সৌদি পাটানোর নামে প্রতারনার দায়ে ৪ জনকে গ্রেফতার করলো জামালগঞ্জ থানা পুলিশ
- Update Time : ০৭:৫০:৫৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ জুলাই ২০২৩
- / ০ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি :: সৌদিআরবে লোক পাটানোর নামে উদ্দেশ্যমূলক জালিয়াতি প্রতারনা ও অর্থ আত্মসাৎ এর দায়ে ৪ জনকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে প্রেরণ করেছে সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ থানা পুলিশ। মঙ্গলবার (২৫ জুলাই) ভোররাতে জেলার জামালগঞ্জ উপজেলার ভীমখালি ইউনিয়নের লক্ষীপুর নয়াহাটি গ্রামে অভিযান চালিয়ে তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়। জেলা পুলিশ সুপার মোঃ এহসান শাহ ও জামালগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মীর মোঃ আব্দুন নাসের এর নির্দেশে এসআই প্রণয় কুমার সরকার ও এএসআই মোঃ সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল পুলিশ তাদেরকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতরা হলেন,লক্ষীপুর নয়াহাটি গ্রামের মৃত আব্দুল হাসিমের পুত্র নুরু মিয়া (৫৫) ও সেলিম মিয়া (৪১),গ্রেফতারকৃত নুরু মিয়ার পুত্র সৌদি প্রবাসী রাসেল মিয়া (২৯) ও কন্যা শিপা বেগম (২১)।
জামালগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ বরাবরে ঐ পরিবারের ৬ জনসহ অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করেছেন ভূক্তভোগী মোঃ মোছাব্বির হোসেন (২৮)। তিনি উপজেলার ৬নং জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের ইনচানপুর গ্রামের মোঃ আলাল উদ্দিনের পুত্র।
মামলার আসামীরা হলেন জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাক ইউনিয়নের লক্ষীপুর নয়াহাটি গ্রামের পিতামৃত আব্দুল হাসিমের পুত্র নুরু মিয়া (৫৫) ও সেলিম মিয়া (৪১),গ্রেফতারকৃত নুরু মিয়ার পুত্র সৌদি রাসেল মিয়া (২৯) ও শামীম মিয়া ওরফে এমডি শামীম আহমদ (৩৫), নুরু মিয়ার স্ত্রী ফুলতারা বেগম ও কন্যা শিপা বেগম (২১) প্রমুখ।
মামলার বিবরণে প্রকাশ, জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাক ইউনিয়নের লক্ষীপুর নয়াহাটি গ্রামের নুরু মিয়ার দুই পুত্র শামীম মিয়া ওরফে এমডি শামীম আহমদ ও রাসেল মিয়া প্রবাসে থেকে মাঝেমধ্যে দেশে এসে সৌদিআরবে লোক পাটানোর নামে এলাকার সরল সহজ লোকজনকে বিদেশে প্রেরণের প্রলোভন দেখিয়ে ধোকা দিয়ে তাদের পিতা চাচা মাতা ও বোনের মাধ্যমে নগদ টাকা পয়সা হাতিয়ে নেয়। শামীম মিয়া দেশে অবস্থানকালে জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের ইনচানপুর গ্রামের মোঃ আলাল উদ্দিনের পুত্র ভূক্তভোগী মোঃ মোছাব্বির হোসেন, ধর্মপাশা উপজেলার শুকাইর রাজাপুর গ্রামের শহীদ মিয়ার