০৬:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২০ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এবং আহমদ বদরুদ্দিন খান একটি বিতর্কিত নিবন্ধের সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ

  • Update Time : ১২:০৪:৫৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ মার্চ ২০১৮
  • / ১ বার নিউজটি পড়া হয়েছে

ইকবাল হাসান জাহিদ

 

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এবং আহমদ বদরুদ্দিন খান একটি বিতর্কিত নিবন্ধের সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ

 

জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রাক্তন নির্বাহী সভাপতি উপমহাদেশের প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ মাওলানা মুহিউদ্দিন খানের কৃতিত্বের জন্য আমরা বাংলাদেশের ইসলামপন্থীরা তাঁর কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ। আল্লাহপাক তাঁকে জান্নাতের উঁচু মাকাম দান করুন।

 

গতকাল আমার কাছে যুব জমিয়ত বাংলাদেশের একটি স্মারক এসে পৌঁছেছে। স্মারকে মাওলানা মুহিউদ্দিন খান সাহেবের ছেলে আহমদ বদরুদ্দিন খানের একটা নিবন্ধে আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। মুহিউদ্দিন খান সাহেবের বিষয়েই যেহেতু এই নিবন্ধ, সেহেতু লেখাটি পুরাই পড়লাম। পড়ে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। সাথে সাথে কিছু প্রশ্ন জাগ্রত হয়েছে। যেই লেখাগুলি পড়ে আমার প্রশ্ন জেগেছে, আজকের লেখায় সেগুলো কোড করে দিচ্ছি।

 

“…সংগঠনে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখাটাই আমার বাবা মাওলানা মুহিউদ্দিন খান রাহ. জীবনের সবচেয়ে বড় কর্তব্য বলে জ্ঞান করতেন। তাই জমিয়ত করতে গিয়ে তিনি কখনও পদ পদবীর তোয়াক্কা করেননি। আর তাই নিজের চেয়েও অনেক অযোগ্য লোককে তিনি নেতা হিসাবে মেনে নিয়ে নিষ্ঠার সাথে দল ও দেশের জন্য কাজ করে গেছেন। সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও যোগ্যতা প্রদর্শন করা সত্ত্বেও তাঁর জুতার সমতুল্য নয় এমন অকর্মন্য ও বিতর্কিত ব্যক্তি কর্তৃক তিনি একাধিকবার দল তথা জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। যারা নিজের নামটি পর্যন্ত নিজের মাতৃভাষায় লিখতে পারেন না- এমন অযোগ্য ফেৎনাবাজরা তাঁকে বার বার দেওবন্দী নয় এই ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক অজুহাতে দাঁড় করিয়ে দল থেকে দূরে সরিয়ে দিয়ে মূলতঃ দল, দেশ ও জাতির অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করেছে।”

 

উক্ত কোড বিশিষ্ট প্যারায় বদরুদ্দিন খান সাহেব তাঁর বাবার প্রতি অসীম দরদ দেখিয়ে যে ভাষার ব্যবহার করেছেন তা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত। মাওলানা মুহিউদ্দিন খান সাহেবকে তৎকালিন সময়ে কারা বহিষ্কার করেছেন? যারা মহিউদ্দিন খান সাহেবের জুতার সমানও ছিলেন না। আল্লাহপাক আমাদেরকে ক্ষমা করুন। জমিয়ত এমন অযোগ্য ও নীচুমানের নেতাকে আজ পর্যন্ত এতো উুঁচ পার্যায়ের নেতা নির্বাচন করেছে বলে কোনো নজির নেই। যিনি মুহিউদ্দিন খান সাহেবের জুতার সমান না, অথচ তাঁকে বহিষ্কার করার ক্ষমতা রাখেন। আমার জানামতে তখন দলের সভাপতি ও নীতিনির্ধারক ছিলেন শায়খে কৌড়িয়া রহ. আল্লামা আকুনি, মাওলানা শামসুদ্দিন কাসেমীসহ অনেক বুজুর্গ ব্যক্তিবর্গ।

 

