পায়ে গুলি খেয়েও পিছু হটেননি বড়লেখার আব্দুল হান্নান
- Update Time : ০৪:৫৭:০৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ মার্চ ২০১৯
- / ০ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
এ.জে লাভলু, মৌলভীবাজার :: ১৯৭১ সাল। ১৮ বছরের টগবগে তরুণ আব্দুল হান্নান তখন আনসার বাহিনীর সদস্য। হঠাৎ দেশে শুরু হল মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধের ডাক পেয়েই ঘরে বসে থাকেননি হান্নান। মা, ভাই আর বোনকে বাড়িতে রেখে দেশ স্বাধীন করার শপথ নিয়ে বাড়ি ছাড়লেন তিনি। তবে একা যাননি। সঙ্গে নিয়ে গেলেন বড় ভাই ইসহাক আলীকেও। দুই ভাই ঝাঁপিয়ে পড়লেন মুক্তিযুদ্ধে। যুদ্ধ করলেন টানা নয়মাস। দেশ স্বাধীন হলো। হান্নান ও তাঁর ভাই বাড়ি ফিরলেন। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর কেমন আছেন আব্দুল হান্নান। এ প্রতিবেদকের মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি। আলাপকালে শুনিয়েছেন যুদ্ধদিনের স্মৃতিকথা।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন আব্দুল হান্নান। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে আমার বয়স তখন ১৮ বছর। যুদ্ধ শুরুর ২৫ দিন আগে আমার বাবা মারা যান। আমি লেখাপড়া বেশ করতে পারিনি। আমি তৎকালীন সময়ে আনসার ও মোজাহিদ ট্রেনিং করেছি। তখন ১৯৭১ সালের মার্চ মাস। দেশে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। আমি একদিন বড়লেখা বাজারে গিয়েছি। ওই সময় আওয়ামী লীগ নেতা বড়লেখার মরহুম আখদ্দছ আলী চৌধুরী, মরহুম তৈমুছ আলী এমপি, তৎকালীন থানা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারী ডা. অমরেন্দ্র বাবু ও মাস্টার সিরাজুল ইসলাম সাহেবসহ অনেকেই আমাকে মুক্তিযুদ্ধে যেতে বলেন। এদিকে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সবাইকে মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিলেন। আমি ভেতরে ভেতরে যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুত নেই।
আব্দুল হান্নান বলেন, ১৯৭১ সালের ২ এপ্রিল সন্ধ্যায় আমরা ৩২জন বড়লেখা পিসি উচ্চ বিদ্যালয়ে একত্রিত হই। সবাই আনসার-মুজাহিদের ট্রেনিং প্রাপ্ত সদস্য। আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ আমাদের প্রত্যেকের হাতে পাঁচটাকা করে তুলে দিয়ে আমাদের মৌলভীবাজারে পাঠান। আমার সঙ্গে তজমুল আলী, মুবশ্বির আলী, মস্তকিন আলী, মাজন মিয়া, সিরাজ উদ্দিন, আকবর আলী ও আমার বড় ভাই ইসহাক আলী। সবার নাম এখন মনে পড়ছে না। আমরা মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের ছাত্রবাস হলে গিয়ে আমার সেখান থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করি। আমাকে একটি থ্রি নট থ্রি রাইফেল এবং ৫ রাউন্ড করে বুলেট দেওয়া হয়। এরপর আমরা সেখান থেকে সেরপুরের দিকে অগ্রসর হই। সেরপুরে পৌঁছার পর পরই তৎকালীন সময়ে পাকিস্তানের ইস্ট-বেঙ্গল বাহিনীর কয়েকজন সিলেট থেকে পালিয়ে এসে আমাদের সাথে যোগ দেন। তখন তারা সেরপুরে অবস্থান নেন আর আমাদেরকে সাদিপুর এলাকায় দেওয়া হয়। ঠিক ওইদিন রাতেই সাদিপুর ঘাটে পাক-বাহিনীদের সাথে আমাদের যুদ্ধ শুরু হয়। তখন পাক বাহিনীরা বিমান দিয়ে হামলা চালায়। আমরা যেখানে রান্না করে খেতাম ঠিক ওই জায়গা লক্ষ্য করে তারা প্রথমে বোমা বর্ষণ করে। নিরস্ত্র মানুষ বোমার আঘাতে পাশের একটি নদীতে পড়েন। আমরা তখন পাকিস্তানিদের সাথে মুখোমুখি যুদ্ধ শুরু করি। ঠিক ওইসময় ইস্ট-বেঙ্গলের মুক্তিযোদ্ধা স্বরূপে এসে আমাদের সঙ্গে যুদ্ধে অংশ নেন। দীর্ঘক্ষণ চলে তুমুল যুদ্ধ। শত শত