শবে বরাতের ফজিলত
- Update Time : ০৩:০০:১০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২০ মার্চ ২০২১
- / ০ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
মাওলানা আব্দুল হক মিরাসী
শাবান মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত শবে বরাত। শব অর্থ-রাত্রি, আর বরাত অর্থ-অদৃষ্ট বা ভাগ্য। সুতরাং শবে বরাত অর্থ ভাগ্যরজনী। শবে বরাত বা ভাগ্যরজনী দুনিয়ার সমস্ত মুসলমানের নিকট অতি পরিচিত গুরুত্বপূর্ণ একটি রাত। এ রাতে বান্দার ভাল-মন্দ, রুজী-রোজগার, হায়াত-মৌত প্রভৃতি যাবতীয় বিষয় লিপিবদ্ধ করা হয়। এজন্য এ মাসে আমাদের দেশ ও বিদেশে মুসলমানদের মধ্যে সকল ধরনের নেক আমল-নামায, রোযা, তিলাওয়াতে কোরআন, দুরুদ শরীফ, জিয়ারত করা, মসজিদ ও বাড়িতে মিলাদ শরীফ পড়া ও কিয়াম করা সহ দান খয়রাত করতে দেখা যায়।
উল্লেখিত কারণেই মানুষের কাছে শবে বরাতের গুরত্ব অপরিসীম। সারা বছরে একমাত্র শবে কদর ব্যতীত এত অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও মাহাত্ব মন্ডিত রাত আর দ্বিতীয়টি নেই। এ মাহাত্ম ও গুরুত্বের কারণেই মহান আল্লাহ পাক এ রাতটিকে অফুরন্ত ফজিলত দান করেছেন। শবে বরাত সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে অসংখ্য হাদীস বর্ণিত আছে। এখানে তার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য হাদীস বর্ণনা করা হল- ইমাম সুকফী (রহঃ) তদীয় তফসীর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, জুমআর রাতের এবাদতের উসিলায় সপ্তাহের গোনাহ মাফ হয় এবং শবে বরাতে ইবাদত করলে সারা জীবনের গোনাহ মাফ হয়ে যায়। সোবহানাল্লাহ। এজন্য শবে বরাতকে গোনাহ মাফীর রাতও বলা হয়। অনুরূপ এ রাতকে হায়াত বা জীবনের রাতও বলা হয়। ইমাম মুনযেরী (রহঃ) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন- যে ব্যক্তি দু’ঈদের দুই রাত এবং অর্ধ শাবানের রাত জেগে এবাদত করবে, তার অন্তর কিয়ামতের দিন মরবেনা যে দিন অন্তরসমূহের মৃত্যু হবে।
এ রাতকে শাফাআতের রাতও বলা হয়। হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের জন্য তেরই শাবানের রাতে সুপারিশ করেছিলেন, তাতে এক তৃতীয়াংশ কবুল হয়েছিল। অতঃপর চৌদ্দই শাবানের রাতে সুপারিশ করেছেন, তাতে কবুল হয়েছে আরেক তৃতীয়াংশ, অতঃপর পনেরই শাবানের রাতের সুপারিশে অবশিষ্ট তৃতীয়াংশ কবুল হয়ে তা পূর্ণতা লাভ করে।
শবে বরাতের এ রাতকে মাগফেরাতের রাতও বলা হয়। ইমাম আহমদ (রহঃ) বর্ণনা করেছেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন-“আল্লাহ তায়ালা অর্ধ শাবানের রাতে বান্দাদের প্রতি বিশেষ করুণার দৃষ্টি করেন এবং দু’শ্রেণীর লোক ব্যতীত সকলের মাগফিরাত করে দেন। এ দু’শ্রেণী হল, মুশরিক ও হিংসুক। শবে বরাতের রাতের সন্ধ্যায় গোলস করা মুস্তাহাব। যদি কেউ এ রাতে গোসল করে, তবে শরীরের ছিটকানো প্রত্যেক পানির ফোটার পরিবর্তে তার আমলনামায় মহান আল্লাহ পাক সাতশত রাকাত নফল নামাযের সওয়াব দান করেন। সোবহানাল্লাহ। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাদীসে বলেছেন- সেই ব্যক্তির জন্য পরম সৌভাগ্য এবং খুশির কথা, যে শাবান মাসের পনের তারিখ রাতে ইবাদাতে লিপ্ত থাকে।
হযরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেছেন যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন যে, হে মুমীনগণ! তোমরা শাবান মাসের পনের তারিখ রাত জেগে ইবাদাত বন্দেগী কর। কেননা ঐ রাতটি অতিশয় বরকতময় এবং ফজিলতপূর্ণ। এ রাতে মহান আল্লাহ তায়ালা বলে থাকেন, হে বান্দাগণ! তোমাদের মধ্যে ক্ষমা প্রার্থনাকারী কেউ আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করব। এ সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- নিশ্চয় মহান আল্লাহ পাক এ রাতে বনী কালব, বনী রবী এবং বনী মুদার গোত্রের সমগ্র ভেড়া বকরীর পশমের সংখ্যার পরিমাণ আমার গুনাহগার উম্মতকে ক্ষমা করে থাকেন। সোবহানাল্লাহ।
উল্লেখ্য যে, আরবের এ তিনটি গোত্রের প্রত্যেক গোত্রে তখন কম বেশি তিন হাজার হতে বিশ হাজার করে ভেড়া বকরী ছিল। অপর এক হাদীসে বর্ণিত আছে যে, হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জিব্রাঈল ফেরেশতা এসে আমাকে বলে গেলেন যে, আপনার উম্মতগণকে জানিয়ে দিন যে, তারা যদি শবে বরাতে এবাদাত করে, তবে তারা যেন শবে কদরে এবাদাত করল। এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, শবে বরাতের এবাদাত শবে কদরের এবাদাতের মতই মহামূল্যবান। আরেক হাদীসে বর্ণিত আছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-“এ রাতে যারা এবাদাতে মগ্ন থাকে তাদের প্রতি মহান আল্লাহর ফেরেশতাগণ অবতীর্ণ হয়। তাদের সগীরা কবীরা গোনাহসমূহ মহান আল্লাহ পাক ক্ষমা করে থাকেন।”
অপর এক হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-“জিব্রাঈল ফেরেশতা এসে আমাকে বলে গেলেন যে, হে আল্লাহর নবী! আপনি উঠে নামায পড়ুন এবং মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন। কারণ এ রাতে মহান আল্লাহ পাক তাঁর বান্দার জন্য একশত রহমতের দরজা খুলে দেন। অতএব আপনি আপনার গুনাহগার উম্মতদের অপরাধ ক্ষমা করে নিন। অবশ্য মুশরিক, যাদুকর, গণক, কৃপণ, সুদখোর, শরাবপায়ী, মা-বাপের নাফরমান ও ব্যভিচারীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবেন না। কারণ তাদেরকে আল্লাহ অবশ্যই শাস্তি প্রদান করবেন।
অন্য এক হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন-শাবান মাসের শবে বরাতের রাতে যে ব্যক্তি একশত রাকাত নফল নামায আদায় করবে, তার জীবনের যাবতীয় গোনাহ ক্ষমা করা হবে এবং তার জন্য দোজখ হারাম হয়ে যাবে।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপর এক হাদীসে বলেছেন-শবে বরাতের রাতকে যে জীবিত রাখে অর্থাৎ ইবাদাত বন্দেগী করে, মহান আল্লাহ পাক তাকেও জীবিত রাখবেন। অর্থাৎ তার আমল নামায় মৃত্যুর পরেও কিয়ামত পর্যন্ত সওয়াব লিখা হতে থাকবে। এবং পনেরই শাবান দিনের বেলা যে রোযা রাখবে তাকে দোযখের আগুন স্পর্শ করবে না। সোবহানাল্লাহ।
অপর এক হাদীসে বর্ণিত আছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন- মহান আল্লাহ তায়ালা স্বীয় বান্দাদেরকে লক্ষ্য করে বলতে থাকেন, আজ যেই বান্দা আমার সমীপে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আমি তাকে ক্ষমা দান করব। যে আজ আমার কাছে সুস্বাস্থ্য কামনা করবে, আমি তাকে আজ তা দান করব। যে আজ আমার নিকট ধন-সম্পদ প্রার্থনা করবে, আমি তাকে অপরিমিত ধন-সম্পদ দান করব। তাকে ধনশালী বানাব।