আরেকটি জায়গায় বদরুদ্দিন খান লিখেছেন- “পক্ষান্তরে নেতৃত্বের যে ফেৎনাবাজ শ্রেণিটি আমার বাবাকে একাধিকবার জমিয়ত থেকে তাঁর যোগ্যতার প্রতি বিদ্বেষপরায়ন হয়ে বহিষ্কার করেছে, তারা সারা জীবন সহীহ ও আসল জমিয়তী ও দেওবন্দী হওয়ার দাবীদার হওয়া সত্ত্বেও জীবনে কখনো হযরত শাইখুল ইসলামের জীবনীর দুলাইন অনুবাদ করে দেশবাসীর খেদমতে উপস্থাপন করেছে বলে কখনো শোনা যায়নি। অথচ জমিয়ত নেতার লকবধারী এই কপটদের ভুয়া মদনী-ভক্তি দেখলে যে কারো হাসির উদ্রেক হবে। কারণ, এরা পারে না এহেন কুকর্ম নেই, এমন কি মদনী ভক্তি প্রদর্শনে এরা এতটাই পরাঙ্গম যে, পিতৃদত্ব নামের আগে-পিছে মদনী, হোসাইনী ও আসআদী এমনভাবে যোগ করে নিয়েছে যে, তাতে কোনটা তার আসল নাম আর কোনটা পদবী তা শ্রোতার পক্ষে বোঝা মুশকিল। বিগত দিনে এই শ্রেণির অযোগ্য নেতৃত্ব জমিয়তকে এদেশের রাজনৈতিক ময়দানে কাংখিত ও প্রত্যাশিত লক্ষ অর্জনে অনেকে পিছিয়ে দিয়েছে। জমিয়ত থেকে পদলোভী ফেৎনাবাজদের যে ছাটাইপর্ব বা শুদ্ধি অভিযান সম্প্রতি শুরু করা হয়েছে তা আরো কয়েক দশক আগে শুরু হলে জমিয়ত আজ অনেকটাই গতিশীল ও পরিচ্ছন্ন ইমেজে থাকত। বিগত দিনের একটা উল্লেখযোগ্য সময় ইতিবাচক রাজনীতির পরিবর্তে অতিমাত্রায় ব্যক্তিপূঁজা আর মসলক-মশরবের চর্চা জমিয়তের অনেক সম্ভাবনাময় অর্জনকে ধুলিস্মাৎ করে দিয়েছে। সেই সাথে প্রতিষ্ঠাকালীন মূল লক্ষ্য উদ্দেশ্য থেকেও সংগঠনকে অনেক দূরে সরিয়ে এনেছে।”

 

এখানে তিনি “ এরা পারে না এহেন কুকর্ম নেই, বলতে কার কথা ইঙ্গিত করেছেন? জমিয়তের হাই কমান্ডে তিনি এমন কোন নেতাকে এতো জঘণ্য অপবাদ দিলেন আমার বুঝে আসছে না। পারে না এমন কোনো কুকর্ম এমন কথা কোনো ইসলামী আদর্শে বিশ্বাসী লোক কোনো নেতাকে ট্যাগ দিতে পারে না। এবং “মদনী ভক্তি প্রদর্শনে এরা এতটাই পরাঙ্গম যে, পিতৃদত্ব নামের আগে-পিছে মদনী, হোসাইনী ও আসআদী এমনভাবে যোগ করে নিয়েছে যে, তাতে কোনটা তার আসল নাম আর কোনটা পদবী তা শ্রোতার পক্ষে বোঝা মুশকিল।” এই কথা দিয়ে কাকে তিনি ইঙ্গিত করেছেন সেটাও তিনি পরিষ্কার করেন নি। কথা হলো, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের বর্তমান কার্যক্রম নিয়ে আমাদের বহু প্রশ্ন থাকতে পারে, কিন্তু জমিয়তের আল্লাহওয়ালা বুজুর্গদের ব্যাপারে এমন শক্ত কটুবাক্য জমিয়ত সংশ্লিষ্ট কেউ এর আগে ব্যবহার করা তো দূরের কথা জমিয়তের রাজনীতির সাথে সাংঘর্ষিক এমন কোনো নীতি আদর্শের নেতাকর্মীরাও এমন ভাষা দেদারসে ব্যবহার করেছে বলে আমার জানা নেই।

