এ শোকের কথা শোনার মানুষ জগতে আছে বৈকি! মানুষে মানুষে এখন আর পার্থক্য নাই। বড় ছোট পার্থক্য। যুবক বৃদ্ধ পার্থক্য। ছেলে মেয়ে পার্থক্য। মা মেয়ে পার্থক্য। ভাই ভাইয়ে পার্থক্য। করণিক হ্যাড পার্থক্য। শিক্ষক শিক্ষার্থীর পার্থক্য। সম্মানের পার্থক্য। মেনে চলার পার্থক্য। এসবের মাঝে যে পার্থক্য ছিলো, তাদের মাঝে যে মানা মান্যতা ছিলো, সুসম্পর্কের বন্ধুত্ব ছিলো তা আজকাল চোখে পড়ে না। আমি সব সময় একটা কথা বলে থাকি- নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে সকলেই সকলের সাথে সম্পর্ক কিংবা বন্ধুত্ব করতে পারেন। কিন্তু আজকাল সম্পর্ক বা বন্ধুত্ব হচ্ছে ঠিকই কিন্তু নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা হচ্ছে না। যেটা অবশ্যই আমাদের সকলের উদ্ধেগ প্রকাশ করার বিষয়। কেনো এমনটা হচ্ছে না, তা নিয়ে কিঞ্চিৎ বলার চেষ্টা করবো।
পারিবারিক শিক্ষা:
ছোটবেলা বাবার কনিষ্ঠা আঙ্গুল ধরে বাজারে আসতাম। বাজারের সাথেই আমাদের গ্রাম হওয়ায় এক মিনিটের রাস্তাও নয় আমাদের। তবুও প্রতি রবি ও বুধ বারে বাজারে আসতাম। হাট বারে। খুব ছোট ছিলাম তখন কিংবা যখন কিছুটা বুঝতে শিখি তখনো অযথা বাজারে আসতাম না। আসলে গ্রামের মুরব্বিরা বকা দিতেন। চতুর্দিকে একটা শাসন ছিলো। পরিবার ছিলো আমাদের শিক্ষার প্রধান উৎস। সন্ধ্যায় রাতের রান্না শেষ করে কিংবা রাঁধতে রাঁধতে আম্মা আমাদের ছড়া শিখাতেন।
আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে?
গল্প শোনাতেন। নবী রাসুলের গল্প। সফলতার গল্প। মিথ্যা বলা মহাপাপ সেটা শিখাতেন। এর জন্য শাস্তি দিতেন। ‘গালি দিলে জিহ্বা পঁচে যায়’ এ শিক্ষা আম্মার কাছ থেকে পরিবারেই পেয়েছি। সকালে মক্তবে যাওয়া ছিলো অন্যরকম ছাপ। এ ছাপে আমরা সকালে ছাই দিয়ে দাঁত মাঝতে মাঝতে মসজিদে যেতাম। বৃহস্পতিবার মসজিদে নৈতিক শিক্ষা দেওয়া হতো। নামাজ শিক্ষা দেওয়া হতো। সব মিলিয়ে আমরা পরিবার থেকে এ শিক্ষা পেয়েছি।
এখন এটা নেই। পরিবারে কেউ এখন ‘গালি দিলে জিহ্বা পঁচে যায়’ এ শিক্ষা দেওয়ার মতো সময় নাই। বাবা ছেলে মেয়েকে নিয়ে আনন্দ উপভোগ করে না। সকালের নৈতিক শিক্ষার পাঠ কয়টা ছেলে মেয়ে পায় এখন?
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা:
আমাদের একটা কবিতা ছিলো। মদন মোহন তর্কালঙ্কার নামক এক গুণী কবি লিখেছিলেন-
সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি
সারাদিন আমি যেনো ভালো হয়ে চলি।
এমন শপথ পড়ে আমাদের সময়কার ছেলে মেয়েদের সকাল শুরু হতো। কতো জন ভাল হয়ে চলতো জানি না তবে কেউ না কেউ তো ভাল হয়ে চলেছেনই?
তিনি আরো লিখেছিলেন-
আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে
আমি যেনো সেই কাজ করি ভাল মনে।
বলছি যে, বর্তমান ক’জন শিক্ষক আছেন যে, শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই, গাইড বই আর কোচিং পড়া ছাড়া ভাল কাজে আদেশ দেন আর মন্দ কাজে বাঁধা দেন? সারা দেশে হাতে গুনা কয়েকজন হবেন।
শুধুমাত্র শিক্ষককুলকে দোষারোপ করছি না, শিক্ষা ব্যবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নৈতিক শিক্ষা পাবে এমন কোনো ভাল পাঠই এখন পাঠ্য বইয়ে নাই। সবই ব্যক্তি বিশেষের আলোচনা। বানান ভুলের বাড়াবাড়ি। বিতর্কিত শব্দ চয়ন ইত্যাদি। বাচ্ছারা শিখবে কি? আর শিক্ষকেরাও কি শেখাবেন?
