১২:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৩ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ধর্মের বাগানে ফুটুক ঐক্যের ফুল

  • Update Time : ০৪:১৫:৫৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২২
  • / ১ বার নিউজটি পড়া হয়েছে

আহনাফ আবদুল কাদির

 

আপনার সঙ্গে কারও মতাদর্শের ভিন্নতা থাকতেই পারে। ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক দূরত্ব থাকাটাও স্বাভাবিক। মানুষে মানুষে এ মতপার্থক্য ও বৈচিত্র্যময়তা যুগযুগ ধরে চলে আসছে। কিন্তু সেই ভিন্নতা ও বৈচিত্র্যময়তা যখন নোংরামি ও কাদা ছোড়াছুড়িতে রূপ নেয় এবং তারচেয়ে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে সেটি যদি কুফরি, মারামারি ও হত্যাকাণ্ডের রূপ ধারণ করে তবে এটি ধর্ম ও মানবতার জন্য খুবই ক্ষতিকর।

 

বিশেষত কুরআনের অসংখ্য আয়াত ও নবিজি (সা.)-এর বহু হাদিসে এমন আচরণকে প্রবৃত্তির অনুসরণ ও চরম মূর্খতা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের কিছু ধর্মীয় পণ্ডিতদের মাঝে এটি আজ ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।

আলেম আলেমের বিরুদ্ধে, দল দলের বিরুদ্ধে, পির পিরের বিরুদ্ধে অহরহ বিষোদগার করে যাচ্ছেন। মাহফিলের স্টেজে, ফেসবুকের ওয়ালে এবং ইউটিউবের চ্যানেলে নোংরামি ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য আজ যেন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

 

কখনো কখনো একপক্ষ অপর পক্ষকে ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের এজেন্ট এবং সরাসরি কাফের ফতোয়া দিচ্ছে। আবার খুব মামুলি বিষয় যেমন টুপির ধরন ও পাঞ্জাবি-পায়জামার কাটিং এসব নিয়েও মতভেদ করতে দেখা যায়। অথচ ইসলামে ছোটখাটো বিষয় নিয়ে যারা তর্কবিতর্কে লিপ্ত হয় এবং অহংকার ও গোঁড়ামিবশত নিজেদের একমাত্র মুমিন-মুসলমান মনে করে তাদের থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে বলা হয়েছে।

পবিত্র কুরআনুল কারিমে এ ধরনের আচরণকে মুশরিকদের স্বভাব হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। যারা তাদের দ্বীনে বিভেদ সৃষ্টি করেছে আর নিজেরা দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে আনন্দিত’ (সূরা রুম : ৩১, ৩২)।

 

আরও বলা হয়েছে, ‘যারা তাদের দ্বীনকে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে এবং নিজেরা বিভিন্ন দলে-উপদলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের সঙ্গে আপনার কোনো সম্পর্ক নেই’ (সূরা আল-আন’আম : ১৫৯)।

 

আরও বহু আয়াতে দলাদলি বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যারা বিভেদ সৃষ্টি করে তাদের জন্য কঠিন শাস্তির হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়েছে। স্রষ্টার অনুগ্রহপ্রাপ্ত বান্দারাই কেবল এ ধরনের বিভক্তি পরিহার করে চলতে পারে। পবিত্র কুরআনুল কারিমে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমার পালনকর্তা যাদের অনুগ্রহ করেন তারা ছাড়া অন্যরা সর্বদা মতভেদ করতেই থাকবে’ (সূরা : হুদ-১১৮, ১১৯)।

 

মহান আল্লাহর উলুহিয়্যাত-প্রভুত্ব ও তাওহিদ -একত্ববাদের বিষয়ে বিশ্বের সমগ্র জাতির ঐকমত্য আজ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবু কুরআনের নীতি হচ্ছে, যারা ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ও মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরোধী মনোভাব পোষণ করে তাদের সঙ্গেও সুসম্পর্ক বজায় রেখে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা। মহান আল্লাহতায়ালা বিশেষভাবে মুসলমানদের মানব সমাজের অপরাপর ধর্মীয় গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে সর্বোত্তম, প্রজ্ঞাপূর্ণ ও সুন্দর আচরণের নীতি অনুসরণ করার তাগিদ প্রদান করেন।

 

সূরা ইউনুসের ৯৯নং আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর যদি তোমার রব চাইতেন, তবে জমিনের সবাই ইমান আনত। তবে কি তুমি বাধ্য করবে, যাতে তারা মুমিন হয়?

