পবিত্র শবে বরাত : করণীয় ও বর্জনীয়
- Update Time : ০১:৪২:৩১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ মে ২০১৮
- / ১ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
হুসাইন আহমদ মিসবাহ
সূচনা : শবে বরাত নিয়ে আমাদের সমাজে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ শবে বরাতকে মানতেই নারাজ। তাদের ভাষায় ‘শবে বরাত’ বলতে ইসলামে কিছুই নেই। কেউ আবার শবে বরাতকে নিয়ে অধিক বাড়াবাড়িতে লিপ্ত হন। এমনকি তারা শবে বরাতকে শবে কদরের মত মনে করেন। বাস্তবে শবে বরাত নিয়ে উভয় পক্ষের ধারণাই ভুল। ইসলামে শবে বরাতের ভিত্তি রয়েছে, শবে রাতের আমল বর্ণিত আছে, কিন্তু শবে কদরের মত নয়। তাই “হাকিকাতে শবে বরাত” নিয়েই আজকের আলোচনা।
শবে বরাত কি? : ‘শবে বরাত’ ফার্সি শব্দদ্বয়। ফার্সিতে ‘শব’ অর্থ রাত/রজনী। আর ‘বরাত’ অর্থ ভাগ্য। সুতরাং শবে বরাতের শাব্দিক অর্থ “ভাগ্য রজনী” রজনী। এ রাতে তা‘আলা সমস্ত মাখলুকাতের বার্শিক ভাগ্য লিপিবদ্ধ করা হয়, তাই এইরাত “শবে বরাত”। “বরাতে”র আরেক অর্থ মুক্তি বা নিষ্কৃতি। যেহেতু আল্লাহ পাক এই রাতে বেহিসাব পাপী লোকদের ক্ষমা করেন, নিষ্কৃতি দেন ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন, সেহেতু এ রাতকে লাইলাতুল বারাআত বা শবে বরাত বলা হয়।
এই রাতকে আরবীতে বলা হয় “লাইলাতুন্ নিসফ্ মিন শাবান”। শাবান মাসের পঞ্চদশ রজনী, মানে শা’বান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত।
শবে বরাতের অস্থিত্ব : অসংখ্য হাদীসদ্বারা শবে বরাতের অস্থিত্ব প্রমাণিত। নিম্নে দু’টি উল্লেখ করলাম।
১. হযরত মুয়াজ বিন জাবাল রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
( يطلع الله إلى خلقه في ليلة النصف من شعبان فيغفر لجميع خلقه إلا لمشرك أو مشاحن )
“আল্লাহ তায়ালা শা’বান মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতে সৃষ্টিকুলেলের দিকে রহমতের নজরে তাকান। মুশরিব এবং বিদ্ধেষ পোষণকারী ব্যতিত সকলকে ক্ষমা করে দেন।”
( সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং, ৫৬৬৫.
২. হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসল্লাম বলেন:
إِذَا كَانَ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ يَنْزِلُ اللَّهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى إِلَى سَمَاءِ الدُّنْيَا ، فَيَغْفِرُ لِعِبَادِهِ إِلاَّ مَا كَانَ مِنْ مُشْرِكٍ أَوْ مُشَاحِنٍ لأَخِيهِ
অর্থাৎ, “আল্লাহ তায়ালা শা’বানের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতে সৃষ্টিকূলের দিকে রহমতের নজরে তাকান। মুশরিক এবং বিদ্ধেষপোষণকারী ব্যতিত সকলকে মাফ করে দেন।”
( মুসনাদুল বাযযার,হাদিস নং,৮০)
শবে বরাতের ফজিলত : এ প্রসঙ্গে হযরত আয়শা রা. থেকে একটি হাদিস বর্ণিত আছে যে, নবী করিম সা. হযরত আয়শা রা. কে সম্বোধন করে বললেন, “হে আয়শা! এ রাতে কি হয় জান? হযরত আয়শা রা. বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন”। রাসূল (সা.) বললেন, “এ রাতে আগামী বছর যত শিশু জন্ম নিবে এবং যত লোক মারা যাবে তাদের নাম লেখা হয়, মানুষের বিগত বছরের সব আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয় এবং মানুষের রিজিক অবতীর্ণ হয়”।
(মিশকাত শরীফ ১ম খ- পৃ. ১১৫)