 

আরেক জায়গায় তিনি লিখেছেন- “অথচ সেই বর্ণাঢ্য অতীতের অধিকারী জমিয়তই আজ মসলক মশরকধারী কতিপয় সংকীর্ণমনা মানুষের কারণে বিগত অর্ধ শতাব্দি যাবৎ রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পরও বাংলাদেশের ন্যায় একটি ছোট্ট দেশে প্রিয় নবিজীর সা এর উকাব ও খেজুর গাছের ন্যায় অতুলনীয় প্রতিক নিয়ে স্বাধীনতা উত্তরকালে এদেশের কোনো একিট জাতীয় নির্বাচনে এককভাবে নির্বাচন করার মতো সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি।”

 

এখানে তিনি মসলক মশরকধারী শব্দটি আবার ব্যবহার করেছেন। আমরা জানি মসলক মশরক এই সকল শব্দ স্বাভাবিকত আহলে হাদীস বা সালাফিরা ইউজ করে থাকে। আমার প্রশ্ন তিনি বার বার মসলক মশরক শব্দ ব্যবহার করে তিনি কি আহলে হাদীসের প্রমোট করছেন? নাকি জামায়াতের ইসলামীর কোনো গোপন এজেন্ডা বাস্তবায়নের আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন।

 

আরেক জায়গায় লিখেছেন- “বর্তমানে এমন কেনো নেতা নেই, যাকে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। এই লজ্জাজনক শুন্যতা সৃষ্টি হয়েছে সেই সকল হীন মানসিকতা সম্পন্ন নেতৃত্বের কারণে, যারা সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থে সর্বদা জমিয়তকে দেওবন্দীয়ত ও মদনীয়তের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন রেখে সম্ভাবনাময় নেতৃত্ব তৈরীতে দেশের উলামায়ে কেরামের একটি বিরাট অংশকে বঞ্চিত রেখে নিজেরা সিন্দাবাদের দৈত্যের ন্যায় জমিয়তের কাঁধে জোর পূর্বক সওয়ার হয়ে ছিলেন এবং আছেন। কারণ যারা নিজেদের কদর্য স্বার্থ ও চিন্তা চেতনার সীমাবদ্ধতা ও সংকীর্ণ মানসিকতার কারণ জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের ন্যায় সুবিশাল মহীরূহকে শুধুমাত্র দেওবন্দ-পন্থীদের সংগঠন হিসেবে দাঁড় করাবার অপচেষ্ঠায় লিপ্ত তারা মূলত জমিয়ত প্রতিষ্ঠার সুমহান লক্ষ্য উদ্দেশ এবং সুবিস্তৃত চিন্তাধারা থেকে বিচ্ছিন্ন এক সাম্প্রদায়।”

 

এখানে অনেক কথার সাথে তিনি আবারও বলেছেন- “যারা সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থে সর্বদা জমিয়তকে দেওবন্দীয়ত ও মদনীয়তের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন রেখে সম্ভাবনাময় নেতৃত্ব তৈরীতে দেশের উলামায়ে কেরামের একটি বিরাট অংশকে বঞ্চিত রেখে নিজেরা সিন্দাবাদের দৈত্যের ন্যায় জমিয়তের কাঁধে জোর পূর্বক সওয়ার হয়ে ছিলেন এবং আছেন” এই কথা দ্বার তিনি সরাসরি দারুল উলুম দেওবন্দের আদর্শকে এ্যাটাক করেছেন বলে আমার মনে হচ্ছে। কারণ জমিয়ত শব্দের সাথে দারুল উলুম দেওবন্দেরই সবচে বেশি সংস্পর্শ। আর দারুল উলুম দেওবন্দের চিন্তাধারা লালন ছাড়া জমিয়তে নেতৃত্ব দেওয়ার ইতিহাস ছিলোও না এখনও নেই। কিন্তু তিনি বারবার তার কথার মারপ্যাচ দিয়ে দারুল উলুম দেওবন্দ ও মাসলাক মাশরাব দিয়ে কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছেন আমার বোধগম্য হচ্ছে না।

