০২:০৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কবি আল মাহমুদের মৃত্যুতে আমরা শোকাহত

  • Update Time : ০৬:০৮:২০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯
  • / ০ বার নিউজটি পড়া হয়েছে

সৈয়দ মবনু ::

 

আল মাহমুদ বিশ শতকের দ্বিতীয় অংশে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। তিনি শুধু কবি নয়, একাধারে ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্প লেখক, শিশুসাহিত্যিক, ছাড়াকার এবং সাংবাদিক। তিনি তাঁর কাজ দিয়ে আধুনিক বাংলা কবিতাকে নতুন আঙ্গিকে, চেতনায় ও বাক্ভঙ্গীতে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছেন। তিনি ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সম্মুখ সমরে অংশ নিয়েছেন। তিনি স্বাধীনতার সরকার বিরোধী দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন।

 

আল মাহমুদের জন্ম, শৈশব, কৈশোর, যৌবন গিয়েছে তিতাস নদীর তীরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়। তিনি তাঁর বিভিন্ন কবিতায় তিতাসের স্মৃতিচারণ করেছেন বিভিন্নভাবে। ‘তিতাস’ শিরোনামে তাঁর একটি পূর্ণাঙ্গ কবিতাও আছে। এতে তিনি বলেছেন,
‘এ আমার শৈশবের নদী জলের প্রহার
সারাদিন তীর ভাঙে, পাক খায়, ঘোলা স্রোতের টানে
যৌবনের প্রতীকের মতো অসংখ্য নৌকার পালে। (তিতাস)

 

আল মাহমুদের জন্ম ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার মোড়াইল গ্রামে। তাঁর মূল নাম মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি থানার সাধনা হাই স্কুল এবং পরে চট্টগ্রামের সীতাকু- হাই স্কুলের পড়াশোনা করেন। মূলত এই সময় থেকেই তার লেখালেখির শুরু। এই কবি আজীবন তিতাসের মতোই আত্মপ্রত্যয়ী এবং খরস্রোত। সংবাদপত্রে লেখালেখির সূত্র ধরে তিনি ঢাকা আসেন ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে। কবি আল মাহমুদের প্রথম ঢাকায় আসার স্মৃতিচারণে তৎকালিন সওগাত সম্পাদক কবি ও সাংবাদিক আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী আমাকে বলেন, একটা ছেলে একটা টিনের বক্স হাতে সওগাত অফিসে আসে কবিতা দিতে। দেখেই বুঝা যাচ্ছে সদ্য গ্রাম থেকে আসা। আমি তাকে বললাম, টেবিলে কবিতা রেখে যাও। সে তাই করলো। কবিতা হাতে নিয়ে দেখলাম, ভালো কবিতা। প্রকাশও করলাম। সেই ছেলে একদিন আল মাহমুদ হয়ে ওঠে। আমাদের স্বীকার করতে হবে, গ্রাম থেকে ঢাকায় আসা এই কবি শুধু কবিতা সাধনা করে একের পর এক সাফলতা অর্জন করেছেন। ডিঙিয়ে গেছেন তাঁর সময়ের সকল কবিকে।

 

আল মাহমুদের লেখালেখির শুরু যতটুকু জানা যায়, সমকালিন বাংলা সাপ্তাহিক পত্র-পত্রিকার মধ্যে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী সম্পাদিত ও নাজমুল হক প্রকাশিত সাপ্তাহিক কাফেলায়। তিনি নাসির উদ্দিনের সওগাতেও লিখতেন। আল মাহমুদের কর্মজীবন শুরু হয় দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে। ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী কাফেলার চাকরি ছেড়ে দিলে তিনি সেখানে সম্পাদক হিসেবে যোগদেন।

 

১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ১৮ বছর বয়সে কবিতা লিখে আল মাহমুদ প্রশংসিত হতে থাকেন।। ঢাকায় আসার পর পত্রিকায় কাজ নেন ও সাহিত্যে পুরোদমে মনযোগী হন। ঢাকা থেকে প্রকাশিত সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল পত্রিকা এবং কলকাতার নতুন সাহিত্য, চতুষ্কোণ, ময়ূখ, কৃত্তিবাস ও বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত বিখ্যাত ‘কবিতা’ পত্রিকায় লেখালেখির সুবাদে ঢাকা-কলকাতার পাঠকদের কাছে তার নাম সুপরিচিত হয়ে ওঠে এবং তাকে নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়।
১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে কবিতার বই ‘লোক লোকান্তর’ প্রকাশিত হলে তিনি বাংলার প্রখ্যাত কবিদের দৃষ্টি আকর্ষন করেন। এরপর ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় ‘কালের কলস’, ও ‘সোনালি কাবিন’, ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘মায়াবী পর্দা দুলে উঠো’। এই কবিতার বইগুলো আল মাহমুদকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম সারির কবি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি গল্প লেখায় মনোযোগী হন। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁর প্রথম ছোটগল্পের বই ‘পানকৌড়ির রক্ত’ প্রকাশিত হয়। ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘কবি ও কোলাহল’ প্রকাশিত হয়।

