সুনামগঞ্জে ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে গৃহ প্রদানে জেলা প্রশাসনের সংবাদ সম্মেলন
- Update Time : ০২:৩৪:২৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ জুলাই ২০২২
- / ০ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি :: সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেছেন,সাহস ও ধৈর্য্যর সাথে স্মরণকালের এই ভয়াবহ বন্যার মোকাবেলা করে আমরা বেঁচে আছি। তিনি বলেন, ১৬ জুন ২য় দফায় সুনামগঞ্জ জেলায় যে বন্যা শুরু হয়েছিল তা দেখে আমরা একেবারে হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। সারা জেলার মধ্যে একটু জায়গাও অবশিষ্ট ছিলনা যেখানে বন্যার পানি উঠেনি। দেখতে দেখতে সবগুলো সরকারী বেসরকারী স্থাপনা বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়।তারপরও আমরা বসে থাকিনি। আমি এবং আমার সহকারী অফিসাররা শহরের পুরাতন সিনেমা হলের সামনে একটি দোকান থেকে প্রথমে গুড় চিড়া মুড়ি সংগ্রহ করি। তারপর শহরের পানসী হোটেলটি আমাদের জেলা প্রশাসনের দখলে নিয়ে নেই। শুকনো খাবার তৈরী করে তাৎক্ষনিকভাবে বানভাসীদের মাঝে দেয়ার চেষ্টা করি। প্রথম ৩ দিন সারা দেশের সাথে আমরা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিলাম। মোবাইলের নেট চলে যাওয়ার আগেই আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অফিস, ক্যাবিনেট ডিভিশন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করে বন্যা পরিস্থিতির অবনতির কথা অবগত করি।কেয়ার এনজিও সংস্থার অফিস থেকে জেনারেটরটি এনে বাজারে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জিয়াউল হকের কাছে তুলে দেই এজন্য যে তিনি একটি জেনারেটরের সাহায্যে তার হোটেলসহ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যাপক পরিমাণে শুকনো খাবারের প্যাকেট সরবরাহ করেন।৩ দিনের ব্যবধানেই সার্কিট হাউজের ছাদে উঠে আমরা জেলা প্রশাসনের কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করি। টিভি চ্যানেলের সাংবাদিকরা সেখানে এসে আমাদের কাছ থেকে নেটওয়ার্কিং সুবিধা নিয়ে তাদের জরুরি সংবাদ প্রেরণ করেন। সার্কিট হাউজ থেকে বের হয়ে শহরের বিভিন্ন মহল্লায় বানভাসীদের মধ্যে পূণর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা করতে যাবো এর মধ্যে প্রবল বৃষ্টিপাতের সাথে বজ্রপাতের আতংকে আমার সহকর্মীরা ভয় পেয়ে যান। অনেকে আমাকে বাইরে যেতে নিষেধ করেন। কিন্তু আমি তাদেরকে বলি আমাকে যেতে হবেই। আমার যদি কিছু হয়ে যায় বা আমি যদি বেঁচে না থাকি তোমরা আমার সন্তানদের দেখ এই কথা বলে বের হই। শহরের বিভিন্ন পাড়া মহল্লা পরিদর্শণ ও শুকনো খাবার বিতরন শেষে স্পীডবোট নিয়ে দোয়ারাবাজার উপজেলায় ছুটে যাই। সেখানে মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব মুহিবুর রহমান মানিক ও ইউএনওকে নিয়ে আমরা উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা চালাই। বিকেলে আবার শহরে ফিরে সন্তান সম্ভবা এক মাকে উদ্ধার করে মল্লিকপুর থেকে নৌকায় এনে জেলা প্রশাসনের হেফাজতে রাখি। এ অবস্থায় ঐমা সন্তান প্রসব করেন। মাননীয প্রধানমন্ত্রী আমার কাছ থেকে বিষয়টি জেনে নবজাতকের নাম রাখেন প্লাবন। পরে নবজাতকসহ ঐ মাকে হাসপাতালে চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা করে দেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপহার ও অনুদান তুলে দেই পরিবারটির হাতে। এবারের বন্যায় ৪৫ হাজার ২ শত ৮৮টি বাড়ীঘর ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বলে জেলা প্রশাসন চিহ্নিত করেছে উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন,ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো বেশী হতে পারে। আমরা মাননীয় প্রধানন্ত্রীর দেয়া অনুদানের টাকায় ক্ষতিগ্রস্থদের ঘরবাড়ী মেরামতে সহায়তা দেবো। এছাড়াও ক্ষতিগ্রস্থদের আরো তালিকা তৈরী