 

অন্য জায়গায় লিখেছেন- “দলের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা ফেৎনাবাজ নেতৃত্বের অপরিনামদর্শী বিতর্কিত কর্মকান্ডের ফলে উপমহাদেশের কালজয়ী মনীষীদের মেহনতে গড়া ঐতিহ্যবাহী শতবর্শী এই সংগঠন যদি একবার জনগণ পর্যায়ে বিতর্কিত হয়ে পড়ে, তবে এর জবাবদিহীতা বর্তমান নেতৃত্বকে শুধু এখানেই করতে হবে না, বরং পরকালেও করতে হবে।”

 

এখানে তিনি বর্তমান নেতৃত্বের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে থাকা লেকাদেরও ফেৎনাবাজ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এবং তাদেরকে ইহকাল ও পরাকালে কাটগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। কথা হলো, আহমদ বদরুদ্দিন খান জমিয়তের কোন দায়িত্বে আছেন? এবং তার লেখার প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পর্যালোচনা করে যা পাওয়া যায় তার অনেকটা স্ববিরোধী বক্তব্য। এক সময় বলেছেন দারুল উলুম দেওবন্দই একমাত্র জমিয়তের পরিচায়ক। আরেক সময় বলেছেন দেওবন্দের ধোঁয়া তুলে দলকে এগিয়ে যাবার অন্তরায় করছেন। তার টেটাল বক্তব্যের নির্যাস আমি খুজে পাচ্ছি না।

 

আরেক জায়গায় লিখেছেন- “তাই ক্ষেভের সাথেই বলতে হচ্ছে যে, ক্ষমতার উচ্ছিষ্ঠভোগী এই রাজনৈতিক জোকারদের যদি আজ শাইখুল ইসলাম হযরত মাদানি রহ. এর রাজনৈতিক উত্তরসূরী হিসেবে মেনে নেয়া হয়, তবে হযরত মাদানির জন্য এর চে বড় অপমান আর কিছুই হতে পারে না।”

 

এখানে তিনি জমিয়তের রাজনীতিতে রাজনৈতিক জোকার বলতে কাকে বুঝালেন। একজন লোক জমিয়তের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকলে এমন সকল উদ্ভট শব্দের অবতরাণা করার কথা নয়।

 

আরো লিখেছেন- “তবে বর্তমান অবস্থাদৃষ্টে আমার মনে হয় এবার সেই ফেৎনাবাজদের কেউ তাঁকে বহিষ্কার করার সুযোগ পেত না। বরং তার আগেই তিনি নিজেকে এই ফেৎনাবাজদের সান্নিধ্য থেকে প্রত্যাহার করে নিতেন। কারণ ফেৎনার সময়টিতে মুনাফেকদের সঙ্গ ত্যাগ করার ঈমানের অন্যতম দাবী।”

 

এখানে তিনি বর্তমান নেতৃত্বের গোটা দায়িত্বশীলদের অনেকটা মোনাফেকদের সাথে তুলনা করেছেন। এবং এই নেতৃত্বের সাথে তাঁর বাবা থাকতেন না বলে তিনি ঘোষণা দিচ্ছেন।

 

আমি পুরো লেখাটা বারবার পড়েছি। আহমদ বদরুদ্দীন খানের সাথে অমার ব্যক্তিগত পরিচয় নেই। তার সাথে আমার ব্যক্তি আক্রোশও নেই। তাঁর সম্পর্কে আমার অতি উঁচুমানের ধারণা ছিলো। কিন্তু তিনি যখন বলেছেন তার বাবাকে এমন সব লোক বহিষ্কার করেছন, যারা তার বাবার জুতার সমানও নয়, তখন বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করার চিন্তা করলাম। কেউ যদি আমার এই সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষনটি আহমদ বদরুদ্দীন খানের কাছে পৌঁছিয়ে তাঁকে এর ব্যাখ্যা দেয়ার বিষয়টি জানান তবে জাতি বিশাল একটা তথ্যবিভ্রাট থেকে রেহাই পাবে বলে আমি মনে করি।