 

আল মাহমুদ আধুনিক বাংলা কবিতার শহরমুখী প্রবণতার মধ্যেই ভাটি বাংলার জনজীবন, গ্রামীণ আবহ, নদীনির্ভর জনপদ, চরাঞ্চলের জীবনপ্রবাহ এবং নরনারীর চিরন্তন প্রেম-বিরহ, সহজিয়া, ধ্রুপদি, বাউল-মরমি, বাস্তব-পরাবাস্তব, ধর্ম-ধর্মহীনতা, আগুন-পানি, শালিনতা-অশ্লীলতার সংমিশ্রন করেছেন তার কবিতায়। ফলে বিভিন্ন খন্ডে খন্ডিত সমাজের কোন খন্ডই তাঁকে হজম করতে পারেনি। অনেকের সাথে তাঁর সংঘাতটা এখানেই। দলান্ধ ধার্মিক কিংবা অধার্মিকেরা নিজেদের মতো না পেয়ে করেছে আল-মাহমুদের অপপ্রচার। এই সব অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আল মাহমুদ বলেন, আমি যেমন অজু করে কবিতা লেখি না, তেমনি আমি আমার বিশ্বাসকেও বাদ দিতে পারি না। (লেখককে কবি নিজেই বলেছেন)।

 

কবি আল মাহমুদ ৮২ বছর বয়সে ১৫ ফেব্রুয়ানি শুক্রবার রাত ১১টারদিকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আমরা তাঁর মৃত্যুতে শোকাহত। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতের উঁচু মাকাম দান করুন।

 

লেখক: কবি ও গবেষক সৈয়দ মবনু, সিলেট।

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ

কবি আল মাহমুদের মৃত্যুতে আমরা শোকাহত

Update Time : ০৬:০৮:২০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

সৈয়দ মবনু ::

 

আল মাহমুদ বিশ শতকের দ্বিতীয় অংশে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। তিনি শুধু কবি নয়, একাধারে ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্প লেখক, শিশুসাহিত্যিক, ছাড়াকার এবং সাংবাদিক। তিনি তাঁর কাজ দিয়ে আধুনিক বাংলা কবিতাকে নতুন আঙ্গিকে, চেতনায় ও বাক্ভঙ্গীতে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছেন। তিনি ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সম্মুখ সমরে অংশ নিয়েছেন। তিনি স্বাধীনতার সরকার বিরোধী দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন।

 

আল মাহমুদের জন্ম, শৈশব, কৈশোর, যৌবন গিয়েছে তিতাস নদীর তীরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়। তিনি তাঁর বিভিন্ন কবিতায় তিতাসের স্মৃতিচারণ করেছেন বিভিন্নভাবে। ‘তিতাস’ শিরোনামে তাঁর একটি পূর্ণাঙ্গ কবিতাও আছে। এতে তিনি বলেছেন,
‘এ আমার শৈশবের নদী জলের প্রহার
সারাদিন তীর ভাঙে, পাক খায়, ঘোলা স্রোতের টানে
যৌবনের প্রতীকের মতো অসংখ্য নৌকার পালে। (তিতাস)

 