করে ঢেউটিন প্রদানের ব্যবস্থা করবো। সুনামগঞ্জে আবহাওয়া অধিদপ্তরের অফিস স্থাপনের দাবীর প্রেক্ষিতে তিনি বলেন, সুনামগঞ্জে আবহাওয়া অধিদপ্তরের অফিস হওয়াটা জরুরি। কিন্তু সেটা যদি সম্ভব না হয় অন্ততপক্ষে পাউবোর অফিসের সাথে সংযুক্ত হয়ে দু একজন স্টাফ যাতে আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও সতর্কীকরন বার্তা সর্বসাধারনের মাঝে পৌছে দিতে পারেন তার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত দাবী উপস্থাপন করবো। তিনি চলমান দুর্যোগ মোকাবেলায় সুনামগঞ্জের সকল সংসদ সদস্যসহ অন্যান্য জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় সহযোগীতার কথা স্বীকার করে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ একযোগে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করায় দুর্যোগ মোকাবেলা করা সম্ভব হয়েছে। ২০ জুলাই বুধবার সকাল ১১ টায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর হোসেন উপরোক্ত কথাগুলো বলেন। বাংলাদেশের একজন মানুষও গৃহহীন থাকবে না, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ স্লোগানকে সামনে রেখে ‘ক’ শ্রেণির পরিবার তথা ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে গৃহ প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির বিষয়ে উক্ত সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) অসীম চন্দ্র বনিক, এনডিসি মেহেদী হাসান, সহকারী কমিশনার আর্নিকা আক্তার, মোঃ তুরাব হোসেন, দিপংকর বর্মণ, মোঃ আরিফুল ইসলাম, ইফতিসাম প্রীতি, মোহন মিঞ্জি, বিটিভির প্রতিনিধি এডভোকেট আইনুল ইসলাম বাবলু,সুনামগঞ্জ রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি লতিফুর রহমান রাজু, সহ সভাপতি আল-হেলাল ও সাধারন সম্পাদক হিমাদ্রি শেখর ভদ্র মিটুসহ স্থানীয় সাংবাদিকবৃন্দ। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের মাধ্যমে সারাদেশে ‘ক’ শ্রেণির পরিবারের জন্য আবাসন নির্মাণ করা হচ্ছে। ‘ক’ শ্রেণির পরিবারগুলোকে ২ (দুই) শতাংশ জমি ও দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সেমিপাকা বাড়ি প্রদান করা হচ্ছে। পাশাপাশি জমির রেজিস্ট্রেশন, নামজারী, কবুলিয়তসহ অন্যান্য দলিলাদিও সরকারি খরচে সম্পন্ন করা হচ্ছে। মুজিববর্ষের এসব ঘরে নিরাপদ পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বিনামূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে। সারাদেশের ন্যায় সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন ‘ক’ শ্রেণির পরিবারের জন্য মুজিববর্ষের ঘর নির্মাণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে ৩য় পর্যায়ের ১ম ধাপে ৪০৬ টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ২১ জুলাই সকাল ১০টায় ৩য় পর্যায়ের ২য় ধাপে নির্মিত গৃহ হস্তান্তর কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করবেন। সারাদেশে ২৬,২৯৯টি ঘরের শুভ উদ্বোধন হবে। এর সাথে সঙ্গতি রেখে সুনামগঞ্জ জেলায় ৪০৬টি ঘরের উদ্বোধন করা হবে। উপজেলা ভিত্তিক ২১ জুলাই উদ্বোধনের জন্য নির্ধারিত গৃহের সংখ্যা হচ্ছে, সুনামগঞ্জ সদর ৩৫টি, দোয়ারাবাজার ৯০ টি, বিশ্বম্ভরপুর ৬০ টি, ছাতক ৫৮টি, জগন্নাথপুর ৩০টি, জামালগঞ্জ ২৫ টি, শান্তিগঞ্জ ৩৫টি, তাহিরপুর ৪০টি, দিরাই ৩৩টি। জেলা প্রশাসক বলেন, আশা করি এ ঘর পেয়ে উপকারভোগীরা আর্থ সামাজিকভাবে লাভবান হবেন, তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে এবং তাদের উন্নত জীবনের পথে এগিয়ে যাওয়া সহজতর হবে। আগামীতেও আরও ঘর নির্মাণ কাজ অব্যাহত থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। উল্লেখ্য ৩য় পর্যায়ে (২য় ধাপ) সুনামগঞ্জ জেলার মোট ৪০৬টি গৃহ আগামীকাল ২১ জুলাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করবেন। ইতোমধ্যে এ জেলায় ৫৪১৫টি গৃহ উদ্বোধন করা হয়েছে।


