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এবং আহমদ বদরুদ্দিন খান একটি বিতর্কিত নিবন্ধের সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ

Update Time : ১২:০৪:৫৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ মার্চ ২০১৮

ইকবাল হাসান জাহিদ

 

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এবং আহমদ বদরুদ্দিন খান একটি বিতর্কিত নিবন্ধের সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ

 

জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রাক্তন নির্বাহী সভাপতি উপমহাদেশের প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ মাওলানা মুহিউদ্দিন খানের কৃতিত্বের জন্য আমরা বাংলাদেশের ইসলামপন্থীরা তাঁর কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ। আল্লাহপাক তাঁকে জান্নাতের উঁচু মাকাম দান করুন।

 

গতকাল আমার কাছে যুব জমিয়ত বাংলাদেশের একটি স্মারক এসে পৌঁছেছে। স্মারকে মাওলানা মুহিউদ্দিন খান সাহেবের ছেলে আহমদ বদরুদ্দিন খানের একটা নিবন্ধে আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। মুহিউদ্দিন খান সাহেবের বিষয়েই যেহেতু এই নিবন্ধ, সেহেতু লেখাটি পুরাই পড়লাম। পড়ে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। সাথে সাথে কিছু প্রশ্ন জাগ্রত হয়েছে। যেই লেখাগুলি পড়ে আমার প্রশ্ন জেগেছে, আজকের লেখায় সেগুলো কোড করে দিচ্ছি।

 

“…সংগঠনে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখাটাই আমার বাবা মাওলানা মুহিউদ্দিন খান রাহ. জীবনের সবচেয়ে বড় কর্তব্য বলে জ্ঞান করতেন। তাই জমিয়ত করতে গিয়ে তিনি কখনও পদ পদবীর তোয়াক্কা করেননি। আর তাই নিজের চেয়েও অনেক অযোগ্য লোককে তিনি নেতা হিসাবে মেনে নিয়ে নিষ্ঠার সাথে দল ও দেশের জন্য কাজ করে গেছেন। সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও যোগ্যতা প্রদর্শন করা সত্ত্বেও তাঁর জুতার সমতুল্য নয় এমন অকর্মন্য ও বিতর্কিত ব্যক্তি কর্তৃক তিনি একাধিকবার দল তথা জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। যারা নিজের নামটি পর্যন্ত নিজের মাতৃভাষায় লিখতে পারেন না- এমন অযোগ্য ফেৎনাবাজরা তাঁকে বার বার দেওবন্দী নয় এই ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক অজুহাতে দাঁড় করিয়ে দল থেকে দূরে সরিয়ে দিয়ে মূলতঃ দল, দেশ ও জাতির অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করেছে।”

 

উক্ত কোড বিশিষ্ট প্যারায় বদরুদ্দিন খান সাহেব তাঁর বাবার প্রতি অসীম দরদ দেখিয়ে যে ভাষার ব্যবহার করেছেন তা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত। মাওলানা মুহিউদ্দিন খান সাহেবকে তৎকালিন সময়ে কারা বহিষ্কার করেছেন? যারা মহিউদ্দিন খান সাহেবের জুতার সমানও ছিলেন না। আল্লাহপাক আমাদেরকে ক্ষমা করুন। জমিয়ত এমন অযোগ্য ও নীচুমানের নেতাকে আজ পর্যন্ত এতো উুঁচ পার্যায়ের নেতা নির্বাচন করেছে বলে কোনো নজির নেই। যিনি মুহিউদ্দিন খান সাহেবের জুতার সমান না, অথচ তাঁকে বহিষ্কার করার ক্ষমতা রাখেন। আমার জানামতে তখন দলের সভাপতি ও নীতিনির্ধারক ছিলেন শায়খে কৌড়িয়া রহ. আল্লামা আকুনি, মাওলানা শামসুদ্দিন কাসেমীসহ অনেক বুজুর্গ ব্যক্তিবর্গ।

 