আল মাহমুদের জন্ম ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার মোড়াইল গ্রামে। তাঁর মূল নাম মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি থানার সাধনা হাই স্কুল এবং পরে চট্টগ্রামের সীতাকু- হাই স্কুলের পড়াশোনা করেন। মূলত এই সময় থেকেই তার লেখালেখির শুরু। এই কবি আজীবন তিতাসের মতোই আত্মপ্রত্যয়ী এবং খরস্রোত। সংবাদপত্রে লেখালেখির সূত্র ধরে তিনি ঢাকা আসেন ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে। কবি আল মাহমুদের প্রথম ঢাকায় আসার স্মৃতিচারণে তৎকালিন সওগাত সম্পাদক কবি ও সাংবাদিক আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী আমাকে বলেন, একটা ছেলে একটা টিনের বক্স হাতে সওগাত অফিসে আসে কবিতা দিতে। দেখেই বুঝা যাচ্ছে সদ্য গ্রাম থেকে আসা। আমি তাকে বললাম, টেবিলে কবিতা রেখে যাও। সে তাই করলো। কবিতা হাতে নিয়ে দেখলাম, ভালো কবিতা। প্রকাশও করলাম। সেই ছেলে একদিন আল মাহমুদ হয়ে ওঠে। আমাদের স্বীকার করতে হবে, গ্রাম থেকে ঢাকায় আসা এই কবি শুধু কবিতা সাধনা করে একের পর এক সাফলতা অর্জন করেছেন। ডিঙিয়ে গেছেন তাঁর সময়ের সকল কবিকে।

 

আল মাহমুদের লেখালেখির শুরু যতটুকু জানা যায়, সমকালিন বাংলা সাপ্তাহিক পত্র-পত্রিকার মধ্যে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী সম্পাদিত ও নাজমুল হক প্রকাশিত সাপ্তাহিক কাফেলায়। তিনি নাসির উদ্দিনের সওগাতেও লিখতেন। আল মাহমুদের কর্মজীবন শুরু হয় দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে। ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী কাফেলার চাকরি ছেড়ে দিলে তিনি সেখানে সম্পাদক হিসেবে যোগদেন।

 

১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ১৮ বছর বয়সে কবিতা লিখে আল মাহমুদ প্রশংসিত হতে থাকেন।। ঢাকায় আসার পর পত্রিকায় কাজ নেন ও সাহিত্যে পুরোদমে মনযোগী হন। ঢাকা থেকে প্রকাশিত সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল পত্রিকা এবং কলকাতার নতুন সাহিত্য, চতুষ্কোণ, ময়ূখ, কৃত্তিবাস ও বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত বিখ্যাত ‘কবিতা’ পত্রিকায় লেখালেখির সুবাদে ঢাকা-কলকাতার পাঠকদের কাছে তার নাম সুপরিচিত হয়ে ওঠে এবং তাকে নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়।
১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে কবিতার বই ‘লোক লোকান্তর’ প্রকাশিত হলে তিনি বাংলার প্রখ্যাত কবিদের দৃষ্টি আকর্ষন করেন। এরপর ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় ‘কালের কলস’, ও ‘সোনালি কাবিন’, ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘মায়াবী পর্দা দুলে উঠো’। এই কবিতার বইগুলো আল মাহমুদকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম সারির কবি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি গল্প লেখায় মনোযোগী হন। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁর প্রথম ছোটগল্পের বই ‘পানকৌড়ির রক্ত’ প্রকাশিত হয়। ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘কবি ও কোলাহল’ প্রকাশিত হয়।

 

আল মাহমুদ আধুনিক বাংলা কবিতার শহরমুখী প্রবণতার মধ্যেই ভাটি বাংলার জনজীবন, গ্রামীণ আবহ, নদীনির্ভর জনপদ, চরাঞ্চলের জীবনপ্রবাহ এবং নরনারীর চিরন্তন প্রেম-বিরহ, সহজিয়া, ধ্রুপদি, বাউল-মরমি, বাস্তব-পরাবাস্তব, ধর্ম-ধর্মহীনতা, আগুন-পানি, শালিনতা-অশ্লীলতার সংমিশ্রন করেছেন তার কবিতায়। ফলে বিভিন্ন খন্ডে খন্ডিত সমাজের কোন খন্ডই তাঁকে হজম করতে পারেনি। অনেকের সাথে তাঁর সংঘাতটা এখানেই। দলান্ধ ধার্মিক কিংবা অধার্মিকেরা নিজেদের মতো না পেয়ে করেছে আল-মাহমুদের অপপ্রচার। এই সব অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আল মাহমুদ বলেন, আমি যেমন অজু করে কবিতা লেখি না, তেমনি আমি আমার বিশ্বাসকেও বাদ দিতে পারি না। (লেখককে কবি নিজেই বলেছেন)।

 

কবি আল মাহমুদ ৮২ বছর বয়সে ১৫ ফেব্রুয়ানি শুক্রবার রাত ১১টারদিকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আমরা তাঁর মৃত্যুতে শোকাহত। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতের উঁচু মাকাম দান করুন।

 

লেখক: কবি ও গবেষক সৈয়দ মবনু, সিলেট।

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