পুত্র বায়জিদ মিয়া ও জালাল উদ্দিন এর পুত্র ইকবাল হোসেন এ তিনজন কে সৌদি প্রবাসে নেওয়ার কথা বলে ১৫ মাস পূর্বে প্রস্তাব দিয়ে নয় লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা প্রদানের জন্য বললে ভূক্তভোগীরা বাড়ী জমি ও গরু বাছুর বিক্রয় করে সরলমনে বিশ্বাস করত: বিভিন্ন তারিখ ও সময়ে তাদের বাড়ীতে গিয়ে পর পর ৩ দফায় নগদ নয় লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা প্রদান করেন। নুরু মিয়া ও তার স্ত্রী,ভাই ও কন্যারা বিদেশযাত্রী ৩ জনের কাছ থেকে নগদ টাকা সমজিয়ে গুনে গুনে নিজেদের বসত ঘরের আলমারীতে রাখে। প্রতারক রাসেল ২০২২ সালের ৮ মার্চ তারিখে দুপুর ১২.০৯ টায় এবং একই দিন দুপুর ১২.২১ টায় মোছাব্বির হোসেন এবং তার মা ও বাবার সাথে দুদফায় ফোনালাপ করে তাদেরকে ফ্লাইটের তারিখ ও সৌদি আরব পাঠানোর কথা বলে বিশ্বাস জন্মিয়ে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে অতিরিক্ত আরো টাকা দাবী করে। তাদের পক্ষে নুরু মিয়া ৮ মার্চ তারিখে দুপুর ১২.২৬ টায় একইভাবে ফোনালাপ করে পুত্র রাসেল এর নির্দেশমতে আরো টাকা প্রদানের জন্য মোছাব্বির কে হুকুম দেয়। (যাহার অডিও রেকর্ড পুলিশের কাছে সংরক্ষিত আছে। পরে প্রতারক শামীম, +৯৬৬৫৭২৩০৮০৯৭ নং বিদেশী নাম্বার হতে মোছাব্বিরকে কল করে এমডি শামীম আহমেদ ফাতেমা ট্রেভেলস ইন্টারন্যাশনাল,হাউজ ৩৩,রোড ১/এ,সুখনীড় বøক জে,বারিধারা ঢাকা ১২১২ এই ঠিকানায় তার ট্রেভেলসে গিয়ে তারা ৩ জনের পাসপোর্ট সংগ্রহ এবং ফিঙ্গার ও মেডিকেল করার জন্য নির্দেশ দেয়। প্রতারিত ৩ বিদেশযাত্রী যথারীতি শামীমের নির্দেশ মোতাবেক ঢাকায় রওয়ানা হলে,জাভেদ নামের এক ব্যক্তি তার ০১৬২৮-২৯১৫৩১ নং মোবাইল নাম্বার হতে মোছাব্বিরকে কল করে কথিত ফাতেমা ট্রেভেলসে এগিয়ে নিয়ে যায়। উক্ত জাভেদ নিজেকে প্রতারক শামীম ও রাসেলের লোক বলে পরিচয় দিয়ে তাদের ৩ জনকে মেডিকেলের জন্য রেইনবো হার্টস মেডিকেল সেন্টারে (বাড়ী নং ৭৯,বøক জে,৩য় তলা,এয়ারপোর্ট রোড,বনানী ঢাকা ১২১৩ ঠিকানায় নিয়ে মেডিকেল করায় এবং এক সপ্তাহ পরে সৌদিআরবে ফ্লাইটের তারিখ দেয়। প্রতারিত ৩ বিদেশযাত্রী পাসপোর্ট ও ফ্লাইটের টিকেট চাইতে গেলে,শামীম ও রাসেল তাদেরকে এক সপ্তাহ পর ফ্লাইটের সময় যথারীতি পাসপোর্ট ও বিমানের টিকেট দেয়া হবে বলে জানালে তারা খুশীমনে বিদেশের লাগেজ ক্রয় করত: এক সপ্তাহ পরে সৌদিআরব যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বাড়ীতে চলে আসে।