আরেকটি জায়গায় বদরুদ্দিন খান লিখেছেন- “পক্ষান্তরে নেতৃত্বের যে ফেৎনাবাজ শ্রেণিটি আমার বাবাকে একাধিকবার জমিয়ত থেকে তাঁর যোগ্যতার প্রতি বিদ্বেষপরায়ন হয়ে বহিষ্কার করেছে, তারা সারা জীবন সহীহ ও আসল জমিয়তী ও দেওবন্দী হওয়ার দাবীদার হওয়া সত্ত্বেও জীবনে কখনো হযরত শাইখুল ইসলামের জীবনীর দুলাইন অনুবাদ করে দেশবাসীর খেদমতে উপস্থাপন করেছে বলে কখনো শোনা যায়নি। অথচ জমিয়ত নেতার লকবধারী এই কপটদের ভুয়া মদনী-ভক্তি দেখলে যে কারো হাসির উদ্রেক হবে। কারণ, এরা পারে না এহেন কুকর্ম নেই, এমন কি মদনী ভক্তি প্রদর্শনে এরা এতটাই পরাঙ্গম যে, পিতৃদত্ব নামের আগে-পিছে মদনী, হোসাইনী ও আসআদী এমনভাবে যোগ করে নিয়েছে যে, তাতে কোনটা তার আসল নাম আর কোনটা পদবী তা শ্রোতার পক্ষে বোঝা মুশকিল। বিগত দিনে এই শ্রেণির অযোগ্য নেতৃত্ব জমিয়তকে এদেশের রাজনৈতিক ময়দানে কাংখিত ও প্রত্যাশিত লক্ষ অর্জনে অনেকে পিছিয়ে দিয়েছে। জমিয়ত থেকে পদলোভী ফেৎনাবাজদের যে ছাটাইপর্ব বা শুদ্ধি অভিযান সম্প্রতি শুরু করা হয়েছে তা আরো কয়েক দশক আগে শুরু হলে জমিয়ত আজ অনেকটাই গতিশীল ও পরিচ্ছন্ন ইমেজে থাকত। বিগত দিনের একটা উল্লেখযোগ্য সময় ইতিবাচক রাজনীতির পরিবর্তে অতিমাত্রায় ব্যক্তিপূঁজা আর মসলক-মশরবের চর্চা জমিয়তের অনেক সম্ভাবনাময় অর্জনকে ধুলিস্মাৎ করে দিয়েছে। সেই সাথে প্রতিষ্ঠাকালীন মূল লক্ষ্য উদ্দেশ্য থেকেও সংগঠনকে অনেক দূরে সরিয়ে এনেছে।”

 

এখানে তিনি “ এরা পারে না এহেন কুকর্ম নেই, বলতে কার কথা ইঙ্গিত করেছেন? জমিয়তের হাই কমান্ডে তিনি এমন কোন নেতাকে এতো জঘণ্য অপবাদ দিলেন আমার বুঝে আসছে না। পারে না এমন কোনো কুকর্ম এমন কথা কোনো ইসলামী আদর্শে বিশ্বাসী লোক কোনো নেতাকে ট্যাগ দিতে পারে না। এবং “মদনী ভক্তি প্রদর্শনে এরা এতটাই পরাঙ্গম যে, পিতৃদত্ব নামের আগে-পিছে মদনী, হোসাইনী ও আসআদী এমনভাবে যোগ করে নিয়েছে যে, তাতে কোনটা তার আসল নাম আর কোনটা পদবী তা শ্রোতার পক্ষে বোঝা মুশকিল।” এই কথা দিয়ে কাকে তিনি ইঙ্গিত করেছেন সেটাও তিনি পরিষ্কার করেন নি। কথা হলো, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের বর্তমান কার্যক্রম নিয়ে আমাদের বহু প্রশ্ন থাকতে পারে, কিন্তু জমিয়তের আল্লাহওয়ালা বুজুর্গদের ব্যাপারে এমন শক্ত কটুবাক্য জমিয়ত সংশ্লিষ্ট কেউ এর আগে ব্যবহার করা তো দূরের কথা জমিয়তের রাজনীতির সাথে সাংঘর্ষিক এমন কোনো নীতি আদর্শের নেতাকর্মীরাও এমন ভাষা দেদারসে ব্যবহার করেছে বলে আমার জানা নেই।

