বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে আবারো নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে বিএনপি
- Update Time : ০৪:০৬:১৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৮ আগস্ট ২০১৮
- / ০ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
জগন্নাথপুর পত্রিকা ডেস্ক :: আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে আবারো নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে বিএনপি। দলটির নেতারা জানিয়েছেন, তারা আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চায়। কিন্তু দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাবন্দি রেখে, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ছাড়া বর্তমান সংসদের অধীনে নির্বাচন হলে সেটা কোনোভাবে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। এ অবস্থায় তারা কীভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন? এছাড়া সমপ্রতি দলের তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তারাও বর্তমান সংসদকে বহাল রেখে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ও সেনাবাহিনী মোতায়েন ছাড়া নির্বাচনে না যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। গতকাল রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বাংলাদেশে কর্মরত ১৮টি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিকাল চারটা থেকে পঁাঁচটা পর্যন্ত ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে বিএনপি নেতারা তাদের এ অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
বৈঠকের শুরুতেই দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তিন পৃষ্ঠার একটি লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন। বৈঠক সূত্র জানায়, সে বক্তব্যে সদ্য অনুষ্ঠিত পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষপাত, নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা, নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলন, শিক্ষার্থী ও গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলা, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা, মার্কিন রাষ্ট্র্রদূতের গাড়িতে হামলা, গণমাধ্যমের ওপর নতুন নির্দেশনা জারি, সার্বিক রাজনীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কূটনীতিকদের ব্রিফ করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সূত্র জানায়, এ সময়ে তিনি নির্বাচনের সময়ে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো সামনে নিয়ে আসেন। এ ছাড়া দলের পক্ষ থেকে এসব সিটি নির্বাচনের বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ সিডি আকারে তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সূত্র জানায়, বিএনপি মহাসচিবের বক্তব্যের পর কূটনীতিকরা আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বিএনপির অবস্থান সম্পর্কে জানতে চান। জবাবে মির্জা আলমগীর কূটনীতিকদের জানান, দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে বর্তমান সরকার।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় কারাগারে পাঠানোর পর পদে পদে তার জামিন আটকে দিয়ে তাকে অন্যায়ভাবে কারাগারে আটক রাখা হয়েছে। তিনি আইনের শাসন থেকে বঞ্চিত। এ অবস্থায় নির্বাচনী লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না থাকলে তারা কিভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন? এ ছাড়া বর্তমান সংসদকে বহাল রেখে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ও সেনাবাহিনী মোতায়েন ছাড়া দলের তৃণমূল পর্যন্ত নির্বাচনে না যাওয়ার পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। সূত্র জানায়, এ কূটনীতিকরা খালেদা জিয়ার সর্বশেষ সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চান। তাদের এমন বক্তব্যের পর দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও আইনজীবী এজে মোহাম্মদ আলী বিএনপি চেয়ারপারসনের মামলা ও তার জামিন নিয়ে বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করেন। তারা জানান, নিম্ন আদালত সরকারের নির্বাহী ক্ষমতার অধীন হওয়ার কারণে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন খালেদা জিয়া। জামিনযোগ্য মামলাগুলোতেও তার জামিন আটকে দেয়া হচ্ছে। একইভাবে উচ্চ আদালতেও সরকার নানাবিধ প্রভাব খাটিয়ে তার জামিন প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করছে। এ পর্যায়ে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বিষয়ে বিএনপির অবস্থান জানতে চান কূটনীতিকরা। শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলন সম্পর্কে বিএনপি নেতারা বলেন, শিক্ষার্থীরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়, সুনির্দিষ্ট ও যৌক্তিক দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছিল। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ধরন ছিল সবার জন্য শিক্ষণীয়। আর এ আন্দোলনে অভিভাবকদের তরফে শিক্ষার্থীদের বাধা না দেয়া ও নিজেদের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে বর্তমান সরকারের সার্বিক অনিয়ম-নৈরাজ্যের বিপক্ষে মানুষের এ আন্দোলন হয়ে উঠেছিল একটি স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ।
বিএনপি নেতারা আন্দোলনকারীদের সুশৃঙ্খল ও অভূতপূর্ব আন্দোলনের ধরন এবং আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ ও সরকারদলীয় কর্মী-সমর্থকদের সশস্ত্র হামলার নানা ভিডিও ফুটেজ দেখান। তারা কূটনীতিকদের জানান, আন্দোলনরত এসব ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের ওপর ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়ে তাদের রক্তাক্ত করা হয়েছে। হেলমেট ও মুখোশ পরে বিভিন্ন সংবাদকর্মীর ওপর হামলা করে তাদেরকেও আহত করা হয়েছে। হামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ নেতাদের জড়িত থাকার ব্যাপারে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও প্রচারিত ভিডিও ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা তুলে ধরেন। বৈঠকে অনেক কূটনীতিক যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাটের গাড়িতে হামলার প্রসঙ্গটিকেও সামনে নিয়ে আসেন। তারা জানান, বিষয়টি নিয়ে তারা ওয়াকিবহাল হলেও বিএনপির মতামত জানতে চান। জবাবে বিএনপির নেতারা জানান, এ ঘটনা অনাকাঙিক্ষত, অগ্রহণযোগ্য। এ ঘটনার মাধ্যমে প্রমাণ হয় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা নাজুক। নেতারা বলেন, সরকারি দল ও তাদের নেতাকর্মী অনেক বেশি অসহিষ্ণু হয়ে পড়েছে। যার কারণে তারা ভিন্নমত ও পথকে সহ্য করতে পারছে না। তারা সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করে দিয়েছে। সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে সংবাদ মাধ্যমে এ বিষয়ে চিঠি দিয়ে সতর্ক করা হয়েছে বলে উপস্থিত কূটনীতিকদের জানান দলের একজন নেতা। এ ছাড়া নিরপেক্ষভাবে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে একটি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার দেয়ার পর গোয়েন্দা পুলিশ যে প্রক্রিয়ায় দেশ-বিদেশে খ্যাতনামা ফটোসাংবাদিক ও সমাজকর্মী শহিদুল আলমকে আটকের ধরন, তার উপর নির্যাতন ও তাকে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনের বিষয়টিকেও সামনে নিয়ে আসেন বিএনপির নেতারা।
বৈঠকে বিদেশি কূটনীতিকদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জার্মান, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, কুয়েত, স্পেন ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বৈঠকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়াও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা রিয়াজ রহমান, অ্যাডভোকেট এজে মোহাম্মদ আলী, সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ, সহ আন্তর্জাতিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফাহমিদা মুন্নি, ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, কেন্দ্রীয় নেতা ব্যারিস্টার মীর হেলাল ও তাবিথ আউয়াল উপস্থিত ছিলেন। এদিকে কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকের পরপরই সন্ধ্যায় একটি জরুরি বৈঠক করে ২০ দলীয় জোট। বৈঠকে সদ্য অনুষ্ঠিত পাঁচ সিটি নির্বাচনের পরিবেশ ও ফলাফল পর্যালোচনা, আগামী জাতীয় নির্বাচন, শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনসহ সার্বিক রাজনৈতিক বিষয়ে নিয়ে আলোচনা হয়।



















