‘ঘুম থেকে উঠে দেখি ঘর নাই’
- Update Time : ০৫:৫১:১৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ জুলাই ২০২০
- / ০ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
ডেস্ক রিপোর্ট :: সময় তখন ভোর ৬টা। ফরিদপুর পৌরসভার সাদিপুর, বিলগজারিয়া এলাকার মানুষ সবে ঘুম থেকে জাগতে শুরু করেছে। হঠাৎ বিকট শব্দ। আতঙ্কিত হয়ে বাইরে এসে কেউ দেখলেন তার রান্নাঘর নেই, কেউ দেখলেন গবাদিপশুসহ ভেসে গেছে গোয়ালঘর। চোখের সামনে দিয়ে তীব্র স্রোতে ভেসে যাচ্ছে ঘরের আসবাবপত্র। শুরু হয়ে যায় চিৎকার- চেঁচামেচি। অনেকে নারী-শিশুদের নিয়ে দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে আশ্রয় নেন সড়কে। কেউ স্রোত থেকে তোলার চেষ্টা করেন খাট, টেবিল-চেয়ার, বাসনকোসন। গতকাল বন্যার পানির চাপে ফরিদপুরের শহররক্ষা বাঁধটি ধসে পড়লে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বর্তমানে বাঁধ এলাকার ২০টি পরিবার তাদের বাড়ির মালামাল নিয়ে রাস্তায় খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছে। টানা বন্যা আর তীব্র ভাঙনে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশের উত্তর-পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদ। নদীর পানি কমলেও এখনো নিমজ্জিত অধিকাংশ নিম্নাঞ্চল, ফসলের খেত। এ ছাড়া পানি বাড়ছে কিছু নদীতে। গতকালও অনেক এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। মুন্সীগঞ্জের ভাগ্যকুল পয়েন্টে গতকালও পদ্মার পানি বিপৎসীমার ৬৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পদ্মার পানিতে নতুন করে প্লাবিত হয়েছে শরীয়তপুরের অনেক এলাকা। নওগাঁয় বন্যার পানিতে ৪ হাজার ২০০ হেক্টর জমির ফসল এখনো নিমজ্জিত। টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীতে বৈরান নদীর বাঁধ ও গাইড ওয়াল ভেঙে প্লাবিত হয়েছে ১৫ গ্রাম। বরগুনায় পায়রা নদীর ব্লক সরে যাচ্ছে। এতে ভয়াবহ ভাঙনের মুখে পড়েছে আমতলী পৌরশহর।
গত কয়েকদিন নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করলেও এখনো ১৩টি নদ-নদীর পানি ২১টি পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, গতকাল সকালে ১০১টি পর্যবেক্ষণাধীন পানি সমতল স্টেশনের ৫৬টিতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে যা আগের দিন ছিল ৪১টি। ১৬টি জেলার মানুষ চলমান বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। অবশ্য বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, অধিকাংশ নদ-নদীর পানি সমতল হ্রাস পাচ্ছে এবং আগামী ২৪ ঘণ্টা তা অব্যাহত থাকতে পারে। এ ছাড়া আজকের মধ্যে সিলেট, সুনামগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও মানিকগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। অপরদিকে নাটোর, মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর ও ঢাকা জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকতে পারে।
আমাদের বিভিন্ন জেলার সংবাদকর্মীরা জানিয়েছেন সেখানকার বন্যা পরিস্থিতি। গাইবান্ধা : ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর পানি বিপৎসীমার অনেক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপৎসীমার ৮৩ সেন্টিমিটার, ঘাঘট নদীর পানি ৫৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট, করতোয়া ও তিস্তার পানি ধীরগতিতে কমছে। এদিকে পানি কমতে শুরু করায় বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকায় নদী ভাঙন শুরু হয়েছে। সদর উপজেলার মোল্লারচর ইউনিয়নে গত চার দিনে বাজে চিথুলিয়া ও চিথুলিয়া গ্রাম দুটির ৩১৮টি পরিবার নদী ভাঙনে গৃহহারা হয়েছে। সুন্দরগঞ্জের শ্রীপুর, হরিপুর ও কাপাসিয়ার পোড়ার চর এবং সাঘাটা উপজেলার হলদিয়ায় নদী ভাঙন শুরু হয়েছে।