 

আরেক জায়গায় তিনি লিখেছেন- “অথচ সেই বর্ণাঢ্য অতীতের অধিকারী জমিয়তই আজ মসলক মশরকধারী কতিপয় সংকীর্ণমনা মানুষের কারণে বিগত অর্ধ শতাব্দি যাবৎ রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পরও বাংলাদেশের ন্যায় একটি ছোট্ট দেশে প্রিয় নবিজীর সা এর উকাব ও খেজুর গাছের ন্যায় অতুলনীয় প্রতিক নিয়ে স্বাধীনতা উত্তরকালে এদেশের কোনো একিট জাতীয় নির্বাচনে এককভাবে নির্বাচন করার মতো সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি।”

 

এখানে তিনি মসলক মশরকধারী শব্দটি আবার ব্যবহার করেছেন। আমরা জানি মসলক মশরক এই সকল শব্দ স্বাভাবিকত আহলে হাদীস বা সালাফিরা ইউজ করে থাকে। আমার প্রশ্ন তিনি বার বার মসলক মশরক শব্দ ব্যবহার করে তিনি কি আহলে হাদীসের প্রমোট করছেন? নাকি জামায়াতের ইসলামীর কোনো গোপন এজেন্ডা বাস্তবায়নের আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন।

 

আরেক জায়গায় লিখেছেন- “বর্তমানে এমন কেনো নেতা নেই, যাকে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। এই লজ্জাজনক শুন্যতা সৃষ্টি হয়েছে সেই সকল হীন মানসিকতা সম্পন্ন নেতৃত্বের কারণে, যারা সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থে সর্বদা জমিয়তকে দেওবন্দীয়ত ও মদনীয়তের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন রেখে সম্ভাবনাময় নেতৃত্ব তৈরীতে দেশের উলামায়ে কেরামের একটি বিরাট অংশকে বঞ্চিত রেখে নিজেরা সিন্দাবাদের দৈত্যের ন্যায় জমিয়তের কাঁধে জোর পূর্বক সওয়ার হয়ে ছিলেন এবং আছেন। কারণ যারা নিজেদের কদর্য স্বার্থ ও চিন্তা চেতনার সীমাবদ্ধতা ও সংকীর্ণ মানসিকতার কারণ জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের ন্যায় সুবিশাল মহীরূহকে শুধুমাত্র দেওবন্দ-পন্থীদের সংগঠন হিসেবে দাঁড় করাবার অপচেষ্ঠায় লিপ্ত তারা মূলত জমিয়ত প্রতিষ্ঠার সুমহান লক্ষ্য উদ্দেশ এবং সুবিস্তৃত চিন্তাধারা থেকে বিচ্ছিন্ন এক সাম্প্রদায়।”

 

এখানে অনেক কথার সাথে তিনি আবারও বলেছেন- “যারা সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থে সর্বদা জমিয়তকে দেওবন্দীয়ত ও মদনীয়তের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন রেখে সম্ভাবনাময় নেতৃত্ব তৈরীতে দেশের উলামায়ে কেরামের একটি বিরাট অংশকে বঞ্চিত রেখে নিজেরা সিন্দাবাদের দৈত্যের ন্যায় জমিয়তের কাঁধে জোর পূর্বক সওয়ার হয়ে ছিলেন এবং আছেন” এই কথা দ্বার তিনি সরাসরি দারুল উলুম দেওবন্দের আদর্শকে এ্যাটাক করেছেন বলে আমার মনে হচ্ছে। কারণ জমিয়ত শব্দের সাথে দারুল উলুম দেওবন্দেরই সবচে বেশি সংস্পর্শ। আর দারুল উলুম দেওবন্দের চিন্তাধারা লালন ছাড়া জমিয়তে নেতৃত্ব দেওয়ার ইতিহাস ছিলোও না এখনও নেই। কিন্তু তিনি বারবার তার কথার মারপ্যাচ দিয়ে দারুল উলুম দেওবন্দ ও মাসলাক মাশরাব দিয়ে কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছেন আমার বোধগম্য হচ্ছে না।