 

এমনকি অপরাপর ধর্মীয় গোষ্ঠী যদি গায়ে পড়ে এসে বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত হতে চায়, তবুও তাদের সঙ্গে তর্ক এড়িয়ে যেতে কুরআনুল কারিম আমাদের চমৎকার নির্দেশনা প্রদান করে।

 

সূরা হজের ৬৮-৬৯নং আয়াতে এসেছে, ‘আর তারা যদি তোমাদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা করে, তাহলে তাদের বল, তোমরা যা করছ সে সম্পর্কে আল্লাহই ভালো জানেন। তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করছ, আল্লাহ সে বিষয়ে কেয়ামতের দিন মীমাংসা করে দেবেন’। কাজেই বিতর্ক পরিহার করে দল, মত, পথ নির্বিশেষে সবার সঙ্গে উত্তম আচরণ করতে হবে। কুরআন আমাদের এ বিষয়েও সতর্ক করে যে, যাতে আমরা বিদ্বেষ পোষণ করে কারও ওপর জুলুম না করে বসি। বরং সবার প্রতি অনুগ্রহ, ইনসাফ ও সহনশীলতা দেখাই।

 

সূরা মায়েদার ৮নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্র“তা পোষণ যাতে কোনোভাবেই তোমাদের অন্যদের প্রতি ইনসাফ করা থেকে বিরত রাখতে না পারে। তোমরা ইনসাফ কর, তা তাকওয়ার নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই তোমরা যা কর, আল্লাহ সে বিষয়ে সবিশেষ অবহিত’। হায়, আজ আমরা যেভাবে বিরোধী মতের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ি তাতে ইনসাফের লেশমাত্র নেই। দ্বীনি ভাই জেনেও এমন ভাষা ও আচরণ দেখাই যা কোনোভাবেই ইনসাফের মধ্যে পড়ে না; বরং সুস্পষ্ট জুলুম। ইসলামের আদর্শবিরোধী কাজ।

 

নবিজি (সা.) তার বাণীতে মুসলিম উম্মাহকে মতবিরোধ ও দলাদলি থেকে বিরত থাকার জন্য বারবার সতর্ক করেছেন। তিনি বহু হাদিস বলেছেন, আমার মৃত্যুর পর তোমরা শেষ জামানায় অনেক মতবিরোধ, দলাদলি ও বিভক্তি দেখতে পাবে। সে সময় বিভক্তি পরিহার করে আমার ও সুপথপ্রাপ্ত প্রতিনিধিদের রীতির ওপর চলবে। কোনো ধরনের দলাদলি করবে না। একে অপরের প্রতি দোষারোপ করবে না।’

 

অথচ নবিজির বাণীকে উপেক্ষা করে আলেম সমাজই আজ সবচেয়ে ভয়াবহ ফিতনার সম্মুখীন। নিজেরা যেমন দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে ভিন্ন মতাবলম্বীদের দোষারোপ করছে, তেমনি সমর্থকগোষ্ঠীও ভিন্ন মতাবলম্বীদের সঙ্গে অহরহ তর্কে জড়াচ্ছে। এমনকি প্রতিপক্ষের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটছে কোথাও কোথাও।

 

অথচ নবিজি (সা.)-এর হাদিসে আমরা আমলের বৈচিত্র্যময়তা লক্ষ করি। একই আমল নবিজি একাধিক নিয়মে করেছেন এবং অন্যদের শিখিয়েছেন। পরে সাহাবাদের মাঝেও আমলের ভিন্নতা ছিল। কিন্তু কেউই নিজেকে হক এবং অন্যদের বাতিল বলেননি। বরং শ্রদ্ধার সঙ্গে অপরের মতামত প্রাধান্য দিতেন। তারা অন্ধভাবে কারও অনুসরণ করতেন না। বরং সবার থেকে ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করতেন।

 

অথচ আমরা আজ আমাদের পছন্দসই দল, পির অথবা শায়খের বক্তব্যই সঠিক মনে করছি। ওই শায়খ ভুল বললেও মেনে নিচ্ছি। বিবাদে জড়াচ্ছি পরস্পর। এর ফলে সংকীর্ণ হচ্ছে আমাদের জানার বহর। আটকে যাচ্ছি ব্যক্তি পূজায়। ইসলাম থেকে দূরে সরে গিয়ে ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত হচ্ছি।