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়শা সিদ্দিকা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা হতে বর্ণিত আছে যে, আমি এক রাতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট গেলাম। তখন তিনি উঠে জায়নামাযে চলে গেলেন। এতে আমার মনে হল এটা আমার প্রতি তার অবজ্ঞা। যখন দেখলাম নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিজদায় গিয়ে কাঁদছেন, আর উম্মতের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছেন। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আমার পিতা মাতা আপনার জন্য কোরবান হোক। আপনি সিজদায় পড়ে কাঁদছেন আর আমি অবহেলিত ভাবে দাঁড়িয়ে আছি। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিজদা হতে মাথা মোবারক উঠায়ে বললেন-হোমায়রা (নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা সিদ্দীকা কে আদরের সাথে এ নামে ডাকতেন) তুমি কি জান আজ কোন রাত? হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বললেন-আল্লাহর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সম্পর্কে ভাল জানেন। হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে এ রাত্রিতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতুল বাকী সহ মদীনার কবরস্থানগুলো জিয়ারত করেছেন। এজন্য এ রাত্রিতে কবরস্থান জিয়ারত করা সুন্নত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- আজ শাবান মাসের পনের তারিখ রাত। এটা এমন এক রাত, যে রাতে মহান আল্লাহর নিকট কোন কিছু প্রার্থনা করলে তা কবুল হয়। যদি কারও গোনাহ পাহাড সমানও হয়, তবু তা এ রাতে ক্ষমা করা হয়। সোবহানাল্লাহী ওয়া বিহামদিহী সোবহানাল্লাহিল আজীম।
ইমাম আব্দুর রহমান ছফবী (রহ:) এর কিতাব নুজহাতুল মাজালিস এর মধ্যে কিতাবুল বারাকাত হতে একটি হাদিস শরীফ বর্ণিত হয়েছে, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি শবে বরাতের রাত্রিতে ১২ (বার) রাকাত নামাজ এভাবে পড়িবেন প্রত্যেক রাকাতে সূরা ফাতেহা শরীফের পর সূরা এখলাছ (কুলহুআল্লাহু আহাদ) ১০ (দশ) বার করে পড়বে, তার সমস্ত জীবনের গোনাহ মিটিয়ে দেয়া হবে ও তার হায়াতে বরকত হবে। সোবহানাল্লাহ। সূত্র নুজহাতুল মাজালিস উর্দু খন্ড-১, পৃঃ ৩১৭।
উল্লেখিত কিতাবে রওদ্বুল ইফকার নামক কিতাব হতে আরেকটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। ঘটনাটি হলো: হযরত ঈসা রহুল্লাহ আলাইহিস সালাম একটি পাহাড় অতিক্রম করার সময় সবুজ রঙ্গের বড় একটি পাথর দেখিলেন, অবাক হয়ে পাথরের চারিদিকে ঘুরতেছিলেন। মহান আল্লাহ পাক ওহী দ্বারা জানাইলেন, হে ঈসা আপনি এর চেয়ে বড় অবাক হওয়ার বস্তু দেখতে ইচ্ছা হয় কি? উত্তরে তিনি (ঈসা আঃ) বললেন, হ্যাঁ। সাথে সাথে পাথরটি ফাটিয়া যায় এবং তার ভিতর হতে সবুজ রঙ্গের একটি লাঠি হাতে নিয়ে একজন পুরুষলোক বাহির হয়ে আসেন। তাহার নিকটে একটি আঙ্গুরের গাছ ছিল। সে বলিল প্রতিদিন ইহা থেকে আমার রিযিক মিলে। সোবহানাল্লাহ। ঈসা রুহুল্লাহ আলাইহিস সালাম বললেন, তুমি কত দিন থেকে পাথরের ভিতরে এবাদতে মশগুল আছ। সে লোকটি উত্তরে বলে, চারশত বৎসর হতে আছি।
ঈসা আলাইহিস সালাম বলেন, আয় বারে এলাহী এ লোকটি হতে উত্তম হয়ত আর কোন মখলুক্ব সৃষ্টি করবে না। আল্লাহ পাক এরশাদ করেন, হে ঈসা যে ব্যক্তি উম্মতে মুহাম্মদিন (সা:) হতে নিছফে শাবান অর্থাৎ শবে বরাতের রাত্রে দুই রাকাত নামাজ পড়বে, সে ব্যক্তি উক্ত চারশত বৎসরের এবাদতকারীর চেয়েও উত্তম হবে। একথাটি শুনিয়া ঈসা রুহুল্লাহ (আঃ) দোয়া করেন, হে আল্লাহ আমি যদি উম্মতে মুহাম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হতাম, তাহলে উত্তম হতো। সোবহানাল্লাহ। সূত্র: ফক্বীহ আবুল লেইছ সমকন্দী (রহ:), ইমাম মোহাম্মদ জাফরী দামেশক্বী (রহঃ) ও ইমাম আব্দুর রহমান ছফবী (রহঃ) এর কিতাব নুজহাতুল মাজালিস।



















