০৪:৫২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬, ১৭ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

দেশপ্রেম: মহানবী’র সা. উত্তম আদর্শ

  • Update Time : ১১:১৯:১২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২৩
  • / ১ বার নিউজটি পড়া হয়েছে

ড. সৈয়দ রেজওয়ান আহমদ

 

ইসলাম মানুষকে দেশপ্রেমের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে। মহানবী সা. দেশ, মাটি ও মানুষকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তাই বলা হয়; দেশ প্রেম মহানবী’র সা. উত্তম আদর্শ। কারণ মহানবী সা. হিজরতের পরও জন্মভূমি মক্কার কথা একটিবারের জন্যও ভোলেননি; বরং হিজরতের পর মক্কার ভালোবাসা তাঁর মধ্যে আরও তীব্র হয়ে ওঠে। মক্কায় ফিরে যাওয়ার জন্য তাঁর হৃদয় সব সময় ব্যাকুল হয়ে থাকত। এ কারণে আল্লাহ তাআলা তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে পবিত্র কোরআনে বলেছেন, ‘যিনি আপনার জন্য কোরআনকে জীবন বিধান বানিয়েছেন, তিনি আপনাকে অবশ্যই আপনার জন্মভূমিতে ফিরিয়ে আনবেন।’ (আল কোরআন; ২৮ : ৮৫)

মহানবী সা. দেশপ্রেমিক ছিলেন বলেই নিজের ভূখণ্ডের নিরাপত্তা সবার আগে বিবেচনা করেছেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের ভূখণ্ডের সীমানা সুরক্ষিত রাখার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘হে ইমানদারগণ, তোমরা ধৈর্য ধরো, ধৈর্যের প্রতিযোগিতা করো এবং প্রতিরক্ষার কাজে সদা প্রস্তুত থাকো।’ (আল কোরআন: ৩ : ২০০)

হাদিসে মহানবী সা. ও দেশের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের অনন্য মর্যাদার কথা ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহর রাস্তায় এক দিন সীমান্ত পাহারা দেওয়া দুনিয়া ও এর মধ্যের সবকিছু থেকে উত্তম।’ (বুখারি)

মহানবী সা. যেমন দেশের প্রতি ভালোবাসা লালন করতেন, তেমনি আল্লাহ যখন কোনো জালিমের বিরুদ্ধে বিজয় দান করতেন, তখন তিনি সেই বিজয়কে আল্লাহর অনুগ্রহ মনে করতেন এবং তাঁর প্রতি ভালো কাজের মাধ্যমে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতেন।