মেডিকেলের পর তারা বাড়ীতে এসে আত্মীয় স্বজনের বাড়ীতে দাওয়াত খেয়ে প্রতারকদের কথামতো এক সপ্তাহ পর ঢাকার উদ্দেশ্যে কথিত ফাতেমা ট্রেভেলসে গেলে প্রতারক জাভেদকে আর খুজে পায়নি। তখন ট্রেভেলসের অন্য লোকজন তাদেরকে তোমরা কোথায় থেকে এসেছ তোমাদেরতো কোন ফ্লাইট ভিসা নেই বললে তারা হাইমাউ করে কান্নাকাটি শুরু করে এবং ঐ প্রতারকগণ কর্তৃক উদ্দেশ্যমূলক জালিয়াতি প্রতারনার বিষয়টি জানতে পারে। এসময় তাদের মতো আরো ১০ জন বিদেশগামী প্রতারক শামীম রাসেল এবং তাদের কথিত ফাতেমা ট্রেভেলস এর প্রতারক সিন্ডিকেটচক্র কর্তৃক অনুরুপভাবে প্রতারিত হয়েছে বলে প্রত্যক্ষ করেন তারা।
পরবর্তীতে প্রতারকগণ কর্তৃক বিদেশে পাঠানোর নামে তাদের সাথে পরিকল্পিত জালিয়াতি প্রতারনার বিষয়টি তারা স্থানীয় গণ্যমান্য লোকজনদেরকে অবহিত করে। একপর্যায়ে ২০২২ইং সনের ১২ ডিসেম্বর সকাল ১০ টায় এলাকার স্থানীয় গণ্যমান্য লোকজন বিষয়টি বিচার সালিশের মাধ্যমে নিস্পত্তি করার জন্য বসলে নুরু মিয়া ও তার পরিবারবর্গরা তাদেরকে এই মর্মে আশ্বাস দেয় যে,কিছুদিনের মধ্যে তাদেরকে সৌদিআরবে নিয়ে যাবে না হয় তাদের সমুদয় (নয় লক্ষ পঞ্চাশ হাজার) টাকা ফেরত প্রদান করবে। কিন্তু অদ্যাবধি পর্যন্ত প্রতারকচক্রটি ভূক্তভোগীদেরকে বিদেশে পাটানোতো দূরের কথা পাওনা টাকাও ফেরত প্রদান করেনি।
২য় দফায় গত ৮ মার্চ বুধবার জামালগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ বরাবরে প্রতারিত মোছাব্বির বাদী হয়ে প্রতারকদের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করলে এসআই প্রণয় বাবু ও এএসআই সাইফুল এর নেতৃত্বে গত ১১ মার্চ শনিবার দুপুর ১২.৪৯ টায় জামালগঞ্জ থানায় এক সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত বৈঠকে এক সপ্তাহের মধ্যে সৌদিআরব পাঠাবে না হয় ৯,৫০,০০০ টাকা ফেরত প্রদান করবে মর্মে সিদ্বান্ত গৃহীত হয়। সালিশের সিদ্বান্ত উপস্থিত সালিশীগণের সম্মুখে মান্য করে ভূক্তভোগীদেরকে এক সপ্তাহের মধ্যে সৌদিআরবে নিবে না হয় তাদের টাকা ফেরত দিবে বলে স্বীকার করিলেও পরবর্তীতে বিদেশ প্রেরণ তো দূরের কথা তাদের পাওনা টাকা দেই দিচ্ছি করে সময় ক্ষেপন করার পাশাপাশি তাদেরকে নানাভাবে প্রাণনাশের হুমকী প্রদর্শন করে নুরু মিয়া ও তার ভাড়াটে মাস্তান বাহিনী। অন্যদিকে সৌদিআরবে থেকে প্রতারক রাসেল গত ৯ মার্চ বৃহস্পতিবার সকাল ১১.১৩ টায় বাদী মোছাব্বিরের ভাতিজা সুনামগঞ্জ পৌরসভার নতুন হাছননগর আবাসিক এলাকার প্রান্তিক ১০৫ নং বাসভবনের বাসিন্দা মুজিবুর রহমানের পুত্র সাংবাদিক অলিউর রহমান সুমন কে প্রাণনাশের হুমকী দেয়।
ফেনারবাক ইউপি চেয়ারম্যান কাজল চন্দ্র তালুকদার বলেন,নুরু মিয়া ও তার ২ সৌদিআরব প্রবাসী পুত্রের প্রতারনায় আমার ইউনিয়নের জনগন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন। একাধিকবার তাদের প্রতারণার বিচার সালিশ করতে হয়েছে আমাকে। তাদের বিরুদ্ধে প্রতারনা ও মানব পাচারের ঘটনায় ৩ টি মামলা বর্তমানেও বিজ্ঞ আদালতে ও থানায় বিচারাধীন ও তদন্তাধীন রয়েছে।