এভাবে চললে নৈতিকতার অবক্ষয় তো ঘটবেই?
খেলাধুলা:
আমরা অনেক বড় বড় দলবেঁধে খেলতাম। সন্ধ্যা পর্যন্ত খেলেছি। খেলায় আনন্দ ছিলো। শিক্ষা ছিলো। ফুলদানির বাজি খেলতাম। দুই টাকা করে চাঁদা দিয়ে ফুলদানি কিনে খেলতাম। জিতলে মিছিল দিয়ে বাজারের দিকে গিয়ে নদীতে ধাপিয়ে পড়তাম। লড়াইয়ে জিতে যাওয়া মোরগের মতো উঁচু গলা হতো আমাদের। ‘কান্দিগাঁইয়্যা বাঘের বাচ্ছা/ গোল দেয় নাইচ্যা নাইচ্যা’ বিশেষ ধরনের শ্লোগান থাকতো আমাদের কণ্ঠে। আর হারলে চুপচাপ চলে আসতাম। প্রমিজ থাকতো পরের ম্যাচে জিতার। আমাদের গ্রামের নাম কান্দিগাঁও। আমি দলের কোনো বিশেষ খেলোয়ার ছিলাম না। যুগীর মতো দলে থাকা আর চাঁদা দেওয়াই ছিলো আমার কাজ। ছোট দলের গোল কিপার ছিলাম। আমাদের দলের নাম ছিলো দুর্জয় স্পোর্টিং ক্লাব। এখান থেকে আমরা শিখতাম কিভাবে জিতার আনন্দ নিতে হয়, হারলে মানতে হয়। একজনের নের্তৃত্ব মানতাম। নিয়মানুবর্তিতা ছিলো আমাদের প্রচুর। আমরা খেলতে খেলতে শিখেছি, আনন্দ পেয়েছি, মানতে শিখেছি। সবচেয়ে বড় কথা হারতে শিখেছি, কিন্তু ভেঙ্গে যাই নি। হারতে শিখে ঠিকে থাকার শিক্ষাটা কাজে দেবে। সকলের কাজে না দিলেও এক জন না এক জনের তো দিবেই।
এখন খেলাটা কমার্শিয়াল হয়ে গেছে। আনন্দ নেই। জুয়ার মতো হয়ে গেছে। ভাবতে অবাক লাগে মানুষ এখন আর আনন্দের জন্য খেলে না। আনন্দ দিতে খেলে না। জিতার জন্য খেলে। টাকার জন্য খেলে। এ অবস্থায় অবশ্যই নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটবেই।
প্রযুক্তির উন্নয়ন:
আমি যখন নবম শ্রেণিতে পড়ি তখন প্রথম মোবাইল ফোন ব্যবহার শুরু করি। এখন পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা মোবাইলের সব কিছুই জানে। তরুর ব্যনারে একটা কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছি। উদ্দেশ্য বিশটা প্রশ্ন তো বাচ্চারা জেনে উত্তর দিতেই হবে। বাজারে পেয়ে ষষ্ঠ শ্রেণির একজন পরিচিত ছাত্র বলল- তরু ভাই, ১৬টা গুগলে পেয়েছি। বাকীগুলো পাচ্ছি না। অবাক হলাম, গুগলও চিনে সে। বই পড়তে হয় নি, গুগল বলে দিয়েছে। ফেচবুকে তো আরো বেহাল অবস্থা। তার মানে বলছি না যে, এসব বাদ দিতে হবে। এসবের দরকার আছে। শিখা দরকার তবে মাত্রাতিরিক্ত দরকার আছে বলে মনে হয় না। বলছি, এই টুকু ছেলে মেয়েরা এসব এখন ব্যবহার না করলেই কি নয়? শুধু যে ভাল শিখছে তা তো নয়, খারাপও তো শিখছে। বড়দের মানছে না। স্যোসাল জগতে থেকে তার বাহ্যিক, মানসিক ও অবস্থান অবশ্যই পরিবর্তন এসেছে যা, এই বয়সে আসার দরকার ছিলো না। এভাবে চললে যতদিন যাবে মানবেও না।
শেষ করবো। আমাদের জাতিগত নীতি মোটেও ঠিক নয়। রাজনীতিকেরা ঠিক নয়। বাচ্চারা যেখান থেকে শিখবে সে জায়গাটা ঠিক নয়, আমি আমরা ঠিক নয়। পরিবার ঠিক নয়। যেখানে আমাদের সমাজই ঠিক নয় সেখানে নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটবে সেটাই স্বাভাবিক। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ না করে বরং কিভাবে উত্তরণ করা যায় তার উপায় বের করা দরকার। না হলে জাতির যাত্রা অন্ধকারে, এটা নিশ্চিত।
লেখক: দক্ষিন সুনামগঞ্জ। মোবাঃ 01723-698369




