হররত আয়েশা রা: বলেন, “একরাতে আমি রাসূলুল্লাহ সা:কে খুঁজে না পেয়ে, খুঁজতে বের হয়ে ‘জান্নাতুল বাকি’ কবরস্থানে হুজুরকে পেলাম। তখন রাসূলুল্লাহ সা: আমাকে বললেন, ‘তুমি কি মনে করো আল্লাহর রাসূল তোমার ওপর জুুলুম করবেন?’ আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমি ধারণা করেছিলাম, আপনি হয়তো আপনার কোনো স্ত্রীর নিকট চলে গিয়েছেন।’ তখন রাসূলুল্লাহ সা: বললেন, ‘মহান আল্লাহ শাবানের মধ্যরাতে নিচ আকাশে নেমে আসেন এবং কালব গোত্রের ছাগলের পালের পশমের চেয়ে বেশি লোকদের ক্ষমা করেন।’ (মুসনাদে আহমাদ, ৬/২৩৮, তিরমিজি ২/১২১, ১২২)
(অনেক মুহাদ্দিসীনের মতে এই হাদীসটি দুর্বল। তবে ফজিলতের ক্ষেত্রে দুর্বল হাদীস গ্রহণযোগ্য)
রাসুল স অন্য হাদীসে বলেছেন, “১৪ শাবান দিবাগত রাত্রে তোমরা নামাজ (নফল) পড় এবং পরদিন রোজা (নফল) রাখ।
বাড়াবাড়ি : অনেকে শবে বরাত নিয়ে বাড়াবাড়ি করেন। শবে কদরের সমতুল বা কাছে নিয়ে যান। “ইন্না আনযালনাহু ফি লাইলাতিম মোবারাকা…” বলে শবে বরাত বুঝাতে চান। যা একেবারেই ভুল। অথচ এই আয়াতটি শবে কদর সম্পর্কে অবতীর্ণ। বাস্তবে শবে কদরের মর্যাদা তুলানাহীন ভাবে বেশি। কয়েক’শ শবে বরাত একত্রিত করলেও শবে কদরের সমান হবে না।
আলোচনা অনেক লম্বা হয়ে গেছে। তাই করনীয় ও বর্জনীয় নিয়ে দীর্ঘ আলোচনায় না গিয়ে শিরোনামের মতই বলছি।
শবে বরাতে করনীয় :
ক. রাত্রের বেলা সাধ্যানুযায়ী নফল নামাজ পড়া।
খ. পরদিন নফল রোজা রাখা।
গ. অন্যান্য নফল ইবাদত যেমন- কুরআর তেলাওয়াত, তাসবিহ পাঠ, দুরুদ-ইস্তেগফার, জিবিত ও মৃত সবার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া।
ঘ. আগামীর প্রয়োজন বিশেষত রিজিকের জন্য, এবং নেক আমলের তাওফিক কামনা করে খোদার কাছে প্রার্থনা ইত্যাদি।
নফল ইবাদত করতে গিয়ে যেন এশা ও ফজরের ফরজ নামাজ না ছুটে, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। নতুবা ফজরের নামাজ ছুটে গেলে সারা রাত্রের নফল ইবাদত অপেক্ষা ক্ষতি বেশি হযে যাবে।
শবে বরাতে বর্জনীয় :
ক. প্রথমেই সকল প্রকার রিয়া তথা লৌকিকা বর্জন করতে হবে।
খ. সামষ্টিক আমল থেকে ব্যক্তিগত আমলের প্রতি গুরুত্ব বেশী দিতে হবে। কারণ অধিকাংশ সামষ্টিক আমলে রিয়া বা লৌকিকতার সম্ভাবনা থাকে।
গ. আলেম-উলামা-ইমাম সাহেব নির্ভর না হয়ে নিজের মুর্দেগানের জন্য নিজে দোয়া করা কিংবা নিজের মুর্দেগানে কবর নিজে যিয়ারত করা অনেক উত্তম। কারণ পিতা-মাতার ক্ষেত্রে সন্তানের দোয়া এবং সন্তানের ক্ষেত্রে পিতা-মাতার দোয়া কবুল হবার নিশ্চয়তা রাসুল (স) দিয়ে গেছেন। আর কারো বেলায় দোয়া কবুলের নিশ্চয়তা নেই।
ঘ. সকল প্রকার ইসরাফ তথা বেহুদা খরচ থেকে বেচে থাকতে হবে। আলোর প্রয়োজনীয়তা ব্যতিত বাতি বা মোমবাতি জ্বালানো থেকে বিরত থাকতে হবে। অনেকে অপ্রয়োজন মোম জ্বালিয়ে এই রাত্রীকে বলে ‘বাত্তির রাত” এটা সম্পুর্ণ শরীয়ত বিরোধী বিধর্মী অনুকরণ।
ঙ. আতশবাজিসহ সকল বিধর্মী সংস্কৃতি থেকে নিজে দূরে থাকতে হবে এবং অধিনস্ত সবাইকে দূরে রাখতে হবে।
আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে শবে বারাতে উপকারী আমল করার তাওফিক দেন এবং অনর্থক ও অপকারী আমল করা থেকে হেফাজন করেন, আমীন।
(লেখক : কলামিস্ট ও শিক্ষাবিদ। মোবাইল ০১৭১২ ১০০০৫৭)



