একই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মতিউর রহমান বলেন,আমার ছেলে সামরুজ মিয়াকে বিদেশে নিয়ে আকামা লাগানোর কথা বলে আমাদের কাছ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা নিয়েছে নুরু মিয়ার ভাই সেলিম ও তার পুত্ররা। কিন্তু বর্তমানে আকামা লাগানোতো দূরের কথা তারা আমার ছেলেকে কোথায় কি অবস্থায় রেখেছে আমি জানিনা। আমি আদালতে গিয়েও কোন ইনসাফ পাইনি। এখন আল্লাহর কাছে বিচার চাইছি।
লক্ষীপুর নয়াহাটি গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দারা জানান,নুরু মিয়া গত বছরের আশ্বিন মাসে নারী কেলেংকারীর ঘটনায় পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার হয়ে ১৩ দিন হাজতবাস করে। সে ও তার প্রবাসী পুত্ররা খারাপ এটা আমরা আগে থেকেই জানতাম। কিন্তু সিনেমার গল্প নাটকের মতো ঢাকায় টেভেলস ব্যবসার সাথে সংযুক্ত থেকে এলাকার সরল সহজ লোকজনকে পাসপোর্ট বিমান ও ঢাকা শহর দেখিয়ে এলাকার বাইরে নিয়ে বিদেশ পাঠানোর নামে ফিল্মী স্টাইলে যে প্রতারনা করে যাচ্ছে তা আমরা জানতামনা। এখন পুলিশের আগমনে আমাদের কাছে বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে গেছে।
সাংবাদিক সুমন ও বাদী মোছাব্বির হোসেন বলেন,জামালগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগ নেতা জিতেন্দ্র তালুকদার পিন্টু দফায় দফায় চিহ্নিত ঐ প্রতারকচক্রটিকে সহযোগীতা করে যাচ্ছেন। তার আস্কারাতেই প্রতারকরা আমাদেরকে বিদেশ পাঠানোর নামে পথে বসিয়ে সর্বশান্ত করেছে। তারা প্রতারক রাসেল ও নুর মিয়াকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে ঐ ঘটনায় আরো কারা জড়িত এবং কে কত টাকা হজম করেছে সেই রহস্য উদঘাটনের দাবী জানিয়েছেন।
জামালগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মীর মোঃ আব্দুন নাসের বলেন,বিদেশে লোক পাটানোর নামে প্রতারনার ঘটনায় ফরিয়াদি মোছাব্বির হোসেন এর দায়েরকৃত অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা ৪ জনকে গ্রেফতার করে ইতিমধ্যে সুনামগঞ্জ কারাগারে পাটিয়ে দিয়েছি। গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ দন্ডবিধি আইনের ৪০৬,৪২০ ও ৫০৬ (২) ধারায় জামালগঞ্জ থানায় মামলা নং ১০ তাং ২৫/০৭/২০২৩ইং রুজু করা হয়েছে। তিনি বলেন,তদন্তে মানব পাচার বা মানি লন্ডারিংসহ অন্যান্য অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশনা নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে মানবপাচারসহ অন্যান্য অপরাধের দায়ে আরো একাধিক মামলা রুজু হতে পারে। উর্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আসামীদেরকে রিমান্ডে আনার প্রয়োজন হলে তদন্ত কর্মকর্তা রিমান্ডের আবেদন করতে পারেন বলেও জানান ওসি মীর মোহাম্মদ আব্দুন নাসের।



