মানুষ প্রাণ হারান। আমরা তাদের গোলার আঘাতে এখানে ঠিকতে না পেরে পিছু হঠার সিদ্ধান্ত নেই। পরে ওই এলাকা থেকে হাকালুকি হাওর হয়ে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় ঢুকতেই ব্রিজের ওপারে থাকা মুক্তিবাহিনী আমাদের পাকবাহিনী মনে গুলি ছোড়ে। আমরাও পাল্টা গুলি ছুড়ি। পরে আমরা তাদের মুক্তিবাহিনী বুঝতে পেরে জয়বাংলা স্লোগান দেই। তখন তারা গুলি বন্ধ করেন। ওইসময় তৎকালীন ফেঞ্চুগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী মছব্বির আলীর মাধ্যমে আমরা ফেঞ্চুগঞ্জ বাজারে যাই এবং তিনি আমাদের খাওয়ান। সেখান থেকে আমরা তিলপাড়া হয়ে আবার বড়লেখায় ফিরে আসি।
তিনি আরও বলেন, তখন এপ্রিল মাস।
সম্ভবত ১৩ কিংবা ১৪ তারিখ। বড়লেখা থেকে মরহুম তৈমুছ আলী এমপির নেতৃত্বে আবারও আমরা মৌলভীবাজারের দিকে রওয়ান দেই। সঙ্গে নিয়ে যাই আমার বড় ভাই ইসহাক আলীকে। তখন মৌলভীবাজারে পাক-বাহিনী অবস্থান করেছে। আমরা অন্য একটি রাস্তা দিয়ে কমলগঞ্জ উপজেলার সমশের নগর ঘাঁটি দখল করি। সমশেরনগরে স্থানীয় ক্যাপটেন সাজ্জাদের নেতৃত্বে আমরা যুদ্ধ পরিচালনা করি। তবে সেখানে পাক হানাদারদের তোপের মুখে আমরা ভারতের দিকে অগ্রসর হই। ভারতের নিলাম বাজারে পৌঁছে আমরা বিভিন্ন অবস্থান থেকে একত্র হই। সেখান থেকে তৎকালীন আমাদের বড়লেখা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি সিরাজুল ইসলামের নেতৃত্বে আমরা বারোপুঞ্জিতে অবস্থান করি। নতুন করে ভারতের লোহারবন্দ ট্রেনিং সেন্টারে ট্রেনিং নিই। এ সময় আমাদের বারোপুঞ্জির সেক্টর কামান্ডার ছিলেন চিত্ত রঞ্জন দত্ত আর সাব-সেক্টর কামান্ডার ছিলেন এমএ রব। আমরা সেক্টর কামান্ডার সিআর দত্তের নেতৃত্বে বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ করি। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য স্থানগুলো হলো শাহবাজপুর, কুমারশাইল, বারুদা, আষ্টঘরি, চানপুর, খড়মপুর এবং আতুয়াসহ বিভিন্ন এলাকায়। পাকবাহিনীর অবস্থান ছিল শাহবাজপুর বাজার এলাকায়। তাদের সাথে আমাদের সংঘর্ষ দৈনন্দিন হতো। খড়মপুর এলাকায় যুদ্ধের সময় আমি একবার আহত হয়েছিলাম। পাকিস্তানিদের সঙ্গে মুখোমুখি যুদ্ধের সময় গুলি এসে আমার উরুতে লাগে। পরে সেখান থেকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে আমাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
হান্নান বলেন, ঠিক ওই সময় আমাদের নতুন ট্রেনিং দেওয়া লোকজন এলো, এফএফ (ফ্রিডম ফাইটার) নামে। তাদের সাথে নিয়ে আমার গেরিলা যুদ্ধ শুরু করি। গেরিলা যুদ্ধে আমাদের একেক প্লাটুনে দুজন-তিনজন করে পুরোন লোক দেওয়া হলো। আমাদের প্লাটুনে ছিলেন ৩২জন। এই প্লাটুনের নায়েক হিসেবে আমি ছিলাম এবং কমান্ডার ছিলেন আবু বক্কর। আমরা বড়লেখা থানার অধীনস্থ মাইজগ্রামে প্রথমে অবস্থান নেই। সেখানে আসার পর বিএলএফ (বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স) বাহিনী লোকজনের নির্দেশে আমাদের মাইজগ্রামের মান্নান মাস্টারের বাড়িতে অবস্থান করে আমরা গেরিলা যুদ্ধ করি। এরপর নিজবাহাদুপুর এলাকার বৈকেন্দ্র দাসের বাড়িতে আমরা অবস্থান নেই। অবস্থান নেওয়ার পরদিনই সন্ধ্যা সময় পাক-বাহিনী আমাদের ঘিরে ফেলে গুলি শুরু করে। হানাদারদের ছোড়া প্রথম গুলিতেই আমাদের সহযোদ্ধা খতিব আলী মারা যান। এদিন আমরা নিশ্চিত ছিলাম যে, আমরা ৩২জনই মারা যাবো। কিন্তু আমরা ভাগ্যগুণে সেখান থেকে কৌশলে ওই এলাকা ছেড়ে যাই। আমরা খতিবের মরদেহ সঙ্গে নিয়ে যেতে পারিনি। সেখান থেকে এরাল বিল পেরিয়ে লঘাটি এলাকা দিয়ে আমার টুকায় পৌঁছাই। আমরা তখন ৩১জন যুদ্ধা। তিনি