 

ইমাম গাজালি তার ‘সত্যের সন্ধান’ বইয়ে সুন্দর করে বলেছেন, ‘বিশ্বাস ও ধর্মের ব্যাপারে মতভেদ এবং পথের ভিন্নতা একটি গভীর সমুদ্রের মতো, যাতে বহু ব্যক্তি নিমজ্জিত হয়েছে, কিন্তু খুব কম লোকই উদ্ধার পেয়েছে। অথচ প্রত্যেকেই মনে করছেন তিনিই শুধু মুক্তির সন্ধান পেয়েছেন’। আমাদের মনে রাখতে হবে, ধর্মে দলাদলি নেই এবং দলাদলিতেও ধর্ম নেই। ধর্ম আছে জ্ঞান আহরণে ও আমলে।

 

বিশ্বজুড়ে মুসলিম উম্মাহ আজ কঠিন সময় পার করছে। অথচ আমরা এখনো পড়ে আছি টুপি আর পাঞ্জাবির সাইজ নিয়ে। যা আমাদের ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে দিচ্ছে। বড় আফসোস করে বিদ্রোহী কবি নজরুল বলেছিলেন, ‘বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে, আমরা তখনো বসে/ বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি, ফিকাহ ও হাদিস চষে।’

 

এখনই সময় ঘুরে দাঁড়ানোর। যুগের সমস্যা সমাধানে আলেমদের যুগোপযোগী জ্ঞানে সমৃদ্ধ হওয়ার। কুরআনের আলোয় তরুণ প্রজন্মকে পথে ফেরানোর। না হয় পরস্পর কাদা ছোড়াছুড়িতে বিপথগামী হবে ধর্মপ্রিয় তরুণরা। দলাদলির কবলে পড়ে তরুণদের একটি শ্রেণি আজ ধর্মের প্রতি আবেদনহীন হয়ে পড়ছে। আরেক শ্রেণি হয়ে পড়ছে উগ্র মানসিকতাসম্পন্ন। তাই এখনই আলেম সমাজকে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ও দলাদলি পরিহার করে ইলম ও প্রজ্ঞার পরিচয় দেওয়া উচিত। লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ

ধর্মের বাগানে ফুটুক ঐক্যের ফুল

Update Time : ০৪:১৫:৫৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২২

আহনাফ আবদুল কাদির

 

আপনার সঙ্গে কারও মতাদর্শের ভিন্নতা থাকতেই পারে। ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক দূরত্ব থাকাটাও স্বাভাবিক। মানুষে মানুষে এ মতপার্থক্য ও বৈচিত্র্যময়তা যুগযুগ ধরে চলে আসছে। কিন্তু সেই ভিন্নতা ও বৈচিত্র্যময়তা যখন নোংরামি ও কাদা ছোড়াছুড়িতে রূপ নেয় এবং তারচেয়ে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে সেটি যদি কুফরি, মারামারি ও হত্যাকাণ্ডের রূপ ধারণ করে তবে এটি ধর্ম ও মানবতার জন্য খুবই ক্ষতিকর।

 

বিশেষত কুরআনের অসংখ্য আয়াত ও নবিজি (সা.)-এর বহু হাদিসে এমন আচরণকে প্রবৃত্তির অনুসরণ ও চরম মূর্খতা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের কিছু ধর্মীয় পণ্ডিতদের মাঝে এটি আজ ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।

আলেম আলেমের বিরুদ্ধে, দল দলের বিরুদ্ধে, পির পিরের বিরুদ্ধে অহরহ বিষোদগার করে যাচ্ছেন। মাহফিলের স্টেজে, ফেসবুকের ওয়ালে এবং ইউটিউবের চ্যানেলে নোংরামি ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য আজ যেন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

 

কখনো কখনো একপক্ষ অপর পক্ষকে ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের এজেন্ট এবং সরাসরি কাফের ফতোয়া দিচ্ছে। আবার খুব মামুলি বিষয় যেমন টুপির ধরন ও পাঞ্জাবি-পায়জামার কাটিং এসব নিয়েও মতভেদ করতে দেখা যায়। অথচ ইসলামে ছোটখাটো বিষয় নিয়ে যারা তর্কবিতর্কে লিপ্ত হয় এবং অহংকার ও গোঁড়ামিবশত নিজেদের একমাত্র মুমিন-মুসলমান মনে করে তাদের থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে বলা হয়েছে।