মহানবী’র স. নিজ জন্মভূমিকে ইসলামের শত্রুদর হাত থেকে মুক্ত করতে এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করতে যুদ্ধ করতে হয়েছিল। যে মক্কা নগরী থেকে আল্লাহর নবী বিতাড়িত হয়েছিলেন, ১০ বছর পর শত-সহস্র সাহাবায়ে কেরামের বিশাল বহর নিয়ে যখন পবিত্র মক্কা নগরীতে প্রবেশ করলেন, তখন তিনি বিজয় মিছিল বা শোভাযাত্রা কিছুই করেননি। বাদ্য-বাজনা বাজাননি। মহানবী সা. একটি উষ্ট্রীর উপর আরোহণাবস্থায় ছিলেন, তাঁর চেহারা ছিল নিম্নগামী। অর্থাৎ বিনয়ের সাথে তিনি পবিত্র জন্মভূমি মক্কায় প্রবেশ করেন।
এরপর সর্বপ্রথম তিনি উম্মে হানীর ঘরে প্রবেশ করেন। সেখানে আট রাকাত নফল নামাজ আদায় করেন। এই নামাজকে বলা হয় বিজয়ের নামাজ। এরপর নবীজী সা. হারাম শরিফে এসে সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে বয়ান প্রদান করেন। তিনি বলেন, হে মক্কার কাফের সম্প্রদায়! তের বছর ধরে আমার ওপর, আমার পরিবারের ওপর, আমার সাহাবাদের ওপর নির্যাতনের যে অতাচার- নির্যাতন করেছ, এর বিপরীতে আজকে তোমাদের কি মনে হয়, তোমাদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করব? তারা বলল, হ্যাঁ, আমরা কঠিন অপরাধী। কিন্তু আমাদের বিশ্বাস, আপনি আমাদের উদারতা, মহানুভবতা প্রদর্শন করবেন। এটাই আমরা প্রত্যাশা করি। তখন আল্লাহর নবী স. বললেন- হ্যাঁ, আমি আজ তোমাদের সকলের জন্য হজরত ইউসুফ’র আ. মতো সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলাম। যাও তোমাদের প্রতি আজ কোন অভিযোগ নেই। তোমাদের থেকে কোন প্রতিশোধ নেয়া হবে না। (সুনানে বাইহাকী) এখানেই ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব, অনবদ্যতা, অনন্যতা। এভাবে মহানুভবতা ও উদারতা প্রদর্শনের দ্বারাই মানুষের মন ইসলামের দিকে আকৃষ্ট হয়েছে। তখন মক্কার কাফিররা মুগ্ধ হয়ে দলে দলে ইসলামে দাখিল হয়েছে। এভাবে শান্তিপূর্ণভাবে মক্কা বিজয় করে মহানবী সা. পুরো বিশ্বকে এই ম্যাসেজ দিলেন যে, আমরা শান্তির পক্ষে।

 

দেশকে কীভাবে ভালোবাসতে হয় এবং কীভাবে দেশের কল্যাণ কামনা করতে হয়, আল্লাহ তায়ালা নবী-রাসুলদের উদাহরণ দিয়ে পবিত্র কোরআনে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহর নবী হজরত ইবরাহিম আ. দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা পোষণ করে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন, ‘হে আমার প্রতিপালক, এই ভূখণ্ডকে মক্কা আপনি নিরাপদ শহরে পরিণত করে দিন এবং এর অধিবাসীদের যারা তোমার প্রতি ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, তাদের রকমারি ফলমূল দিয়ে জীবিকা দান করুন।’ (আল কুরআন; ২ : ১২৬)
মহান রাব্বুল আলামিন; অন্য আয়াতে বলেন- “যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য ও বিজয় আসবে এবং দলে দলে মানুষ ইসলামে প্রবেশ করবে, তখন আল্লাহর প্রশংসার সাথে তাসবীহ ও ইস্তিগফার পড় এবং আল্লাহ শুকরিয়া আদায় করুন।

 

এমনিভাবে বিজয়ের দিনে (বিজয় দিবস উপলক্ষে) আমাদের জন্য করণীয় বলে মনে করি-

১. আল্লাহর মহত্ব, পবিত্রতা ও বড়ত্ব বর্ণনা করা।
২. আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা।
৩. মহান আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে আত্মনিবেদন ও ইস্তিগফার করা।

সুতরাং আমরা মনে করি; ইসলামের এই পদ্ধতিতে বিজয় দিবস পালন করা দরকার। এদিন নফল নামাজ পড়ে এবং মহান আল্লাহর দরবারে তাসবীহ- তাহমীদ পাঠ করে বিজয়ের জন্য তাঁর শোকর আদায় করতে পারি। কুরআন তিলাওয়াত করে এবং দান-খাইরাত করে তার ছাওয়াব দেশের স্বাধীনতার জন্য যারা প্রাণ দিয়েছেন, রক্ত দিয়েছেন তাদের জন্য দু‘আ করতে পারি। আর দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং শান্তিময় ও সমৃদ্ধশালী দেশ গঠনে প্রত্যয় করতে পারি। আল্লাহ আমাদেরকে সে তওফিক দান করুন আমিন।

 

লেখক: অধ্যক্ষ, সৈয়দপুর সৈয়দিয়া শামছিয়া ফাজিল মাদরাসা,
জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ।