টাঙ্গাইল : জেলার ধনবাড়ী উপজেলার বৈরান নদীর মুশুদ্দি কসাইবাড়ি বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ ও মুশুদ্দি বাজার সংলগ্ন গাইড ওয়াল ভেঙে ১৫ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে আমন বীজতলা ও শত শত একর সবজি খেত, মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে মুশুদ্দি কামারপাড়া, উত্তরপাড়া, পূর্বপাড়া, ভাতকুড়া, ফুলবাড়ী, কয়ড়া, চরপাড়াসহ বিভিন্ন গ্রামের কয়েকশ পরিবার।
শরীয়তপুর : পদ্মার পানি গতকাল সকাল ৬টায় সুরেশ্বর পয়েন্টে বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পদ্মার পানি বেড়ে জেলার নড়িয়া, জাজিরা ও ভেদরগঞ্জ উপজেলার নিম্নাঞ্চলের প্রায় ২০টি গ্রামে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। মোক্তারের চর ও নড়িয়া-সুরেশ্বর সড়কের সোনারবাজার এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। সড়কগুলো দিয়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
মুন্সীগঞ্জ : টঙ্গিবাড়ী, লৌহজং ও শ্রীনগর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। হঠাৎ করে পদ্মার পানি বৃদ্ধি পেয়ে এসব উপজেলার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে প্রায় আড়াই হাজার পরিবারের ১৫ হাজার মানুষ। বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য সংকটে পড়েছে পানিবন্দী মানুষগুলো। পাউবোর সহকারী প্রকৌশলী রাকিবুল ইসলাম জানান, গত তিন দিন ধরে মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। গতকালও পদ্মার পানি মাওয়ায় বিপৎসীমার ৫৮ সেন্টিমিটার এবং ভাগ্যকুল পয়েন্টে বিপৎসীমার ৬৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
কুড়িগ্রাম : ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি আবার বৃদ্ধি পেয়ে কুড়িগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। কুড়িগ্রাম পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম গতকাল দুপুরে জানান, ২৪ ঘণ্টায় ধরলা নদীর পানি বেড়ে চিলমারী পয়েন্টে বিপৎসীমার ৬৬ সেন্টিমিটার, নুনখাওয়া পয়েন্টে ৫১ সেন্টিমিটার, ধরলা নদীর সেতু পয়েন্টে ৫৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
ফরিদপুর : শহররক্ষা বাঁধ ধসে যাওয়ায় গতকাল সকালে মুহূর্তের মধ্যে পানির তোড়ে হারিয়ে যায় পৌরসভার বর্ধিত অংশের অনেকের বাড়িঘর। চোখে পানি নিয়ে আলিয়াবাদ ইউনিয়নের বিল গজারিয়া গ্রামের আহম্মদ শেখ বলেন, ‘হঠাৎ কইরা চিৎকার চেঁচামেচি শুইন্যা ঘুম থেইক্যা উইঠ্যা দেহি রান্নাঘর নাই, ঘরের মালসামানা সবই ভাইস্যা গেছে পানিতে’। শুধু আহম্মদ শেখের ঘর নয়, আরও অনেকেরই ঘরবাড়ি, গাছ, আসবাবপত্র পানিরে তোড়ে ভেসে গেছে। বর্তমানে বাঁধ এলাকার ২০টি পরিবার মালামাল নিয়ে রাস্তায় খোলা আকাশের নিচে রয়েছে। বৃষ্টি বাড়িয়েছে আরও ভোগান্তি। আলিয়াবাদ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আকতারুজ্জামান জানান, বন্যার আগে থেকেই শহররক্ষা বাঁধটির বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত ছিল। গতকাল সকালে হঠাৎ করেই সাদিপুর এলাকায় বাঁধের একটি অংশ তীব্র পানির স্রোতে ভেঙে যায়। যে যেভাবে পেরেছে দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়েছে। অনেকেই ঘরের মালামাল বের করতে পারেনি। পানিতে ভেসে গেছে মালামাল। এদিকে গত ১২ ঘণ্টায় পদ্মার পানি না বাড়লেও তা বিপৎসীমার ১০৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলা প্রশাসক অতুল সরকার জানান, জেলার ৩০টি ইউনিয়নের ২২ হাজার পরিবার এখন পানিবন্দী। সুত্র: বিডিপ্রতিদিন





























