সুনামগঞ্জে বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি রোধে সেনাবাহিনীর সার্বিক তত্ত্বাবধান নিশ্চিতসহ ১২ দাবি
- Update Time : ১২:৪৮:১৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
- / ৭ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
আল হেলাল, সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি :: সুনামগঞ্জে বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি রোধে সেনাবাহিনীর সার্বিক তত্ত্বাবধান নিশ্চিতসহ ১২ দফা দাবি উপস্থাপন করেছে হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন সুনামগঞ্জ জেলা কমিটি। জেলার বোরো ফসলের রক্ষাকবচ হিসেবে পরিচিত বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম, লুটপাট ও অব্যবস্থাপনার চলমান প্রেক্ষাপটে এ অভিযোগ করে সংঘটনটি। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে শহরের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে এই অভিযোগ করেন কমিটির নেতৃবৃন্দ।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি মো. রাজু আহমেদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মোঃ ওবায়দুল হক মিলন। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সহ-সভাপতি মোজাহিদুল ইসলাম মজনু, ওবায়দুল হক মুন্সী, আলী খান, সুহেল আলম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোঃ মাইনুদ্দীন, অর্থ সম্পাদক আকিব জাবেদ, সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল বাছির, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মোশফিকুর রহমান স্বপন প্রমুখ।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, সংশোধিত কাবিটা নীতিমালা ২০২৩ উপেক্ষা করে পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) গঠন, সিন্ডিকেট রাজত্ব এবং অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প দেখিয়ে সরকারের কোটি কোটি টাকা লোপাটের পাঁয়তারা চলছে। গত অর্থবছরের তুলনায় এবার পিআইসি সংখ্যা মাত্র ১৫টি বাড়লেও রহস্যজনকভাবে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে ১৮ কোটি টাকা। অথচ মাঠপর্যায়ে কাজের মান অত্যন্ত নিম্নমুখী এবং গুরুত্বপূর্ণ ক্লোজারগুলো এখনও অরক্ষিত থাকায় আগামী বোর ফসল ঘরে তুলা নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছেন জেলার লক্ষাধিক কৃষক। সংগঠনের পক্ষ থেকে ১৭ জানুয়ারি থেকে ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জেলার ১২টি উপজেলার বাঁধ পরিদর্শন শেষে এই মধ্যবর্তী প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে সুনামগঞ্জে ৬৮৭টি পিআইসির বিপরীতে বরাদ্দ ছিল ১২৭ কোটি টাকা। কিন্তু চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ৭০২টি পিআইসির বিপরীতে বরাদ্দ বাড়িয়ে করা হয়েছে ১৪৫ কোটি টাকা। সংগঠনের নেতৃবৃন্দ প্রশ্ন তুলেন, মাত্র ১৫টি পিআইসি বাড়লে কেন ১৮ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ প্রয়োজন হলো? প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশে রাষ্ট্রের এই বিশাল অঙ্কের অর্থ অপচয় ও আত্মসাতের পাঁয়তারা চলছে বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।
এছাড়াও নীতিমালা অনুযায়ী প্রকৃত কৃষকদের নিয়ে পিআইসি গঠনের কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে তা মানা হয় নি। মাঠ প্রশাসনের গণশুনানিকে ‘লোকদেখানো’ আখ্যা দিয়ে বলা হয়, স্থানীয় প্রভাবশালী, দলীয় প্রভাব ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পিআইসি গঠন করা হয়েছে। অনেক পিআইসিতে এমন লোক রয়েছেন যাদের সংশ্লিষ্ট হাওরে কোনো জমি নেই। এমনকি একই ব্যক্তিকে একাধিক পিআইসিতে অন্তর্ভুক্ত করে দুর্নীতির জাল বিস্তার করা হয়েছে। অনেক উপজেলায় অক্ষত ও ভালো বাঁধে নতুন প্রকল্প বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সেখানে নতুন মাটি না ফেলে এক্সেভেটর (ভেকু) মেশিন দিয়ে খুঁড়ে বাঁধের পুরাতন মাটি ওলট-পালট করে নতুন মাটির প্রলেপ দেখিয়ে বিল উত্তোলনের চেষ্টা করা হচ্ছে। এর ফলে বাঁধের গঠন শক্তিশালী হওয়ার পরিবর্তে উল্টো দুর্বল হয়ে পড়ছে। জেলার গুরুত্বপূর্ণ ক্লোজার বা ভাঙ্গা অংশের কাজ অত্যন্ত নাজুক। বোগলাখালী, সিফতখালী, সদরপুর ও উথারিয়া ক্লোজারসহ অধিকাংশ ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে ড্রেজারের বালু, নিম্নমানের বাঁশ এবং সিমেন্টের প্লাস্টিক বস্তা ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে পাহাড়ি ঢলের সামান্য চাপেই এসব বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়াও ১৫ ডিসেম্বর কাজ শুরুর নির্দেশনা থাকলেও অধিকাংশ পিআইসি ২ সপ্তাহ দেরিতে কাজ শুরু করেছে।
বাঁধ নির্মাণের নামে হাওরের ফসলি জমি, কান্দা এবং খাস জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি লুটে নেওয়া হচ্ছে। এতে আবাদি জমির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে এবং গো-চারণ ভূমি সংকুচিত হয়ে দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। জনবসতি ও বাঁধ সংলগ্ন এলাকায় কোনো কাজের বিবরণী সম্বলিত সাইনবোর্ড না থাকায় সাধারণ মানুষ কাজের স্বচ্ছতা সম্পর্কে অন্ধকারে রয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলন থেকে হাওর রক্ষা ও দুর্নীতি রোধে ১২ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। এগুলো হলো- বাঁধের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা রোধে স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সার্বিক তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করা, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর মাধ্যমে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ, পিআইসি প্রথাকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র রুখতে কাবিটা নীতিমালার সঠিক বাস্তবায়ন এবং প্রকৃত কৃষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, অস্থায়ী ক্লোজারের বদলে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের লক্ষ্যে জরিপ সাপেক্ষে পর্যায়ক্রমে স্লুইস গেট নির্মাণ করা।


























