স্বাগতম হিজরী নববর্ষ ১৪৪৩: মুসলিম জীবনে হিজরী সনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য : শাহ মমশাদ আহমদ
- Update Time : ০৩:৫৭:৩৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৯ আগস্ট ২০২১
- / ০ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
বর্ষ পরিক্রমায় আরও একটি হিজরী সন শুরু হতে যাচ্ছে, ১লা মুহাররাম হিজরী নববর্ষ। সবার তরে কামনা করি,
كل عام وانتم بخير। বছরের প্রতিক্ষণে, থাক সুখে-কল্যাণে।
মুলতঃ প্রিয় নবীর (সঃ) নবুওত প্রাপ্তির তের বছর পর মক্কা থেকে যে বছর মদিনায় হিজরত করেন, সে বছরকে প্রথম বছর ধরে হিজরী সন গণনার সুচনা হয়, প্রিয় নবী (সঃ) হিজরত করেন রবিউল আউয়াল মাসে, সে বছরের মুহাররাম মাসকে প্রথম মাস হিসাব করে হিজরতের বছরকে প্রথম বর্ষ ধরেই হিজরি সনের শুরু হয় বিধায় এ সনের নাম হিজরি সন। হিজরত থেকেই হিজরী। হযরত উমর (রাঃ) হিজরি সনের প্রবর্তন করেন।
পৃথিবীর আদিকাল থেকেই চঁন্দ্র ও সৌর হিসাবে দিনক্ষণ ও বছর গণনার প্রচলন চলে আসছে,পবিত্র কুরআনে দুনু পদ্ধতির কথা উল্লেখ আছে।
সুর্য যে বছর ও দিনক্ষণ হিসাব নিকাশের একটি মাধ্যম সে সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
و جعلنا الليل والنهار ايتين فمحونا اية الليل وجعلنا اية النهار مبصرة لتبتغو فضلا من ربكم ولتعلمو عدد السنين والحساب،،،،،بني اسراءيل
“আমি রাতের চিহ্নকে তিরোহিত করে দিনের চিহ্নকে দর্শনযোগ্য করলাম, যাতে তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ তথা রুজি রোজগার অন্বেষণ করতে পার এবং তোমরা বর্ষপঞ্জি ও দিনক্ষণের হিসাব অবগত হতে পার” (সুরা বনি ইসরাইল-১২)
অপরদিকে কুরআন কারিমে চাঁদকে আল্লাহ প্রদত্ত দিনক্ষণ ও বছর গননার মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে,
يسألونك عن الاهله قل هي مواقت للناس والحج،،،بقره
তারা তোমার নিকট নতুন চাঁদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, বলে দাও যে, এটি মানুষের জন্য সময় নির্ধারণ ও হজ্বের দিনক্ষণ নির্ধারণের মাধ্যম। (সুরা বাকারা ১৮৯)
অপর আয়াতে আল্লাহ বলেন,
وقدره منازل لتعلمو عدد السنين والحساب،،،يونس
আর তার জন্য নির্ধারিত করেছেন মানজিল সমুহ, যাতে তোমরা বছর গণনা ও হিসাব জানতে পার। (ইউনুস ৫)
তবে ইসলাম কতিপয় এবাদত ও বিধানকে চান্দ্রমাসের হিসাবের সাথে নির্দিষ্ট করে দিয়েছে, যেমন রমজানের রোজা, ঈদুল ফিতর ও আযহা, হজ্জ, লাইলাতুলকদর, শাবানের মধ্য রজনী, আশুরা ও আরাফা চাঁন্দ্র মাসের সাথে সম্পৃক্ত।
এছাড়া তালাকপ্রাপ্তা নারীর ইদ্দত ও বালেগ হওয়ার সময় চান্দ্রমাস হিসাবেই হতে হয়, সৌরবর্ষ ধর্তব্য নয়। তাই একজন মুসলিমের জীবনে চাঁন্দ্রমাস তথা হিজরি সনের গুরুত্ব সহজেই অনুমেয়।
