেন। তিনি অত্যন্ত সহজ সরল স্বভাবের মানুষ ছিলেন খুব অল্প সময়ে তিনি যে কারোর সাথে মিশে যেতে পারতেন। রশিকতাপূর্ণ চালচলনে অতি সহজে মানুষের মন জয় করতে পারতেন। এজন্য ছাত্র শিক্ষক সহ সব পেশার মানুষ মন থেকে তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ভক্তি করত,বিশেষ করে হিফজের ছাত্রদের সাথে প্রতি তাঁর আন্তরিকতা ছিল অপরিসীম। সব সময় ২/৪ জন ছাত্র তাঁর সাথে থাকতো এবং তাদের সাথে কোরআনের আলোচনায় তিনি ব্যস্ত থাকতেন। তিনি পান সুপারী খেতে খুব বেশী পছন্দ করতেন।পান সুপারীর কৌটা সবসময় তাঁর সাথে থাকতো। একথা সর্বজন স্বীকৃত যে,প্রায় সকলেই তাঁর সাথের কৌটা হতে পান সুপারী খেয়েছেন।
জীবনের বেশীর ভাগ সময় তিনি পবিত্র মাহে রমজানে খতমে তারাবীর নামাজ পড়িয়েছেন। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় প্রায় ৪৭ বছর সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জামে মসজিদে অত্যন্ত শ্রুতি মধুর ও সুললিত কন্ঠে তারাবীর নামাজ পড়িয়েছেন। তিনি প্রতি রমজান মাসে বেশ কয়েকটি কোরআন খতম আদায় করতেন। চলাফেরায় তিনি সবসময় ঠোট নাড়তেন এবং মনে মনে কোরআন শরীফ তিলাওয়াত করতেন। প্রতি জুম্মার রাতে নিজ খরছে তাঁর বাড়ীতে সাপ্তাহিক শবিনার ব্যবস্থা করতেন। সারারাত ছাত্ররা তিলাওয়াত করতো আর তিনি জেগে জেগে ছাত্রদের তিলাওয়াত শুনতেন।
তিনি ইসলামী বিষয়ে প্রচুর গবেষণা করতেন এবং লেখােলখি পছন্দ করতেন। তিনি বেশ ক’ খানা ইসলামী পুস্তিকা রচনা করে গেছেন। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য-ছরকায়ে দু- জাহান ( না’তে রাসুল সঃ),১৩০ ফরজের বয়ান ও জরুরী মাছয়ালা মাছায়েল, ভক্তিমূলক গীতিকা ও জরুরী দোয়া দূরুদ।
২০১৪ খ্রীস্টাব্দের মার্চের দিকে হঠাৎ করে রোগ ব্যাধিতে তিনি আক্রান্ত হয়ে পড়েন। তিনির ছাহেবজাদারা ও আত্মীয় স্বজন অনেক চিকিৎসাসেবা দিলে ও ধীরে ধীরে তিনি দূর্বল হয়ে পড়েন।রোগ ব্যধিতে শারীরিকভাবে দূর্বল হলেও মনোবল কখনো ভাঙ্গেননি। অসুস্থ শরীর নিয়ে দায়িত্ব পালনে ও কোনরূপ অবহেলা তাঁর মাঝে পরিলক্ষিত হয়নি।
২০১৬ খ্রীস্টাব্দের জানুয়ারীর শুরুর দিকে শারীরিকভাবে অত্যন্ত দূর্বল হয়ে পড়েন এবং এ দূর্বলতা তাঁকে একেবারে কাবু করে ফেলে। ঐ বছরের ২৩ শে জুন সোমবার পবিত্র লাইলাতুল বরাতের পূণ্যময় রজনীতে স্বজ্ঞানে খুব বেশি নফল নামাজ,কোরআন তেলাওয়াত ও বিভিন্ন দোয়া দুরুদ বেশি বেশি পড়তে থাকেন। বাদ ফজর ঘরের সবাই নিজ নিজ ঘরে শুয়ে পড়লে ও তিনির শারীরিক অবস্থার অবনতিতে সকলেই জেগে ওঠেন। সকালে তাঁর নির্ধারিত নাস্তা এবং ঔষধ সেবন করে আপন বিছানায় শুয়ে পড়েন এবং শব্দ করে পবিত্র কালেমা ও দুরুদ পড়তে থাকেন। শয়ন অবস্থায় তিনির স্ত্রী, ছেলে -মেয়ে,ও নাতি নাতনী সবাই তাঁকে ঘিরে রাখলে মধুর কালেমা পড়ে পড়ে মহান আল্লাহ পাকের ডাকে সাড়া দিয়ে সকাল ১০:১০মিনিটে আমাদের সকলকে শোক সাগরে ভাসিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। (ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
মহান এই হাফিজে কোরআন ও আশিকে রাসুল (সাঃ) এর ইন্তিকালের পর পরই চতুর্দিকে এখবর ছড়িয়ে পড়ে। পার্শ্ববর্তী মসজিদগুলোর মাইকে তাঁর ইন্তিকালের খবর এলাকাবাসী কে জানিয়ে দেওয়া হয়। জগন্নাথপুর ও পার্শ্ববর্তী উপজেলায় তাঁর শোক সংবাদ প্রচারে ছড়িয়ে পড়ে মাইকিং এর গাড়ী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক ও ইন্টারনেটের কল্যাণে ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী তাঁর হাজার হাজার ছাত্র,ভক্ত ও আত্মীয় স্বজনের কাছে তাঁর ইন্তিকালের খবর দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে। সর্বত্র নেমে আসে শোকের ছায়া। অনেকেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। হাজার হাজার শোকাহত মানুষ তাদের প্রিয় মানুষটিকে শেষ বারের মত একনজর দেখতে ও জানাজায় শরীক হতে তাঁর বাড়ীতে ভীড় জমান।
ঐদিন বাদ আছর ঐতিহ্যবাহী মীরপুর পাবলিক হাই স্কুলের মাঠে নামাজে জানাজা অনুষ্টিত হয়।জানাজার পূর্বে বক্তারা তাঁর কর্মময় জীবন নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেন।তিনির ছাহেবজাদা হাফিজ মোঃ তাজ উদ্দিন বাবুলের ইমামতিতে অনুষ্টিত জানাজাায় সহস্রাধিক মুসল্লি অংশগ্রহণ করেন। জানাজা শেষে তাঁর শেষ ইচ্ছানুযায়ী নিজ বাড়ীতে সমাহিত করা হয়। পরিশেষে মহান আল্লাহ পাকের দরবারে প্রার্থনা, তিনি যেন তাঁর প্রিয় বান্দাকে জান্নাতুল ফিরদাউসের উচ্চ আসনে আসীন করেন।আমীন।
লেখকঃ শিক্ষক, আল জান্নাত ইসলামিক এডুকেশন ইন্সটিটিউট, ইসহাকপুর, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ।



