পবিত্র কুরআনুল কারিমে এ ধরনের আচরণকে মুশরিকদের স্বভাব হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। যারা তাদের দ্বীনে বিভেদ সৃষ্টি করেছে আর নিজেরা দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে আনন্দিত’ (সূরা রুম : ৩১, ৩২)।

 

আরও বলা হয়েছে, ‘যারা তাদের দ্বীনকে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে এবং নিজেরা বিভিন্ন দলে-উপদলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের সঙ্গে আপনার কোনো সম্পর্ক নেই’ (সূরা আল-আন’আম : ১৫৯)।

 

আরও বহু আয়াতে দলাদলি বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যারা বিভেদ সৃষ্টি করে তাদের জন্য কঠিন শাস্তির হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়েছে। স্রষ্টার অনুগ্রহপ্রাপ্ত বান্দারাই কেবল এ ধরনের বিভক্তি পরিহার করে চলতে পারে। পবিত্র কুরআনুল কারিমে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমার পালনকর্তা যাদের অনুগ্রহ করেন তারা ছাড়া অন্যরা সর্বদা মতভেদ করতেই থাকবে’ (সূরা : হুদ-১১৮, ১১৯)।

 

মহান আল্লাহর উলুহিয়্যাত-প্রভুত্ব ও তাওহিদ -একত্ববাদের বিষয়ে বিশ্বের সমগ্র জাতির ঐকমত্য আজ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবু কুরআনের নীতি হচ্ছে, যারা ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ও মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরোধী মনোভাব পোষণ করে তাদের সঙ্গেও সুসম্পর্ক বজায় রেখে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা। মহান আল্লাহতায়ালা বিশেষভাবে মুসলমানদের মানব সমাজের অপরাপর ধর্মীয় গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে সর্বোত্তম, প্রজ্ঞাপূর্ণ ও সুন্দর আচরণের নীতি অনুসরণ করার তাগিদ প্রদান করেন।

 

সূরা ইউনুসের ৯৯নং আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর যদি তোমার রব চাইতেন, তবে জমিনের সবাই ইমান আনত। তবে কি তুমি বাধ্য করবে, যাতে তারা মুমিন হয়?

 

এমনকি অপরাপর ধর্মীয় গোষ্ঠী যদি গায়ে পড়ে এসে বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত হতে চায়, তবুও তাদের সঙ্গে তর্ক এড়িয়ে যেতে কুরআনুল কারিম আমাদের চমৎকার নির্দেশনা প্রদান করে।

 

সূরা হজের ৬৮-৬৯নং আয়াতে এসেছে, ‘আর তারা যদি তোমাদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা করে, তাহলে তাদের বল, তোমরা যা করছ সে সম্পর্কে আল্লাহই ভালো জানেন। তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করছ, আল্লাহ সে বিষয়ে কেয়ামতের দিন মীমাংসা করে দেবেন’। কাজেই বিতর্ক পরিহার করে দল, মত, পথ নির্বিশেষে সবার সঙ্গে উত্তম আচরণ করতে হবে। কুরআন আমাদের এ বিষয়েও সতর্ক করে যে, যাতে আমরা বিদ্বেষ পোষণ করে কারও ওপর জুলুম না করে বসি। বরং সবার প্রতি অনুগ্রহ, ইনসাফ ও সহনশীলতা দেখাই।

 

সূরা মায়েদার ৮নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্র“তা পোষণ যাতে কোনোভাবেই তোমাদের অন্যদের প্রতি ইনসাফ করা থেকে বিরত রাখতে না পারে। তোমরা ইনসাফ কর, তা তাকওয়ার নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই তোমরা যা কর, আল্লাহ সে বিষয়ে সবিশেষ অবহিত’। হায়, আজ আমরা যেভাবে বিরোধী মতের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ি তাতে ইনসাফের লেশমাত্র নেই। দ্বীনি ভাই জেনেও এমন ভাষা ও আচরণ দেখাই যা কোনোভাবেই ইনসাফের মধ্যে পড়ে না; বরং সুস্পষ্ট জুলুম। ইসলামের আদর্শবিরোধী কাজ।

 