&শরীয়তের বিধি বিধান কে চান্দ্রবর্ষের সাথে নির্ধারণ করার বহু হেকমত ও কারণ রয়েছে।
#সৌরবর্ষের হিসাব খুব জটিল, ইসলাম যেহেতু সার্বজনীন ও সর্বকালীন জীবন ব্যবস্থা, তাই সর্বসাধারণের বোধগম্য চান্দ্রবর্ষকেই নির্ধারণ করা হয়েছে, পর্বত চুড়া, জনমানবহীন দ্বীপ, সাগরের উত্তাল ডেউয়ে ভাসমান জাহাজে ও শিক্ষিত অশিক্ষিত সকলেই চান্দ্র হিসাব বুঝতে পারে। পক্ষান্তরে সৌরবর্ষ এত সহজ নয়।
#চান্দ্রমাসের সাথে এবাদাত সমুহ সম্পৃক্ত হওয়ার কারণে এবাদাতের মওসুম পরিবর্তন হয়, সব ঋতু ও মওসুমে এবাদাতের তৃপ্তি অনুভব করা যায়, এবাদাতকারী নতুনত্ব ও বৈচিত্রপুর্ন স্বাদ লাভ করার সুযোগ পায়।
সৌর বর্ষের সাথে নির্ধারিত হলে নির্দিষ্ট মওসুমে রোজা, হজ্ব ইত্যাদি এবাদাত পালন করতে হত, একগুয়েমি পরিলক্ষিত হত, এবাদাত বান্দিগীতে এরুপ মধুর স্বাদ পাওয়া যেতনা।
&হিজরি সনের আরও কিছু তাৎপর্য রয়েছে, প্রয়োজন সকল মুসলমানদের এক্ষেত্রে সচেতন হওয়া।
#হিজরি সন কবে থেকে শুরু হবে,এনিয়ে সাহাবায়ে কেরাম হযরত উমার (রাঃ) কে বিভিন্ন পরামর্শ দিলেন, বদরের বিজয় দিবসের বছর, মক্কা বিজয়ের বছর, প্রিয় নবীর (সঃ) জন্মের বছর, নবীজির ইন্তেকালের বছর, নবুওত লাভের বছর কে প্রথম বছর ধরে হিসাবের প্রস্তাব আসলেও হযরত উমর (রাঃ) হযরত আলীর (রাঃ) প্রস্তাবে হিজরতের বছরকেই প্রথম বছর ধরে হিজরী সনের প্রবর্তন করলেন।
তিনি এদিকেই ইঙ্গিত দিলেন, মুসলমান আনন্দ কে স্মরণীয় রাখেনা, মুসলমান স্মারক হিসেবে দ্বীনের তরে আত্মত্যাগের কথাই স্মরণ রাখবে, সারা বছর ব্যাপী ইসলামের জন্য ত্যাগ করে যাবে, মুসলিম মানেই ত্যাগের জাতী, ভোগের নয়।
#হিজরি সনের সুচনা হয় কারবালার স্মারক মুহাররাম মাস দিয়ে, শেষ হয় হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও ইসমাঈল (আঃ) এর আত্মত্যাগের স্মৃতিবাহী জিলহাজ্ব দিয়ে, যাতে মুসলমানদের বছরের সুচনা ও শেষ হয় ইসলামের জন্য ত্যাগ ও কুরবানী করে।
#হিজরী সনের প্রথম মাস হিসাবে মুহাররাম মাস মনোনীত করা হয়, এর কারন হিসেবে ইবনে হাজার আসকালানী (রহঃ)বলেন,যদিও হিজরতের ঘটনা রবিউল আউয়াল মাসে সংঘটিত হয়, কিন্তু প্রিয় নবী (সঃ) হিজরতের দৃঢ় সংকল্প করেন মুহাররাম মাসে, জিলহাজ্ব মাসে বাইয়াত সংগঠিত হওয়ার পর মুহাররাম মাসে হিজরত করার চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে সুযোগ মত রবিউল আউয়াল মাসে বাস্তবায়ন করেন, তা স্মরণীয় রাখতেই হিজরি সনের প্রথম মাস মুহাররাম রাখা হয়। আল্লাহ আমাদের হিজরি সনের তাৎপর্য অনুধাবন করে নিজ জীবন ইসলামের জন্য বিলিয়ে দেয়ার তাওফিক দিন। লেখক: মুহাদ্দিস ও কলামিস্ট, সিলেট।



