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ

দেশপ্রেম: মহানবী’র সা. উত্তম আদর্শ

Update Time : ১১:১৯:১২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২৩

ড. সৈয়দ রেজওয়ান আহমদ

 

ইসলাম মানুষকে দেশপ্রেমের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে। মহানবী সা. দেশ, মাটি ও মানুষকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তাই বলা হয়; দেশ প্রেম মহানবী’র সা. উত্তম আদর্শ। কারণ মহানবী সা. হিজরতের পরও জন্মভূমি মক্কার কথা একটিবারের জন্যও ভোলেননি; বরং হিজরতের পর মক্কার ভালোবাসা তাঁর মধ্যে আরও তীব্র হয়ে ওঠে। মক্কায় ফিরে যাওয়ার জন্য তাঁর হৃদয় সব সময় ব্যাকুল হয়ে থাকত। এ কারণে আল্লাহ তাআলা তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে পবিত্র কোরআনে বলেছেন, ‘যিনি আপনার জন্য কোরআনকে জীবন বিধান বানিয়েছেন, তিনি আপনাকে অবশ্যই আপনার জন্মভূমিতে ফিরিয়ে আনবেন।’ (আল কোরআন; ২৮ : ৮৫)

মহানবী সা. দেশপ্রেমিক ছিলেন বলেই নিজের ভূখণ্ডের নিরাপত্তা সবার আগে বিবেচনা করেছেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের ভূখণ্ডের সীমানা সুরক্ষিত রাখার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘হে ইমানদারগণ, তোমরা ধৈর্য ধরো, ধৈর্যের প্রতিযোগিতা করো এবং প্রতিরক্ষার কাজে সদা প্রস্তুত থাকো।’ (আল কোরআন: ৩ : ২০০)

হাদিসে মহানবী সা. ও দেশের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের অনন্য মর্যাদার কথা ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহর রাস্তায় এক দিন সীমান্ত পাহারা দেওয়া দুনিয়া ও এর মধ্যের সবকিছু থেকে উত্তম।’ (বুখারি)

মহানবী সা. যেমন দেশের প্রতি ভালোবাসা লালন করতেন, তেমনি আল্লাহ যখন কোনো জালিমের বিরুদ্ধে বিজয় দান করতেন, তখন তিনি সেই বিজয়কে আল্লাহর অনুগ্রহ মনে করতেন এবং তাঁর প্রতি ভালো কাজের মাধ্যমে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতেন।