নবিজি (সা.) তার বাণীতে মুসলিম উম্মাহকে মতবিরোধ ও দলাদলি থেকে বিরত থাকার জন্য বারবার সতর্ক করেছেন। তিনি বহু হাদিস বলেছেন, আমার মৃত্যুর পর তোমরা শেষ জামানায় অনেক মতবিরোধ, দলাদলি ও বিভক্তি দেখতে পাবে। সে সময় বিভক্তি পরিহার করে আমার ও সুপথপ্রাপ্ত প্রতিনিধিদের রীতির ওপর চলবে। কোনো ধরনের দলাদলি করবে না। একে অপরের প্রতি দোষারোপ করবে না।’

 

অথচ নবিজির বাণীকে উপেক্ষা করে আলেম সমাজই আজ সবচেয়ে ভয়াবহ ফিতনার সম্মুখীন। নিজেরা যেমন দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে ভিন্ন মতাবলম্বীদের দোষারোপ করছে, তেমনি সমর্থকগোষ্ঠীও ভিন্ন মতাবলম্বীদের সঙ্গে অহরহ তর্কে জড়াচ্ছে। এমনকি প্রতিপক্ষের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটছে কোথাও কোথাও।

 

অথচ নবিজি (সা.)-এর হাদিসে আমরা আমলের বৈচিত্র্যময়তা লক্ষ করি। একই আমল নবিজি একাধিক নিয়মে করেছেন এবং অন্যদের শিখিয়েছেন। পরে সাহাবাদের মাঝেও আমলের ভিন্নতা ছিল। কিন্তু কেউই নিজেকে হক এবং অন্যদের বাতিল বলেননি। বরং শ্রদ্ধার সঙ্গে অপরের মতামত প্রাধান্য দিতেন। তারা অন্ধভাবে কারও অনুসরণ করতেন না। বরং সবার থেকে ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করতেন।

 

অথচ আমরা আজ আমাদের পছন্দসই দল, পির অথবা শায়খের বক্তব্যই সঠিক মনে করছি। ওই শায়খ ভুল বললেও মেনে নিচ্ছি। বিবাদে জড়াচ্ছি পরস্পর। এর ফলে সংকীর্ণ হচ্ছে আমাদের জানার বহর। আটকে যাচ্ছি ব্যক্তি পূজায়। ইসলাম থেকে দূরে সরে গিয়ে ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত হচ্ছি।

 

ইমাম গাজালি তার ‘সত্যের সন্ধান’ বইয়ে সুন্দর করে বলেছেন, ‘বিশ্বাস ও ধর্মের ব্যাপারে মতভেদ এবং পথের ভিন্নতা একটি গভীর সমুদ্রের মতো, যাতে বহু ব্যক্তি নিমজ্জিত হয়েছে, কিন্তু খুব কম লোকই উদ্ধার পেয়েছে। অথচ প্রত্যেকেই মনে করছেন তিনিই শুধু মুক্তির সন্ধান পেয়েছেন’। আমাদের মনে রাখতে হবে, ধর্মে দলাদলি নেই এবং দলাদলিতেও ধর্ম নেই। ধর্ম আছে জ্ঞান আহরণে ও আমলে।

 

বিশ্বজুড়ে মুসলিম উম্মাহ আজ কঠিন সময় পার করছে। অথচ আমরা এখনো পড়ে আছি টুপি আর পাঞ্জাবির সাইজ নিয়ে। যা আমাদের ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে দিচ্ছে। বড় আফসোস করে বিদ্রোহী কবি নজরুল বলেছিলেন, ‘বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে, আমরা তখনো বসে/ বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি, ফিকাহ ও হাদিস চষে।’

 

এখনই সময় ঘুরে দাঁড়ানোর। যুগের সমস্যা সমাধানে আলেমদের যুগোপযোগী জ্ঞানে সমৃদ্ধ হওয়ার। কুরআনের আলোয় তরুণ প্রজন্মকে পথে ফেরানোর। না হয় পরস্পর কাদা ছোড়াছুড়িতে বিপথগামী হবে ধর্মপ্রিয় তরুণরা। দলাদলির কবলে পড়ে তরুণদের একটি শ্রেণি আজ ধর্মের প্রতি আবেদনহীন হয়ে পড়ছে। আরেক শ্রেণি হয়ে পড়ছে উগ্র মানসিকতাসম্পন্ন। তাই এখনই আলেম সমাজকে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ও দলাদলি পরিহার করে ইলম ও প্রজ্ঞার পরিচয় দেওয়া উচিত। লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