 

অন্য জায়গায় লিখেছেন- “দলের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা ফেৎনাবাজ নেতৃত্বের অপরিনামদর্শী বিতর্কিত কর্মকান্ডের ফলে উপমহাদেশের কালজয়ী মনীষীদের মেহনতে গড়া ঐতিহ্যবাহী শতবর্শী এই সংগঠন যদি একবার জনগণ পর্যায়ে বিতর্কিত হয়ে পড়ে, তবে এর জবাবদিহীতা বর্তমান নেতৃত্বকে শুধু এখানেই করতে হবে না, বরং পরকালেও করতে হবে।”

 

এখানে তিনি বর্তমান নেতৃত্বের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে থাকা লেকাদেরও ফেৎনাবাজ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এবং তাদেরকে ইহকাল ও পরাকালে কাটগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। কথা হলো, আহমদ বদরুদ্দিন খান জমিয়তের কোন দায়িত্বে আছেন? এবং তার লেখার প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পর্যালোচনা করে যা পাওয়া যায় তার অনেকটা স্ববিরোধী বক্তব্য। এক সময় বলেছেন দারুল উলুম দেওবন্দই একমাত্র জমিয়তের পরিচায়ক। আরেক সময় বলেছেন দেওবন্দের ধোঁয়া তুলে দলকে এগিয়ে যাবার অন্তরায় করছেন। তার টেটাল বক্তব্যের নির্যাস আমি খুজে পাচ্ছি না।

 

আরেক জায়গায় লিখেছেন- “তাই ক্ষেভের সাথেই বলতে হচ্ছে যে, ক্ষমতার উচ্ছিষ্ঠভোগী এই রাজনৈতিক জোকারদের যদি আজ শাইখুল ইসলাম হযরত মাদানি রহ. এর রাজনৈতিক উত্তরসূরী হিসেবে মেনে নেয়া হয়, তবে হযরত মাদানির জন্য এর চে বড় অপমান আর কিছুই হতে পারে না।”

 

এখানে তিনি জমিয়তের রাজনীতিতে রাজনৈতিক জোকার বলতে কাকে বুঝালেন। একজন লোক জমিয়তের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকলে এমন সকল উদ্ভট শব্দের অবতরাণা করার কথা নয়।

 

আরো লিখেছেন- “তবে বর্তমান অবস্থাদৃষ্টে আমার মনে হয় এবার সেই ফেৎনাবাজদের কেউ তাঁকে বহিষ্কার করার সুযোগ পেত না। বরং তার আগেই তিনি নিজেকে এই ফেৎনাবাজদের সান্নিধ্য থেকে প্রত্যাহার করে নিতেন। কারণ ফেৎনার সময়টিতে মুনাফেকদের সঙ্গ ত্যাগ করার ঈমানের অন্যতম দাবী।”

 

এখানে তিনি বর্তমান নেতৃত্বের গোটা দায়িত্বশীলদের অনেকটা মোনাফেকদের সাথে তুলনা করেছেন। এবং এই নেতৃত্বের সাথে তাঁর বাবা থাকতেন না বলে তিনি ঘোষণা দিচ্ছেন।

 

আমি পুরো লেখাটা বারবার পড়েছি। আহমদ বদরুদ্দীন খানের সাথে অমার ব্যক্তিগত পরিচয় নেই। তার সাথে আমার ব্যক্তি আক্রোশও নেই। তাঁর সম্পর্কে আমার অতি উঁচুমানের ধারণা ছিলো। কিন্তু তিনি যখন বলেছেন তার বাবাকে এমন সব লোক বহিষ্কার করেছন, যারা তার বাবার জুতার সমানও নয়, তখন বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করার চিন্তা করলাম। কেউ যদি আমার এই সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষনটি আহমদ বদরুদ্দীন খানের কাছে পৌঁছিয়ে তাঁকে এর ব্যাখ্যা দেয়ার বিষয়টি জানান তবে জাতি বিশাল একটা তথ্যবিভ্রাট থেকে রেহাই পাবে বলে আমি মনে করি।

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