মহানবী’র স. নিজ জন্মভূমিকে ইসলামের শত্রুদর হাত থেকে মুক্ত করতে এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করতে যুদ্ধ করতে হয়েছিল। যে মক্কা নগরী থেকে আল্লাহর নবী বিতাড়িত হয়েছিলেন, ১০ বছর পর শত-সহস্র সাহাবায়ে কেরামের বিশাল বহর নিয়ে যখন পবিত্র মক্কা নগরীতে প্রবেশ করলেন, তখন তিনি বিজয় মিছিল বা শোভাযাত্রা কিছুই করেননি। বাদ্য-বাজনা বাজাননি। মহানবী সা. একটি উষ্ট্রীর উপর আরোহণাবস্থায় ছিলেন, তাঁর চেহারা ছিল নিম্নগামী। অর্থাৎ বিনয়ের সাথে তিনি পবিত্র জন্মভূমি মক্কায় প্রবেশ করেন।
এরপর সর্বপ্রথম তিনি উম্মে হানীর ঘরে প্রবেশ করেন। সেখানে আট রাকাত নফল নামাজ আদায় করেন। এই নামাজকে বলা হয় বিজয়ের নামাজ। এরপর নবীজী সা. হারাম শরিফে এসে সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে বয়ান প্রদান করেন। তিনি বলেন, হে মক্কার কাফের সম্প্রদায়! তের বছর ধরে আমার ওপর, আমার পরিবারের ওপর, আমার সাহাবাদের ওপর নির্যাতনের যে অতাচার- নির্যাতন করেছ, এর বিপরীতে আজকে তোমাদের কি মনে হয়, তোমাদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করব? তারা বলল, হ্যাঁ, আমরা কঠিন অপরাধী। কিন্তু আমাদের বিশ্বাস, আপনি আমাদের উদারতা, মহানুভবতা প্রদর্শন করবেন। এটাই আমরা প্রত্যাশা করি। তখন আল্লাহর নবী স. বললেন- হ্যাঁ, আমি আজ তোমাদের সকলের জন্য হজরত ইউসুফ’র আ. মতো সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলাম। যাও তোমাদের প্রতি আজ কোন অভিযোগ নেই। তোমাদের থেকে কোন প্রতিশোধ নেয়া হবে না। (সুনানে বাইহাকী) এখানেই ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব, অনবদ্যতা, অনন্যতা। এভাবে মহানুভবতা ও উদারতা প্রদর্শনের দ্বারাই মানুষের মন ইসলামের দিকে আকৃষ্ট হয়েছে। তখন মক্কার কাফিররা মুগ্ধ হয়ে দলে দলে ইসলামে দাখিল হয়েছে। এভাবে শান্তিপূর্ণভাবে মক্কা বিজয় করে মহানবী সা. পুরো বিশ্বকে এই ম্যাসেজ দিলেন যে, আমরা শান্তির পক্ষে।

 

দেশকে কীভাবে ভালোবাসতে হয় এবং কীভাবে দেশের কল্যাণ কামনা করতে হয়, আল্লাহ তায়ালা নবী-রাসুলদের উদাহরণ দিয়ে পবিত্র কোরআনে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহর নবী হজরত ইবরাহিম আ. দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা পোষণ করে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন, ‘হে আমার প্রতিপালক, এই ভূখণ্ডকে মক্কা আপনি নিরাপদ শহরে পরিণত করে দিন এবং এর অধিবাসীদের যারা তোমার প্রতি ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, তাদের রকমারি ফলমূল দিয়ে জীবিকা দান করুন।’ (আল কুরআন; ২ : ১২৬)
মহান রাব্বুল আলামিন; অন্য আয়াতে বলেন- “যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য ও বিজয় আসবে এবং দলে দলে মানুষ ইসলামে প্রবেশ করবে, তখন আল্লাহর প্রশংসার সাথে তাসবীহ ও ইস্তিগফার পড় এবং আল্লাহ শুকরিয়া আদায় করুন।

 

এমনিভাবে বিজয়ের দিনে (বিজয় দিবস উপলক্ষে) আমাদের জন্য করণীয় বলে মনে করি-

১. আল্লাহর মহত্ব, পবিত্রতা ও বড়ত্ব বর্ণনা করা।
২. আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা।
৩. মহান আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে আত্মনিবেদন ও ইস্তিগফার করা।

সুতরাং আমরা মনে করি; ইসলামের এই পদ্ধতিতে বিজয় দিবস পালন করা দরকার। এদিন নফল নামাজ পড়ে এবং মহান আল্লাহর দরবারে তাসবীহ- তাহমীদ পাঠ করে বিজয়ের জন্য তাঁর শোকর আদায় করতে পারি। কুরআন তিলাওয়াত করে এবং দান-খাইরাত করে তার ছাওয়াব দেশের স্বাধীনতার জন্য যারা প্রাণ দিয়েছেন, রক্ত দিয়েছেন তাদের জন্য দু‘আ করতে পারি। আর দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং শান্তিময় ও সমৃদ্ধশালী দেশ গঠনে প্রত্যয় করতে পারি। আল্লাহ আমাদেরকে সে তওফিক দান করুন আমিন।

 

লেখক: অধ্যক্ষ, সৈয়দপুর সৈয়দিয়া শামছিয়া ফাজিল মাদরাসা,
জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ।

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