বলেন, পরদিন সকালে মান্নান মাস্টার তৎকালীন চান্দগ্রাম এলাকার স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সোলায়মান আলী কাছে খবর দিয়ে আমাদের জন্য খাবার ব্যবস্থা করতে বললেন। খবর পেয়ে সোলায়মান আলী ভাত আর ডাল রান্না করলেন। তিনি খাবারগুলো একটি টুকরিতে (বাঁশের ঝুড়ি) ভরে মাথায় করে একটি বিলের পারে নিয়ে আসেন। এসে তিনি আমাদের ডাকেন থৈ থৈ (সাংকেতিক ভাষায়) শব্দ করে। তখন আমরা দুদিনের উপোস। কোনো কিছুই খাইনি। তাঁর ডাকে আমরা ধানখেতের মাঝখান থেকে মাথা তুলে দাঁড়াই। দেখি তিনি আমাদের জন্য ভাত নিয়ে এসেছেন। ভাত খাওয়া শেষে আমরা আবার ধানখেতে অবস্থান করি। আর সোলামান মিয়া আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নেন। তিনি বড়লেখা-চান্দগ্রাম রোডে গিয়ে উঠেতেই পাক-বাহিনী তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি শুরু করে। তাঁর হাতে এসে একটি গুলি লাগে। প্রাণ বাঁচাতে তিনি দৌঁড় গিয়ে নিরাপদে আশ্রয় নেন। আমরা তখন তা দূর থেকে দেখছি। ওইদিন রাতেই আমরা সোলেমান মিয়াকে সঙ্গে নিয়ে ভারতের বারোপুঞ্জিতে নিয়ে আসি। তাঁর চিকিৎসা করাই। আমরা রেস্ট নেই। পরদিন সেখান থেকে আমরা জকিগঞ্জের জালালপুরের দিকে রওয়ানা দিই। এসময় বিভিন্ন ক্যাম্পে আমাদের যাওয়া আসা শুরু হয়। আমরা দেশে থেকে বেশ কয়েকটি স্থানে গেরিলা যুদ্ধ করেছি। আর ভারত থেকে দেশে ঢুকে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে যুদ্ধ করতাম। ভারতের বারোপুঞ্জিতে থাকতাম। কখনও ভাবিনি যুদ্ধ থেকে বেঁচে ফিরতে পারবো। মায়ের সঙ্গে দেখা করতে পারিনি। আমরা দুইভাই মুক্তিযুদ্ধ করছি তা জানতে পেরে পাকহানাদাররা আমার মাকে অনেক মেরেছে। এভাবে টানা নয়মাস যুদ্ধ করেছি। দেশ স্বাধীন করেছি।
আব্দুল হান্নান বলেন, আমরা মুক্তিযোদ্ধারা বাড়ি-গাড়ি কিংবা সম্পদের পাওয়ার আশায় যুদ্ধ করিনি। এরকম কোনো লোভ আমাদের ছিল না। আমরা আমাদের দেশ চেয়েছি, মাটি ও স্বাধীনতা চেয়েছি। দেশ স্বাধীন করে একটি লাল সবুজের পতাকা পেয়েছি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হচ্ছে, দেশে আজ গণতন্ত্র নেই। তবে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার যে মহত উদ্যোগ নিয়েছে। তাকে আমরা স্বাগত জানাই। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশনেত্রী শেখ হাসিনা দেশের গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে যেভাবে কাজ করছেন। এজন্য তাঁর প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। তাঁর জন্য সবসময় আমরা দোয়া করবো। আমরা স্বাধীনতাকামী মানুষ, আমরা দেশের শান্তি চাই। মঙ্গল চাই। কখনো ক্ষতি চাইনা। বড়লেখা পৌরসভার মহুবন্দ এলাকার বাসিন্দা মৃত ছইদ আলীর ছেলে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হান্নান। তাঁর বয়স এখন ৬৭ বছর। পারিবারিক জীবনে স্ত্রী দুই ছেলে আর নাতি-নাতনী নিয়েই সংসার চলছে তাঁর। দুই ছেলে এখন সরকারি চাকুরি করছেন।
আব্দুল হান্নান বলেন, দেশ স্বাধীন করে বাড়িতে ফিরলাম। তখন পরিবারে অভাব অনটনের কারণে রিকশা চালাতে হয়েছে। মানুষের কাজ করেছি। পরে বঙ্গবন্ধু কন্যা ক্ষমতায় এসে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ভাতা হিসেবে ৩’শ টাকা করে দেন। এই তিনশ টাকা থেকে বাড়তে বাড়তে এখন প্রতি মাসে আমাকে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ২৫ হাজার টাকা ভাতা দেয়া হচ্ছে। আমার বিদ্যুৎ বিল ও গ্যাস বিল মওকুফ। আমার দুই সন্তান সরকারি চাকুরিতে আছেন। আল্লাহর অশেষ রহমতে ভালোই চলছি।





























